বিশ্ব সাপ দিবসে শ্রীমঙ্গলে দুই অজগর উদ্ধার

প্রকাশিত: ১১:১০ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০২৬

বিশ্ব সাপ দিবসে শ্রীমঙ্গলে দুই অজগর উদ্ধার

Manual1 Ad Code
  • গাছের মগডাল ও বাঁশের চূড়া থেকে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান; মানুষকে আতঙ্কমুক্ত করে বন বিভাগে হস্তান্তর

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ১৬ জুলাই ২০২৬ : বিশ্ব সাপ দিবসে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পৃথক দুটি লোকালয় থেকে দুটি অজগর সাপ জীবিত ও সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।

Manual5 Ad Code

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই ২০২৬) উপজেলার উত্তর ভাড়াউড়া ও সিন্দুরখান ইউনিয়নের হুগলিয়া এলাকায় গাছের মগডাল এবং উঁচু বাঁশের ওপর আশ্রয় নেওয়া সাপ দুটি বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের উদ্ধারকারী দল ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের মাধ্যমে নামিয়ে আনে। পরে সাপ দুটি শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়।

বিশ্ব সাপ দিবসে সংঘটিত এই দুটি উদ্ধার অভিযান শুধু মানুষের আতঙ্ক দূর করেনি, বরং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে আরেকটি কারণে। মাত্র দুই দিন আগে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা, দেশের সুপরিচিত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মী শীতেশ রঞ্জন দেবের মৃত্যু হয়েছে। শোকাবহ এই সময়েও তাঁর ছেলে ও ফাউন্ডেশনের বর্তমান পরিচালক স্বপন দেব সজল ব্যক্তিগত শোক উপেক্ষা করে উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দেন।

উত্তর ভাড়াউড়ায় প্রথম উদ্ধার অভিযান

ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৫ নম্বর পুল উত্তর ভাড়াউড়া এলাকার বাসিন্দা যোবায়ের আহমেদের বাড়িতে একটি অজগর সাপ দেখা যায়।

Manual4 Ad Code

স্থানীয়রা জানান, কয়েক দিন ধরে বাড়ি থেকে হাঁস ও মুরগির বাচ্চা রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হচ্ছিল। বৃহস্পতিবার সকালে পরিবারের সদস্যরা বাড়ির দেয়ালের ওপর একটি বড় অজগর দেখতে পান। পরে সেটি পাশের একটি গাছ বেয়ে দ্রুত মগডালে উঠে আশ্রয় নেয়। এতে পুরো পরিবার এবং আশপাশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের ধারণা, হারিয়ে যাওয়া হাঁস-মুরগির বাচ্চাগুলো ওই অজগরই খেয়ে ফেলেছিল।

খবর পেয়ে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল, পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ এবং রিদন গৌড় ঘটনাস্থলে পৌঁছান। দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণের পর উদ্ধারকারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাছে উঠে বিশেষ কৌশলে অজগরটিকে নিচে নামিয়ে আনেন। পুরো অভিযানে সাপটির কোনো ধরনের ক্ষতি হয়নি। উদ্ধার শেষে সেটিকে শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়।

হুগলিয়ায় দ্বিতীয় অজগর ঘিরে জনতার ভিড়

একই দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নের হুগলিয়া এলাকায় আরও একটি অজগর সাপের খবর আসে। স্থানীয় বাসিন্দারা একটি বড় অজগর দেখতে পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাড়া খেয়ে সাপটি দ্রুত একটি উঁচু বাঁশের ওপর উঠে যায়।

ঘটনাস্থলে মুহূর্তের মধ্যেই শত শত কৌতূহলী মানুষ জড়ো হন। অনেকেই আতঙ্কে সাপটিকে মারার চেষ্টা করলেও স্থানীয় কয়েকজন সচেতন ব্যক্তি তাদের নিবৃত্ত করেন এবং বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনকে খবর দেন।

খবর পেয়ে স্বপন দেব সজল ও রাজদীপ দেব দীপ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উপস্থিত জনতাকে শান্ত করেন। পরে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বাঁশের অনেক ওপরে উঠে অজগরটিকে নিরাপদে উদ্ধার করেন। উদ্ধার অভিযানের সময় উৎসুক জনতার ভিড় সামাল দেওয়াও ছিল বড় একটি চ্যালেঞ্জ। সফল অভিযানের পর এলাকাজুড়ে স্বস্তি ফিরে আসে।

শোককে শক্তিতে রূপান্তরের এক অনন্য দৃষ্টান্ত

এ দিনের দুটি উদ্ধার অভিযান আরও একটি মানবিক কারণে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। গত ১৪ জুলাই সকালে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা, বিশিষ্ট বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মী, প্রকৃতিপ্রেমী ও সমাজসেবক শীতেশ রঞ্জন দেব পরলোকগমন করেন।

পারিবারিক শোকের মধ্যেও সনাতন ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী অশৌচকালীন সাদা উত্তরীয় পরিহিত অবস্থায় উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন তাঁর ছেলে স্বপন দেব সজল। ব্যক্তিগত শোককে পাশে রেখে তিনি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বন্যপ্রাণী রক্ষার দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা জানান, বাবার মৃত্যুর মাত্র দুই দিনের মাথায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া সত্যিই বিরল একটি দৃষ্টান্ত। তাঁদের মতে, শীতেশ রঞ্জন দেব যে আদর্শ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের চেতনা গড়ে তুলেছিলেন, স্বপন দেব সজল তা নিষ্ঠার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

বিশ্ব সাপ দিবসের তাৎপর্য

প্রতিবছর ১৬ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব সাপ দিবস। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো সাপ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে প্রচলিত ভয়, ভুল ধারণা ও কুসংস্কার দূর করা এবং সাপ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি প্রজাতির সাপ রয়েছে। এর মধ্যে অল্পসংখ্যক প্রজাতিই বিষধর এবং মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অধিকাংশ সাপই মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে চায় এবং কেবল আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই আক্রমণ করে।

সাপ প্রকৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিকারি। তারা ইঁদুরসহ কৃষির জন্য ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশ ও কৃষির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের অসচেতনতার কারণে অনেক প্রজাতির সাপ আজ হুমকির মুখে।

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, লোকালয়ে কোনো সাপ দেখা গেলে আতঙ্কিত হয়ে সেটিকে হত্যা না করে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে এবং বন বিভাগ বা প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দলের সহায়তা নিতে হবে। এতে যেমন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, তেমনি সংরক্ষিত হয় পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই বন্যপ্রাণীও।

বিশ্ব সাপ দিবসে শ্রীমঙ্গলের এই দুটি সফল উদ্ধার অভিযান সেই বার্তাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—সাপকে ভয় নয়, জানতে হবে; হত্যা নয়, সংরক্ষণই হতে পারে মানুষ ও প্রকৃতির নিরাপদ সহাবস্থানের পথ।

সাপ দেখলেই আতঙ্কিত হন মানুষ—

সাপ দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন অনেক মানুষ। যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে সাপকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ভয়, রহস্য ও নানা কুসংস্কার।

পুরাণ, ধর্মীয় গল্প ও লোককথাতেও সাপকে কখনো ভয়ংকর প্রাণী, কখনো আবার শক্তি ও পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, সাপ প্রকৃতির শত্রু নয়; বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা একটি প্রাণী। এই প্রাণী সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণা দূর করা এবং সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতেই প্রতিবছর ১৬ জুলাই পালিত হয় বিশ্ব সাপ দিবস।

ভয় নয়, সাপকে জানতে হবে

বিশ্বজুড়ে সাপের হাজারো প্রজাতি রয়েছে।

অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব মহাদেশেই বিভিন্ন ধরনের সাপের বসবাস। বন, পাহাড়, মরুভূমি, জলাভূমি এমনকি সমুদ্রেও রয়েছে তাদের বিচরণ।
বর্তমান বিশ্বে সাপের ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সব সাপ বিষধর নয়।

মাত্র একটি ছোট অংশের সাপ মানুষের জন্য বিপজ্জনক। অধিকাংশ সাপই মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে।

প্রকৃতিতে সাপের ভূমিকা

Manual4 Ad Code

সাপকে প্রকৃতির দক্ষ শিকারি বলা হয়। তারা ইঁদুরসহ বিভিন্ন ছোট প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এর ফলে কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে।

বিশেষ করে কৃষকদের জন্য সাপ অনেক সময় উপকারী হয়ে ওঠে, কারণ তারা ফসলের ক্ষতি করা ইঁদুরের সংখ্যা কমাতে সাহায্য করে।

সাপের জীবনযাত্রা

সাপ শীতল রক্তের প্রাণী। তাই শরীরের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে তাদের বাইরের পরিবেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। ঠান্ডায় তারা রোদে উষ্ণতা নেয়, আবার গরমে ঠান্ডা ও নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেয়।

তাদের শরীরের বিশেষ গঠন বড় শিকারও সহজে গিলে ফেলতে সাহায্য করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো চামড়া ফেলে নতুন চামড়া ধারণ করাও সাপের স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া।

মানুষের ভয় কতটা যুক্তিসঙ্গত?

সাপকে অনেকেই আক্রমণাত্মক প্রাণী মনে করেন। কিন্তু বেশিরভাগ সাপই মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকতে চায়। সাধারণত ভয় পেলে, আটকা পড়লে বা নিজেদের জীবন হুমকির মুখে পড়লেই তারা আত্মরক্ষার জন্য আক্রমণ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপ দেখলে না মেরে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং প্রয়োজন হলে উদ্ধারকারী দলের সহায়তা নেওয়াই সবচেয়ে ভালো উপায়।

বিপদের মুখে সাপের অস্তিত্ব

বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থল ধ্বংস ও মানুষের অসচেতনতার কারণে অনেক সাপের প্রজাতি বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে।

Manual7 Ad Code

একটি প্রজাতির হারিয়ে যাওয়া শুধু সেই প্রাণীর ক্ষতি নয়, এর প্রভাব পড়ে পুরো বাস্তুতন্ত্রে। তাই সাপ সংরক্ষণ মানে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় অবদান রাখা।

সাপ নিয়ে কিছু মজার তথ্য

বিশ্বের সবচেয়ে ছোট সাপগুলোর একটি হলো বার্বাডোস থ্রেড স্নেক। অন্যদিকে সবচেয়ে লম্বা সাপ হিসেবে পরিচিত রেটিকুলেটেড পাইথন। সবচেয়ে ভারী সাপের মধ্যে রয়েছে গ্রিন অ্যানাকোন্ডা। আর বিষধর সাপের মধ্যে আকারে সবচেয়ে বড় হলো কিং কোবরা।

সাপকে নিয়ে তৈরি হয়েছে অসংখ্য সিনেমা ও গল্প, যেখানে অনেক সময় তাদের ভয়ংকর হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সাপ প্রকৃতির একটি প্রয়োজনীয় অংশ।

বিশ্ব সাপ দিবস তাই মনে করিয়ে দেয়—সাপকে ভয় নয়, বরং সঠিকভাবে জানতে হবে। সচেতনতা ও সংরক্ষণের মাধ্যমেই মানুষ ও সাপের সহাবস্থান সম্ভব।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ