হ্যান্ডস অফ এশিয়া সম্মেলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: সার্বভৌমত্ব, সংহতি ও বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের সন্ধানে

প্রকাশিত: ১০:০০ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৪, ২০২৬

হ্যান্ডস অফ এশিয়া সম্মেলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: সার্বভৌমত্ব, সংহতি ও বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের সন্ধানে

Manual5 Ad Code

নজরুল ইসলাম হক্কানী |

গত ১৬–১৮ জুলাই শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে অনুষ্ঠিত হয় তিনদিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন “Hands Off Asia: A People’s Call for Sovereignty and Solidarity”। সম্মেলনের আয়োজন করে ইন্টারন্যাশনাল পিপলস অ্যাসেম্বলি (International Peoples’ Assembly–IPA) এবং ট্রাইকন্টিনেন্টাল: ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল রিসার্চ (Tricontinental: Institute for Social Research)। এর সহযোগী ছিল শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন গণসংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ও প্রগতিশীল সামাজিক সংগঠন।

সম্মেলনে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, তিমুর-লেস্তে, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল ও কিউবাসহ এশিয়া ও বৈশ্বিক দক্ষিণের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। উপস্থিত ছিলেন রাজনৈতিক দলের নেতা, সংসদ সদস্য, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, কৃষক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন গণআন্দোলনের কর্মীরা।

সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য দেন শ্রীলঙ্কার পরিবেশমন্ত্রী ড. ধাম্মিকা পাটাবেন্দি, নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দাহাল (প্রচণ্ড), শ্রীলঙ্কায় নিযুক্ত কিউবার রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া লাজারা পেগো গুয়ের্রা এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইতিহাসবিদ ও ট্রাইকন্টিনেন্টালের পরিচালক বিজয় প্রসাদ। সম্মেলনের মূল রাজনৈতিক প্রবন্ধ (Political Paper) উপস্থাপন করেন বিজয় প্রসাদ। আলোচনায় অংশ নেন নেপালের কমিউনিস্ট নেতা, ভারতের বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠনের প্রতিনিধি, শ্রীলঙ্কার ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া ও অন্যান্য দেশের গবেষক, শ্রমিক-কৃষক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং আন্তর্জাতিক পিপলস অ্যাসেম্বলির সমন্বয়কারীরা।

Manual3 Ad Code

এই সম্মেলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল এমন একটি এশিয়ার পক্ষে জনমত গড়ে তোলা, যেখানে বহিঃশক্তির সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপের পরিবর্তে সার্বভৌমত্ব, পারস্পরিক সম্মান, আঞ্চলিক সংহতি এবং স্বাধীন উন্নয়ন কৌশলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আয়োজকদের মতে, এশিয়ার জনগণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এশিয়ার জনগণই—কোনো বহিরাগত শক্তি নয়।

সম্মেলনের আলোচনায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পায় চারটি বিষয়।

Manual5 Ad Code

প্রথমত, এশিয়াকে নতুন সামরিক প্রতিযোগিতা ও প্রক্সি সংঘাতের ক্ষেত্র বানানোর বিরোধিতা।

Manual8 Ad Code

দ্বিতীয়ত, একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ঋণনির্ভর উন্নয়ন ও বহিরাগত নীতিগত চাপের পরিবর্তে স্বাধীন অর্থনৈতিক পরিকল্পনার পক্ষে অবস্থান।

তৃতীয়ত, দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা, প্রযুক্তি বিনিময়, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পারস্পরিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের আহ্বান।

Manual8 Ad Code

চতুর্থত, বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরও ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিবেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা।

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিদের মতে, বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের প্রশ্ন কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধির নয়; এটি খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, শিল্পায়ন, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং নীতিনির্ধারণে জাতীয় স্বাধীনতার সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই তারা এমন এক উন্নয়ন মডেলের আহ্বান জানান, যেখানে জনগণের অংশগ্রহণ, উৎপাদনক্ষমতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।

সবশেষে বলা যায়, “হ্যান্ডস অফ এশিয়া” সম্মেলনের মূল বার্তা ছিল—এশিয়া যেন কোনো পরাশক্তির প্রতিযোগিতার যুদ্ধক্ষেত্র না হয়ে শান্তি, সহযোগিতা, সার্বভৌমত্ব এবং বহুমুখী উন্নয়নের একটি স্বাধীন ভূখণ্ডে পরিণত হয়। এই লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা ভবিষ্যৎই বলবে; তবে এশিয়ার ভূরাজনীতি ও উন্নয়ন-ভাবনা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করতে সম্মেলনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
#
অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ