শ্রীমঙ্গলে ৩ দফা দাবীতে চা শ্রমিকদের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

প্রকাশিত: ১:১৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৪

শ্রীমঙ্গলে ৩ দফা দাবীতে চা শ্রমিকদের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

Manual2 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ : দৈনিক মজুরী ৫০০ টাকা নির্ধারণ করাসহ ৩ দফা দাবীতে চা শ্রমিকদের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আজ রবিবার (২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪) দুপুর ১২টায় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল চৌমুহনায় চা শ্রমিক আন্দোলনে ক্রিয়াশীল সংগঠনসমূহের যৌথ আয়োজনে এ সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হয়।

Manual1 Ad Code

এতে নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করে দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা, অবিলম্বে বন্ধ বাগান সমূহ চালু করে দুর্গাপূজার আগেই সকল বকেয়া ও বোনাস পরিশোধ করা এবং চা শ্রমিক ইউনিয়নের মেয়াদোতীর্ণ নেতৃত্বকে অপসারণ করে অবিলম্বে নির্বাচন দেওয়ার ৩ দফা দাবী তুলে ধরেন চা শ্রমিক নেতৃবৃন্দ। এছাড়া আগামী বুধবার মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে শ্রম উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি পেশ করা হবে বলে সমাবেশে জানানো হয়।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি বিপ্লব মাদ্রাজী পাশীর সভাপতিত্বে ও ছাত্র নেতা মিখা পিরেগু’র সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আবুল হাসান, ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক কিরণ শুক্লবৈদ্য, বাংলাদেশ চা শ্রমিকের দশ দফা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক সবুজ তাঁতী, ছাত্রনেতা ও চা শ্রমিকের দশ দফা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির কেন্দ্রীয় সংগঠক মনিষা ওয়াহিদ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সভাপতি ও দ্বারিকাপাল মহিলা কলেজের প্রভাষক কমরেড জলি পাল, সিপিবি’র উপজেলা শাখার সাবেক সভাপতি কমরেড মো. মোসাদ্দেক বেলা, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট মৌলভীবাজার শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক রাজীব সূত্রধর, করিমপুর চা বাগানের ইউপি সদস্য কাজল রায়, মদনমোহনপুর চা বাগানের মথুর চন্দ্র চাষা, মাথিউড়া চা বাগানের ময়না রাজভর, কালিটি চা বাগানের কৃষ্ণ দাস অলমিক প্রমুখ।

বক্তারা বলেন, বিগত ১০ আগস্ট ২০২৩ তারিখে চা শ্রমিকদের দৈনিক নগদ মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারণ করে একটি গেজেট প্রকাশ করা হয়। উক্ত গেজেটের তফসিল (ঙ) এর ৭ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের এক বছর পর থেকে প্রতিবছর ৫% হারে মজুরি বৃদ্ধির বিধান রয়েছে। সে মোতাবেক চা বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদ গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখ মূল মজুরি ১৭০ টাকার ৫% হারে মাত্র ৮.৫০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে সার্কুলার জারি করে। মূলত এরপর থেকেই চা শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়।

Manual1 Ad Code

আজকের কর্মসূচি থেকে চা শ্রমিকরা মালিকপক্ষ ও বিগত সরকারের যোগসাজশে একতরফা অগণতান্ত্রিকভাবে ঘোষিত গেজেট প্রত্যাখ্যান করেন। একইসাথে মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করে বর্তমান বাজারদরের সাথে সঙ্গতি রেখে চা শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণের দাবী জানানো হয়।

বক্তারা আরও বলেন, ন্যাশনাল টি কোম্পানির ১২টি চা বাগান, দেওন্দি টি কোম্পানির ৪টি চা বাগান, মাথউরা, মুমিনছড়া, ফুলতলা, কালগুল প্রভৃতি চা বাগান গুলো মালিপক্ষের দুর্নীতি অবহেলায় অব্যবস্থাপনা শিকার হয়ে ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়েছে। উক্ত বাগানগুলোর শ্রমিকরা দীর্ঘদিন যাবত মজুরি বঞ্চিত হয়েও চা বাগানের উৎপাদন কার্যক্রম চালু রেখেছেন। শ্রমিকদের বৃহত্তর উৎসব দুর্গাপূজার আগেই বকেয়া মজুরি ও বোনাস পাওয়ার অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

Manual1 Ad Code

১৬৭টি চা বাগান, ৭টি ভ্যালি, ১ লাখের উপর স্থায়ী শ্রমিক, ৫০ হাজারের বেশি অস্থায়ী শ্রমিক আর ১০ লাখের বেশি চা জনগোষ্ঠীর মানুষ নিয়ে চা শিল্প৷ পাতা তোলার সুবিধার জন্য চা গাছকে ছেঁটে যেমন ২৬ বা ২৮ ইঞ্চি করে রাখা হয়, তেমনি চা শ্রমিকদের জীবনের স্বপ্নকেও বড় হতে দেয়া হয় না বলেও মন্তব্য করেন বক্তারা। চা শিল্পের বয়স প্রায় ২০০ বছর হলেও চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি এখনো ১৭০ টাকা। এই অন্যায্য মজুরির মাধ্যমে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজারদরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমতাবস্থায় আন্দোলনে ক্রিয়াশীল বিভিন্ন সংগঠন চা শ্রমিকদের শত বছরের বৈষম্য বঞ্চনার নিরসন ঘটিয়ে মানবিক জীবন প্রতিষ্ঠার জন্য বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে জোর দাবী জানান।

Manual4 Ad Code

নতুন গেজেট বাতিল করে দৈনিক ন্যূনতম মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণ করাসহ ৩ দফা দাবী প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, সাপ্তাহিক নতুন কথার বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান মজুরী বৃদ্ধিসহ অন্যান্য দাবীতে চলমান এ আন্দোলনের প্রতি পুন:সমর্থন ও একাত্মতা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান আলাপ আলোচনার মাধ্যমে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন উপযোগী যৌক্তিক মজুরি নির্ধারণের আহবান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, সামান্য কিছু সুযোগ-সুবিধাসহ দৈনিক মাত্র ১৭০ টাকা মজুরিতে আট ঘন্টা, কখনো-বা আরো অধিক সময় ধরে কাজের বিপরীতে এই সামান্য পারিশ্রমিক শোষণ-বৈষম্যমূলক ও সংবিধান পরিপন্থি। মজুরী বৃদ্ধিসহ অন্যান্য দাবীনামা নিয়ে দরকষাকষি ও আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাগান মালিকদের ঔপনিবেশিক মানসিকতা পরিহার করতে হবে ও সরকারকেও চা-শ্রমিকদের দেশের নাগরিক হিসেবে গণ্য করে ন্যায্য ও মানবিক উদ্যোগ নিতে হবে। একইসাথে, চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য শ্রম আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য সম-পর্যায়ের খাতের সর্বনিম্ন মজুরি বিবেচনায় নিয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবন ধারণের উপযুক্ত ও চা-শ্রমিকদের নিকট গ্রহণযোগ্য ন্যায্য পারিশ্রমিক নির্ধারণে বাগান মালিক, বাংলাদেশীয় চা সংসদ, শ্রম অধিদপ্তর ও সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান আরও বলেন, প্রতি দুই বছর পরপর চা-শ্রমিক ও বাগান কর্তৃপক্ষের মধ্যে মজুরি সংক্রান্ত চুক্তি নবায়নের রীতি রয়েছে, যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মজুরি নির্ধারণে বাস্তবে একতরফাভাবে বাগান কর্তৃপক্ষই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তথাপি দীর্ঘদিন ধরে চা-শ্রমিকরা মজুরি চুক্তির বাইরে রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতির এই সময় চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষিতে মাত্র ৮ টাকা ৫০ পয়সা মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাব চা-শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি অবজ্ঞা ও নিছক উপহাসমূলক অধিকার লঙ্ঘন ছাড়া আর কিছু নয় উল্লেখ করে তিনি বলছেন, চা-শ্রমিকদের প্রাপ্ত আবাসনসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় নিয়েও একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, দেশের অন্য যে-কোনো খাতের তুলনায় চা শ্রমিকদের মজুরি সর্বনিম্ন ও শোষণ-বৈষম্যমূলক। অথচ সার্বিক বিবেচনায় এ খাতটি অর্থনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া, এখন পর্যন্ত কোনো পরিসংখ্যান বা তথ্য-উপাত্ত দিয়েও কেউ বলতে পারেননি যে, চা-বাগানের মালিক পক্ষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা এমন কোনো অবস্থায় আছেন যে, যাদের অবদানের ওপর নির্ভর করে চা-শিল্প বিকাশমান, সেই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি প্রদানে তারা অক্ষম। বরং এটি একটি লাভজনক বাণিজ্যিক খাত। অন্যদিকে চা-শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরিসহ অন্যান্য মৌলিক অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু মালিকপক্ষের মর্জির ওপর ছেড়ে দেয়া ঠিক নয়। চা শ্রমিকদের দেশের নাগরিক হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তাদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে চলমান আন্দোলনের যৌক্তিকতা অনুধাবনের পাশাপাশি সমতাভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে চা শ্রমিকদের নিকট গ্রহণযোগ্য মজুরি নির্ধারণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’
তিনি বলেন, দেশের “ন্যূনতম মজুরি বোর্ড” অন্যান্য খাতের ন্যূনতম মজুরি যেখানে কয়েক গুণ বেশি নির্ধারণ করেছে, সেখানে কোন অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে শ্রম মন্ত্রণালয়ের “গাইড লাইন” উপেক্ষা করে বারবার চা বাগান মালিক পক্ষের নির্ধারণ করা ন্যূনতম মজুরির হার বহাল রেখে শ্রম মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ