নেপালে হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষে নিহত ৩

প্রকাশিত: ১২:২০ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০২৬

নেপালে হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষে নিহত ৩

Manual7 Ad Code
  • সুনসারিতে কারফিউ, সহিংসতা ছড়িয়েছে পার্শ্ববর্তী জেলাতেও; শান্ত থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক | কাঠমান্ডু (নেপাল), ৩১ জুলাই ২০২৬ : নেপালের দক্ষিণাঞ্চলে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সুনসারি জেলায় পুলিশের গুলিতে দুজন এবং পার্শ্ববর্তী সিরাহা জেলায় কারফিউ ভেঙে বিক্ষোভের সময় আরও একজন নিহত হন।

সহিংসতার জেরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সুনসারি ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় কঠোর কারফিউ জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

এদিকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশের নাগরিকদের শান্ত, সংযত ও দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছেন নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। গত মার্চে দায়িত্ব গ্রহণের পর জনসমক্ষে তুলনামূলকভাবে কম উপস্থিত হওয়া প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে এ আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের শান্তি, সামাজিক সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐক্য রক্ষা করা এই মুহূর্তে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। কোনো ধরনের গুজব, উসকানি বা উত্তেজনাপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়ার জন্য তিনি নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘আসুন, সবাই মিলে অশান্তির মেঘ দূর করি।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি সরকারের পক্ষ থেকে সব নাগরিক, সুশীল সমাজ, ধর্মীয় সম্প্রদায়, নেতা, রাজনৈতিক দল ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। আপনারা সবাই ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখুন। দেশে শান্তি, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব এবং জাতীয় ঐক্য রক্ষা করাই এখন আমাদের মূল লক্ষ্য।’

যেভাবে সংঘর্ষের সূত্রপাত

সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার ভারত সীমান্তবর্তী সুনসারি জেলার একটি গ্রামে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। সেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মুসলিমদের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়।

Manual4 Ad Code

প্রাথমিকভাবে শোভাযাত্রায় উচ্চ শব্দে গান বাজানো এবং ধর্মীয় পতাকা টাঙানোকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে কথাকাটাকাটি তীব্র আকার ধারণ করে এবং তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে হস্তক্ষেপ করে।

পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফ্লের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলি চালালে দুজন নিহত হন। এ ঘটনায় আরও অনেকে আহত হয়েছেন কি না বা হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

সুনসারির ঘটনার পর উত্তেজনা পার্শ্ববর্তী এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। সিরাহা জেলায় কারফিউ জারি থাকা অবস্থায় বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ রাস্তায় নেমে আসে। কারফিউ ভেঙে বিক্ষোভের সময় সেখানে আরও একজনের মৃত্যু হয়।

কঠোর অবস্থানে প্রশাসন

পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে সুনসারি ও আশপাশের জেলাগুলোতে কঠোর কারফিউ জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। সম্ভাব্য নতুন সংঘাত ঠেকাতে পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

Manual8 Ad Code

পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফ্লে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।

Manual7 Ad Code

তিনি বলেন, ‘আমরা সব পুলিশ সদস্যকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রেখেছি। আমাদের লক্ষ্য, ন্যূনতম বল প্রয়োগ করে জনগণের জানমাল রক্ষা করা এবং যেকোনো সংঘাতময় পরিস্থিতি এড়ানো।’

পুলিশের পক্ষ থেকে একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে—এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

স্বচ্ছ তদন্তের প্রতিশ্রুতি

সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনায় সম্পূর্ণ ‘সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ’ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। সহিংসতার পেছনে যারা দায়ী, তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারবে না। সহিংসতার মাধ্যমে সামাজিক বা ধর্মীয় বিরোধের সমাধান করা সম্ভব নয় বলেও তিনি সতর্ক করেন।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য উসকানি ও নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে উদ্বেগ

নেপাল ঐতিহাসিকভাবে একটি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ হিন্দুধর্মাবলম্বী। তবে দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য বসবাস রয়েছে। ফলে সীমান্তবর্তী এসব এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে একটি ধর্মীয় আয়োজনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ কীভাবে প্রাণঘাতী সংঘাতে রূপ নিল, তা খতিয়ে দেখা এখন প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

‘অশান্তির মেঘ দূর করতে হবে’

জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বারবার জাতীয় ঐক্য ও সামাজিক সম্প্রীতির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় নেতা, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে—বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বকেও উত্তেজনা প্রশমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

তিনি নাগরিকদের প্রতি শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষা সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে উসকে দেয়—এমন বক্তব্য, কর্মকাণ্ড বা প্রচারণা থেকে বিরত থাকার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

এদিকে সংঘর্ষে তিনজনের মৃত্যুর পর সুনসারি ও আশপাশের অঞ্চলে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও কারফিউয়ের মধ্যে নতুন করে কোনো সংঘাত যাতে না ঘটে, সে জন্য নিরাপত্তা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

Manual2 Ad Code

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে সহিংসতার প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের শনাক্ত করা হবে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে স্থানীয় জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ