বই পড়ে কেউ দেউলিয়া হয় না: ইউএনও জিয়াউর রহমান

প্রকাশিত: ২:৫০ অপরাহ্ণ, জুলাই ২১, ২০২৬

বই পড়ে কেউ দেউলিয়া হয় না: ইউএনও জিয়াউর রহমান

Manual5 Ad Code
  • ২৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে শ্রীমঙ্গলে দেড়মাসব্যাপী ‘বই পড়া উৎসব-২০২৬’ শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ২১ জুলাই ২০২৬ : “বই পড়ে কেউ দেউলিয়া হয় না। আজকের রিডারই ভবিষ্যতের লিডার।”— এমন অনুপ্রেরণামূলক আহ্বান জানিয়ে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেছেন, প্রযুক্তির এই সময়ে নতুন প্রজন্মকে শুধু পরীক্ষামুখী শিক্ষা নয়, পাঠ্যবইয়ের বাইরের জ্ঞানচর্চার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বই মানুষের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে, বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়ায় এবং একজন দায়িত্বশীল, মানবিক ও সৃজনশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।

তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের বই পড়ার আগ্রহ দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ। একটি সমাজকে জ্ঞানভিত্তিক সমাজে রূপান্তর করতে হলে বইপড়ার কোনো বিকল্প নেই। আমরা চাই, মোবাইলনির্ভর বিনোদনের পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলুক। কারণ বই মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না, জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দেয়।”

মঙ্গলবার (২১ জুলাই ২০২৬) সকাল ১০টায় শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দেড় মাসব্যাপী ‘বই পড়া উৎসব-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

Manual6 Ad Code

এবারের আয়োজনকে অন্যতম বৃহৎ বইপাঠভিত্তিক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে ইউএনও বলেন, “আমরা শুধু একটি প্রতিযোগিতা করছি না; আমরা একটি পাঠ আন্দোলনের সূচনা করছি। এই আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে, তাদের চিন্তাশক্তি বিকশিত হবে এবং সমাজে একটি ইতিবাচক সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি হবে।”

২৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এতে অংশগ্রহণ করবে

উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে শুরু হওয়া এই উৎসবে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীসহ উন্মুক্ত বিভাগ মিলিয়ে ২৫ হাজারেরও বেশি প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করবে বলে আয়োজকদের আশা। এর মধ্যে উপজেলার ৩৮টি মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থী সরাসরি বিভিন্ন ধাপে অংশ নেবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিন কামাল। তিনি বলেন, “নিজেকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করতে বই পড়ার বিকল্প নেই। বই মানুষের ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ ও জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে।”

তিন ধাপে পাঠযাত্রা

উৎসবটি পরিচালিত হচ্ছে চারটি বিভাগে। ‘ক’ বিভাগে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি, ‘খ’ বিভাগে নবম ও দশম শ্রেণি, ‘গ’ বিভাগে একাদশ শ্রেণি থেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও তদূর্ধ্ব শিক্ষার্থী এবং ‘ঘ’ বিভাগে শ্রীমঙ্গল উপজেলার যে কোনো বয়সের বইপ্রেমী সাধারণ মানুষ অংশ নিতে পারবেন।

পুরো উৎসব তিনটি ধাপে অনুষ্ঠিত হবে— মুকুল, ফুল ও ফল। প্রতিটি ধাপে প্রতিযোগীদের পাঠ্যবইয়ের বাইরে নির্বাচিত গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, জীবনী ও অন্যান্য সাহিত্যগ্রন্থ পড়তে হবে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতা যাচাই করে পরবর্তী ধাপে উন্নীত করা হবে।

প্রথম ধাপ ‘মুকুল’-এর জন্য বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণির উপযোগী মোট ১৫টি বইয়ের একটি নির্বাচিত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিটি শ্রেণির জন্য নির্ধারিত দুটি বইয়ের মধ্য থেকে একটি পড়ে আগামী ৩ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে।

লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা দ্বিতীয় ধাপ ‘ফুল’-এ অংশ নেবে। এ ধাপে নতুন একটি বইয়ের ওপর নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। সেখান থেকে নির্বাচিত সেরা পাঠকেরা উপজেলা পর্যায়ের চূড়ান্ত ধাপ ‘ফল’-এ অংশগ্রহণ করবেন। চূড়ান্ত ধাপেও নতুন একটি বই নির্ধারণ করা হবে এবং তার ওপর মূল্যায়নের মাধ্যমে সেরা পাঠক নির্বাচন করা হবে।

অর্থাৎ একজন প্রতিযোগীকে পুরো উৎসবজুড়ে তিনটি পৃথক বই পাঠ করতে হবে এবং প্রতিটি বইয়ের ওপর ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে তার পাঠদক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও সাহিত্যবোধ যাচাই করা হবে।

শুধু প্রতিযোগিতা নয়, পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার আন্দোলন

আয়োজকরা জানিয়েছেন, এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য কেবল বিজয়ী নির্বাচন নয়; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, জ্ঞানচর্চা ও বিশ্লেষণী দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিমনস্ক একটি প্রজন্ম তৈরি করা।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইলনির্ভর বিনোদনের কারণে শিশু-কিশোরদের বই থেকে দূরে সরে যাওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, এই উদ্যোগ সেই প্রবণতা পরিবর্তনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস।

প্রথমবার যুক্ত হলো উন্মুক্ত বিভাগ

Manual3 Ad Code

এবারের উৎসবের অন্যতম বিশেষত্ব হলো উন্মুক্ত বিভাগ। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা শ্রীমঙ্গল উপজেলার যে কোনো বয়সের বইপ্রেমী ব্যক্তি এই উৎসবে অংশ নিতে পারবেন। আয়োজকদের মতে, এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেও বইপাঠের আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে।

উৎসব ঘিরে বইপাঠের প্রাণচাঞ্চল্য

দেড় মাসব্যাপী এই উৎসবকে ঘিরে ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বই সংগ্রহ, পাঠচক্র, আলোচনা সভা ও পাঠ-প্রস্তুতির কর্মসূচি শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও সংস্কৃতিকর্মীদের অংশগ্রহণে পুরো উপজেলায় বইপাঠকে কেন্দ্র করে এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

উৎসব বাস্তবায়নে উপজেলা প্রশাসনকে সমন্বয় সহযোগিতা করছে শ্রীমঙ্গল আবৃত্তি উৎসব, আর পাঠ সহযোগী হিসেবে রয়েছে উত্তরণ, শ্রীমঙ্গল।

Manual5 Ad Code

বিশিষ্টজনদের উপস্থিতি

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অয়ন চৌধুরী, নটরডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রিন্সিপাল ফাদার প্রশান্ত নিকোলাস, শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বিমল কান্ত দাশ, দি বাডস রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক সুপর্ণা দেবনাথ ও শিক্ষক রাশেদ আহমেদ, সিনিয়র সাংবাদিক আতাউর রহমান কাজল, শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপরাজিতা বর্ধন অপি ও উম্মে কুলসুম মীমসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষানুরাগীরা।

কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানের শুভেচ্ছা

বইপড়া উৎসবের সফলতা কামনা করে শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথা-এর বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান এক শুভেচ্ছাবার্তায় বলেছেন, “জ্ঞান, মনন ও সৃজনশীলতার এই উজ্জ্বল যাত্রায় শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবে। জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ‘আলোকিত মানুষ গড়ার’ আন্দোলন আরও বেগবান হবে।”

তিনি বলেন, ডিজিটাল যুগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক আরও গভীর করতে এবং বর্তমান প্রজন্মকে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করতে এ ধরনের উৎসব সময়োপযোগী ও অত্যন্ত কার্যকর উদ্যোগ।

Manual5 Ad Code

সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত আয়োজন করা গেলে পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা আরও সমৃদ্ধ হবে। একই সঙ্গে বইকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সৃজনশীল, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ