একজন ভদ্রমহিলাকেই আমি ফলো করি তিনি গুলতেকিন খান

প্রকাশিত: ১০:০৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০২২

একজন ভদ্রমহিলাকেই আমি ফলো করি তিনি গুলতেকিন খান

Manual2 Ad Code

তানজিমা হোসেন |

ফেসবুকে একজন ভদ্রমহিলাকেই আমি ফলো করি তিনি গুলতেকিন খান। তিনি আমার দেখা ব্যক্তিত্বময়ী এবং আত্মবিশ্বাসী নারীদের মধ্যে একজন। কিছুটা আত্মঅহংকারীও বটে। এপাড় বাংলায় একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদকে যিনি পরিত্যাগ করতে পারেন তাকে কিছুটা অহংকারী বলা যুক্তিসঙ্গত।

আপনার আমার মত আমজনতার কাছে তিনি হিমু, মিসির আলি, শুভ্রর স্রষ্টা স্বয়ং হুমায়ূন আহমেদ। গুলতেকিন খানের কাছে সে চার সন্তানের ভ্রুণদাতা।তিনি ভোরবেলা চায়ের কাপ আর সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে জলচৌকি টেনে লিখতে বসে যেতেন। এ-ফোর কাগজে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা হত জোৎস্না ও জননীর গল্প বা আগুনের পরশমনি। লিখতে লিখতে হাঁক দিতেন,
-গুলতেকিন,পিঠটা চুলকে দিয়ে যাও তো। আরেক কাপ চা দাও। লেবু দিয়ে রঙ চা।

Manual8 Ad Code

সেই গল্পের নায়কে হুমায়ূন আহমেদ শুধুই একজন আলাভোলা পিতা। যিনি সন্তানেরা কে কোন ক্লাসে পড়ে তা জানেন না,আজ কি বাজার হবে তা জানেন না। গিন্নী তিন কন্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা সামলে ঠিকই সংসার সামলান।

Manual2 Ad Code

একজন সফলতম পুরুষের পিছনে তার সঙ্গীনীর অবদান কখনও বলে শেষ করা যায় না। আর সে যদি লেখকের স্ত্রী হয় তবে তার দায়িত্ব আরো এক কাঠি উপরে। বাচ্চারা স্কুলে, কাজের বুয়ার ছুটি। অনেকদিন বাদে একটু ফুরসত পেয়ে গুলতেকিন হয়ত পছন্দের শাড়িটা পরেছেন, কপালে ম্যাচিং টিপ, আলগোছে চোখে কাজল টেনে দিয়েছেন। লাজুক মুখে ঘোরাঘুরি করেছেন স্বামীর কাছাকাছি। লেখক মহাশয় স্ত্রীকে এক পলক দেখলেন তো দেখলেন না। তিনি তখন উপন্যাসের মৃন্ময়ীর চরিত্র আঁকতে ব্যস্ত।

কলিংবেল বাজছে। বাচ্চাদের স্কুল থেকে ফেরার সময় হয়েছে। গুলতেকিন কপালের টিপ সরিয়ে হাসিমুখে সদর দরজা খুলতে গেলেন। বাচ্চাদের হইচইয়ের কলরবে চাপা পরে গেল এক রমণীর দীর্ঘশ্বাস। আমরা সেই সুদীর্ঘ ত্রিশ বছরের দীর্ঘশ্বাসের গল্প জানি না।আমরা জানি, মৃন্ময়ীর মন ভালো নেই।

Manual3 Ad Code

শিল্পীরা সাংসারিক জীবনে সবচেয়ে অসুখী হয় কেননা শিল্পীরা তার কাজের চেয়ে আর কাউকে বেশি ভালোবাসতে পারে না। সে হোক নায়ক, গায়ক কিংবা লেখক। শাকিব খানের কাবিননামা সই করতেও বুক কাঁপে নাই যতটা বুক কেঁপেছে “কোটি টাকার কাবিন” সিনেমা রিলিজের দিন। যাই হোক, আমাদের হুমায়ূন আহমেদ তিনিও নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম কেউ ছিল না।

ষোলো বছর বয়সী একজন কিশোরী তার ঘর করতে এল। বাসর ঘরের পরদিন যে দেখতে পেল বাড়ির একটা একটা করে ফার্ণিচার গায়েব হয়ে গেল। অবাক হয়েছিলেন কিন্তু ভেঙে পরেন নাই।অতবড় বনেদি ঘরের মেয়ে চমৎকারভাবে মিশে গেলেন নিম্নমধ্যবিত্ত এক পরিবারের সাথে। সেই পরিবারে সামর্থ্য ছিল না ঠিক তবে আকাশছোঁয়া স্বপ্ন ছিল। আয়েশা ফয়েজের মত রত্নগর্ভা মা থাকতে সেই পরিবারে অমঙ্গল কখনই দানা বেঁধে প্রবেশ করতে পারে না। সম্ভব না। গুলতেকিন খান আমাদের সেই অখ্যাত হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে সুখেই ছিলেন। সুখ্যাতি হয়েই যত ব্যবধান।

Manual3 Ad Code

একজন ব্যস্ত হুমায়ূন আহমেদ। একাধারে চলচ্চিত্রকার, কথাসাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক। বইমেলায় যার বই প্রকাশ করার জন্যে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো হুমড়ি খেয়ে পরে। নাটক লিখছেন, পরিচলনা করছেন, সিনেমার কাজ চলছে। সংসার কেমন চলছে? পুত্র নুহাশের কত বছর হল? নুহাশের মা জানে। সত্যি ঘরে দুর্গার মত একজন দশভুজা গুলতেকিন থাকতে হুমায়ুন আহমেদের ঘর-সংসার, সন্তানাদি নিয়ে চিন্তা না করলেও চলে। গুলতেকিন স্বামীর ব্যস্ততায় ক্লান্ত হন না। যেই মানুষকে ত্রিশ বছর ধরে একটু একটু করে সাফল্যের চূড়ায় আরোহণ করতে দেখেছেন তার সমস্ত সুখে-দুঃখে পাশে ছিলেন। তিনি স্বামীর কাজে বাগড়া দেবার মানুষই নন।

বাঁধ সাধল স্বামীর জীবনে দ্বিতীয় নারীর উপস্থিতি। যেই স্বামীর জন্যে নিজের পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, উচ্চবিত্ত পরিবার সবকিছু বিসর্জন দিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন সেই পুরুষ আজ অন্য নারীতে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে। এখনও তিনি চোখে কাজল আঁকেন অথচ পুরুষের চোখ অন্য নারীর চোখে চোখ রাখতে ব্যস্ত।

ভেঙে গেল সাজানো ঘর। আমরা দূর থেকে শুধু দুটো মানুষের সম্পর্ক ভাঙনের গল্প শুনে আহজারি করি।একজন নারী কি শুধু একজন পুরুষকে হারায়? একটা পরিবার, শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, দেবর-ননদ, অমুকের কাকী তমুকের মামী। একটা মেয়ে যখন একটু একটু করে নিজের রুচি-অভ্যাসগুলো পাল্টে অন্য একটা পরিবারের সদস্য হয়ে দাঁড়ায় সেই পরিবারকে ছেড়ে আসা কত যে ভয়ংকর! সেই ভয়ংকরতম কষ্ট একজন প্রতারণার শিকার নারীই জানে।

যার সন্তান নুহাশ হুমায়ূন, শিলা আহমেদ, নোভা, বিপাশা তার চোখে অশ্রু মানায় না। মধ্যবয়সীনী গুলতেকিন ঘুরে দাঁড়ালেন। আহমেদ থেকে খান হলেন। সন্তানদের যথাযথভাবে মানুষ করে প্রকৃত বন্ধুর হাত ধরলেন। মেয়েরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবীনী ছাত্রী ছিল বলে ভাববেন না শুধু বাবার জিন পেয়েছে। মাও ঢাবির প্রাক্তন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী। তাও পড়াশোনা শেষ করেছেন তিন সন্তানের মা হবার পর।

শিলা আহমেদ হারিয়ে গেছে। প্রথমে শিশুশিল্পী তারপর কিশোরী রুপে পর্দার সামনে আসা আজ রবিবারের কংকা। হয়ত বাবার সাথে অভিমান করেই সুযোগ্য মেধাবী অভিনেত্রী হারিয়ে গেছে। আমরা তার হাস্যোজ্জ্বল মুখ পর্দায় আর কখনও দেখতে পাব না কিন্তু পর্দার আড়ালে কাজ করছে গুলতেকিন খানের আরেক সুযোগ্য সন্তান।

নুহাশ হুমায়ূন। “ষ” বাংলা ভাষায় রিলিজ হওয়া সবচেয়ে সাবলীল হরর সিরিজগুলোর অন্যতম। ‘ষ’নিযে কোনো কথা হবে না, চারটা পরিচিত শৈশবের ভূতের গল্প সে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যে এমন কেউ নেই যে দেখতে দেখতে নষ্টালজিয়ায় ভুগেছে। ভূতের গল্পের এত চমৎকার কম্বিনেশন ভাবা যায়! “ষ” সিরিজের জন্যে সেরা পরিচালকের সম্মান গিয়েছে নুহাশ হুমায়ূনের ঝুলিতে।

নুহাশ আরো অনেক অনেক দূর এগিয়ে যাবে।অপারেজয় মায়ের সন্তানরা কখনও হেরে যেতে পারে না। নুহাশের জন্যে অনেক অনেক শুভকামনা।

চরকির অ্যাওয়ার্ড শোতে গুলতেকিন খানের শাড়ি পুত্রের দেওয়া ঈদ-উপহার। পুত্রের পাঞ্জাবি মায়ের উপহার।

মা-পুত্রের বিজয়ের হাসি দেখে আরেকজনও বুঝি দূর আকাশ থেকে মিটিমিটি হাসছে আর বলছে,

-গুলতেকিন তোমার ঋণ আমি সাত জন্মেও শেষ করতে পারব না।

__হাবিবা সরকার হিলা