এ কে জি ভবনে পুলিশের প্রবেশ নিয়ে উত্তেজনা, ঐশী ঘোষকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা

প্রকাশিত: ৬:১৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৮, ২০২৬

এ কে জি ভবনে পুলিশের প্রবেশ নিয়ে উত্তেজনা, ঐশী ঘোষকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা

Manual6 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | নয়াদিল্লি (ভারত), ২৮ জুলাই ২০২৬ : ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)—সিপিআই(এম)-এর দিল্লির সদর দপ্তর এ কে জি ভবনে পুলিশ প্রবেশ করে স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (এসএফআই) নেত্রী ঐশী ঘোষকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করেছে—এমন অভিযোগ করেছে দলটি।

Manual4 Ad Code

দলটির দাবি, কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ের ভেতরে এভাবে পুলিশি অভিযান চালানো শুধু অনভিপ্রেত নয়, গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপরও গুরুতর হস্তক্ষেপ।

সিপিআই(এম)-এর অভিযোগ অনুযায়ী, দিল্লি পুলিশ এ কে জি ভবনে প্রবেশ করে ঐশী ঘোষকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেয়। এ সময় দলের রাজ্যসভা সদস্য জন ব্রিটাস পুলিশের ওই পদক্ষেপে হস্তক্ষেপ করেন এবং দলীয় কার্যালয়ের ভেতর থেকে তাঁকে গ্রেপ্তারের প্রচেষ্টা প্রতিহত করেন। ঘটনাকে কেন্দ্র করে দলীয় কার্যালয় চত্বরে উত্তেজনা তৈরি হয়।

দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুলিশি এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেন জন ব্রিটাস। তাঁর হস্তক্ষেপে পুলিশ ঐশী ঘোষকে দলীয় কার্যালয় থেকে নিয়ে যেতে পারেনি বলে দাবি করেছে সিপিআই(এম)।

সিপিআই(এম) এক বিবৃতিতে ঘটনাটিকে ‘অবৈধ’ ও ‘গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর আক্রমণ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। দলের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি ও আন্দোলনের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে সমাধান করার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকার পুলিশি ক্ষমতা প্রয়োগ করে প্রতিবাদী কণ্ঠকে দমন ও ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে।

দলের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন এসএফআই নেত্রী ঐশী ঘোষ। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ)-এর সাবেক ছাত্রনেত্রী হিসেবে তিনি ভারতের ছাত্ররাজনীতিতে পরিচিত মুখ। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের অধিকার, শিক্ষা ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার প্রশ্নে আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। তাঁকে ঘিরে সাম্প্রতিক পুলিশি তৎপরতাকে তাই বৃহত্তর ছাত্র আন্দোলনের ওপর চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবে দেখছে বামপন্থী দলটি।

Manual3 Ad Code

সিপিআই(এম)-এর বক্তব্য, শিক্ষার্থীরা যখন শিক্ষা, অধিকার ও ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলন করছে, তখন তাদের সঙ্গে আলোচনা না করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দলের ভাষায়, এ ধরনের পদক্ষেপ ‘ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত’ করার প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট করে।

রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে পুলিশের প্রবেশ নিয়ে প্রশ্ন

ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো একটি জাতীয় রাজনৈতিক দলের সদর দপ্তরের ভেতরে পুলিশের প্রবেশ। সিপিআই(এম) প্রশ্ন তুলেছে, দলীয় কার্যালয়ে প্রবেশ করে কোনো রাজনৈতিক কর্মী বা নেতাকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে পুলিশ কী ধরনের আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কী অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল।

Manual6 Ad Code

দলটির অভিযোগ, এ কে জি ভবনে পুলিশের প্রবেশ ছিল রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক পরিসরে সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল। সিপিআই(এম)-এর দাবি, কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয়কে সাধারণ কোনো স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করে সেখানে নির্বিচারে পুলিশি অভিযান চালানো যায় না। বিশেষ করে একজন রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় কী বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তারা কোন মামলার প্রেক্ষিতে এ কে জি ভবনে প্রবেশ করেছিল এবং ঐশী ঘোষকে গ্রেপ্তারের জন্য কোনো আইনগত নির্দেশ বা পরোয়ানা ছিল কি না—এসব বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার আইনগত ও প্রশাসনিক দিকটি আরও স্পষ্ট হতে পারে।

জন ব্রিটাসের হস্তক্ষেপ

ঘটনার সময় সিপিআই(এম)-এর রাজ্যসভা সদস্য জন ব্রিটাসের ভূমিকা বিশেষভাবে সামনে এসেছে। দলটির দাবি, পুলিশ ঐশী ঘোষকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নিলে ব্রিটাস ঘটনাস্থলে হস্তক্ষেপ করেন এবং পুলিশকে দলীয় কার্যালয়ের ভেতরে ওই পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখেন।

সিপিআই(এম)-এর বক্তব্য অনুযায়ী, একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে ব্রিটাস পুলিশের পদক্ষেপের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং দলীয় সদর দপ্তরের ভেতরে গ্রেপ্তারের প্রচেষ্টা প্রতিরোধ করেন। দলটির মতে, ঘটনাটি শুধু একজন ছাত্রনেত্রীকে গ্রেপ্তারের প্রশ্ন নয়; বরং রাজনৈতিক দলের স্বাধীন কার্যক্রম এবং বিরোধী মত প্রকাশের অধিকার নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।

উইচ হান্ট’-এর অভিযোগ

ঐশী ঘোষকে ঘিরে পুলিশি তৎপরতাকে ‘উইচ হান্ট’ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি হিসেবে বর্ণনা করেছে সিপিআই(এম)। দলটির অভিযোগ, সরকারের নীতির বিরোধিতা করে যারা ছাত্র ও যুবসমাজকে সংগঠিত করছেন, তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সিপিআই(এম) মনে করছে, এই প্রবণতা গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারের জন্য উদ্বেগজনক। তাদের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে আলোচনা ও রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সংকুচিত হয়।

দলের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার, শিক্ষা ও গণতন্ত্রের দাবিকে দমন করা যাবে না। সিপিআই(এম) আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের পুরোনো অভিযোগ

এ ঘটনা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে তদন্তকারী সংস্থা ও পুলিশকে রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অভিযোগ করে আসছে। যদিও সরকার ও ক্ষমতাসীন বিজেপি এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করে থাকে।

সরকারপক্ষের যুক্তি হলো, আইন ভঙ্গের অভিযোগ থাকলে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে এ কে জি ভবনের ঘটনাতেও পুলিশের আইনগত ভিত্তি, গ্রেপ্তারের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট মামলার প্রকৃতি স্পষ্ট হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে পুলিশি তৎপরতা এবং কোনো রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সাংবিধানিক অধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত হলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও পুলিশের রয়েছে। ফলে ঘটনাটির প্রকৃত মূল্যায়নের জন্য পুলিশের বক্তব্য, মামলার নথি এবং আদালতের নির্দেশ—সবকিছু সামনে আসা প্রয়োজন।

Manual2 Ad Code

ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে নতুন উত্তাপ

ঐশী ঘোষকে ঘিরে এই ঘটনা ভারতের ছাত্ররাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। শিক্ষা, ফি, ক্যাম্পাসের গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অধিকার নিয়ে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন চলে আসছে। এসব আন্দোলনে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনও সক্রিয়।

সিপিআই(এম)-এর অভিযোগ, ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। দলটি মনে করে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত।

অন্যদিকে, কোনো আন্দোলনের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনা বা ফৌজদারি অভিযোগ যুক্ত থাকলে পুলিশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে—এমন অবস্থানই সাধারণত প্রশাসনের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়। তাই এ ক্ষেত্রে আন্দোলনের অধিকার এবং আইন প্রয়োগ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্যই হবে মূল প্রশ্ন।

‘গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর আক্রমণ’

এ কে জি ভবনে পুলিশের প্রবেশের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সিপিআই(এম)। দলটির ভাষ্য, একটি রাজনৈতিক দলের সদর দপ্তরে পুলিশের এমন তৎপরতা বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টির উদাহরণ এবং এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিসর সংকুচিত হচ্ছে।

দলটি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ‘ভিন্নমত দমন’ এবং ছাত্র আন্দোলনকে ‘অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত’ করার অভিযোগও তুলেছে। একই সঙ্গে সিপিআই(এম) ঘোষণা করেছে, শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার, শিক্ষা ও গণতন্ত্রের দাবির প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।

ঘটনাটি নিয়ে এখন মূলত তিনটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—ঐশী ঘোষকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের আইনগত ভিত্তি কী ছিল, দলীয় সদর দপ্তরে প্রবেশের ক্ষেত্রে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল এবং ছাত্র আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের অভিযোগ কতটা সত্য। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট মামলার তথ্য এবং আদালতের নথি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এ কে জি ভবনের ঘটনাকে ঘিরে সিপিআই(এম)-এর প্রতিবাদ তাই কেবল একটি গ্রেপ্তার-চেষ্টার বিরোধিতা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি ভারতের রাজনীতিতে বিরোধী দলের স্বাধীনতা, ছাত্র আন্দোলনের অধিকার, পুলিশের ক্ষমতার সীমা এবং গণতান্ত্রিক পরিসর নিয়ে বৃহত্তর বিতর্ককেও সামনে নিয়ে এসেছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ