কিংবদন্তি শ্রমিক নেতা কমরেড আবুল বাশার: জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম ও বিপ্লবী রূপান্তরের এক অনন্য প্রবক্তা

প্রকাশিত: ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৭, ২০২৬

কিংবদন্তি শ্রমিক নেতা কমরেড আবুল বাশার: জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম ও বিপ্লবী রূপান্তরের এক অনন্য প্রবক্তা

Manual7 Ad Code

সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলন, বামপন্থী মতাদর্শের বিপ্লবী রাজনীতি ও জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে কমরেড আবুল বাশার এক অনন্য নাম। তিনি ছিলেন কেবল শ্রমিকদের মজুরি, বোনাস, চাকরির নিরাপত্তা কিংবা ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার আদায়ের সংগ্রামী নেতা নন শুধু; তিনি ছিলেন শ্রমিক শ্রেণিকে একটি সচেতন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নদ্রষ্টা, সংগঠক ও বিপ্লবী। শ্রমিকের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রামকে বৃহত্তর জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

তিনি ছিলেন শ্রমিক আন্দোলনের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাবেক সভাপতি। পাকিস্তানি সামরিক শাসন, ঔপনিবেশিক শোষণ, স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক আধিপত্য ও আগ্রাসন এবং শ্রমিকস্বার্থবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন।

২০১০ সালের ৭ নভেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এই কিংবদন্তি শ্রমিক নেতা। ২০২৬ সালের ৭ নভেম্বর তাঁর ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন নয়; বরং বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস, বামপন্থী মতাদর্শের প্রগতিশীল রাজনীতির ঐতিহ্য এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার অসমাপ্ত সংগ্রামকে নতুন করে উপলব্ধি করা।

কমরেড আবুল বাশারের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন, শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) এবং শ্রমিক আন্দোলনের জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুবাদে তাঁকে কাছ থেকে দেখার ও তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সংগ্রামী জীবন সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে। তিনি ছিলেন আমাদের কাছে একটি জীবন্ত ইতিহাস, অভিজ্ঞতার এক বিশাল ভান্ডার। তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে যত আলোচনা করা হোক, তা কখনোই যথেষ্ট নয়।

কৃষক পরিবার থেকে শ্রমিক আন্দোলনের জাতীয় নেতা

কমরেড আবুল বাশার ১৯৩৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার বর্তমান লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার কেরোয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা নুরুজ্জামান পণ্ডিত এবং মাতা আনোয়ারা খাতুন। সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে অন্যায়-অবিচার ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মনোভাব গড়ে ওঠে।

ছাত্রজীবনে তিনি জমিদারি প্রথাবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। মওলানা ফজলুল করীমের সান্নিধ্যে এসে সামাজিক বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সচেতনতা অর্জন করেন। এলাকার মানুষের কাছে মওলানা ফজলুল করীম ‘মওলানা মিসরি’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর প্রভাবে আবুল বাশারের মধ্যে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা আরও গভীর হয়।

১৯৫৩ সালে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি চট্টগ্রামে আসেন। কালুরঘাটে তৎকালীন চিটাগাং জুট ম্যানুফ্যাকচারিং বা ইস্পাহানী জুট মিলে কারিগরি বিভাগের শ্রমিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কারখানার কঠোর শ্রমপরিবেশ, শ্রমিকদের বঞ্চনা, মালিকপক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা এবং শ্রমিকদের অধিকারহীনতা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া লিখে দেওয়া, তাঁদের সমস্যা নিয়ে কথা বলা এবং সংগঠিত করার কাজে এগিয়ে আসার কারণে সহকর্মীদের কাছে তিনি ‘মাস্টার’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। সেই সময় শিক্ষিত সহকর্মীদের শ্রমিকরা সম্মান করে মাস্টার বলে সম্বোধন করতেন।

এই ‘মাস্টার’ পরিচয়ের আড়ালেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে একজন আপসহীন শ্রমিক নেতার রাজনৈতিক সত্তা।

শ্রমিক আন্দোলন ও কমিউনিস্ট রাজনীতি

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। এ সময় মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, জহুর আহমদ চৌধুরী এবং চট্টগ্রামের বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও যোগাযোগ গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শ্রমিক আন্দোলনে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে তাঁকে চাকরিচ্যুত হতে হয়। কিন্তু চাকরি হারানো তাঁর সংগ্রামী জীবনের সমাপ্তি ঘটাতে পারেনি; বরং শ্রমিক আন্দোলনই হয়ে ওঠে তাঁর সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মক্ষেত্র।

তৎকালীন ট্রেড ইউনিয়ন আইন ও সাংগঠনিক বাস্তবতার মধ্যে তিনি শ্রমিক নেতা হিসেবে শ্রমিক ইউনিয়ন ও যৌথ দরকষাকষি প্রতিনিধি বা সিবিএর নেতৃত্বে ভূমিকা পালন করেন।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল—প্রকাশ্যে শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক ও নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং একই সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির একজন বিপ্লবী কর্মী ও সংগঠক হিসেবে কাজ করা। এই দুই দায়িত্বের মধ্যে তিনি কোনো মৌলিক বিরোধ দেখেননি। বরং শ্রমিকের অর্থনৈতিক দাবি আদায়ের সংগ্রামকে শ্রেণিসচেতন রাজনৈতিক আন্দোলনে উন্নীত করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

এ কারণেই তিনি একই সঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনের নেতা এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন।

পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকেই শ্রমিক আন্দোলনে তাঁর সাহসী ভূমিকার কারণে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী ও মালিকপক্ষের বিরাগভাজন হন। ১৯৫৬-৫৭ সালে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয় বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। হুলিয়া মাথায় নিয়েও তিনি ১৯৫৭ সালের ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।

পরবর্তীকালে তিনি মওলানা ভাসানীর ন্যাপের সঙ্গে যুক্ত হন এবং মজদুর ফেডারেশনের নেতৃত্বে ভূমিকা পালন করেন।

১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করলে দেশে গণতান্ত্রিক ও শ্রমিক আন্দোলনের ওপর নেমে আসে দমন-পীড়ন। এই পরিস্থিতিতে আবুল বাশার আত্মগোপনে থেকেও শ্রমিক আন্দোলনকে সংগঠিত রাখার চেষ্টা করেন।

১৯৬১ সালে তিনি গ্রেফতার হন। প্রায় ১৫ মাস কারাভোগের পর ১৯৬২ সালে মুক্তি পেলেও তাঁকে নিজ গ্রামে অন্তরীণ রাখা হয়। কিন্তু শ্রমিকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল যে, ১৯৬৩ সালের দিকে কালুরঘাটের শ্রমিকরা তাঁকে গোপনে শ্রমিক কলোনিতে নিয়ে আসেন। শ্রমিক কলোনিগুলো তখন শ্রমিকদের ঐক্য ও প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল।

১৯৬৪ সালের জুলাই মাসে শিল্পাঞ্চলের বাইরে আসার পর তিনি আবার গ্রেফতার হন। তাঁর গ্রেফতারের প্রতিবাদে চট্টগ্রামের পাটকলসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক সংগঠিত হন। শ্রমিকরা আদালত এলাকা ও কারাগার ঘেরাও করে তাঁর মুক্তির দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই গণপ্রতিরোধের মুখে সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

এই ঘটনা আবুল বাশারের জনপ্রিয়তা ও শ্রমিকদের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্কের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। একজন শ্রমিক নেতার মুক্তির দাবিতে হাজার হাজার শ্রমিকের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ প্রমাণ করে, তিনি শ্রমিকদের কাছে কতটা আস্থাভাজন ছিলেন।

তাঁর নেতৃত্বের বিশেষত্ব ছিল, তিনি শ্রমিকদের কেবল সভা-সমাবেশে উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানাতেন না; তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক সংহতি, আত্মবিশ্বাস এবং অধিকার আদায়ের সক্ষমতা গড়ে তুলতেন।

পাটকল শ্রমিক আন্দোলন: সংগ্রাম আর নেতৃত্বে অনন্য

ষাটের দশকে চট্টগ্রামের পাটকলগুলোতে শ্রমিক আন্দোলন ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মজুরি, কর্মপরিবেশ, চাকরির নিরাপত্তা, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার এবং শ্রমিকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন বিস্তৃত হতে থাকে।

১৯৬৬ সালে বামপন্থীদের শ্রেণি সংগ্রামের মতাদর্শে শ্রমিক ফেডারেশন গঠিত হলে আবুল বাশার এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৬৮ সালে পাটকল শ্রমিকদের ধারাবাহিক ধর্মঘট ও সংগ্রাম শ্রমিক আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে এই সময়ের ধর্মঘটের স্থায়িত্ব নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তবে শ্রমিকদের দীর্ঘস্থায়ী ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ যে মালিকপক্ষ ও প্রশাসনকে চাপে ফেলেছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

তাঁর নেতৃত্বে চট্টগ্রামের পাটকল, বস্ত্রকল, রেল, বন্দর, বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা ক্রমশ ঐক্যবদ্ধ হতে থাকেন।

শ্রমিক আন্দোলনকে তিনি কেবল কারখানার অভ্যন্তরীণ দাবি আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি মনে করতেন, শ্রমিকদের শোষণের মূল কারণ বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিহিত। তাই শ্রমিকদের মুক্তির জন্য উৎপাদনব্যবস্থা, সম্পদের মালিকানা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরিত্র পরিবর্তনের প্রশ্নও সামনে আনতে হবে।

এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে সাধারণ ট্রেড ইউনিয়ন নেতার সীমা অতিক্রম করে একজন শ্রেণিসচেতন বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠক ও নেতৃত্বে পরিণত করে।

জাতীয় মুক্তি ও শ্রেণিসংগ্রামের ঐতিহাসিক সমন্বয়

কমরেড আবুল বাশারের রাজনৈতিক চিন্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম এবং শ্রেণিসংগ্রামের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা।

১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে পূর্ব বাংলার রাজনীতি উত্তাল হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে ওঠে। একই সময়ে বামপন্থী রাজনীতির ভেতরে জাতীয় মুক্তির প্রশ্ন এবং শ্রেণিসংগ্রামের অগ্রাধিকার নিয়ে তীব্র মতাদর্শিক বিতর্ক চলছিল।

বিশেষ করে চীনপন্থী বামপন্থীদের একাংশের মধ্যে জাতীয় মুক্তির সংগ্রামের পরিবর্তে শ্রেণিশত্রু খতমের রাজনীতির প্রভাব বিস্তার লাভ করে। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্যেও শ্রেণিগত বৈষম্য ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্ন অনেক সময় আড়ালে থেকে যাচ্ছিল।

এই জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতায় আবুল বাশার জাতীয় মুক্তি ও শ্রেণিসংগ্রামের সম্পর্ককে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।

১৯৭০ সালের শেষভাগে তাঁর লেখা ‘ছয় দফা বনাম পূর্ব বাংলার জাতীয় মুক্তির আন্দোলন’ শীর্ষক পুস্তিকাটি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই লেখায় তিনি ছয় দফা কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণের পাশাপাশি পূর্ব বাংলার জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য তুলে ধরেন। একই সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা এবং শোষণমুক্ত বাংলাদেশের সম্ভাব্য রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করেন।

তাঁর চিন্তার মৌলিক দিক ছিল, জাতীয় মুক্তির সংগ্রামকে শ্রেণিসংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যাবে না। আবার জাতীয় মুক্তির প্রশ্নকে উপেক্ষা করে শ্রেণিসংগ্রামের বাস্তব অগ্রগতিও সম্ভব নয়।

অর্থাৎ একটি নিপীড়িত জাতির স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম ঐতিহাসিকভাবে শ্রমিক-কৃষকসহ মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। জাতীয় স্বাধীনতা অর্জন রাজনৈতিক মুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলেও অর্থনৈতিক শোষণ, শ্রেণিবৈষম্য ও সম্পদের অসম বণ্টন অব্যাহত থাকলে মানুষের পূর্ণ মুক্তি অর্জিত হয় না।

এই দ্বান্দ্বিক উপলব্ধি তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। জাতীয় মুক্তি ও সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্যে সেতুবন্ধন প্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা তিনি করেছিলেন, তা বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দাবি রাখে।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে শ্রমিক শ্রেণির ভূমিকা

১৯৬৮-৬৯ সালের গণআন্দোলন এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে শ্রমিক শ্রেণির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রসমাজের আন্দোলনের সঙ্গে শ্রমিকদের ধর্মঘট, মিছিল, হরতাল ও গণপ্রতিরোধ যুক্ত হয়ে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।

কমরেড আবুল বাশার চট্টগ্রামের শ্রমিকদের এই বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগ্রামে সম্পৃক্ত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

তাঁর নেতৃত্বে শ্রমিকরা শুধু মজুরি বা চাকরির দাবিতে নয়, গণতান্ত্রিক অধিকার, স্বায়ত্তশাসন এবং জাতীয় মুক্তির দাবিতেও সোচ্চার হয়ে ওঠেন।

চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে শ্রমিকদের বিশাল সমাবেশে ‘শ্রমিক-কৃষক অস্ত্র ধর, পূর্ব বাংলা স্বাধীন কর’—এ ধরনের রাজনৈতিক স্লোগান উচ্চারিত হওয়ার ঘটনা তাঁর নেতৃত্বাধীন শ্রমিক আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্র সম্পর্কে ধারণা দেয়।

তিনি বুঝেছিলেন, শ্রমিক শ্রেণিকে জাতীয় রাজনীতির বাইরে রেখে কোনো গণতান্ত্রিক ও মুক্তিকামী আন্দোলন সফল করা সম্ভব নয়।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে শ্রমিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ তাই তাঁর দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক প্রচেষ্টারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল।

মহান মুক্তিযুদ্ধে কমরেড আবুল বাশার

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম। এই সংগ্রামে কমরেড আবুল বাশার এবং তাঁর রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

দেবেন শিকদার ও আবুল বাশারের নেতৃত্বাধীন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয়। প্রবাসী পূর্ব বাংলার মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সঙ্গেও তাঁদের রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সমন্বয় ছিল।

তিনি নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার মেধা এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের ঘাঁটি গড়ে তোলার কাজে যুক্ত ছিলেন বলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়।

পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি, পূর্ব বাংলা শ্রমিক ফেডারেশন এবং বাংলা ছাত্র ইউনিয়নের অসংখ্য নেতা-কর্মী ও সংগঠক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। চট্টগ্রামের শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক শ্রমিকও সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত হন।

তাঁদের রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল কেবল পাকিস্তানি শাসনের অবসান নয়; স্বাধীন বাংলাদেশে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ সুগম করা।

এখানেই আবুল বাশারের রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি মুক্তিযুদ্ধকে জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম হিসেবে দেখেছেন, আবার সেই স্বাধীনতার অর্থনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য নিয়েও চিন্তা করেছেন।

তাঁর কাছে স্বাধীনতা ছিল শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।

জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা: ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক আন্দোলনের নতুন অধ্যায়

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। পাকিস্তানি শাসন ও সামরিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে যে শ্রমিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে সেই ঐক্যকে নতুন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৩ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত শ্রমিক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন গঠিত হয়। কমরেড আবুল বাশার সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন।

এটি ছিল বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ঘটনা।

Manual6 Ad Code

জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও খাতের শ্রমিকদের একটি বৃহত্তর ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন। পাটকল, বস্ত্রকল, রেল, বন্দর, বিদ্যুৎ, বেকারি, ছাপাখানা এবং অন্যান্য শিল্প ও সেবা খাতের শ্রমিকদের মধ্যে যোগাযোগ ও ঐক্য প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

তিনি মনে করতেন, শ্রমিক আন্দোলনের শক্তি কোনো একটি কারখানা বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিকদের সামগ্রিক স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজন সর্বক্ষেত্রের শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন।

Manual1 Ad Code

স্বাধীনতার পর শ্রমিকস্বার্থবিরোধী বিভিন্ন প্রবণতা, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং শ্রমিক সংগঠন দখলের অপচেষ্টার বিরুদ্ধেও তিনি অবস্থান নেন।

শ্রমিকদের ওপর শোষক বুর্জোয়া শ্রেণির রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বিশেষ করে শ্রমিকদের স্বতন্ত্র সংগঠিত শক্তি ও ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন।

শ্রমিক ঐক্যের রাজনীতি: বিভাজনের বিরুদ্ধে অবিচল অবস্থান

কমরেড আবুল বাশারের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান শ্রমিক ঐক্যের রাজনীতি।

তিনি বিশ্বাস করতেন, শ্রমিকের শ্রেণিগত স্বার্থ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, ধর্ম, সম্প্রদায় কিংবা ব্যক্তিগত আনুগত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন শ্রমিক যে রাজনৈতিক মতাদর্শেই বিশ্বাস করুন না কেন, মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক মর্যাদা এবং শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাঁদের স্বার্থ মৌলিকভাবে অভিন্ন।

এই উপলব্ধি থেকেই তিনি শ্রমিক আন্দোলনের সংকীর্ণ দলীয় বিভাজন দূর করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন।

১৯৮৪ সালে দলমত নির্বিশেষে শ্রমিক-কর্মচারীদের ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত পাট, সুতা ও বস্ত্রকলের শ্রমিক-কর্মচারীদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে পাট-সুতা-বস্ত্রকল শ্রমিক-কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদ গঠনে নেতৃত্ব দেন।

এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের শ্রমিকদের অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা, মজুরি এবং শিল্পের স্বার্থ রক্ষার সংগ্রামে নতুন গতি সঞ্চার করে।

তাঁর কাছে ঐক্য ছিল নিছক সাংগঠনিক কৌশল নয়; এটি ছিল শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক শক্তি বিকাশের অন্যতম প্রধান শর্ত।

তিনি বুঝতেন, বিভক্ত শ্রমিক আন্দোলন মালিকপক্ষ, শাসকগোষ্ঠী ও শ্রমিকস্বার্থবিরোধী শক্তির জন্য সুবিধা তৈরি করে। তাই মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও শ্রমিকদের অভিন্ন দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।

আজকের শ্রমিক আন্দোলনের জন্যও এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মজদুর পার্টি থেকে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি

কমরেড আবুল বাশারের রাজনৈতিক পরিচয় কেবল শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি শ্রমিক শ্রেণির নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন।

স্বাধীনতার পর তিনি অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। পরবর্তীকালে শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার লক্ষ্যে মজদুর পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

আশির দশকে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম এবং পুঁজিবাদী শোষণবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পনেরো দলীয় জোটের সঙ্গেও যুক্ত হন।

১৯৮৫ সালের ১৭-১৮ অক্টোবর মজদুর পার্টি ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ঐক্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এই ঐক্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির নতুন রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় এবং কমরেড আবুল বাশার ঐক্যবদ্ধ পার্টির সভাপতি নির্বাচিত হন।

পরবর্তীকালে তিনি পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এই ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। কারণ, তিনি একদিকে যেমন শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, অন্যদিকে শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী রাজনৈতিক দল গঠন ও পরিচালনার দায়িত্বও পালন করেছেন।

একজন শ্রমিক নেতার পক্ষে এই দুই ধারাকে একই রাজনৈতিক লক্ষ্য ও দর্শনের অধীনে সমন্বিত করা সহজ নয়। কিন্তু আবুল বাশার তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে সেই কাজ করার চেষ্টা করেছেন।

১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণও প্রমাণ করে যে, তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা ও জাতীয় রাজনীতির প্রশ্নকে শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক সংগ্রামের বাইরে রাখেননি।

সামরিক শাসন, স্বৈরাচার ও বেসরকারিকরণবিরোধী সংগ্রাম

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে সামরিক ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে কমরেড আবুল বাশার সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসন এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তিনি শ্রমিক আন্দোলনকে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেন।

আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তাঁর রাজনৈতিক উপলব্ধি ছিল, গণতন্ত্রের সংগ্রামকে শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের জীবনসংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।

একইভাবে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্দেশিত কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি, শিল্প সংকোচন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের বেসরকারিকরণ এবং তথাকথিত বি-শিল্পায়ন নীতির বিরুদ্ধেও তিনি সোচ্চার ছিলেন।

Manual2 Ad Code

তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কেবল সরকারের মালিকানাধীন কিছু প্রতিষ্ঠান নয়; এগুলো দেশের উৎপাদনব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত।

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে বেসরকারিকরণের মাধ্যমে শ্রমিক ছাঁটাই, কর্মসংস্থান সংকোচন এবং উৎপাদনব্যবস্থার ওপর করপোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

তাঁর এই অবস্থানকে কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প রক্ষার আন্দোলন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে ছিল জাতীয় অর্থনীতির স্বনির্ভরতা, উৎপাদনমুখী উন্নয়ন এবং শ্রমিকের অধিকার রক্ষার বৃহত্তর রাজনৈতিক দর্শন।

তাঁর রাজনৈতিক দর্শন: শ্রমিক ঐক্যই মুক্তির পথ

কমরেড আবুল বাশারের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।

তিনি বিশ্বাস করতেন, শ্রমিকের মুক্তি কেবল মজুরি বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিকের প্রকৃত মুক্তির জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক শোষণের অবসান, উৎপাদনের উপকরণের ওপর জনগণের অধিকার, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং সামাজিক বৈষম্যের অবসান।

তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার কয়েকটি মৌলিক দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

প্রথমত, অর্থনৈতিক দাবি ও রাজনৈতিক সংগ্রামের সমন্বয়। তিনি শ্রমিকদের দৈনন্দিন দাবি আদায়ের সংগ্রামকে বৃহত্তর শ্রেণিসংগ্রামের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতেন। মজুরি বৃদ্ধি, চাকরির নিরাপত্তা ও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার আদায়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়েই শ্রমিকদের শ্রেণিসচেতনতা বিকশিত হতে পারে—এটাই ছিল তাঁর উপলব্ধি।

দ্বিতীয়ত, জাতীয় মুক্তি ও শ্রেণিমুক্তির সম্পর্ক। তিনি মনে করতেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পরও অর্থনৈতিক শোষণ ও শ্রেণিবৈষম্য অব্যাহত থাকলে শ্রমিক-মেহনতি মানুষের পূর্ণ মুক্তি সম্ভব নয়। তাই জাতীয় স্বাধীনতাকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে এগিয়ে নিতে হবে।

তৃতীয়ত, শ্রমিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা। তিনি দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে শ্রমিকদের অভিন্ন স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক আন্দোলন ছাড়া শোষণমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

চতুর্থত, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও অসাম্প্রদায়িক অবস্থান। তিনি সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং ধর্মের নামে বিভাজনের বিরুদ্ধে ছিলেন। তাঁর রাজনীতির ভিত্তি ছিল মানুষের মুক্তি, ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও শ্রেণিগত সংহতি।

পঞ্চমত, গণতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর। তিনি গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তনের পূর্বশর্ত ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করতেন।

এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তাঁর রাজনীতি নিছক ট্রেড ইউনিয়ন কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা হয়ে উঠেছিল শ্রমিক শ্রেণির সামগ্রিক মুক্তির রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ।

বর্তমান বাস্তবতায় কমরেড আবুল বাশারের প্রাসঙ্গিকতা

আজকের বাংলাদেশে শ্রমিক আন্দোলন নানা জটিল সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, কর্মপরিবেশ, চাকরির নিরাপত্তা, ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার এখনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন।

তৈরি পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও জীবনমানের প্রশ্নের পাশাপাশি শিল্পের টেকসই বিকাশ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের অংশগ্রহণের বিষয়গুলোও সামনে এসেছে।

অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে বিভাজন, নেতৃত্বের সংকট, দলীয় প্রভাব, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং শ্রমিকদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের অভাব আন্দোলনকে অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল করে তুলছে।

এই বাস্তবতায় কমরেড আবুল বাশারের শ্রমিক ঐক্যের দর্শন নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার বিষয় হলো, শ্রমিক আন্দোলনকে কেবল তাৎক্ষণিক দাবি আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শ্রমিকদের অধিকার, মর্যাদা ও জীবনমানের প্রশ্নকে জাতীয় অর্থনীতি, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের উন্নয়ন দর্শনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

একই সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির সংকীর্ণ স্বার্থের পরিবর্তে শ্রমিকদের প্রকৃত স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে।

শ্রমিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করা, শিল্পের বিকাশ ও শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষা এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তাঁর অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক দর্শন গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

নতুন প্রজন্মের কাছে আবুল বাশারের জীবন ও আদর্শ তুলে ধরা জরুরি

কমরেড আবুল বাশারের জীবন কেবল একজন ব্যক্তির সংগ্রামের ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলন, বামপন্থী রাজনীতি এবং জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্যায় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি কখনো শ্রমিকদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাজনীতি করেননি। শ্রমিকদের জীবন, তাঁদের কর্মক্ষেত্র, তাঁদের সুখ-দুঃখ, বঞ্চনা ও প্রতিবাদই ছিল তাঁর রাজনীতির প্রধান ভিত্তি।

তিনি শ্রমিকদের নেতা ছিলেন, কারণ শ্রমিকরা তাঁকে নিজেদের মানুষ মনে করতেন। তাঁকে ‘আমাদের কমরেড বাশার’ বলে সম্বোধন করতেন। এই পরিচয় কোনো আনুষ্ঠানিক পদবি বা রাজনৈতিক প্রচারণার ফসল ছিল না; এটি অর্জিত হয়েছিল দীর্ঘদিনের ত্যাগ, সংগ্রাম, আত্মনিবেদন ও শ্রমিকদের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে।

তাঁর মতো নেতার রাজনৈতিক জীবন থেকে নতুন প্রজন্মের শ্রমিক, ছাত্র, তরুণ রাজনৈতিক কর্মী ও গবেষকদের অনেক কিছু শেখার রয়েছে।

বিশেষ করে তাঁর রচনা, রাজনৈতিক প্রবন্ধ, বক্তব্য, দলীয় ও সাংগঠনিক দলিল এবং শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা জরুরি। তাঁর জীবন ও চিন্তাধারা নিয়ে গবেষণা, প্রামাণ্য গ্রন্থ প্রকাশ, স্মারক বক্তৃতা, আলোচনা এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পাঠচর্চার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

কারণ, একটি দেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণ করা মানে সেই দেশের উৎপাদনব্যবস্থা, অর্থনীতি, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাস সংরক্ষণ করা।

প্রয়াণের ১৬ বছর: সংগ্রামী আদর্শের উত্তরাধিকার

২০১০ সালের ৭ নভেম্বর ৭৬ বছর বয়সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কমরেড আবুল বাশার মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলন হারায় এক অভিজ্ঞ, সাহসী ও আপসহীন সংগঠককে।

কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে তাঁর সংগ্রামের অবসান ঘটেনি। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহ্য, শ্রমিক ঐক্যের রাজনৈতিক শিক্ষা এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন আজও প্রাসঙ্গিক।

একজন প্রকৃত বিপ্লবী নেতার মূল্যায়ন শুধু তিনি জীবদ্দশায় কতগুলো আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, কতটি সংগঠনের পদে ছিলেন কিংবা কতবার কারাবরণ করেছেন—তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কতটা অনুপ্রাণিত করতে পারে, সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে তাঁর অভিজ্ঞতা কতটা কার্যকর হতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

কমরেড আবুল বাশারের জীবন আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।

তিনি দেখিয়েছেন, শ্রমিক আন্দোলনকে জাতীয় মুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করা যায়; ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে শ্রেণিসচেতন রাজনৈতিক আন্দোলনে উন্নীত করা যায়; মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও শ্রমিকদের অভিন্ন স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ করা যায়; এবং একজন শ্রমিক নেতা একই সঙ্গে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মী হয়ে উঠতে পারেন।

Manual2 Ad Code

আজ যখন দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সম্পদের কেন্দ্রীভবন, শ্রমিকের অধিকারহীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে নতুন করে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে, তখন কমরেড আবুল বাশারের জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি।

তাঁর প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা নিবেদনের অর্থ হবে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা, শ্রমিক ঐক্য সুদৃঢ় করা, গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে শক্তিশালী করা এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়া।

কমরেড আবুল বাশার ছিলেন শ্রমিকের নেতা, মুক্তিযোদ্ধা, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিপ্লবী এবং জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের এক নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—শ্রমিকের মুক্তি ছাড়া মানুষের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়, আর ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক শ্রেণির সচেতন রাজনৈতিক সংগ্রাম ছাড়া শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।

তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিপ্লবী লাল সালাম।
#

সৈয়দ আমিরুজ্জামান, এলএল.বি
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক;
বিশেষ প্রতিনিধি, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ