ভাইরাল ভিডিও ঘিরে সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষিকার জিডি

প্রকাশিত: ১০:৫৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০২৬

ভাইরাল ভিডিও ঘিরে সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষিকার জিডি

Manual8 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট), ২৭ জুলাই ২০২৬ : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে অপপ্রচার, হয়রানি ও সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পাল। তাঁর অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি ফেসবুক আইডি থেকে তাঁকে অপমানজনক ও সম্মানহানিকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

সোমবার (২৭ জুলাই ২০২৬) ফেঞ্চুগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান জিডির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার একটি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ধারণ করা প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালের একটি রিল ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটিতে তাঁকে শাড়ি পরা অবস্থায় একটি বাংলা গানের সঙ্গে বিভিন্ন ভঙ্গিতে হাঁটতে দেখা যায়। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। একপর্যায়ে ভিডিওটিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে তাঁকে নিয়ে অপপ্রচার ও হয়রানি করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে থানায় জিডি করেন ওই প্রধান শিক্ষিকা।

কয়েকটি ফেসবুক আইডির বিরুদ্ধে অভিযোগ

থানায় করা জিডিতে কয়েকটি ফেসবুক আইডির মাধ্যমে তাঁকে সামাজিকভাবে হেয়, অপমান ও সম্মানহানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিউটি রাণী পাল। অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ভিডিও ও পরিচয়কে কেন্দ্র করে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

ফেঞ্চুগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান বলেন, প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালের করা জিডিটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘লিখিত অভিযোগে কয়েকটি ফেসবুক আইডি থেকে প্রধান শিক্ষিকাকে অপমানজনক ও সম্মানহানিকরভাবে উপস্থাপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

Manual7 Ad Code

অভিযোগে উল্লেখ করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোর পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে জানিয়ে ওসি বলেন, আইডিগুলো শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য আইটি ফরেনসিকে পাঠানো হয়েছে।

তদন্তের আওতায় ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ ও ‘ইব্রাহিম খলিল’ নামের ফেসবুক আইডির বিষয়টিও রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে এসব আইডির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই অপপ্রচার বা হয়রানির সঙ্গে জড়িত—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি। তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা

জানা গেছে, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ধারণ করা ওই ভিডিওটি প্রথমে রিল হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরে সেটি বিভিন্ন ব্যক্তি ও পেজ থেকে শেয়ার হওয়ার পর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মন্তব্য দেখা যায়।

একপর্যায়ে ভিডিওটির মূল বিষয়বস্তুর বাইরে প্রধান শিক্ষিকার ব্যক্তিগত ও পেশাগত পরিচয় নিয়েও বিভিন্ন মন্তব্য ও পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ করা হয়। এসব পোস্ট ও মন্তব্যের কিছু অংশকে অপমানজনক ও সম্মানহানিকর হিসেবে উল্লেখ করে আইনি প্রতিকার চেয়েছেন বিউটি রাণী পাল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে ধারাবাহিকভাবে অপমান, হেয়প্রতিপন্ন, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা হয়রানি করা হলে তা সাইবার বুলিংয়ের পর্যায়ে পড়তে পারে। তবে এই ঘটনায় প্রকাশিত পোস্ট, মন্তব্য ও সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোর প্রকৃতি এবং আইনগত দায় রয়েছে কি না, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রশাসনিকভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে 

Manual8 Ad Code

অন্যদিকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়েও আলোচনা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণবিধি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারের দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখছে প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন।

সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সাখাওয়াত এরশেদ জানিয়েছেন, ভিডিওটি নিয়ে প্রশাসনিকভাবে মূলত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণবিধি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নির্দেশনা লঙ্ঘন হয়েছে কি না, সেটিই পর্যালোচনা করা হবে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যালোচনায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের কোনো বিষয় পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে খতিয়ে দেখার প্রক্রিয়া রয়েছে।

একই ঘটনায় দুটি ভিন্ন দিক

প্রধান শিক্ষিকার জিডি এবং শিক্ষা প্রশাসনের পর্যালোচনা—দুটি বিষয়কে পৃথকভাবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। একদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তাঁকে উদ্দেশ্য করে অপপ্রচার, হয়রানি বা সম্মানহানি করেছে কি না, সেটি পুলিশের তদন্তের বিষয়। অন্যদিকে একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর কর্মকাণ্ড সরকারি আচরণবিধি ও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটি প্রশাসনিকভাবে যাচাইয়ের বিষয়।

Manual6 Ad Code

পুলিশ বলছে, জিডিতে উল্লিখিত ফেসবুক আইডিগুলোর প্রকৃত পরিচয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং তাঁদের মাধ্যমে কোনো আইনভঙ্গ হয়েছে কি না, তা প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট তথ্য আইটি ফরেনসিকে পাঠানো হয়েছে।

তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সেটিকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি, অপমানজনক মন্তব্য কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির পরিচয়, পেশা বা সামাজিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে অনলাইনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হলে অনেক সময় মূল ঘটনার বাইরে ব্যক্তিগত হয়রানিরও শিকার হতে হয়।

ফেঞ্চুগঞ্জের এই ঘটনাতেও ভিডিওটি প্রকাশ ও ভাইরাল হওয়ার পর কীভাবে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে তা ছড়িয়েছে, সেখানে কী ধরনের বক্তব্য বা মন্তব্য যুক্ত হয়েছে এবং সেগুলোর কোনোটি আইনগতভাবে অপরাধের পর্যায়ে পড়ে কি না—এসব বিষয় এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে।

ফেঞ্চুগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান জানিয়েছেন, তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আচরণবিধি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নির্দেশনা অনুসরণের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ফলে ভাইরাল ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ঘটনাটি এখন পুলিশের সাইবার তদন্ত এবং শিক্ষা প্রশাসনের প্রশাসনিক পর্যালোচনা—দুই দিকেই এগোচ্ছে।

Manual3 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ