কৃষ্ণকলির ১২৬ বছর: রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যবোধ, মানবতার সংগ্রাম এবং সমকালীন বাস্তবতা

প্রকাশিত: ২:০৬ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৯, ২০২৬

কৃষ্ণকলির ১২৬ বছর: রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যবোধ, মানবতার সংগ্রাম এবং সমকালীন বাস্তবতা

Manual2 Ad Code

সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এমন কিছু কবিতা আছে, যেগুলো কেবল সাহিত্যিক সৃষ্টিই নয়, বরং সমাজ-দর্শন, মানবিক মূল্যবোধ এবং নান্দনিক চেতনার স্থায়ী দলিল হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কৃষ্ণকলি’ কবিতা তেমনই একটি অনন্য সৃষ্টি। ১৩০৭ বঙ্গাব্দের ৫ আষাঢ়ে (১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দ) শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে রচিত এই কবিতার ১২৬ বছর পূর্ণ হয়েছে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কবিতাটি আজও সমান প্রাসঙ্গিক, বরং অনেক ক্ষেত্রে নতুন অর্থে পুনরাবিষ্কৃত হচ্ছে। সমস্তই বিপুল পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে অবিশ্রান্ত।

বিশ্বের সেই অন্তর্নিহিত শক্তি, যার থেকে এই রূপময় পৃথিবী এবং সমগ্র বিশ্বের সৃষ্টি, সেই অন্তর্নিহিত শক্তিই হলো সমস্ত সৃষ্টির মূলসত্য। রবীন্দ্রনাথের মধ্যে এই আধ্যাত্মিক চেতনার সাথে যুক্ত হয়েছিল, বিশ্বের কোনো কিছুই স্থির হয়ে নেই। সমস্তই বিপুল পরিবর্তন, পরিবর্ধনের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে অবিশ্রান্ত। এই যে অনির্বাণ ছুটে চলা, অনন্ত জীবনপ্রবাহ এটাই হলো বিশ্বসৃষ্টির মূল তত্ত্ব।

কারণ, ‘কৃষ্ণকলি’ কেবল একজন কালো মেয়ের সৌন্দর্য আবিষ্কারের কবিতা নয়; এটি প্রচলিত সৌন্দর্যবোধের বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু গভীর প্রতিবাদ। এটি বর্ণভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানবিকতার কাব্যিক ঘোষণা। এটি এমন এক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, যেখানে মানুষের মূল্য তার গায়ের রঙে নয়, তার অস্তিত্ব, ব্যক্তিত্ব এবং প্রাণময় সৌন্দর্যে নিহিত।

শিলাইদহের মাঠ থেকে বিশ্বমানবতার পাঠ

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গত শতাব্দিতে লিখে গেছেন,
‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক/
মেঘলাদিনে দেখেছিলেম মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
ঘোমটা মাথায় ছিলনা তার মোটে,
মুক্তবেণী পিঠের ‘পরে লোটে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে
ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই,
শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে
কুটির হতে ত্রস্ত এল তাই।
আকাশ-পানে হানি যুগল ভুরু
শুনলে বারেক মেঘের গুরুগুরু।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
পূবে বাতাস এল হঠাত্‍‌ ধেয়ে,
ধানের ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ।
আলের ধারে দাঁড়িয়েছিলেম একা,
মাঠের মাঝে আর ছিল না কেউ।
আমার পানে দেখলে কিনা চেয়ে,
আমি জানি আর জানে সেই মেয়ে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
এমনি করে কাজল কালো মেঘ
জ্যৈষ্ঠমাসে আসে ঈশান কোণে।
এমনি করে কালো কোমল ছায়া
আষাঢ়মাসে নামে তমাল-বনে।
এমনি করে শ্রাবণ-রজনীতে
হঠাত্‍‌ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,
আর যা বলে বলুক অন্য লোক।
দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
মাথার পরে দেয়নি তুলে বাস,
লজ্জা পাবার পায়নি অবকাশ।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।’

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—

Manual7 Ad Code

“কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।”

এই পংক্তিগুলো বাংলা ভাষার অন্যতম শক্তিশালী মানবিক উচ্চারণ। এখানে কবি কেবল একটি মেয়েকে দেখেননি; তিনি দেখেছেন এক সামাজিক বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা সৌন্দর্যের নতুন সংজ্ঞা।

Manual4 Ad Code

উনিশ শতকের শেষভাগে যখন উপমহাদেশের সমাজে গায়ের রংকে কেন্দ্র করে নানা সামাজিক ধারণা ও কুসংস্কার বিদ্যমান ছিল, তখন রবীন্দ্রনাথ কালো মেয়ের সৌন্দর্যকে উদযাপন করেছেন। তিনি তাকে করুণা করেননি, তাকে ব্যতিক্রম হিসেবেও দেখেননি। বরং তিনি তার সৌন্দর্যকে প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে একাত্ম করেছেন।

মেঘ, বর্ষা, তমালবন, আষাঢ়-শ্রাবণের ছায়া—সবকিছুর সঙ্গে কৃষ্ণকলির রূপকে মিলিয়ে দিয়ে তিনি যেন বলতে চেয়েছেন, কালো কোনো ত্রুটি নয়; বরং প্রকৃতিরই এক গভীর ও মনোহর রূপ।

পূর্ববাংলার প্রকৃতি ও রবীন্দ্র-চেতনার বিকাশ

সাহিত্য সমালোচক প্রমথনাথ বিশী একবার বলেছিলেন, পূর্ববাংলায় না এলে রবীন্দ্রনাথ হয়তো নাগরিক কবিই থেকে যেতেন। কথাটি আংশিক অতিরঞ্জিত হলেও এর মধ্যে গভীর সত্য রয়েছে।

শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর—এই জনপদগুলো রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক ও মানবিক বিকাশে অসামান্য ভূমিকা রেখেছে। তিনি এখানে এসে শুধু জমিদারি পরিচালনা করেননি; তিনি বাংলার কৃষক, জেলে, মাঝি, গ্রামীণ নারী, লোকসংস্কৃতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।

‘কৃষ্ণকলি’ সেই অভিজ্ঞতারই ফসল। শহুরে অভিজাত দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এসে তিনি সাধারণ গ্রামীণ জীবনের ভেতর সৌন্দর্যের নতুন আবিষ্কার করেছিলেন। যে মেয়েটিকে সমাজ হয়তো গুরুত্ব দেয় না, কবি তাকেই অমরত্ব দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যদর্শন: রূপের আড়ালে মানবতা

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যজগতে সৌন্দর্য কখনো কেবল বাহ্যিক নয়। তাঁর কাছে সৌন্দর্য মানে জীবন, প্রাণশক্তি, সত্য এবং মানবিকতার সম্মিলন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, বিশ্বজগতের সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে এক অন্তর্নিহিত ঐক্য বিদ্যমান। এই পৃথিবীর কোনো কিছুই স্থির নয়; সবকিছুই পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং বিকাশের ধারায় প্রবাহমান। এই জীবনপ্রবাহের মধ্যেই তিনি সৌন্দর্যের উৎস খুঁজে পেয়েছেন।

‘কৃষ্ণকলি’ কবিতায় কালো মেয়েটির সৌন্দর্যও সেই জীবনপ্রবাহের অংশ। সে প্রকৃতির মতোই স্বতঃস্ফূর্ত, মুক্ত এবং অকৃত্রিম। তার মাথায় ঘোমটা নেই, তার চুল মুক্তবেণীতে পিঠে লুটিয়ে আছে। সে কোনো সাজানো সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; সে জীবন্ত সৌন্দর্যের প্রতীক।

একুশ শতকে বর্ণবাদ: দৃশ্যমান ও অদৃশ্য বাস্তবতা

বাংলাদেশে সাধারণভাবে বর্ণবাদকে অনেকেই পশ্চিমা বিশ্বের মতো কোনো বড় সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখেন না। আমাদের দেশে দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাপার্টহেইড ছিল না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো জাতিগত বিভাজনের ইতিহাসও নেই।

কিন্তু তাই বলে বর্ণবাদ নেই—এ কথা বলা কঠিন।

আমাদের সমাজে গায়ের রংকে কেন্দ্র করে এক ধরনের সাংস্কৃতিক বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। বিশেষত নারীদের ক্ষেত্রে এই বৈষম্য আরও প্রকট।

একটি মেয়ে জন্ম নেওয়ার পর থেকেই অনেক পরিবারে তার গায়ের রং নিয়ে মন্তব্য শুরু হয়। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে শুনতে হয়—“আরও একটু ফর্সা হলে ভালো হতো”, “বিয়েতে সমস্যা হবে”, “রোদে যেও না, কালো হয়ে যাবে” ইত্যাদি।

এই কথাগুলো নিছক মন্তব্য নয়; এগুলো সামাজিক মানসিকতার প্রতিফলন।

বাজার, বিজ্ঞাপন এবং সৌন্দর্যের বাণিজ্য

বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে সৌন্দর্য একটি পণ্য হয়ে উঠেছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি ধারণা প্রচার করেছে যে ফর্সা ত্বক মানেই সাফল্য, আকর্ষণীয়তা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা।

ফেয়ারনেস ক্রিম, প্রসাধনী পণ্য, ফ্যাশন শিল্প এবং বিজ্ঞাপনের একটি বড় অংশ এই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ব্যবসা করেছে।

যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে এই প্রবণতার সমালোচনা বেড়েছে, তবুও এর প্রভাব এখনো রয়ে গেছে।

টেলিভিশন নাটক, সিনেমা, মডেলিং, উপস্থাপনা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—বহু ক্ষেত্রেই একটি নির্দিষ্ট ধরনের সৌন্দর্যকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে কালো বা শ্যামবর্ণ নারীরা নিজেদের সম্পর্কে এক ধরনের হীনমন্যতায় আক্রান্ত হতে পারেন।

এই প্রবণতা রবীন্দ্রনাথের ‘কৃষ্ণকলি’-র মানবিক দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত।

বিয়ে, সামাজিক মর্যাদা এবং নারীর প্রতি বৈষম্য

Manual4 Ad Code

বাংলাদেশের অনেক পরিবারে এখনো বিয়ের ক্ষেত্রে গায়ের রং গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখা হয়।

পাত্রপক্ষের চাহিদা, আত্মীয়স্বজনের মন্তব্য এবং সামাজিক চাপ—সব মিলিয়ে কালো মেয়েদের প্রায়ই অতিরিক্ত মানসিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়।

যদিও শহুরে শিক্ষিত সমাজে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে, তবুও সমস্যাটি পুরোপুরি দূর হয়নি।

এখানে প্রশ্ন হলো, একজন মানুষের যোগ্যতা, শিক্ষা, কর্মদক্ষতা, সৃজনশীলতা কিংবা মানবিক গুণাবলি উপেক্ষা করে কেবল গায়ের রংকে কেন এত গুরুত্ব দেওয়া হবে?

রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলি এই প্রশ্নটিই ১২৬ বছর আগে উত্থাপন করেছিল।

পরিবর্তনের ইতিবাচক লক্ষণ

তবে বাংলাদেশের সমাজ সম্পূর্ণ স্থবির নয়। গত কয়েক দশকে নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সামাজিক নেতৃত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আজ নারী চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিচারক, সাংবাদিক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, গবেষক, বিজ্ঞানী এবং রাষ্ট্রনেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

এই পরিবর্তন সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করছে।

Manual8 Ad Code

ক্রমশ মানুষ উপলব্ধি করছে যে একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার গায়ের রং নয়; তার জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধ।

এই পরিবর্তন এখনো অসম্পূর্ণ, কিন্তু এটি আশাব্যঞ্জক।

কৃষ্ণকলির শিক্ষা: সৌন্দর্যের গণতন্ত্রীকরণ

‘কৃষ্ণকলি’ কবিতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো সৌন্দর্যের গণতন্ত্রীকরণ।

রবীন্দ্রনাথ সৌন্দর্যকে অভিজাত শ্রেণির একচেটিয়া সম্পদ হতে দেননি। তিনি সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছেন গ্রামীণ মাঠে, কৃষকের জীবনে, সাধারণ মানুষের মুখে এবং এক কালো মেয়ের হরিণ-চোখে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি আজও প্রাসঙ্গিক।

কারণ আধুনিক সমাজে আমরা প্রায়ই বাহ্যিক চাকচিক্যকে গুরুত্ব দিই, অথচ মানুষের ভেতরের সৌন্দর্যকে উপেক্ষা করি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন—সৌন্দর্য কোনো নির্দিষ্ট রং, আকৃতি বা মানদণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

সাম্য, মানবতা ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

বাংলাদেশের সংবিধান সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলে। একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের জন্য কেবল আইনি কাঠামো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সাংস্কৃতিক ও মানসিক পরিবর্তন।

পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সাহিত্য, শিল্প এবং সামাজিক সংগঠন—সবাইকে এই পরিবর্তনের অংশ হতে হবে।

বিশেষ করে শিশুদের এমনভাবে বড় করতে হবে, যাতে তারা মানুষের মূল্যায়ন করে তার চরিত্র, যোগ্যতা ও মানবিকতার ভিত্তিতে; গায়ের রঙের ভিত্তিতে নয়।

উপসংহার

‘কৃষ্ণকলি’ কবিতার ১২৬ বছর পূর্তি কেবল একটি সাহিত্যিক ঘটনা নয়; এটি আত্মসমালোচনারও একটি উপলক্ষ।

রবীন্দ্রনাথ যে কালো মেয়েটির মধ্যে সৌন্দর্যের অনন্ত সম্ভাবনা দেখেছিলেন, আমরা কি আজও সেই দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করতে পেরেছি?

বাংলাসাহিত্যের দিকপাল ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ‘কৃষ্ণকলি’ কবিতাকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা—

“রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলি”

একশ ছাব্বিশ বছর পেরিয়ে গেছে, তবু আজও দেখি,
মেঘের ভাঁজে জমে আছে সেই প্রাচীন চোখের রেখি।
ধানের ক্ষেতে বাতাস নামে, নদী ডাকে ঘাটের তীরে,
মানুষ শুধু বদলায় রূপ, সময় ছুটে নতুন নীড়ে।

পৃথিবী আজ দ্রুতগামী, যন্ত্রজালে বাঁধা জীবন,
আকাশ জুড়ে উপগ্রহের অগণিত সব অভিযোজন।
তবু কোথাও শ্যামল মুখের নিঃশব্দ এক দীর্ঘশ্বাস,
বর্ণবাদের ক্ষুদ্র বিষে জর্জরিত মানববিশ্বাস।

একদিন এক কবি দেখেন গ্রামবাংলার কালো মেয়ে,
মেঘের নিচে দাঁড়িয়ে আছে আপন সত্তা বুকের নিয়ে।
লোকের চোখে রঙের বিচার, কবির চোখে সৌন্দর্য,
সেই দৃষ্টির দীপ জ্বলে আজও অক্ষয় মহিমার্য।

আজকে দেখি শহরজুড়ে আলোর নীচে রঙের মেলা,
বিজ্ঞাপনের বিশাল দেয়াল শেখায় কত মিথ্যা খেলা।
বলছে তারা—ফর্সা হলে স্বপ্ন নাকি সহজ হয়,
কালো রঙে সাফল্যের পথটি নাকি বন্ধ রয়।

কিন্তু আমি মাঠে যাই আর নদীর পারে দাঁড়াই গিয়ে,
দেখি সেখানেও সূর্য ওঠে একই সোনার আলো নিয়ে।
শ্যামল মুখে ঘামের বিন্দু ঝলমলায় রৌদ্র-স্নানে,
সেই শ্রমিকের হাতে লেখা দেশের ভবিষ্যৎ গানে।

যে কৃষাণী ভোরের আগে ধানের ক্ষেতে নামে নীরব,
যে মজুরের কপাল জুড়ে রৌদ্রের আগুন দগ্ধ-তীব্র,
যে শিক্ষিকা গ্রামের পথে জ্ঞানের প্রদীপ হাতে চলে,
তাদের রঙের মাপকাঠি কোন সভ্যতা মাপে বলে?

সময় বলে—মানুষ চিনো মানুষেরই কর্মে গিয়ে,
মনের দীপ্তি, জ্ঞানের আলো, সাহস কত হৃদয় নিয়ে।
ত্বকের রঙে মর্যাদা কি? রক্ত তো সব একই লাল,
সকল মুখেই সমানভাবে জ্বলে জীবনেরই জয়গান।

একশ ছাব্বিশ বছরের এই দীর্ঘ ইতিহাসখানি,
শুধু কবির স্মৃতি নয়, এ জনপদের আত্মবাণী।
পদ্মা-মেঘনা-যমুনা জুড়ে যে বাতাসের চলাচল,
সেই বাতাসে ভেসে আসে সমতারই অনুরণন।

কত সাম্রাজ্য ধূলায় মিশে, কত পতাকা গেছে ঝরে,
কত প্রথার প্রাচীর ভেঙে মানুষ নেমেছে পথের পরে।
তবু কেন রঙের কারণে অবহেলার ক্ষত রয়ে যায়?
কেন এখনো কন্যাসন্তান নিজ গৃহেতে ভয়ই পায়?

কেন এখনো বিয়ের বাজার হিসাব কষে রঙের মান?
কেন এখনো যোগ্যতাকে ঢেকে রাখে কুসংস্কার?
কেন এখনো আয়নার কাছে শিখতে হয় লজ্জার ভাষা?
কেন এখনো কালো মুখে সমাজ দেখে অপূর্ণ আশা?

এই প্রশ্নের উত্তর লুকায় অর্থলোভের গভীর ফাঁদে,
বাজার নামে নতুন রাজা বিজ্ঞাপনের সোনার সাঁড়ে।
মানুষকে সে পণ্য করে, স্বপ্নকে দেয় বিক্রির দাম,
সৌন্দর্যও পণ্যে বদলে লেখে নতুন বিভ্রান্ত নাম।

কিন্তু মানুষ শুধু ক্রেতা নয়, মানুষ ইতিহাসের ধারা,
মানুষ মানে অন্যায় দেখে প্রতিবাদের দৃপ্ত তারা।
মানুষ মানে বৈষম্যের দেয়াল ভাঙার দৃঢ় হাত,
মানুষ মানে সত্যের পক্ষে নির্ভীক এক দীর্ঘ প্রভাত।

তাই আজ আবার উচ্চারণ করি আমরা স্পষ্ট স্বরে,
মানুষ বড় মানুষেরই মহৎ কর্মের গৌরবে।
রঙের ভেদে ভাগ হয় না নদী, আকাশ, শস্যক্ষেত,
রঙের ভেদে কমে না কারও বেঁচে থাকার অধিকারটেত।

যে তরুণী গবেষণাগারে নতুন দিনের স্বপ্ন গড়ে,
যে চিকিৎসক রাত জেগে থাকে রোগীর শিয়রে দাঁড়ে,
যে কবি লেখে মানুষের গান, যে শিল্পী রাঙায় দেশ,
তাদের গায়ের রঙের কাছে যোগ্যতা কি হয় অবশেষ?

দেখো ইতিহাস কেমন করে নীরব সত্য রেখে যায়,
যারা মানুষ চিনতে জানে, তারাই শেষে পথ দেখায়।
যারা শুধু বাহ্যরূপে গড়ে নিজেদের বিচারধারা,
তাদের চোখে জমে থাকে অজ্ঞতারই কালো কারা।

বাংলার মাটি শিখিয়েছে বৈচিত্র্যের গভীর মানে,
পলিমাটির রঙ বদলায় ঋতু বদলায় গানের টানে।
কৃষ্ণ মেঘে বর্ষা নামে, শ্যামল বনে প্রাণের ঢেউ,
কালো মাটির বুক না থাকলে সোনার ফসল ফলত কই?

সন্ধ্যা যখন নেমে আসে পশ্চিম আকাশ লাল করে,
রাত্রি আসে কৃষ্ণবর্ণে নক্ষত্রমালা জ্বালিয়ে ঘরে।
কেউ কি তবে রাতকে বলে সৌন্দর্যহীন অন্ধকার?
তবু কেন মানুষের বেলায় রঙের এত অহংকার?

আজকে যারা কন্যাশিশুর চোখে স্বপ্নের প্রদীপ জ্বালে,
তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই ভবিষ্যতের উজ্জ্বল কালে।
যে পরিবার শিক্ষা দেয়—নিজের শক্তি চিনে নাও,
অন্যায় যদি সামনে আসে, মাথা তুলে দাঁড়িয়ে যাও।

নারী আজ আর ঘরের কোণে নীরব কোনো নাম নয়,
নারী আজকে বিজ্ঞান, শিল্প, সংগ্রামেরই অন্য পরিচয়।
নারী আজকে নৌকা বেয়ে পৌঁছে যায় দুরন্ত স্রোতে,
নারী আজকে নেতৃত্ব দেয় মানবতার বৃহৎ পথে।

তবু পথের শেষ হয়নি, সামনে এখন বহু কাজ,
অবিচারের বিরুদ্ধে গড়তে হবে নতুন সমাজ।
যেখানে কোনো শিশুকে আর শুনতে হবে না অপমান,
যেখানে রঙ নয়, মানুষ হবে মর্যাদার প্রধান মান।

একশ ছাব্বিশ বছর আগে যে দৃষ্টি ছিল মুক্ত, দীপ্য,
সেই আলোকে ধারণ করে এগিয়ে যাক আগামী প্রজন্ম।
কবিতারও কাজ যে শুধু সৌন্দর্যের গান নয়,
কবিতারও কাজ অন্যায় দেখে প্রতিবাদের শঙ্খময়।

তাই লিখি আজ দীর্ঘ পঙ্‌ক্তি সময়েরই প্রান্তর জুড়ে,
মেঘের নিচে শস্যক্ষেতে, নগরীরও কংক্রিট ঘিরে।
লিখি মানুষের সমতার গান, মর্যাদার মহা-উৎসব,
লিখি ভবিষ্যৎ নির্মাণের দৃঢ় প্রত্যয় অবিরত।

যে কিশোরী আজ বিদ্যালয়ে বইয়ের পাতায় চোখ রাখে,
যে যুবতী কর্মক্ষেত্রে সংগ্রামেরই পতাকা আঁকে,
যে প্রবীণা জীবনভর সংসার গড়ে আলো জ্বালেন,
তাদের সবার গৌরবগাথা ইতিহাসের বুকে টানে।

পৃথিবী জুড়ে পরিবর্তনের অশ্ব ছুটে দিনরজনী,
তবু মানবতার মূল সুরে জাগুক নতুন চিরধ্বনি।
সকল বিভেদ, সকল ঘৃণা, সকল সংকীর্ণতার ক্ষয়,
সমতারই বিশাল বৃক্ষে ফুটুক মানুষের পরিচয়।

তখন হয়তো ভবিষ্যতের কোনো শিশু প্রশ্ন করে—
“রঙের কারণে মানুষ মানুষকে ছোট করত কবে রে?”
আমরা তখন হাসব নীরব, বলব শুধু এই কথাটি—
মানুষ জিতেছে, হার মেনেছে অজ্ঞতার অন্ধ রাতই।

এই প্রত্যয়ে শেষ না হয়ে কবিতা যাক বহুদূর,
নদীর মতো বয়ে চলুক অবিরাম এক জীবনসুর।
যতদিন এই বাংলাজুড়ে ধানের শীষে আলো ঝরে,
ততদিনই সমতার গান উচ্চারিত হবে ঘরে ঘরে।

একশ ছাব্বিশ বছর পরে এই আমাদের অঙ্গীকার—
মানুষ হবে মানুষেরই শ্রেষ্ঠ পরিচয়, শ্রেষ্ঠ অধিকার।
রঙের ভেদ নয়, হৃদয়ের দীপ্তিই হোক চূড়ান্ত ফলি,
সময়ের বুক জুড়ে ফুটুক নতুন নতুন কৃষ্ণকলি।
—(রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলি,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

বিশ্বকবি আমাদের শিখিয়েছিলেন—

“কালো? তা সে যতই কালো হোক,
দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।”

এই উচ্চারণ শুধু প্রেমের নয়, মানবতারও। এটি কেবল একজন নারীর সৌন্দর্যের স্বীকৃতি নয়, বরং সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের মর্যাদার ঘোষণা।

কৃষ্ণকলির ১২৬ বছর পরে দাঁড়িয়ে সেই ঘোষণার গুরুত্ব কমেনি; বরং আরও বেড়েছে। কারণ পরিবর্তিত বিশ্বের ভেতরেও মানুষ এখনো সমতা, মর্যাদা এবং সৌন্দর্যের প্রকৃত অর্থ খুঁজে ফিরছে। আর সেই অনুসন্ধানে রবীন্দ্রনাথের ‘কৃষ্ণকলি’ আজও আমাদের পথ দেখায়।

#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯
Bikash number : +8801716599589 (personal)
১৯ জুন ২০২৬

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ