সিলেট ১৩ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
কৃষকের অধিকার, নারীমুক্তি, অসাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সংগ্রামে ইলা মিত্রের জীবন আজও এক অবিনাশী প্রেরণা। নাচোলের মাটিতে যে নারী নিপীড়িত কৃষকের আপনজন হয়ে উঠেছিলেন, তাঁর সংগ্রামের ইতিহাস কেবল অতীতের স্মারক নয়; বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়েও তা সমান প্রাসঙ্গিক।
১. ইলা মিত্র: একটি জীবন, একটি আন্দোলন, একটি ইতিহাস
বাংলার কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে কিছু মানুষ রয়েছেন, যাঁদের জীবনকথা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না। তাঁদের আত্মত্যাগ, আদর্শ ও সংগ্রাম অতিক্রম করে যায় দেশ, কাল ও প্রজন্মের সীমারেখা। কমরেড ইলা মিত্র তেমনই এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি শুধু তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী নন; তিনি বাংলার ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের এক উজ্জ্বল প্রতীক, নারী-প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে নিবেদিতপ্রাণ বিপ্লবী।
জমিদারি-জোতদারি শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষকের দীর্ঘ সংগ্রামে ইলা মিত্রের নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধায়। বিশেষত নাচোলের সাঁওতাল ও দরিদ্র কৃষকদের সংগঠিত করা, তাঁদের ন্যায্য ফসলের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখেও আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হওয়ার কারণে তিনি ইতিহাসে স্বতন্ত্র স্থান অর্জন করেছেন।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় হলো গ্রেপ্তারের পর ভয়াবহ নির্যাতন। কিন্তু সেই নির্যাতন তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি। বরং তাঁর ওপর চালানো নির্যাতনের বিবরণ ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার, পাকিস্তানি রাষ্ট্রের দমননীতি এবং নারীদেহকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত হয়েছে।
১৩ অক্টোবর ২০২৬, তাঁর ২৪তম প্রয়াণবার্ষিকীতে, ইলা মিত্রকে স্মরণ করার অর্থ কেবল একজন কিংবদন্তি নেত্রীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং কৃষক-শ্রমিকের অধিকার, নারীর মর্যাদা, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসা।
২. জন্ম, পরিবার ও শিক্ষা: স্বচ্ছল জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের মুক্তির পথে
ইলা মিত্রের জন্ম ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতায়। তাঁর জন্মনাম ইলা সেন। পিতা নগেন্দ্রনাথ সেন ব্রিটিশ ভারতের বাংলার অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। স্বচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারে জন্ম নেওয়ায় তাঁর সামনে ব্যক্তিগত উন্নতি, সামাজিক প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপদ জীবন গড়ে তোলার সুযোগ ছিল।
কিন্তু মানুষের জীবনকে মহৎ করে তোলে কেবল তার পারিবারিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বরং সে কোন আদর্শে বিশ্বাস করে এবং মানুষের দুঃখ-দুর্দশার মুখোমুখি হয়ে কী অবস্থান নেয়, সেটিই শেষ পর্যন্ত তার ঐতিহাসিক পরিচয় নির্ধারণ করে। ইলা মিত্রের জীবন তারই এক অনন্য উদাহরণ।
তিনি কলকাতার বেথুন স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করেন। ছাত্রজীবন থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় তাঁর অসাধারণ দক্ষতা প্রকাশ পায়। অ্যাথলেটিকস, বাস্কেটবল, ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন খেলায় তিনি সাফল্য অর্জন করেন। খেলাধুলার মধ্য দিয়ে শৃঙ্খলা, অধ্যবসায়, শারীরিক সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার যে অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দৃঢ়তা ও সাহসের সঙ্গে তার একটি তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়।
তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনের সবচেয়ে আলোচিত তথ্য হলো ১৯৪০ সালের হেলসিঙ্কি অলিম্পিককে ঘিরে তাঁর সম্ভাবনা। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪০ সালের অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয়নি।
ইলা মিত্রের জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য অবশ্য খেলাধুলার সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যে নারী ব্যক্তিগত জীবনে স্বচ্ছলতা ও সামাজিক নিরাপত্তার সুযোগ পেয়েছিলেন, তিনি পরবর্তী সময়ে সেই পরিচিত গণ্ডি অতিক্রম করে দাঁড়িয়েছিলেন ভূমিহীন কৃষক, দরিদ্র নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পাশে। তাঁর জীবনের এই রূপান্তর ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতাকে বড় করে দেখার এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
৩. রাজনীতিতে প্রবেশ: ব্যক্তিগত সাফল্য থেকে সামষ্টিক মুক্তির স্বপ্ন
ইলা মিত্রের রাজনৈতিক চেতনা বিকশিত হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন ভারতবর্ষে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং সমাজতান্ত্রিক চিন্তার প্রসার পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠছিল।
১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আলোড়িত করে। একই সময়ে কমিউনিস্ট আন্দোলন, শ্রমিক সংগঠন ও কৃষক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজের শ্রেণিগত বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক শোষণের প্রশ্নও সামনে আসছিল। ইলা সেন এই বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই নিজের অবস্থান নির্ধারণ করেন।
১৯৪৩ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। একই সময়ে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নারীদের সংগঠিত করার কাজে অংশ নেন। দুর্ভিক্ষ, খাদ্যসংকট, মূল্যবৃদ্ধি, নারী নির্যাতন ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পরিধি ক্রমে বিস্তৃত হয়।
১৯৪৩ সালের বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ তাঁকে যে সমাজবাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল, তা ছিল গভীরভাবে বৈষম্যপূর্ণ। একদিকে খাদ্য ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকারী গোষ্ঠী, অন্যদিকে অনাহারে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা সাধারণ মানুষ—এই বৈপরীত্য শাসনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে।
ইলা মিত্রের কাছে রাজনীতি ক্রমে কেবল ক্ষমতা দখল কিংবা দলীয় কর্মকাণ্ডের বিষয় থাকেনি। তা হয়ে উঠেছিল মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, খাদ্য, জমি, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যম।
এই সিদ্ধান্তই তাঁকে পরবর্তী সময়ে নিয়ে যায় বাংলার গ্রামীণ সমাজের এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে ভূমিহীন কৃষকের জীবন ছিল ঋণ, খাজনা, ফসলের ভাগ এবং ক্ষমতাবানদের নিপীড়নের শৃঙ্খলে আবদ্ধ।
৪. রমেন মিত্রের সঙ্গে বিবাহ এবং নাচোলের পথে যাত্রা
১৯৪৫ সালে ইলা সেনের সঙ্গে মালদহ অঞ্চলের কৃষক আন্দোলনের কর্মী রমেন মিত্রের বিবাহ হয়। বিবাহের পর তাঁর জীবনের গতিপথ নতুন দিকে মোড় নেয়। কলকাতার নগরজীবন ছেড়ে তিনি যুক্ত হন উত্তরবঙ্গ ও তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সীমান্তবর্তী গ্রামীণ জনপদের কৃষকসমাজের সঙ্গে।
পরবর্তী সময়ে নাচোল অঞ্চলের কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর নাম নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়ে। তৎকালীন প্রশাসনিক সীমানা, দেশভাগ এবং মালদহ-নবাবগঞ্জ অঞ্চলের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন বিবরণে পার্থক্য থাকলেও নাচোলের কৃষক বিদ্রোহে তাঁর ভূমিকা বাংলার দুই পারের ইতিহাসেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
গ্রামে গিয়ে তিনি কৃষকদের জীবনকে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করেননি; বরং তাঁদের সঙ্গে বসবাস, কথা বলা, সংগঠিত করা এবং আন্দোলনের বাস্তব সমস্যাগুলোর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে তাঁদের আস্থা অর্জন করেন।
কৃষকের ঘরে খাদ্য নেই, অথচ উৎপাদিত ফসলের বড় অংশ চলে যায় জোতদারের গোলায়—এই বাস্তবতা তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে। জমি চাষ করেন একদল মানুষ, কিন্তু জমির মালিকানা ও উৎপাদিত ফসলের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে অন্যদের হাতে। শ্রম ও প্রাপ্তির এই বৈষম্য ছিল গ্রামীণ শোষণব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি।
ইলা মিত্র উপলব্ধি করেছিলেন, কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু সহানুভূতি প্রকাশ করলেই চলবে না। প্রয়োজন কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করা, তাঁদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং সংগঠিত প্রতিরোধের সক্ষমতা গড়ে তোলা।
এই কারণেই তিনি কৃষকের কাছে হয়ে ওঠেন আপনজন। নাচোলের মানুষের কাছে তাঁর পরিচিতি গড়ে ওঠে ‘রাণীমা’ নামে—যে পরিচয়ের মধ্যে ছিল ভালোবাসা, আস্থা, আশ্রয় ও সংগ্রামী নেতৃত্বের স্বীকৃতি।
৫. তেভাগা আন্দোলন: জমি, ফসল ও উৎপাদকের অধিকারের প্রশ্ন
ইলা মিত্রের রাজনৈতিক জীবনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝতে হলে তেভাগা আন্দোলনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি অনুধাবন করা প্রয়োজন।
বাংলার কৃষি অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে জমিদারি ও জোতদারি ব্যবস্থা কৃষকের ওপর বহুমুখী শোষণ চালিয়ে এসেছে। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন জমিদারদের ভূমিরাজস্ব আদায়ের অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। এর ফলে ভূমির ওপর প্রকৃত চাষির অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্ন আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিভিন্ন অঞ্চলে জমিদার, জোতদার, মহাজন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে কৃষকের উদ্বৃত্ত ফসল ও আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ চলে যেত।
বর্গাচাষি বা ভাগচাষিরা জমি চাষ করতেন, বীজ বপন করতেন, পরিচর্যা করতেন এবং ফসল উৎপাদনের জন্য নিজেদের শ্রম ব্যয় করতেন। অথচ উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক কিংবা তারও বেশি অংশ অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের জমির মালিক বা জোতদারকে দিতে হতো। কৃষি উপকরণ, ঋণ ও ফসল ভাগাভাগির শর্তের ওপর নির্ভর করে তাঁদের জীবিকা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠত।
এই ব্যবস্থায় কৃষক শুধু অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত হতেন না; তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকেও দূরে থাকতেন। ঋণ শোধ করতে না পারলে তাঁর ওপর আরও দায় চাপত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলহানি কিংবা খাদ্যসংকটের সময়ে তাঁর জীবন হয়ে উঠত চরম অনিশ্চিত।
১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ এই সংকটকে ভয়াবহ রূপ দেয়। খাদ্য উৎপাদনকারী মানুষই খাদ্যের অভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। দুর্ভিক্ষের কারণ ছিল বহুমাত্রিক—যুদ্ধকালীন অর্থনীতি, মূল্যবৃদ্ধি, বাজারব্যবস্থার সংকট, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও বণ্টনগত বৈষম্য এর সঙ্গে জড়িত ছিল। এই পরিস্থিতি কৃষকসমাজের অধিকার ও ভূমি সংস্কারের প্রশ্নকে আরও জরুরি করে তোলে।
এমন প্রেক্ষাপটে ১৯৪৬ সালে বাংলার প্রাদেশিক কৃষকসভা ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের উদ্যোগে তেভাগা আন্দোলন বিস্তৃত হয়। আন্দোলনের প্রধান দাবি ছিল, বর্গাচাষি যে ফসল উৎপাদন করেন, তার দুই-তৃতীয়াংশ তাঁর প্রাপ্য হবে এবং ফসল সংরক্ষণের অধিকারও কৃষকের হাতে থাকতে হবে।
‘তেভাগা’ নামের মধ্যেই নিহিত ছিল এই দাবির অর্থ—তিন ভাগের দুই ভাগ ফসল চাষির, অবশিষ্ট এক ভাগ জমির মালিকের। এটি ছিল উৎপাদন ও প্রাপ্তির মধ্যে ন্যায়সংগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার দাবি।
তেভাগা আন্দোলন দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি, ময়মনসিংহ, রাজশাহীসহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। হাজী মোহাম্মদ দানেশসহ বহু কৃষক নেতা এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নারী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং ভূমিহীন কৃষকের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তি দেয়।
এই আন্দোলন শুধু ফসলের ভাগ বাড়ানোর দাবি ছিল না। এর গভীরে ছিল কৃষকের আত্মমর্যাদা, উৎপাদনের ওপর অধিকার, গ্রামীণ ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তন এবং শোষণমুক্ত জীবনের আকাঙ্ক্ষা।
ইলা মিত্রের সংগ্রাম এই বৃহত্তর কৃষক আন্দোলনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
৬. দেশভাগ, পূর্ব পাকিস্তান ও নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ
১৯৪৭ সালের দেশভাগ বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে আমূল পরিবর্তন করে। পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়, আর পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক সীমানা পরিবর্তিত হলেও কৃষকের জমি, ফসল ও জীবিকার সংকট দূর হয়নি।
নাচোল অঞ্চলে ভাগচাষি ও দরিদ্র কৃষকদের জীবন ছিল নানা ধরনের বঞ্চনায় আক্রান্ত। আদিবাসী সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কৃষিকাজ ও গ্রামীণ শ্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের জমি, জীবিকা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের অধিকার ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ইলা মিত্র এই মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে তাঁদের সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর নেতৃত্বে কৃষকদের মধ্যে অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ে। তাঁরা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য অংশ আদায় এবং প্রচলিত শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে শুরু করেন।
১৯৪৯ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে নাচোল অঞ্চলের আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। কৃষক সংগঠন, সাঁওতাল জনগোষ্ঠী এবং কমিউনিস্ট কর্মীদের অংশগ্রহণে প্রতিরোধের বিস্তার ঘটে। স্থানীয় বিরোধ ক্রমে প্রশাসনের সঙ্গে সংঘর্ষে রূপ নেয়।
১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে নাচোল অঞ্চলে পুলিশি অভিযান ও সংঘর্ষে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ঐতিহাসিক বিবরণে নিহত মানুষের সংখ্যা, সংঘর্ষের নির্দিষ্ট ঘটনাক্রম এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, কৃষক আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ এবং তার ফলে প্রাণহানি নাচোলের ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল।
সংঘর্ষের পর ইলা মিত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর গ্রেপ্তার নাচোলের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
‘নাচোল বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত এই সংগ্রাম দেখিয়ে দেয়, ভূমির মালিকানা ও ফসলের অধিকার নিয়ে গ্রামীণ অসন্তোষ কত গভীর হতে পারে এবং অর্থনৈতিক বঞ্চনা কীভাবে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিরোধের জন্ম দেয়।
ইলা মিত্রের নেতৃত্ব এই আন্দোলনকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। তিনি শহর থেকে আসা কোনো সাময়িক সহানুভূতিশীল কর্মী ছিলেন না; তিনি কৃষকের সঙ্গে নিজের জীবনকে যুক্ত করেছিলেন। সেই সংযোগই তাঁকে ‘রাণীমা’ পরিচয়ে মানুষের স্মৃতিতে স্থায়ী আসন দিয়েছে।
৭. গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও আদালতের জবানবন্দি: এক নারীর অবিনাশী প্রতিরোধ
ইলা মিত্রের জীবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক ও একই সঙ্গে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হলো গ্রেপ্তারের পর তাঁর ওপর চালানো নির্যাতন।
১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে গ্রেপ্তারের পর তিনি পুলিশি হেফাজতে ভয়াবহ শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। আদালতে দেওয়া তাঁর জবানবন্দিতে হেফাজতে নির্যাতনের যে বিবরণ উঠে আসে, তা মানবাধিকারের ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক দলিল হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁকে বিবস্ত্র করে মারধর, গরম ডিম ও লোহার পেরেক ব্যবহার করে নির্যাতন এবং ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগের উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব বিবরণের ক্ষেত্রে তাঁর আদালত-প্রদত্ত জবানবন্দি ও সংশ্লিষ্ট মামলার নথি অনুসরণ করা জরুরি। তবে নির্যাতনের অভিযোগের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কোনোভাবেই খাটো করা যায় না।
একজন রাজনৈতিক বন্দির কাছ থেকে তথ্য আদায় কিংবা আন্দোলন সম্পর্কে স্বীকারোক্তি নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নির্যাতন চালানো কেবল ব্যক্তিগত নিষ্ঠুরতা নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির লঙ্ঘন।
ইলা মিত্রের ক্ষেত্রে নির্যাতনের আরেকটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। তাঁর নারীপরিচয়কে কেন্দ্র করে যৌন সহিংসতা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অংশ হয়ে উঠেছিল বলে তাঁর জবানবন্দি ও ঐতিহাসিক বিবরণে প্রতিফলিত হয়। নারীদেহকে অপমান, ভয় প্রদর্শন ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এই প্রবণতা আজও বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কিন্তু শারীরিক যন্ত্রণা, অপমান ও মৃত্যুভয়ের মধ্যেও ইলা মিত্র আন্দোলনের সহকর্মীদের বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তি দিতে কিংবা নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পরিত্যাগ করতে সম্মত হননি—তাঁর সংগ্রামী জীবনের স্মৃতিতে এই দৃঢ়তা বিশেষভাবে আলোচিত।
তাঁর জবানবন্দি শুধু নির্যাতনের বিবরণ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সামনে একজন নিরস্ত্র মানুষের সত্য উচ্চারণের সাহসেরও প্রতীক।
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নির্যাতন করে শরীরকে আহত করা যায়, কিন্তু মানুষের বিশ্বাস ও নৈতিক অবস্থানকে সব সময় পরাজিত করা যায় না।
ইলা মিত্রের মুক্তির দাবিতে ভারতসহ বিভিন্ন অঞ্চলের প্রগতিশীল মহল, রাজনৈতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকারের পক্ষে সোচ্চার মানুষ প্রতিবাদ জানান। তাঁর মামলা ক্রমে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও মানবিক প্রশ্নে পরিণত হয়।
শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যেতে থাকে।
তাঁর নির্যাতনের ইতিহাস তাই কেবল অতীতের একটি ঘটনা নয়। পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন, বন্দির অধিকার, নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা এবং রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বর্তমান সময়েও যে প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হয়, ইলা মিত্রের অভিজ্ঞতা সেসব প্রশ্নকে ঐতিহাসিক গভীরতা দেয়।
৮. কারাবাস, মুক্তি ও নতুন করে জীবন গড়ে তোলা
দীর্ঘ কারাবাস ও নির্যাতনের ফলে ইলা মিত্রের শারীরিক অবস্থা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৫৪ সালে চিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় এবং কলকাতায় চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।
এই মুক্তি ছিল তাঁর জীবনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। কিন্তু কারাগারের নির্যাতনের শারীরিক ও মানসিক অভিঘাত থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সহজ ছিল না। দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে তাঁকে নিজের জীবন নতুন করে গড়ে তুলতে হয়।
তিনি আবার শিক্ষাজীবনে ফিরে আসেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে শিবনাথ শাস্ত্রী কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত হন; জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতার ক্ষেত্রেও নিজের অবদান রাখেন।
এখানে তাঁর জীবনের আরেকটি দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নির্যাতনের শিকার হয়েও তিনি নিজেকে কেবল অতীতের ক্ষতচিহ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। রাজনৈতিক সংগ্রাম, শিক্ষকতা, সাহিত্যচর্চা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি সমাজের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।
ইলা মিত্রের এই প্রত্যাবর্তন নিছক ব্যক্তিগত সাফল্যের কাহিনি নয়। এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের পুনরুত্থানের ইতিহাস। দমন-পীড়নের মুখেও শিক্ষা, চিন্তা ও সামাজিক দায়িত্বকে আঁকড়ে ধরে কীভাবে জীবনকে নতুন অর্থ দেওয়া যায়, তাঁর পরবর্তী জীবন তার দৃষ্টান্ত।
৯. সংসদীয় রাজনীতি ও জনজীবনে অবদান
কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর ইলা মিত্র ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকেন। কমিউনিস্ট আন্দোলন, নারী সংগঠন এবং বিভিন্ন প্রগতিশীল উদ্যোগের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অব্যাহত ছিল।
১৯৭২ সাল থেকে তিনি পরপর চারবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন বলে তাঁর রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে প্রচলিত জীবনীমূলক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। বিধানসভায় তাঁর ভূমিকা এবং দলীয় কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিসরে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এই অধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে ইলা মিত্রের সংগ্রাম কেবল গ্রামীণ বিদ্রোহ বা রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিসরেও জনগণের প্রশ্ন উত্থাপনের চেষ্টা করেছেন।
বিপ্লবী রাজনীতি ও সংসদীয় রাজনীতির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু ইলা মিত্রের জীবনে এই দুই পরিসরের সংযোগ ছিল বাস্তব অভিজ্ঞতার অংশ। কৃষকের অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও সামাজিক সমতার প্রশ্ন তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রেই অবস্থান করেছে।
একজন আন্দোলনকর্মী হিসেবে মাঠে মানুষের পাশে থাকা এবং একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক পরিসরে কাজ করা—এই দুই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনকে বহুমাত্রিক করেছে।
১০. সাহিত্য, অনুবাদ ও সংস্কৃতিচর্চা: সংগ্রামের আরেকটি ভাষা
ইলা মিত্রকে শুধু কৃষক আন্দোলনের নেত্রী কিংবা রাজনীতিক হিসেবে দেখলে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অনালোচিত থেকে যায়। তিনি ছিলেন লেখক, অনুবাদক এবং সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ।
তাঁর অনূদিত গ্রন্থ ‘হিরোশিমার মেয়ে’ বাংলা পাঠকের কাছে যুদ্ধ, ধ্বংস, মানবিক বেদনা ও শান্তির প্রশ্নকে তুলে ধরতে সাহায্য করেছে। এই গ্রন্থের জন্য তিনি সোভিয়েত ল্যান্ড নেহেরু পুরস্কার লাভ করেন বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ পাওয়া যায়।
এ ছাড়া ‘জেলখানার চিঠি’, ‘মনেপ্রাণে’ এবং অনুবাদসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গ্রন্থের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত। তাঁর সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে নির্ভুল মূল্যায়নের জন্য প্রতিটি গ্রন্থের সংস্করণ, প্রকাশক, প্রকাশকাল এবং অনুবাদ-সম্পাদনার তথ্য নির্ভরযোগ্য গ্রন্থপঞ্জির মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
তাঁর সাহিত্যিক আগ্রহের মধ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোগ লক্ষ করা যায়। যে মানুষ জীবনে শোষণ, নির্যাতন ও রাজনৈতিক সংঘাতের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমেও মানুষের মুক্তি, মর্যাদা ও মানবিক সম্পর্কের প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
হিরোশিমার ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে রচিত সাহিত্য অনুবাদ করা কিংবা কারাগারের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করা—এসব কাজের মধ্য দিয়ে ইতিহাসকে মানুষের অনুভূতি ও বিবেকের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হয়।
ইলা মিত্রের জীবন আমাদের শেখায়, সংগ্রাম শুধু রাজপথে সংঘটিত হয় না। শিক্ষা, সাহিত্য, অনুবাদ, স্মৃতি সংরক্ষণ ও সাংস্কৃতিক চর্চাও সমাজ পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
১১. নারীমুক্তি ও পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে ইলা মিত্রের অবস্থান
ইলা মিত্রের জীবনকে নারীমুক্তির ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। তাঁর সংগ্রাম একই সঙ্গে শ্রেণিশোষণ ও পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ইতিহাস।
তেভাগা আন্দোলনে নারীরা শুধু রান্না করা, আহতদের সেবা করা কিংবা পুরুষ আন্দোলনকারীদের সহায়তা করার ভূমিকায় ছিলেন না। তাঁরা মিছিল করেছেন, সংগঠিত হয়েছেন, খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন, প্রতিরোধে অংশ নিয়েছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন।
কৃষক পরিবারের নারীরা জমিতে শ্রম দিলেও জমির মালিকানা, ফসলের আয় এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের অধিকার ছিল সীমিত। ভূমিহীনতা ও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার সঙ্গে যুক্ত ছিল সামাজিক বৈষম্য, বাল্যবিবাহ, শিক্ষাবঞ্চনা এবং নানা ধরনের সহিংসতা।
ইলা মিত্র এই বাস্তবতায় নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে আসেন। তাঁর নেতৃত্ব প্রমাণ করে, নারী কেবল আন্দোলনের সহায়ক শক্তি নন; তিনি আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ, সংগঠন পরিচালনা এবং নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রেও সক্ষম।
তাঁর ওপর চালানো যৌন নির্যাতনের বিবরণ এই আলোচনাকে আরও গভীর করে। রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে একজন নারীকে নির্যাতন করার ঘটনা দেখায়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্য অনেক সময় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নারীর শরীর ও মর্যাদাকে আক্রমণ করে।
এখানে ইলা মিত্রের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কেবল নির্যাতনের শিকার হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর জবানবন্দি, প্রতিবাদ এবং পরবর্তী জীবনের সক্রিয়তা নির্যাতনের অভিজ্ঞতাকে নীরবতার মধ্যে হারিয়ে যেতে দেয়নি।
আজ বাংলাদেশে নারী শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, কৃষিতে নারীর অবদানের স্বীকৃতি, সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের প্রশ্নে ইলা মিত্রের জীবন নতুন করে পাঠ করা প্রয়োজন।
তাঁর সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নারীমুক্তি কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক কর্মসূচি নয়। অর্থনৈতিক অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর আন্দোলনের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
১২. সমাজতান্ত্রিক চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা ও শ্রেণিসংগ্রাম
ইলা মিত্রের রাজনৈতিক জীবনের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য ছিল সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি অঙ্গীকার। তাঁর রাজনীতির মূল ভিত্তিতে ছিল উৎপাদনকারী মানুষের অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং নিপীড়িত মানুষের সংগঠিত শক্তির ওপর আস্থা।
তেভাগা আন্দোলনের মূল দাবি—উৎপাদিত ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ চাষির প্রাপ্য—একটি নির্দিষ্ট কৃষি সংস্কারের দাবি হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল আরও বিস্তৃত। এর মাধ্যমে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, উৎপাদনের প্রধান শ্রম যিনি দেন, উৎপাদনের সুফল থেকে তিনি কেন বঞ্চিত হবেন?
এই প্রশ্ন শুধু কৃষির নয়; শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন, সেবা এবং অন্যান্য শ্রমনির্ভর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। শ্রমিকের মজুরি, কৃষকের ফসলের ন্যায্য মূল্য, শ্রমের নিরাপত্তা এবং উৎপাদনের ওপর মানুষের অধিকার—এসব প্রশ্নের মধ্যে একটি মৌলিক যোগসূত্র রয়েছে।
তবে সমাজতন্ত্রের ধারণাকে কেবল রাষ্ট্রীয় মালিকানা কিংবা সম্পদ বণ্টনের কোনো একক মডেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, মানবাধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
ইলা মিত্রের সংগ্রামের সমকালীন তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে এই বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। শোষণমুক্তির লক্ষ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষাও অপরিহার্য।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনে অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নও তাৎপর্যপূর্ণ। নাচোলের কৃষক আন্দোলনে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয়ের মানুষ একই অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছিলেন। মুসলিম কৃষক, সাঁওতাল জনগোষ্ঠী এবং অন্যান্য দরিদ্র মানুষ ভূমি ও ফসলের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যুক্ত হয়েছিলেন।
এ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়: মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের প্রশ্নে ধর্মীয় বিভাজন অতিক্রম করে ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব। অসাম্প্রদায়িকতা শুধু ভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থান নয়; এটি বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত নাগরিক অবস্থানও।
ইলা মিত্রের জীবন সেই ঐক্যের ঐতিহাসিক সম্ভাবনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
১৩. নাচোল থেকে বাংলাদেশ: কৃষকের অধিকার ও ভূমি সংস্কারের অসমাপ্ত প্রশ্ন
ইলা মিত্রের সংগ্রামের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে ভূমি ও কৃষকের অধিকার প্রশ্নে। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি বদলেছে, উৎপাদন প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, সেচব্যবস্থা ও বাজারের পরিধি বেড়েছে। কিন্তু কৃষকের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, ন্যায্য মূল্য, উৎপাদন ব্যয়, ঋণ, জমির অধিকার এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব নিয়ে সমস্যা এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
ক্ষুদ্র কৃষক ও বর্গাচাষিরা অনেক ক্ষেত্রে জমির মালিকানা থেকে বঞ্চিত। কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, ফসলের বাজারদরের অনিশ্চয়তা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তাঁদের জীবিকাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদকের আয় যে সব সময় সমান হারে বাড়ে না, সেটিও কৃষি অর্থনীতির একটি বড় সমস্যা।
এই বাস্তবতায় তেভাগা আন্দোলনের ঐতিহাসিক শিক্ষা নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কৃষকের ন্যায্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা, বর্গাচাষির অধিকার সুরক্ষিত করা, কৃষিজমি রক্ষা করা এবং কৃষি উৎপাদনের ঝুঁকি কমানোর জন্য কার্যকর নীতি দরকার।
বাংলাদেশের কৃষককে শুধু খাদ্য উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। তাঁকে অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
এর জন্য কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, বর্গাচাষি ও প্রান্তিক কৃষকের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি সহজ, দ্রুত ও ন্যায়সংগত করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কৃষিপণ্যের বাজারে অস্বচ্ছতা, অযৌক্তিক মধ্যস্বত্বভোগিতা এবং দুর্বল সংরক্ষণব্যবস্থার কারণে কৃষক যেন তাঁর শ্রমের যথাযথ মূল্য থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তৃতীয়ত, কৃষিঋণ, বীমা, সেচ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সুযোগ ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে সহজলভ্য করতে হবে।
চতুর্থত, কৃষিতে নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে তাঁদের জমি, ঋণ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে।
পঞ্চমত, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার, জীবিকা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এসব প্রশ্নের উত্তর আজকের বাস্তবতা? নীতিনির্ধারণের আলোকে খুঁজতে হবে। তেভাগা আন্দোলনের সময়কার পরিস্থিতি এবং বর্তমান বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি এক নয়। কিন্তু উৎপাদকের ন্যায্য অধিকার, ভূমির নিরাপত্তা এবং শোষণহীন জীবনের যে মৌলিক প্রশ্ন সেই আন্দোলন সামনে এনেছিল, তা এখনও প্রাসঙ্গিক।
১৪. রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের শিক্ষা
ইলা মিত্রের জীবন আমাদের রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
একটি রাষ্ট্রের বৈধতা শুধু তার প্রশাসনিক ক্ষমতা কিংবা আইন প্রয়োগের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। রাষ্ট্র নাগরিকের অধিকার রক্ষা করছে কি না, ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ দিচ্ছে কি না, বন্দির মর্যাদা বজায় রাখছে কি না এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার নিশ্চিত করছে কি না—এসব বিষয়ও রাষ্ট্রের নৈতিক ও গণতান্ত্রিক চরিত্র নির্ধারণ করে।
কৃষকের আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ, রাজনৈতিক বন্দির ওপর নির্যাতন এবং ন্যায়বিচারের সুযোগ সংকুচিত করা কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ইলা মিত্রের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বলা যায়, রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা কিংবা সামাজিক অসন্তোষকে শুধু দমন-পীড়নের মাধ্যমে মোকাবিলা করার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে সংকটকে আরও গভীর করে।
কৃষকের দাবি যদি ন্যায্য হয়, তবে তার সমাধানের জন্য সংলাপ, নীতিগত সংস্কার ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ হতে হবে আইনসম্মত, আনুপাতিক ও জবাবদিহিমূলক।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদা, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের গুরুত্ব অপরিসীম। যে সমাজ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাকে নিজের কর্মপদ্ধতিতেও ন্যায় ও মানবিকতার মূল্যবোধ ধারণ করতে হয়।
ইলা মিত্রের জীবন তাই একদিকে নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ইতিহাস, অন্যদিকে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য মানবিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রয়োজনীয়তার স্মারক।
১৫. ইলা মিত্রের উত্তরাধিকার: স্মৃতিচারণের বাইরে ইতিহাসকে ধারণ করা
২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর কলকাতায় ইলা মিত্রের মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। তাঁর প্রয়াণে একটি দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটলেও তাঁর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার মুছে যায়নি।
বাংলাদেশ ও ভারতের প্রগতিশীল রাজনৈতিক পরিসর, কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস, নারী অধিকারবিষয়ক আলোচনা এবং বাংলার গণআন্দোলনের স্মৃতিতে তিনি আজও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তাঁর প্রতিকৃতি প্রদর্শন, বক্তৃতা আয়োজন কিংবা আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদন নয়। প্রকৃত স্মরণ তখনই অর্থবহ হয়, যখন তাঁর জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষাকে বর্তমান সমাজের সমস্যা সমাধানের আলোচনায় যুক্ত করা যায়।
ইলা মিত্রের উত্তরাধিকার ধারণ করার অর্থ হলো কৃষকের ন্যায্য প্রাপ্য নিয়ে কথা বলা, ভূমিহীন মানুষের অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া, নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করার রাজনীতির বিরুদ্ধে মানবিক ঐক্য গড়ে তোলা।
এর অর্থ ইতিহাসকে তথ্যনিষ্ঠভাবে অধ্যয়ন করা, আন্দোলনের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা উভয়কেই বিশ্লেষণ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে সংগ্রামের অভিজ্ঞতা পৌঁছে দেওয়া।
ইলা মিত্রের জীবন নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তাঁর আদালতের জবানবন্দি, সমকালীন সংবাদপত্র, রাজনৈতিক দলিল, কারাবাসের নথি, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র এবং সহযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা জরুরি। নাচোলের কৃষক আন্দোলনে সাঁওতাল নারী-পুরুষের ভূমিকা এবং স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতাও সমান গুরুত্বে নথিবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।
ইতিহাসকে শুধু কয়েকজন নেতার জীবনকাহিনিতে সীমাবদ্ধ রাখলে গণআন্দোলনের প্রকৃত সামাজিক ভিত্তি অদৃশ্য হয়ে যায়। ইলা মিত্রের অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর সঙ্গে সংগ্রাম করা অসংখ্য নামহীন কৃষক, নারী ও আদিবাসী মানুষের ভূমিকাও তুলে ধরতে হবে।
এই ইতিহাস সংরক্ষণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু অতীত সম্পর্কে জানাবে না; বরং সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে সাধারণ মানুষের ভূমিকা সম্পর্কেও সচেতন করবে।
১৬. উপসংহার: রাণীমা থেকে মুক্তিকামী মানুষের চিরন্তন প্রেরণা
ইলা মিত্রের জীবনকে এক বাক্যে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। তিনি ছিলেন ক্রীড়াবিদ, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক কর্মী, কৃষক আন্দোলনের নেত্রী, নির্যাতনের শিকার এক সাহসী নারী, শিক্ষক, লেখক, অনুবাদক ও জনপ্রতিনিধি। কিন্তু এসব পরিচয়ের মধ্যেও যে সুতোটি তাঁর সমগ্র জীবনকে একত্র করেছে, তা হলো নিপীড়িত মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।
তিনি দেখিয়েছেন, জন্মপরিচয় মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না; মানুষ নিজের আদর্শ, কর্ম ও অবস্থানের মধ্য দিয়ে ইতিহাসে নিজের স্থান তৈরি করতে পারে। তিনি দেখিয়েছেন, কৃষক-শ্রমিকের অধিকার কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। তিনি দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় নির্যাতন মানুষের শরীরকে বিপর্যস্ত করতে পারে, কিন্তু সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর নৈতিক সাহসকে সহজে নিশ্চিহ্ন করতে পারে না।
তেভাগা আন্দোলনের ‘রাণীমা’ আজও আমাদের সামনে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে গেছেন। যাঁরা খাদ্য উৎপাদন করেন, তাঁরা কি ন্যায্য মূল্য পান? যাঁরা সমাজের সম্পদ সৃষ্টি করেন, তাঁরা কি সেই সম্পদের ন্যায্য অংশীদার? নারী কি নিজের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে নিরাপদে বাঁচতে পারেন? ধর্ম, জাতিসত্তা কিংবা শ্রেণিগত পরিচয়ের কারণে কোনো মানুষ কি অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন? রাষ্ট্র কি নাগরিকের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দিতে পারছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্যেই ইলা মিত্রের সংগ্রামের সমকালীন তাৎপর্য নিহিত।
বাংলাদেশে একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হলে কৃষক-শ্রমিকের অধিকার, নারীর সমতা, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মর্যাদা, আইনের শাসন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে রাষ্ট্র ও সমাজের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সমাজতন্ত্র অভিমুখী গণতান্ত্রিক ও সমতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণের বিতর্কে ইলা মিত্রের জীবন ও সংগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। তাঁর আদর্শকে ধারণ করার অর্থ অতীতকে হুবহু পুনরাবৃত্তি করা নয়; বরং বর্তমান বাস্তবতায় শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কার্যকর, গণতান্ত্রিক ও মানবিক পথ অনুসন্ধান করা।
১৩ অক্টোবর তাঁর প্রয়াণবার্ষিকীতে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক—ইলা মিত্রকে কেবল স্মৃতির পাতায় নয়, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিটি ন্যায়সংগত উদ্যোগে স্মরণ করা। কৃষকের ঘামে উৎপন্ন ফসলের ন্যায্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার সংগ্রামে, নির্যাতিত নারীর ন্যায়বিচারের দাবিতে, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে এবং বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণের প্রত্যয়ে তাঁর জীবন আমাদের পথ দেখাক।
নাচোলের মাটিতে যে নারী কৃষকের পাশে দাঁড়িয়ে ‘রাণীমা’ হয়ে উঠেছিলেন, তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার কোনো উপাধিতে সীমাবদ্ধ নয়। সেই উত্তরাধিকার মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারে।
জয়তু কমরেড ইলা মিত্র। জয়তু তেভাগার রাণীমা। জয় হোক কৃষক-শ্রমিকের অধিকার, নারীমুক্তি, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিক মর্যাদার সংগ্রামের।
#
লেখক পরিচিতি
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
বিশেষ প্রতিঈনিধি, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি; ‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য;
বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়নের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য;
মাগুরছড়ার গ্যাসসম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক;
বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশনের প্রাক্তন সভাপতি।
তথ্যসূত্র ও প্রাসঙ্গিক গ্রন্থপঞ্জি
1. সরদার ফজলুল করিম, ইলা মিত্র ও তেভাগা আন্দোলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর্কাইভ।
2. হাজী দানেশ, বাংলার কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস, প্রকাশনী সংস্থা, কলকাতা, 1978।
3. কমিউনিস্ট পার্টি আর্কাইভ, কলকাতা ও রাজশাহী জেলা দলিলপত্র, 1946–1954।
4. ইলা মিত্র, জেলখানার চিঠি ও মনেপ্রাণে।
5. সৈয়দ আমিরুজ্জামান, তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি ইলা মিত্র, ২০২৫।
6. Contemporary Indian History Review, Vol. 8 (2022), pp. 112–140.

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি