লড়াই-সংগ্রামের প্রিয় দিনগুলো

প্রকাশিত: ১১:৩০ অপরাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০২৬

লড়াই-সংগ্রামের প্রিয় দিনগুলো

Manual7 Ad Code
  • বিজয়ের চেতনায় গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলনের এক স্মরণীয় অধ্যায়

কামরুজ্জামান ফিরোজ |

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার ইতিহাস নয়; এটি শোষণ, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের অবিরাম সংগ্রামের প্রতীক। সেই বিজয়ের চেতনা থেকেই দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও শ্রমজীবী আন্দোলন শক্তি সঞ্চয় করেছে। স্বাধীনতার পর শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ প্রতিষ্ঠার দাবিতে যে ধারাবাহিক সংগ্রাম গড়ে ওঠে, গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলন তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

Manual6 Ad Code

আজও স্মৃতির অ্যালবামে অমলিন হয়ে আছে ১৯৯৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের সেই ঐতিহাসিক দিনটি। দিনটি ছিল একদিকে জাতীয় গৌরবের, অন্যদিকে গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলনের জন্য নতুন প্রত্যয়ের দিন। সেদিন গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলন সমন্বয় পরিষদের নবনির্বাচিত কেন্দ্রীয় কমিটিকে রজনীগন্ধা ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল রাজধানীর মিরপুরের কালসি বালু মাঠ বস্তিতে অবস্থিত সংগঠনের কার্যালয়ে। সাধারণ আয়োজন হলেও এর তাৎপর্য ছিল গভীর। এটি ছিল শ্রমিক আন্দোলনের ঐক্য, নেতৃত্বের প্রতি আস্থা এবং ভবিষ্যৎ সংগ্রামের অঙ্গীকারের প্রতীক।

Manual6 Ad Code

সেই দুর্লভ ছবিতে উপস্থিত ছিলেন গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলনের তৎকালীন উপদেষ্টা ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ, যিনি তাঁর ঝাঁকড়া চুল ও লাল হাফহাতা সুয়েটার পরিহিত অবস্থায় ছবিতে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। তাঁর পাশে ছিলেন গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলনের তৎকালীন সভাপতি কামরুজ্জামান ফিরোজ, কালো কোর্ট পরিহিত। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ, যাঁদের প্রত্যেকের অবদান ছিল সংগঠনকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও শ্রমিকদের জীবন ছিল নানা বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা। স্বল্প মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, চাকরির নিরাপত্তাহীনতা, নারী শ্রমিকদের প্রতি বৈষম্য, মাতৃত্বকালীন সুবিধার অভাব, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার সীমিত হওয়া এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার সংকট ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। এসব বাস্তবতার বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা থেকেই গড়ে ওঠে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন। গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলন ছিল সেই সময়ের অন্যতম সক্রিয় ও সংগ্রামী সংগঠন।

এই আন্দোলনের নেতাকর্মীরা শুধু দাবি-দাওয়া উত্থাপন করেই থেমে থাকেননি; তাঁরা শ্রমিকদের সচেতন করে তুলেছেন, সংগঠিত করেছেন এবং আইনি ও সাংগঠনিক সহায়তার মাধ্যমে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে পাশে থেকেছেন। আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচি ছিল শ্রমিকের সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অংশ।

১৯৯৭ সালের বিজয় দিবসে নবনির্বাচিত কমিটিকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর ঘটনাটি ছিল নেতৃত্বের প্রতি আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি নতুন দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকারেরও প্রতীক। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম আরও বেগবান করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল—সংগঠিত শ্রমিকশক্তিই পারে শিল্পের উন্নয়ন এবং শ্রমিকের ন্যায্য অধিকারকে একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে।

আজ প্রায় তিন দশক পর ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয়, সেই সময়কার সংগ্রাম বৃথা যায়নি। গার্মেন্টস খাতে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, শ্রম আইন সংস্কার, নিরাপত্তা বিষয়ে আন্তর্জাতিক নজরদারি এবং শ্রমিক অধিকার নিয়ে জাতীয় ও বৈশ্বিক আলোচনা—এসব অর্জনের পেছনে দীর্ঘদিনের শ্রমিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যদিও এখনও অনেক সমস্যা রয়ে গেছে, তবুও অতীতের সংগ্রাম বর্তমানের অগ্রগতির ভিত্তি নির্মাণ করেছে।

মিরপুরের কালসি বালু মাঠ বস্তির সেই ছোট্ট অফিসকক্ষ হয়তো বাহ্যিকভাবে ছিল অত্যন্ত সাধারণ; কিন্তু সেখানেই জন্ম নিয়েছিল বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, অসংখ্য আন্দোলনের পরিকল্পনা এবং শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয়। তাই সেই কার্যালয়, সেই অনুষ্ঠান এবং সেই ছবি আজ শুধু একটি স্মৃতি নয়—এটি বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসের মূল্যবান দলিল।

Manual4 Ad Code

ইতিহাস সংরক্ষণ করা মানে শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানানো যে, আজকের অর্জনের পেছনে কত মানুষের ত্যাগ, শ্রম, সাহস ও আত্মনিবেদন জড়িয়ে আছে। যারা নিরলসভাবে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন, তাঁদের অবদান যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

মহান বিজয় দিবস আমাদের শিখিয়েছে—অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম কখনও ব্যর্থ হয় না। সেই শিক্ষা নিয়েই গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলনের নেতাকর্মীরা এগিয়ে গিয়েছিলেন শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে। ১৯৯৭ সালের ১৬ ডিসেম্বরের সেই দুর্লভ ছবিটি তাই কেবল একটি আলোকচিত্র নয়; এটি সংগ্রাম, ঐক্য, নেতৃত্ব, আত্মত্যাগ এবং ভবিষ্যতের প্রতি অটল বিশ্বাসের এক জীবন্ত ইতিহাস।

আজকের প্রজন্মের শ্রমিক নেতা, গবেষক এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে এই স্মৃতি অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকুক। কারণ, ইতিহাসের শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই একটি ন্যায়ভিত্তিক, মর্যাদাপূর্ণ এবং মানবিক কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। মহান বিজয়ের চেতনা ধারণ করে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই পথচলা অব্যাহত থাকুক—এটাই প্রত্যাশা।

Manual7 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ