উগ্রবাদ-সহিংসতামুক্ত সম্প্রীতির মৌলভীবাজার গড়তে ১১ দফা ঘোষণা

প্রকাশিত: ৫:৫০ অপরাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০২৬

উগ্রবাদ-সহিংসতামুক্ত সম্প্রীতির মৌলভীবাজার গড়তে ১১ দফা ঘোষণা

Manual8 Ad Code
  • আন্তঃধর্মীয় সংলাপে সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ওপর গুরুত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক | মৌলভীবাজার, ০৭ জুলাই ২০২৬ : জাতিগত ও ধর্মীয় উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং রাজনৈতিক সহিংসতামুক্ত একটি সম্প্রীতির মৌলভীবাজার গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন জেলার বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজ, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, গণমাধ্যমকর্মী ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা। এ লক্ষ্যে ১১ দফা ঘোষণাপত্র গ্রহণের পাশাপাশি সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ধর্মীয় সহনশীলতা, সংলাপের সংস্কৃতি এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান জোরদারের আহ্বান জানানো হয়।

Manual7 Ad Code

মঙ্গলবার (৭ জুলাই ২০২৬) সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের পিস ফ্যাসিলিটেটর গ্রুপ (পিএফজি) মৌলভীবাজারের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আন্তঃধর্মীয় সংলাপে এসব বিষয় গুরুত্ব পায়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীসহ শতাধিক ব্যক্তি অংশ নেন।

Manual8 Ad Code

পিএফজি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কো-অর্ডিনেটর খালেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং আন্তঃধর্মীয় কমিটি মৌলভীবাজারের আহ্বায়ক এম. মুহিবুর রহমান মুহিবের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল।

Manual1 Ad Code

অনুষ্ঠানের শুরুতে অংশগ্রহণকারীরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোকপাত করেন। পরে সুজন মৌলভীবাজারের সাধারণ সম্পাদক ডা. ছাদিক আহমদ ১১ দফা ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। ঘোষণাপত্রে ধর্মীয় ও জাতিগত উগ্রবাদ প্রতিরোধ, রাজনৈতিক সহিংসতা পরিহার, সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং শান্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলার অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়।

এমআইপিএস (MIPS) কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন সিলেট বিভাগের প্রতিনিধি নাজমুল হক মিনা। তিনি বলেন, সমাজে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল আইনগত ব্যবস্থা নয়, পারস্পরিক আস্থা, সংলাপ এবং নাগরিক অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত সংলাপ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

সংলাপে বক্তব্য রাখেন মৌলভীবাজার টাউন কামিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মুফতি শামসুল ইসলাম, বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুনিল কুমার দাস, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শান্তি পদ ঘোষ, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ফজলুর রহমান, দৈনিক বাংলার দিন পত্রিকার সম্পাদক বকশি ইকবাল আহমদ, রাজনীতিবিদ মোয়াজ্জেম হোসেন মাতুক, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি আশু রঞ্জন দাস, খ্রিস্টান মিশন উন্নয়ন কমিটির সভাপতি আইভান সমাদ্দার, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ভিক্টর প্রিটন্স, বাংলাভিশনের জেলা প্রতিনিধি সৈয়দ হোমায়েদ আলী শাহীন, সমাজসেবক সিরাজুল ইসলাম সিদ্দিকী, মাওলানা আসাদ আহমেদ চৌধুরী, পিএফজি শ্রীমঙ্গলের কো-অর্ডিনেটর সৈয়দ ছায়েদ আহমদ, পিএফজি মৌলভীবাজারের অ্যাম্বাসেডর মাহমুদুর রহমান, উপদেষ্টা মোস্তাক আহমেদ মম, অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম শেফুল, রুহেল আহমদ চৌধুরী, যুক্তরাজ্য প্রবাসী শামীম তরফদার, হাওর রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব খছরু চৌধুরী, গোবিন্দ জিউর আখড়ার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিত্য গোস্বামী, সাংবাদিক নুরুল ইসলাম, মাহবুবুর রহমান রাহেল, ইমন দেব চৌধুরী, দেওয়ান মুনাকিব চৌধুরী, শাহ মোস্তফা কলেজের সহকারী অধ্যাপক আসাদুল্লাহ এবং নারী নেত্রী শ্যামলী দাশ।

এছাড়া পিএফজির নেতৃবৃন্দের মধ্যে জ্যোতিময় চক্রবর্তী, শ্রী কমলাশিষ চক্রবর্তী, খিজির মোহাম্মদ জুলফিকার, তাপস কুমার ঘোষ, প্রভাত দেবনাথ, সুয়ারা বেগম, ইয়ুথ পিস অ্যাম্বাসেডর গ্রুপ (ওয়াইপিএজি) মৌলভীবাজার সদরের কো-অর্ডিনেটর কামরান চৌধুরী, ছাত্র প্রতিনিধি সংগঠক ইহাম মুজাহিদ ও রাজ মুস্তাকিনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ বহু ধর্ম, বহু সংস্কৃতি ও বহু জাতিসত্তার মানুষের দেশ। এই বৈচিত্র্যই দেশের অন্যতম শক্তি। তাই কোনো ধরনের উগ্রবাদ, বিদ্বেষ বা সহিংসতা সমাজের জন্য কল্যাণকর নয়। ভিন্ন ধর্ম, মত ও বিশ্বাসের মানুষের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান এবং সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে সামাজিক স্থিতিশীলতা আরও সুদৃঢ় হবে।

তারা আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, বিদ্বেষমূলক প্রচারণা এবং বিভাজন সৃষ্টিকারী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। ধর্মকে বিভেদ নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়, সহমর্মিতা ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে সম্প্রীতি, সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করার ওপরও বক্তারা গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে সর্বসম্মতিক্রমে ১১ দফা ঘোষণাপত্র গ্রহণ করা হয়। ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে জাতিগত ও ধর্মীয় উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং রাজনৈতিক সহিংসতামুক্ত একটি শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সম্প্রীতির মৌলভীবাজার গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

অংশগ্রহণকারীরা বলেন, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ কেবল মতবিনিময়ের একটি আনুষ্ঠানিক পরিসর নয়; এটি পারস্পরিক আস্থা ও সামাজিক সংহতি গড়ে তোলার একটি কার্যকর মাধ্যম। ভবিষ্যতেও এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত আয়োজনের মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে এবং একটি শান্তিপূর্ণ, সহনশীল ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

প্রাণবন্ত আলোচনা, উন্মুক্ত মতবিনিময় এবং বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের আন্তরিক অংশগ্রহণে পুরো অনুষ্ঠানটি সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সহাবস্থানের এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়।

Manual2 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ