শ্রীমঙ্গলে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের নিয়ে আইসিডিডিআর,বি’র অরিয়েন্টেশন

প্রকাশিত: ৬:২০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬

শ্রীমঙ্গলে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের নিয়ে আইসিডিডিআর,বি’র অরিয়েন্টেশন

Manual2 Ad Code
  • বৈষম্যহীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত ও এইচআইভি প্রতিরোধে সংবেদনশীলতা তৈরির ওপর গুরুত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের নিয়ে বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং এইচআইভি প্রতিরোধ বিষয়ে একটি অরিয়েন্টেশন সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এর উদ্যোগে রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

Manual8 Ad Code

সভায় চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিক, স্বাস্থ্য পরিদর্শকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা অংশ নেন। স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যময় ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সদস্যরা যাতে কোনো ধরনের বৈষম্য, অবহেলা, সামাজিক কুসংস্কার কিংবা নেতিবাচক আচরণের শিকার না হন, সে বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের মধ্যে সচেতনতা ও সংবেদনশীলতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অরিয়েন্টেশন সভায় উপস্থিত ছিলেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন, আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আকাশ নুনিয়া, উপজেলা স্বাস্থ্য পরিদর্শক মো. মাহবুবুর রহমান, স্যানিটারি ইন্সপেক্টর বিনয় সিং রাউতিয়াসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ও নার্সরা।

সভায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে সমাজের বিভিন্ন কারণে স্বাস্থ্যসেবা থেকে পিছিয়ে থাকা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ, সম্মানজনক ও গোপনীয়তাসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, উদ্যোগটির অন্যতম লক্ষ্য হলো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীসহ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মানুষ কোনো ধরনের ভয়, সংকোচ বা সামাজিক কলঙ্কের আশঙ্কা ছাড়াই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারেন। এজন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের আচরণ, যোগাযোগের ধরন এবং রোগীর প্রতি সম্মানজনক মনোভাবকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অরিয়েন্টেশনে এইচআইভি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। ঝুঁকিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সমন্বিত কার্যক্রম, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, সচেতনতা এবং সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এইচআইভি ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসা প্রদান যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, ভুল ধারণা ও সামাজিক কুসংস্কার দূর করা এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী থেকে শুরু করে চিকিৎসক ও নার্স—সব পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

Manual6 Ad Code

সভায় আরও বলা হয়, স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য ও সামাজিক কলঙ্ক অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মানুষকে চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে দূরে রাখে। ফলে রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা গ্রহণ বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এ কারণে রোগীর পরিচয়, ব্যক্তিগত তথ্য ও চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয় গোপন রাখার পাশাপাশি সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অরিয়েন্টেশন কার্যক্রমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের মধ্যে মানবিক ও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা। সমাজের প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যগত চাহিদা বুঝে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা ও সংবেদনশীলতা বাড়ানোর বিষয়টি সভায় গুরুত্ব পায়।

আয়োজকদের মতে, স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথও সহজ হয়। কারণ সুস্বাস্থ্য একজন মানুষের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আয় ও সামাজিক জীবনে সক্রিয় অংশগ্রহণের অন্যতম পূর্বশর্ত। তাই স্বাস্থ্যসেবায় সমতা প্রতিষ্ঠা কেবল একটি চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিষয় নয়; এর সঙ্গে মানুষের সামাজিক মর্যাদা, অধিকার ও সামগ্রিক জীবনমানও জড়িত।

Manual5 Ad Code

সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইসিডিডিআর,বি’র যৌথ উদ্যোগে এ ধরনের অরিয়েন্টেশন কার্যক্রমের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের প্রয়োজনীয় ধারণা ও দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভিসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সেবার সঙ্গে তাদের সংযুক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের প্রত্যন্ত ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে বৈষম্যহীন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্যের কারণে যারা চিকিৎসা নিতে অনাগ্রহী বা সংকোচবোধ করেন, তারাও স্বাস্থ্যব্যবস্থার আওতায় আসার সুযোগ পাবেন।

শ্রীমঙ্গলের এই অরিয়েন্টেশন সভায় অংশ নেওয়া স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আরও সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে রোগীদের প্রতি সমান ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

Manual7 Ad Code

স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কার্যকর ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম শর্ত হলো—রোগীর পরিচয়, লিঙ্গ, সামাজিক অবস্থান কিংবা জীবনযাপনের ধরন বিবেচনা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। এ ধরনের উদ্যোগ সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ