গণঅভ্যুত্থানের পরেও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি: বদরুদ্দীন উমর

প্রকাশিত: ৯:০০ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৮, ২০২৫

গণঅভ্যুত্থানের পরেও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি: বদরুদ্দীন উমর

Manual8 Ad Code

বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৮ জুলাই ২০২৫ : বর্তমান পরিস্থিতিতে দক্ষিণপন্থি ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকার শাসক গোষ্ঠীর খেদমতকারী হিসেবে কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী, লেখক ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি কমরেড বদরুদ্দীন উমর। তিনি বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের পরেও বাস্তবে দেশে কোনো শ্রেণিগত পরিবর্তন ঘটেনি। বরং পুরোনো শাসন কাঠামোই বহাল রয়েছে।”

শুক্রবার (১৮ জুলাই ২০২৫) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুরুল হক হলে গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তিতে আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

কমরেড বদরুদ্দীন উমর বলেন, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর দেশে যে শাসনশূন্যতা তৈরি হয়েছিল তা পূরণে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল। এই সরকার শাসক শ্রেণিরই অংশ। তারা মূলত শাসক গোষ্ঠীর খেদমতকারী হিসেবে কাজ করছে।

যদিও অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি কিছুটা কমেছে। কিন্তু গার্মেন্ট শ্রমিকদের ওপর দমন-পীড়ন যেমনটা হাসিনার আমলেও দেখা গিয়েছিল-তা আজও চলছে, বলেন তিনি।

দেশের পোশাক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি উপলব্ধি করে তিনি বলেন, বোঝা যায়, দেশে একটি গণঅভ্যুত্থান হওয়ার পরেও বাস্তবে কোনো শ্রেণিগত পরিবর্তন ঘটেনি। বরং পুরোনো শাসন কাঠামোই বহাল রয়েছে।

এনসিপি ও রাজনীতির হাতিয়ার কী?

Manual2 Ad Code

অভ্যুত্থানের পর গঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ছাত্ররা যে নতুন দল গঠন করেছে তা মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করছে। তাদের চিন্তা ও বক্তব্যে শ্রমিক কিংবা কৃষকের কোনো দাবির প্রতিফলন নেই। এটি স্পষ্ট যে তারা শাসক ও শোষক শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী হিসেবে কাজ করছে। ফলে বর্তমান রাজনীতিতে শ্রমিক-কৃষকের ইস্যুগুলো উপেক্ষিত থাকছে এবং আন্দোলনের প্রকৃত ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ধর্মের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে ইফতার পার্টির মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে জনগণের মধ্যে নিজেদের উপস্থিতি জাহির করতে চাইছে। এরমধ্য দিয়ে বোঝা যায় যে তারা ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

এনসিপি সম্পর্কে কমরেড বদরুদ্দীন উমর আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ছাত্রদের নতুন দলের ঘনিষ্ঠতা এবং ধর্মনির্ভর চিন্তাধারা আরও স্পষ্ট করে দেয় যে বর্তমান পরিস্থিতিতে দক্ষিণপন্থি ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

বর্তমান সরকার জনগণের স্বার্থে কিছু কমিশন গঠন করলেও এটি একটি সংস্কারমূলক উদ্যোগমাত্র। যারা সংস্কার চায়, তারা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে গ্রহণ করে নিয়েছে এবং তার ভেতরেই কিছু পরিবর্তন চায়, বলেন তিনি।

গণঅভ্যুত্থানের পর আশা করা হয়েছিল বামপন্থী ও প্রগতিশীল শক্তিগুলো সামনে আসবে এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, দক্ষিণপন্থি ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী অপ্রত্যাশিতভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। প্রগতিশীলদের সংগঠন ও অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি সহজেই জায়গা করে নিচ্ছে।

দক্ষিণপন্থি রাজনীতির জবাব কীভাবে?

বামপন্থী এই রাজনীতিক বলেন, এই পরিস্থিতিতে যদি দক্ষিণপন্থি রাজনীতির জবাব দিতে হয়, তাহলে আন্দোলনকারীদের শ্রমিক ও কৃষকের কাছে যেতে হবে। কারণ তারাই এই দেশের প্রকৃত গণতান্ত্রিক শক্তি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখন যারা রাজনীতিতে সক্রিয়, তারা কৃষক বা শ্রমিকদের কাছে যাচ্ছেন না বরং শহরকেন্দ্রিক ছোট পরিসরে নিজেদের মধ্যে সভা-সেমিনার করে সীমাবদ্ধ থাকছেন।

Manual8 Ad Code

লেনিনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, জনগণের সংগঠনই হচ্ছে আসল অস্ত্র। সংগঠন না থাকলে কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয় এবং তা আনতে হলে শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে সুসংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আর এ কাজের জন্য শক্তিশালী ও কার্যকর সংগঠন থাকা অপরিহার্য।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের মৌলিক উন্নতি হবে না উল্লেখ করে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের এই সভাপতি বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে অনেকে আশাবাদী হলেও, এই নির্বাচন কোনো মৌলিক শ্রেণি পরিবর্তন আনবে না। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে আশা জন্মেছিল, তা পূরণ হয়নি।

শুধু নীতির কথা বললেই চলবে না-

পরিবর্তন আনতে হলে দরকার আন্দোলন, দরকার একটি বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থান। তবে এই ধরনের বিপ্লব একদিনে সম্ভব নয়। তার জন্য দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন এবং একটি সংগঠিত নেতৃত্ব প্রয়োজন, যা এখনো গড়ে ওঠেনি। সুতরাং ভবিষ্যতের জন্য যে কাজটি সবচেয়ে জরুরি, তা হলো সংগঠন গড়ে তোলা, শ্রমিক-কৃষকের মাঝে যাওয়া এবং একটি বিকল্প বিপ্লবী শক্তি তৈরি করা।

Manual5 Ad Code

কমরেড বদরুদ্দীন উমর বলেন, শুধু বক্তব্য বা নীতির কথা বললেই চলবে না বরং বাস্তবে খেটে খাওয়া মানুষের কাছে যেতে হবে, তাদের সঙ্গে মিশতে হবে এবং সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। সামাজিক পরিবর্তন কেবল তখনই সম্ভব, যখন তা খেটে খাওয়া শ্রমিক, কৃষক ও গ্রামীণ জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ঘটে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক কমরেড ফয়জুল হাকিম, বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সভাপতি কাজী ইকবাল, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের তিন অঞ্চলের সাবেক মুখ্য সংগঠক কমরেড ভোমোল ভৌমিক, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি মিতু সরকারসহ অন্যরা।

Manual8 Ad Code

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ