দেশের রাজনীতিতে কৌশলগত পুনর্বিন্যাস: গেম থিওরির আলোকে একটি বিশ্লেষণ

প্রকাশিত: ৫:৫৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০২৬

দেশের রাজনীতিতে কৌশলগত পুনর্বিন্যাস: গেম থিওরির আলোকে একটি বিশ্লেষণ

Manual3 Ad Code

শহীদুল্লাহ্ ওসমানী |

ইউনূস ও সেনাপ্রধান মিলে পরিকল্পনা করার পর তারেক যখন ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিশ্চয়তা পেলেন, তখনি দেশে পা রাখলেন। একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন, তারেক জিয়া বাংলাদেশের মাটিতে পা দেওয়ার সাথে সাথে তার নিরাপত্তার জন্য সাড়ে চার হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবস্থা করা হলো।

প্রশ্ন হচ্ছে – তারেক জিয়া কি তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন?

Manual5 Ad Code

তারেক জিয়া তখন বিএনপির প্রধানও ছিলেন না।

তবে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেন?
সেনাবাহিনীর পরিকল্পনা তার আগেই হয়ে গেছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় তারেককে রাজকীয় সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে। এটাও মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ। দেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।

Manual2 Ad Code

হঠাৎ ৫ আগষ্টের পর তারেক জিয়ার বক্তব্য পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন? হঠাৎ তারেক জিয়া মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিকে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা সাজাতে লাগলেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে – ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভাঙা থেকে শুরু করে আওয়ামীলীগ নেতাদের ঘরবাড়ি লুট করা, সবকিছুতেই জামায়াতের সহোদর ভাই ছিল বিএনপি।
অথচ তার হঠাৎ মিষ্টি আচরণে বিভ্রান্ত হলো দেশের মানুষ। আমরা বারবার সেই প্রবাদ বাক্য ভুলে যাই –
‼️ দুষ্টু লোকের মিষ্টি ভাষা।‼️

Manual4 Ad Code

২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে তারেক জিয়া বাংলাদেশে পা রাখার সাথে সাথে যে মিডিয়া এতদিন জামায়াত নিয়ন্ত্রিত ছিল তা বিএনপির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

২৫ শে ডিসেম্বর ইউনূস সরকার যেভাবে তারেককে আইন বহির্ভূতভাবে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল দেওয়া শুরু করলো, তখন বিশ্ব মিডিয়া তারেককে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী ভাবতে শুরু করে দিলো।
২৫ ডিসেম্বরের ইন্ডিয়ার মিডিয়াও যেন যেন রাতারাতি পরিবর্তন হতে শুরু করলো। এসব একটা সংকেত ছিল মাত্র।

৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া মারা গেলেন। এর ঠিক পরের দিন ৩১ ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয় শঙ্কর বাংলাদেশে এসে তারেক রহমানের সাথে বৈঠক করে সবাইকে চমকে দিলেন। একটু পর খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বার্তা এলো। জামায়াতের নেতাদের বার্তা দিয়ে গেলেন জয়শঙ্কর।
রয়টার্সের একটি রিপোর্ট ফাঁস না হলে দেশের মানুষের জানাই হতো না ভারতের দু’জন কূটনীতিক গোপনে জামায়াতের সাথে বৈঠক করেছেন। প্রথমে স্বীকার না করলেও পরবর্তীতে রয়টার্সে তথ্য ফাঁস হওয়ার পর জামায়াতের আমীর সেই বৈঠকের কথা স্বীকার করে নিলেন। অর্থাৎ ভারতের পক্ষ থেকে বিএনপিও জামায়াতকে সরকার গঠনের একপ্রকার সবুজ সংকেত দেয়া হয়ে গেল।

১৯৪০ সালের খ্যাতনামা গণিতবিদ ও পদার্থবিদ John von neumann “থিওরি অফ গেমস অ্যান্ড ইকোনোমিক বিহ্যাবিয়ার” নামে রাজনীতি ও অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে একটি বই লিখেছেন। রাজনীতি শুধু দাবা ও পোকার গেম খেলার সাথে জড়িত নয়। রাজনীতির সাথে জড়িয়ে আছে সামাজিক, আঞ্চলিক, নিরাপত্তা ও অর্থনীতি।

৫ আগষ্ট আওয়ামীলীগের ভূল রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতির ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলেও রাজনীতির চাবি চলে যায় সম্পূর্ণ জামায়াতের হাতে। ভারত কিছুতেই তা মেনে নিতে পারেনি।
ইউনূসের বিভিন্ন ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ভারত বাংলাদেশের সাথে সকল বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করলেও সেই ফসল রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামীলীগ। এতেই দিন দিন বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন তারেক রহমান।
এতদিনের হুমকি ধামকির রাজনীতির মুখোশ খুলে আওয়ামীলীগের জন্য বার্তা দিতে থাকেন। একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল তারেক আওয়ামীলীগের সাথে জোট বাঁধতে চাইছেন। যত দিন যায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে দূর্বল হতে থাকে জামায়াত।
জামায়াতের উগ্র রাজনীতির বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাজনীতির স্লোগান উঠে ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে। রাজনীতির এই সুযোগটাই গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান।
আমেরিকা ও ভারতের সাথে দূরত্বের অবসান ঘটাতে কাজ শুরু করে দিয়ে সফল হয়ে যান। একপর্যায়ে জামায়াত পর্যন্ত নতি স্বীকার করে তারেক জিয়ার বিএনপির কাছে।

Manual5 Ad Code

বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে আওয়ামীলীগের দূর্বল সাংগঠনিক অবস্থান, জামায়াতের উগ্র মৌলবাদ এসব দেখে তারেক ছাড়া ভারতের কাছে দ্বিতীয় আর কোন বিকল্প ছিলো না।
নিউম্যানের গেম চেঞ্জার থিওরি হচ্ছে কৌশল পরিবর্তন। এই সুযোগে বিএনপি কৌশল পরিবর্তন করে। এতদিন শহীদ মিনার ও ভাস্কর্য ভাঙা দল পরিণত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একমাত্র জামায়াত বিরোধী শক্তিতে।
আমাদের অনেক প্রগতিশীল বন্ধুদের দেখছিলাম রাতারাতি সুইং করে দল পরিবর্তন করতে।
মূলত জামায়াতের বটবাহিনীর অতিরিক্ত প্রোপাগান্ডা দেখে বাংলাদেশের মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল।তারা সবাই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চাইছেন। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির স্বার্থে এই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চেয়েছে ভারত। অর্থাৎ

‼️” নাই মামার থেকে কানা মামা ভাল।‼️

নির্বাচনের মোড় ঘুরে যেতেই তারেক আর জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে আগ্রহী হলেন না। বিএনপি ও জামায়াতের লন্ডনের পরিকল্পনা মোতাবেক তারেক সরকারি দল আর জামায়াতের পরিকল্পনা বিরোধী দল। অর্থাৎ দুই সহোদর মিলে একটা শক্তিশালী বিরোধীদল বানিয়ে আওয়ামীলীগকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে নির্মূলের পরিকল্পনা হয়ে গেল তারেক জিয়া লন্ডন থাকতেই।
যে সময়টা বাংলাদেশের মানুষ জামায়াতকে মোকাবেলায় আওয়ামীলীগের ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিল, সেই সময়টা নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করে কাজে লাগাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে আওয়ামীলীগ। আওয়ামীলীগের এই ব্যর্থতায় কপাল খুলে গেল তারেক রহমানের।

(দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার আসামি করা হয়েছিল তাকে, এর আলোচনা এখন অপ্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করা হয়।)

বিএনপি তাদের সরকার গঠন অনুষ্ঠানে ভারতের মোদিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এতদিন যারা ভারতের সেভেন সিস্টার্স দখল করতে চেয়েছে তারা রাতারাতি পরিবর্তন হয়ে গেল! বিষয়টা মোটেও এমন কিছু নয়। বিএনপি ও জামায়াত দু’দল মুখে যতোই ভারত বিরোধিতা দেখাক না কেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে ভারত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাই তারা গত প্রায় ৫০ বছর ধরে ভারত বিরোধী প্রোপাগান্ডা চালিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের সুযোগ নিয়েছে। কখনও আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসলে মসজিদে উলুধ্বনি বাজবে, কখনও আওয়ামীলীগ  বা নৌকায় ভোট দিলে ফেনী পর্যন্ত ভারতের দখল হয়ে যাবে! এই প্রোপাগান্ডার সর্বশেষ সংযোজন ছিল আসিফ নজরুল এর ২৬ লক্ষ ভারতীয় এর গোয়েবলসীয় প্রোপাগান্ডা। এই প্রোপাগান্ডার স্লোগান ছিল – দিল্লী না ঢাকা।
তবে কি ভারত রাতারাতি সব ভুলে গেল।

না, ভারত কিছুই ভুলে যায়নি। তারেক জিয়া ও জামায়াতের অতীত সকল অপকর্ম সম্পর্কে ভারত জানে। ভারত শুধু বাংলাদেশ প্রশ্নে তাদের নীতি ও কৌশল পরিবর্তন করেছে। কারণ বেশ কিছুদিন ধরেই ক্ষমতালোভী বিএনপি ও জামায়াত উপ্রে উপ্রে ভারত বিরোধিতা করে তলে তলে ভারতের টেম্পু চালাচ্ছিলেন। নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতের ভারতের পক্ষে বিভিন্ন বক্তব্য ও মন্তব্য সংগ্রহে থাকলে এসব নাটক আপনিও বুঝবেন।

তিস্তা নদীতে বাঁধের উপর বাঁধ দেওয়া বিজ্ঞানী নাতালিয়া হাবিব ও তার বিদেশী বউয়ের কথা একটু মনে করে দেখুন ???? সেই নিরপেক্ষ নাতালিয়া হাবিব নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট চাইলেন! কিন্তু ১৮ মাস হয়ে গেলেও তিস্তায় বাঁধের উপর বসে দেয়া হলো না, হবেও না কোনদিন।
শুধু শুধু শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডার আশ্রয় নিয়েছিলো বিএনপি ও জামায়াত। ভারত বাংলাদেশ তিস্তা চুক্তি হতে না দেওয়া মমতা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে আজ তারেককে অভ্যার্থনা জানাচ্ছেন। জ্বী, এটাও জিও পলিটিক্স এর অংশ। জামায়াতের শফিক প্রধানমন্ত্রী হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাচতেন ও গাইতেন। এসব আপনি/ আপনারা বিশ্বাস না করলেও সত্য।

নিউম্যান থিওরির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক গেম হচ্ছে “‼️ জিরো সাম।” ‼️ অর্থাৎ তোমার ক্ষতি আমার লাভ।
জুলকারনাইন বিএনপির পক্ষে আর পিনাকী ও ইলিয়াস জামায়াতের পক্ষে প্রচারণা করলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে ভাবলো জামায়াত ক্ষমতায় আসছে।

পিনাকী বটবাহিনীর সদস্য হলেও ইলিয়াস মূলত শিবির বেশে বিএনপি। এরা মূলত পরিকল্পিতভাবে প্রোপাগান্ডা ছড়ায়। কিছু মূর্খ আহম্মকরা এসবে বিশ্বাসও করে। এজন্য বিএনপি ও জামায়াত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এদের পেছনে শত কোটি টাকার বিনিয়োগ করেছে শুধুই মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য।
একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন যে মাহমুদুর রহমান জামায়াত করে সেই কিন্তু বেলা একটায় সর্বপ্রথম আমার দেশ পত্রিকায় বিএনপির জয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। অথচ কোন পত্রিকা কোন মিডিয়া তখনও নিশ্চিত নয় আসলে কী হতে যাচ্ছে নির্বাচনে।
অথচ এর আগেই জামায়াত নিয়ে কান্নাকাটি শুরু করেছিল মাহমুদুর রহমান। হঠাৎ মাঝরাতে পল্টি!! এটাকেই বলে রাজনীতির মেটিকুলাস ডিজাইন। এই মেটিকুলাস ডিজাইন রচিত হয়েছিল লন্ডনে জামায়াতের আমীর শফিক ও তারেকের গোপন বৈঠকে। সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছিল পুতুল প্রধানমন্ত্রীর। এই তথাকথিত মাহমুদুর রহমানরা সব জেনেশুনেই মানুষকে বোকা বানিয়েছে এবং এখনও জামায়াতকে বিরোধীদল বানিয়ে রাজনীতির “জিরো সাম” খেলা খেলছে।

আওয়ামীলীগ কখনোই লুসিড ড্রিমদের গুরুত্ব বুঝেনি, ভবিষ্যতেও বুঝবে না। এজন্য এদের এখনও টকশো সিন্ডিকেট, রাজনৈতিক সিন্ডিকেট, ফেসবুক সিন্ডিকেট, বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট। এভাবেই এরা এদের ধ্বংস লিখেই চলেছে।

অপরদিকে নিউম্যানের “থিওরি অফ গেমস অ্যান্ড ইকোনোমিক বিহ্যাবিয়ার” ফলো তথা অনুসরণ করে উল্টো ১৭ কোটি মানুষকে বোকা বানাচ্ছে দুই সহোদর ভাই বিএনপি ও জামায়াত।।
#
শহীদুল্লাহ্ ওসমানী।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ