চ্যানেল আই অনলাইনে সাংবাদিক পলাশ চৌধুরীর শতাধিক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১:৪৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৩, ২০২৬

চ্যানেল আই অনলাইনে সাংবাদিক পলাশ চৌধুরীর শতাধিক রিপোর্ট

Manual3 Ad Code
  • সাংবাদিকতা, সংস্কৃতি ও জনপদের এক অনন্য দলিল

সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

একজন সাংবাদিকের সাফল্য শুধু কতটি সংবাদ প্রকাশ করেছেন, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে তিনি কতটা সময়, সমাজ, মানুষ এবং ইতিহাসকে ধারণ করতে পেরেছেন তার ওপর। সংবাদ যদি হয়ে ওঠে সময়ের দলিল, তবে একজন সাংবাদিক হয়ে ওঠেন সেই সময়ের বিশ্বস্ত ভাষ্যকার। বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় এমন কিছু মানুষ রয়েছেন, যাঁদের কাজ সংবাদ পরিবেশনের গণ্ডি অতিক্রম করে একটি অঞ্চল, একটি সংস্কৃতি, একটি জনপদের ইতিহাসকে লিপিবদ্ধ করেছে। প্রাগ্রসর সাংবাদিক পলাশ চৌধুরী তাঁদেরই একজন।

চ্যানেল আই অনলাইনে তাঁর প্রকাশিত শতাধিক রিপোর্ট শুধু সংখ্যার বিচারে নয়, বিষয়বৈচিত্র্য, গবেষণাধর্মিতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাংস্কৃতিক গভীরতার কারণেও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার এবং বৃহত্তর সিলেটের প্রকৃতি, সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন, পরিবেশ, পর্যটন, সাহিত্য, শিল্প, শিক্ষা এবং মানবিক উদ্যোগের এক বিস্তৃত চিত্র জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

বর্তমান সময়ে যখন সংবাদমাধ্যমের একটি বড় অংশ রাজধানীকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, তখন পলাশ চৌধুরীর রিপোর্টিং প্রমাণ করে—বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে আছে জনপদের মানুষ, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির মধ্যে। তাঁর লেখায় সংবাদ কেবল তথ্য নয়; হয়ে ওঠে একটি অঞ্চলের জীবনচিত্র।

পলাশ চৌধুরীর সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো বিষয় নির্বাচনের বৈচিত্র্য। তিনি শুধু ঘটনাভিত্তিক সংবাদ করেননি; বরং এমন বহু বিষয় তুলে ধরেছেন, যেগুলো সাধারণত জাতীয় গণমাধ্যমে খুব কমই স্থান পায়। তাঁর প্রতিবেদনে যেমন রয়েছে দোল উৎসব, বিষু উৎসব, লাই হরাউবা, ফাগুয়া, ওয়ানগালা, রাহা উৎসব কিংবা রাস উৎসবের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য, তেমনি রয়েছে শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান, জীববৈচিত্র্য, হাওর, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের মতো পরিবেশগত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তিনি বুঝতে পেরেছেন, একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো দিয়ে হয় না; তার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি মনিপুরী, খাসিয়া, গারো, সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাও, খাড়িয়া, বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরীসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবন, উৎসব, ভাষা, শিল্প ও ঐতিহ্যকে ধারাবাহিকভাবে জাতীয় গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন।

Manual7 Ad Code

এই কাজ নিছক রিপোর্টিং নয়; এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি চলমান আর্কাইভ নির্মাণের প্রয়াস।

Manual8 Ad Code

তাঁর প্রতিবেদনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে সচেতন সাংবাদিকতা। বাইক্কা বিলের অতিথি পাখি, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, চা-বাগানের জীববৈচিত্র্য, বন সংরক্ষণ, বন্যপ্রাণী উদ্ধার, বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস, শ্রীমঙ্গলের আবহাওয়া, কুয়াশা, বৃষ্টিবলয়, হাওরের পরিবেশ—এসব বিষয়ে তাঁর ধারাবাহিক কাজ পরিবেশ সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

আজ বিশ্বজুড়ে যখন জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড় এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তখন তাঁর এসব প্রতিবেদন কেবল সংবাদ নয়; পরিবেশ সচেতনতা তৈরিরও একটি কার্যকর মাধ্যম।

পলাশ চৌধুরীর সাংবাদিকতায় পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি শ্রীমঙ্গলকে শুধু ‘চায়ের রাজধানী’ হিসেবে দেখেননি; বরং এটিকে বাংলাদেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক পর্যটন অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছেন।

মাধবপুর লেক, দার্জিলিং টিলা, পৃথিমপাশার নবাববাড়ি, শতবর্ষী ডাকঘর, চা-বাগান, পাহাড়ি জনপদ, হাওর, গ্রামীণ জীবন, লোকসংস্কৃতি—এসব নিয়ে তাঁর ফিচার দেশি-বিদেশি পাঠকের কাছে শ্রীমঙ্গলকে নতুনভাবে পরিচিত করেছে।

পর্যটন শিল্পে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর লেখাগুলো তার একটি বাস্তব উদাহরণ। কারণ একটি অঞ্চলের সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও আতিথেয়তার গল্প যত বেশি প্রচারিত হয়, ততই পর্যটনের সম্ভাবনা বিস্তৃত হয়।

সংস্কৃতিবিষয়ক সাংবাদিকতা বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বরাবরই তুলনামূলকভাবে সীমিত। কিন্তু পলাশ চৌধুরী এই ক্ষেত্রটিকে তাঁর অন্যতম প্রধান কর্মক্ষেত্রে পরিণত করেছেন।

Manual1 Ad Code

নাট্যোৎসব, আবৃত্তি উৎসব, নৃত্য উৎসব, রবীন্দ্র ও নজরুলচর্চা, পঞ্চকবির গান, বইমেলা, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি, শিশুদের সাহিত্যচর্চা, শিল্প প্রদর্শনী, লোকসংগীত, বাউল উৎসব, নতুন বইয়ের প্রকাশনা—এসব বিষয় তিনি ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেছেন।

ফলে তাঁর প্রতিবেদনগুলো কেবল অনুষ্ঠান সংবাদ নয়; বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটি ধারাবাহিক দলিল হিসেবে মূল্যবান হয়ে উঠেছে।

পলাশ চৌধুরীর সাংবাদিকতায় মানবিক বিষয়ও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, চা-বাগানের শিশুদের শিক্ষা, পাঠচক্র, দরিদ্র মানুষের সহায়তা, নাগরিক উদ্যোগ, রোটারি ক্লাবের কার্যক্রম, সামাজিক সংগঠনের মানবিক উদ্যোগ—এসব বিষয়ে তাঁর প্রতিবেদন সমাজের ইতিবাচক শক্তিকে সামনে নিয়ে এসেছে।

একজন সাংবাদিক শুধু সমস্যা তুলে ধরবেন—এ ধারণার বাইরে গিয়ে তিনি সমাজে যারা নীরবে ভালো কাজ করছেন, তাঁদেরও পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে। এই ইতিবাচক সাংবাদিকতা সমাজে অনুপ্রেরণা তৈরি করে।

তাঁর শতাধিক প্রতিবেদনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি সংবাদকে কখনোই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখেননি। প্রতিটি প্রতিবেদনের পেছনে রয়েছে স্থানীয় ইতিহাস, মানুষের জীবনসংগ্রাম, সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার অনুসন্ধান। এ কারণেই তাঁর লেখাগুলো দীর্ঘদিন পরেও পাঠযোগ্য থাকে।

পলাশ চৌধুরীর সাংবাদিকতার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষায়। ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের ফলে ভাষার সৌন্দর্য, সাহিত্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক চেতনা তাঁর লেখায় স্বাভাবিকভাবেই প্রতিফলিত হয়েছে।

১৯৮৯ সালে সাংবাদিকতা শুরু করে তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশন এবং উন্নয়ন সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ এই পথচলায় সংবাদ সম্পাদনা, মাঠ-রিপোর্টিং, ফিচার লেখা, সাংস্কৃতিক সাংবাদিকতা এবং জনসংযোগ—সব ক্ষেত্রেই তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি একজন সংস্কৃতিকর্মী, আবৃত্তি সংগঠক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নিবেদিত কর্মী। শব্দ-আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র, শিশুতীর্থ-আনন্দধ্বনি সঙ্গীত বিদ্যায়তন, জাতীয় আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা তাঁর সাংবাদিকতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

Manual8 Ad Code

বর্তমানে গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্ব পালন করলেও তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। বরং চ্যানেল আই অনলাইনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিয়মিত লেখালেখির মাধ্যমে তিনি জনপদের কথা বলে চলেছেন। একজন দক্ষ জনসংযোগকর্মী এবং একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক—এই দুই পরিচয়ের সমন্বয় তাঁর পেশাগত পরিপক্বতার পরিচায়ক।

চ্যানেল আই অনলাইনে তাঁর শতাধিক রিপোর্ট বাংলাদেশের আঞ্চলিক সাংবাদিকতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, রাজধানীর বাইরে থেকেও জাতীয় মানের সাংবাদিকতা করা সম্ভব; যদি থাকে নিষ্ঠা, বিষয়জ্ঞান, অনুসন্ধিৎসা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।

আজকের ডিজিটাল যুগে সংবাদ দ্রুত আসে, দ্রুত হারিয়েও যায়। কিন্তু যেসব প্রতিবেদন সময়, সমাজ ও সংস্কৃতির সাক্ষ্য বহন করে, সেগুলো ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে। পলাশ চৌধুরীর বহু প্রতিবেদন সেই অর্থে কেবল সংবাদ নয়; বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সমাজ, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার মূল্যবান দলিল।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা, সংস্কৃতি এবং পর্যটন বিকাশে তাঁর এই ধারাবাহিক অবদান নিঃসন্দেহে জাতীয় স্বীকৃতির দাবিদার। চ্যানেল আই অনলাইনে তাঁর শতাধিক রিপোর্ট ব্যক্তিগত সাফল্যের সীমা অতিক্রম করে আঞ্চলিক সাংবাদিকতার সম্ভাবনা, দায়িত্ব এবং শক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

সাংবাদিকতার মূল শক্তি সত্য, মানবিকতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। পলাশ চৌধুরীর দীর্ঘ কর্মজীবন সেই মূল্যবোধেরই প্রতিফলন। তাঁর লেখনী আগামী দিনেও বাংলাদেশের গণমাধ্যম, সংস্কৃতি ও পর্যটনচর্চাকে সমৃদ্ধ করবে—এই প্রত্যাশাই রইল।

#

সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ