হারমোনি ফেস্টিভ্যাল পর্যটন শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে: পর্যটনমন্ত্রী

প্রকাশিত: ৮:০৬ অপরাহ্ণ, জুন ১৯, ২০২৬

হারমোনি ফেস্টিভ্যাল পর্যটন শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে: পর্যটনমন্ত্রী

Manual1 Ad Code
  • শ্রীমঙ্গলে তিন দিনব্যাপী উৎসবের উদ্বোধন, অংশ নিচ্ছে ২৭টিরও বেশি নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী

নিজস্ব প্রতিবেদক, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) | ১৯ জুন ২০২৬ : বাংলাদেশের বহুজাতিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনধারা এবং বাঙালি সংস্কৃতির সম্মিলিত উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ‘হারমোনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-২’। আয়োজকরা মনে করছেন, এ উৎসব শুধু সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির বার্তাই নয়, বরং দেশের পর্যটন শিল্প, স্থানীয় অর্থনীতি এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শুক্রবার (১৯ জুন ২০২৬) বিকেলে শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্যবাহী ফুলছড়া চা বাগান মাঠে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম এমপি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “হারমোনি ফেস্টিভ্যাল এ অঞ্চলের পর্যটন শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে সহায়ক হবে।”

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য সমন্বয়ের দেশ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর জীবনধারা, ভাষা, শিল্পকলা এবং ঐতিহ্য দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। এসব ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করার জন্য এ ধরনের উৎসব অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

তিনি আরও বলেন, স্থানীয় আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের তৈরি হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সৃষ্টি করতে হবে। এতে একদিকে যেমন তাদের সংস্কৃতি টিকে থাকবে, অন্যদিকে তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।

সংস্কৃতি ও পর্যটনের সমন্বিত আয়োজন

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে, উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আয়োজিত এ উৎসবে বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ২৭টিরও বেশি নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী অংশগ্রহণ করছে। তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, লোকজ ঐতিহ্য, নৃত্য, সংগীত এবং হস্তশিল্পের বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনা উৎসবকে দিয়েছে অনন্য মাত্রা।

উৎসবে অংশ নেওয়া জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে মনিপুরী, গারো, খাসিয়া, উরাও, ত্রিপুরা, তেলেগু, শবর, গঞ্জু, কড়া, গৌড়, বুনারজি, হরিদাসসহ আরও অনেক সম্প্রদায়। তাদের উৎপাদিত পণ্য, ঐতিহ্যবাহী খাবার, লোকজ কারুশিল্প ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করছে।

আয়োজকদের মতে, এ উৎসবের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধি করা, যাতে বৈচিত্র্যের মধ্যেও জাতীয় ঐক্যের শক্তিশালী বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয়।

পর্যটন বিকাশে শ্রীমঙ্গলের নতুন ব্র্যান্ডিং

চা-বাগান, পাহাড়, বনাঞ্চল এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির জন্য পরিচিত শ্রীমঙ্গলকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে আরও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরার লক্ষ্যও রয়েছে এ উৎসবের পেছনে। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে হারমোনি ফেস্টিভ্যাল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাপী বর্তমানে ‘কালচারাল ট্যুরিজম’ বা সাংস্কৃতিক পর্যটনের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিদেশি পর্যটকরা স্থানীয় সংস্কৃতি, জীবনধারা, খাদ্য ও ঐতিহ্যের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করছেন। বাংলাদেশের মতো বহুসাংস্কৃতিক দেশে এ ধরনের আয়োজন আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অতিথিদের অংশগ্রহণ

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পরিচালক (যুগ্মসচিব) সালেহা বিনতে সিরাজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এমপি, মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আক্তার, অতিরিক্ত সচিব ও বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুর রউফ, মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান, মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মুজিবুর রহমান চৌধুরী, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান, ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. মাইনুল হাসান, জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পারভেজ এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন আদিবাসী নেতা পরিমল শিং বাড়ইক, ভুবন সিংহ, খাসিয়া প্রতিনিধি ফিলাপত্নী, জিয়ানা মাদরাজী এবং গারো প্রতিনিধি পার্থ ভাজন।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক, আরাফাত রহমান কোকো মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কো-অর্ডিনেটর এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক সরফরাজ আহমেদ সরফু; শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির আহবায়ক ও দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার প্রতিনিধি, অন্যান্য গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা সহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

বক্তারা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরও উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর উৎসব প্রাঙ্গণ

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে প্রধান অতিথিসহ অন্যান্য অতিথিরা উৎসবের বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। তারা নৃ-গোষ্ঠীগুলোর হাতে তৈরি পণ্য, বয়নশিল্প, কারুশিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্য ঘুরে দেখেন। পরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পরিবেশনায় লোকনৃত্য, সংগীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে উৎসব প্রাঙ্গণ রূপ নেয় এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়। রঙিন পোশাক, ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র এবং লোকসংস্কৃতির মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনায় দর্শনার্থীরা মুগ্ধ হন।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও উজ্জ্বল

আয়োজক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, এ ধরনের বৃহৎ উৎসব স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় উদ্যোক্তারা তাদের পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে নতুন বাজার তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, ভবিষ্যতে হারমোনি ফেস্টিভ্যালকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত একটি সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য নতুন আকর্ষণ সৃষ্টি হবে এবং বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশ্বমঞ্চে আরও সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হবে।

২১ জুন পর্যন্ত চলবে উৎসব

তিন দিনব্যাপী এ উৎসব আগামী ২১ জুন পর্যন্ত চলবে। প্রতিদিন বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ঐতিহ্যবাহী খাবারের প্রদর্শনী, হস্তশিল্প মেলা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে।

আয়োজকদের আশা, হারমোনি ফেস্টিভ্যাল দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করার পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ আয়োজনের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্য নতুনভাবে পরিচিতি লাভ করবে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, অঞ্চলভিত্তিক পর্যটন উন্নয়ন ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে টেকসই পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যেই হারমোনি ফেস্টিভ্যাল আয়োজন করা হচ্ছে। উৎসবকে সফল করতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম ও সমন্বয় সভা সম্পন্ন হয়েছে।

গোটা দেশেই অজস্র দর্শনীয় স্থান

Manual8 Ad Code

গোটা বাংলাদেশেই পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো অজস্র দর্শনীয় স্থান রয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের কুয়াকাটা যার সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে সারা বছরই দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকরা আসছে। প্রকৃতির হাতে গড়া সুন্দরবন দেখার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা আসে। সুন্দরবনের বাঘ ও হরিণের আকর্ষণ বিশ্বব্যাপী। আকর্ষণীয় স্থান নীলফামারীর নীলসাগর। শীতকালে মনোহারিনী নীল সাগরে সুদূঢ় সাইবেরিয়া এবং তিব্বতের মতো সফেদ তুষার রাজ্য থেকে নানা প্রজাতির হাজার হাজার পাখি উড়ে আসে। তাদের কোলাহলে সরব থাকে এ নীল সাগরের তীর। তা ছাড়া দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় বহু দুর্লভ পুরাকীর্তি আবিষ্কৃত হওয়ায় পর্যটকদের দৃষ্টি সেদিকে কেড়ে নিচ্ছে। দেশের প্রায় সর্বত্রই রয়েছে ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। রয়েছে জাতির কৃতী সন্তানদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান। দেশের উত্তরাঞ্চলে অর্থাৎ কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামন থানার ঐতিহাসিক ‘দিল্লির আখড়া’র খবর আমাদের কজন রাখে। অথচ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা পাঠে এ আখড়া সম্পর্কে জানা যায়, সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে ২২৬ একর জমি সম্রাট জনৈক ফকিরকে দান করেন এবং এ জমির ওপর সম্রাট একটি উপাসনালয় নির্মাণ করে দেন। পরবর্তীকালে এটাই ‘দিল্লির আখড়া’ নামে পরিচিতি লাভ করে এবং আজ পর্যন্ত স্থানীয় লোকদের কাছে সে নামেই পরিচিত। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হচ্ছে প্রাচীনকালের হিজল গাছ ঘেরা দিল্লির আখড়া এখনও স্থানীয় লোকদের আকর্ষণ করছে। অনুরূপভাবে দেশের প্রায় জেলাতেই রয়েছে দর্শনীয় স্থান, রয়েছে ঐতিহাসিক মর্যাদা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। যেমন পাবর্ত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই, চট্টগ্রামের ফয়েজ লেইক, কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফুলী পেপার মিল, কর্ণফুলী নদীর অপূর্ব দৃশ্য, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, বান্দরবান, খাগড়াছড়ির বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, মৌলভীবাজারের হাকালুকি ও হাইল হাওর, বাইক্কা বিল, এম আর খান চা বাগানের দার্জিলিং টিলা, মাগুরছড়া গ্যাসকূপ বিস্ফোরণ স্থল, মাধবকুন্ড, চা বাগান সমূহ ও হামহাম জলপ্রপাত, জাফলং, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জের সৌন্দর্যের লীলাভূমি হাওর এলাকা ও চা-বাগান, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, চলনবিলসহ সারা দেশে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। এসব স্থানে যাতায়াত এবং থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা না থাকায় লোক চক্ষুর আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
রয়েছে সিলেটের হজরত শাহজালাল, হজরত শাহপরান, হবিগঞ্জে মুফতিয়ে আজম সাইয়্যেদুনা আবুতাহের রহমানপুরী, মুড়ারবন্ধে সৈয়দ নাসিরুদ্দিন সিপাহশালার, আউশপাড়ার খাজা আবুতাহের বোগদাদি, সুলতানশী ও লস্করপুর হাবেলি, চট্টগ্রামের বায়জীদ বোস্তামী ও বাগেরহাটের খান জাহান আলীসহ অসংখ্য পীর দরবেশ ও আওলিয়ার মাজার, সিলেটকে ব্রিটিশদের দখলমুক্ত রাখতে গিয়ে সৈয়দ হাদি ও সৈয়দ মেহদীর মাজার যারা ১৭৮২ সালে আশুরার দিনে ব্রিটিশদের হাতে শহীদ হন। রাঙামাটি দেশের অন্যতম পর্যটনের আকর্ষণীয় স্থান। এখানে আছে পর্যটনের ঝুলন্ত সেতু, কৃষি খামার, শুভলং ঝরনা ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য, পেদা টিংটিং রেস্টুরেন্ট, সাংফাং রেস্টুরেন্ট, চাকমা রাজার বাড়ি, রাজ বনবিহার, উপজাতীয় জাদুঘর, জেলা প্রশাসকের বাংলো, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের সমাধিসৌধ এবং উপজাতিপাড়া ও জীবনযাত্রার দৃশ্য। কাপ্তাই লেকের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ শুভলং ঝরনা ও এর আশপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য কার না মন কাড়ে। বর্ষায় ঝরনাটি পরিপূর্ণ রূপ মেলে ধরে। চারদিকে বিশাল সবুজ পাহাড়ঘেরা এ ঝরনার পানি পতনের দৃশ্য সত্যিই অপরূপ।
পর্যটনকে শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হলে পর্যটন করপোরেশনকে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত বহু জায়গা রয়েছে যেখানে কৃত্রিম উপায়ে হ্রদ সৃষ্টি করে তাতে নৌ-বিহার ও মৎস্য চাষের ব্যবস্থা করা যায়। এসব করতে হলে সরকারিভাবে ভূমি দখল করে জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে সরাসরি পর্যটন করপোরেশনের অধীনে আনা যায়। অথবা নির্বাচিত স্থানের মালিকদের সমবায় সমিতি গঠন করে প্রকল্পের মাধ্যমেও করা যায়। অবশ্য এ ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থাও করতে হবে। বিশেষ করে পর্যটনকে শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বেসরকারি উদ্যোগ ছাড়া উন্নয়ন প্রচেষ্টা সফল হয় না। পর্যটন নীতি যদি এই হয় যে, সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পাবে, তাহলে দেশে পর্যটন শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করবে, দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিবছরই অধিক হারে পর্যটক আসতে থাকবে। অবশ্য ইদানীং দেশের বিভিন্ন স্থানে বেসরকারিভাবে আকর্ষণীয় পর্যটন সেন্টার নির্মাণ করা হচ্ছে।
পর্যটন শিল্প শুধু বিদেশিদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করবে এমন নয়। দেশের নাগরিকরাও দেশের দর্শনীয় স্থানসমূহ দেখতে উদগ্রীব হয়। এ থেকেও পর্যটনের আশাতীত হওয়ার সম্ভাবনা। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করতে হয় যে, আমাদের দেশে অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত শুকনো মৌসুমে দেশের সর্বত্র অবাধে ভ্রমণ করা যায়। কিন্তু বর্ষাকালে সর্বত্র যাওয়া যায় না। নৌপথে সুষ্ঠু ব্যবস্থা থাকলে ভ্রমণকারীদের বিশেষ অসুবিধা হয় না। বাংলাদেশে সফর করার জন্য বর্তমান সময় অত্যন্ত সুসময়। দেশের স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্যও এটা উপযুক্ত সময়। এ সময় বহু শিক্ষার্থী দেশের দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে আগ্রহী হয়।
এ ব্যাপারে পর্যটন কর্তৃপক্ষ যদি দেশের শিক্ষার্থীদের বিশেষ সুবিধা দানসহ বাসের ব্যবস্থা করেন, তাহলে শীত মৌসুমে বহু ছাত্রছাত্রী ভ্রমণে উৎসাহিত হবে এবং পর্যটনের আয় অনেক বেড়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন বলে মনে করি। আমাদের পর্যটন সম্পর্কে যতটুকু প্রচার চালানো হচ্ছে, শিল্প সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে তা অপ্রতুল বলেই মনে হয়। পর্যটনের প্রতি দেশবাসীকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে আরও ব্যাপক প্রচারের প্রয়োজন। সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন যা পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের মূল ভিত্তি।

Manual2 Ad Code

পর্যটন শিল্প জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত

এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, সাংবাদিক, আরপি নিউজের সম্পাদক ও কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, দেশের টেকসই উন্নয়নে পর্যটন শিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অনেক দেশের জাতীয় আয়ের বড় অংশ পর্যটন খাত থেকে আসে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শন, সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যময় জীবনধারাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে পর্যটন।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। অথচ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ খাত এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। পর্যটন শিল্পের প্রসারে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও জরুরি।”

পর্যটনের সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ

কমরেড আমিরুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই রয়েছে দর্শনীয় স্থান, ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অফুরন্ত ভাণ্ডার। কক্সবাজারের বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবন, কুয়াকাটা, জাফলং, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হামহাম, টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, বাইক্কা বিল, রাঙামাটির কাপ্তাই লেক, শুভলং ঝরনা, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি অঞ্চলসহ দেশের অসংখ্য স্থান পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।

Manual1 Ad Code

তিনি উল্লেখ করেন, “মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ ও আশপাশের বিস্তীর্ণ চা বাগান, হাইল হাওর, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাগুরছড়া, দার্জিলিং টিলা, হামহাম জলপ্রপাত এবং আদিবাসী সংস্কৃতি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারে।”

অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ

Manual4 Ad Code

পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থা, আবাসন সুবিধা এবং পর্যাপ্ত প্রচারণার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “দেশের অনেক দর্শনীয় স্থান এখনও পর্যাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পর্যটকবান্ধব অবকাঠামোর অভাবে সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারছে না। নিরাপদ যাতায়াত, মানসম্মত আবাসন, পর্যাপ্ত তথ্যসেবা এবং আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে দেশের পর্যটন খাত আরও এগিয়ে যাবে।”

তিনি আরও বলেন, “পর্যটনকে শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সম্ভাবনাময় এলাকাগুলোতে পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে দেশব্যাপী পর্যটন বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।”

শিক্ষার্থী ও তরুণদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান

সৈয়দ আমিরুজ্জামান মনে করেন, দেশের শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজকে পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে অভ্যন্তরীণ পর্যটন আরও শক্তিশালী হবে। তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ভ্রমণ প্যাকেজ, পরিবহন সুবিধা ও শিক্ষা সফরের সুযোগ বাড়ানো হলে তারা দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আরও বেশি জানতে পারবে। এর ফলে পর্যটন খাতেরও সম্প্রসারণ ঘটবে।”

শ্রীমঙ্গলে পর্যটন চাঙ্গার প্রত্যাশা

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, হারমোনি ফেস্টিভ্যাল শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কারুশিল্পী এবং পর্যটন ব্যবসার জন্যও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। তিনদিনব্যাপী এ উৎসবে বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর সমাগম ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে আয়োজিত এ উৎসব দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ