ভালো কি সত্যিই কম? — সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল বাস্তবতা

প্রকাশিত: ১১:১৫ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৩, ২০২৫

ভালো কি সত্যিই কম? — সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল বাস্তবতা

Manual6 Ad Code

রোজিনা চৌধুরী |

এই পৃথিবীতে কি সত্যিই ভালো মানুষের সংখ্যা কমে গেছে? নাকি ভালো মানুষও নীরবে, আড়ালে, মন্দ ও উদ্ভট কিছু উপভোগ করে—এই প্রশ্নগুলো আজ আর কেবল দার্শনিক কৌতূহল নয়; বরং ফেসবুকসহ সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিদিনের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে থাকা এক গভীর সামাজিক অনুসন্ধান।

Manual4 Ad Code

আমরা দেখি—খারাপ, অশালীন, উদ্ভট কিংবা অনর্থক কিছু মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায়। অথচ ভালো, ইতিবাচক, মানবিক কিংবা সৃজনশীল উদ্যোগ সহজে ভাইরাল হয় না। কেন এমন হয়? এই বৈষম্যের পেছনের ক্যালকুলেশনটা কোথায়?

প্রথমত, মানুষের মনস্তত্ত্ব। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ব্যতিক্রম, সংঘাত, বিতর্ক ও চমকপ্রদ বিষয়টির দিকে দ্রুত আকৃষ্ট হয়। ভালো কাজ আমাদের কাছে অনেক সময় ‘স্বাভাবিক’ বলে মনে হয়—এমনটাই তো হওয়া উচিত। ফলে সেটি দেখলে আমরা প্রশংসা করলেও শেয়ার করার তাগিদ অনুভব করি না। অন্যদিকে খারাপ বা উদ্ভট কিছু দেখলে আমরা অবাক হই, বিরক্ত হই, রাগ করি—আর সেই আবেগ থেকেই লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করি। এই প্রতিক্রিয়াই কোনো কনটেন্টকে ভাইরাল করে তোলে।

Manual2 Ad Code

দ্বিতীয়ত, অ্যালগরিদমের বাস্তবতা। ফেসবুক নিজে থেকে কোনো কনটেন্টকে ‘ভালো’ বা ‘মন্দ’ হিসেবে ভাইরাল করে না। ব্যবহারকারীর আচরণই এখানে মূল চালিকাশক্তি। কোনো পোস্টে যত বেশি প্রতিক্রিয়া—ভালো হোক বা খারাপ—অ্যালগরিদম সেটিকে তত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। ফলে আমরা যখন কোনো খারাপ কনটেন্টের বিরুদ্ধে সমালোচনা করতে গিয়ে সেখানে মন্তব্য করি, তখন অজান্তেই তার বিস্তার ঘটাই।

Manual4 Ad Code

তৃতীয়ত, দায়িত্ববোধের সংকট। আমরা অনেকেই মনে করি—ভালো কাজ করা মানে শুধু বাস্তব জীবনে সীমাবদ্ধ থাকা। অনলাইনে কী দেখছি, কী শেয়ার করছি—সেটা আমাদের নৈতিক দায়িত্বের অংশ নয়। এই ধারণা থেকেই ভালো কনটেন্ট এড়িয়ে যাই, আর খারাপ কনটেন্ট ‘দেখে নেওয়া’, ‘সমালোচনা করা’ কিংবা ‘মজা নেওয়া’র নামে ছড়িয়ে দিই।

Manual1 Ad Code

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—ফেসবুক কি তাহলে শুধুই মন্দ মানুষের জায়গা? উত্তরটি এতটা সরল নয়। ফেসবুকে অসংখ্য ভালো মানুষ আছেন, ভালো কাজও হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো—আমরা সম্মিলিতভাবে কোনটিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। যখন ৯০–৯৫ শতাংশ মানুষের দৃষ্টি, সময় ও প্রতিক্রিয়া উদ্ভট ও নেতিবাচক বিষয়ের পেছনে যায়, তখন ভালো উদ্যোগগুলো আড়ালেই থেকে যায়।

আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য হলো—আমরা নিজেরাও এই ব্যবস্থার অংশ। যে ব্যক্তি উদ্ভট কিছু করে সে যেমন দায়ী, তেমনি যারা লাইক, কমেন্ট ও শেয়ারের মাধ্যমে তাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে তারাও সমানভাবে দায়ী। কারণ দর্শক না থাকলে কোনো কিছুরই ভাইরাল হওয়ার সুযোগ নেই।

তাহলে কি আমরা বলতে পারি—‘আমরা দায়ী নই’? বাস্তবতা হলো, আমরা চাইলেও এই দায় এড়াতে পারি না। বুঝেও কেন আমরা খারাপ জিনিস দেখি? কেন আলোচনা করি, সমালোচনা করি, অথচ এড়িয়ে যাই না? সম্ভবত কারণ, আমাদের ভেতরেও এক ধরনের গোপন কৌতূহল কাজ করে—যা আমরা প্রকাশ্যে স্বীকার করতে চাই না।

সমাধান কোথায়? সমাধান শুরু হতে পারে আমাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থেকে। আমরা কী দেখব, কীতে প্রতিক্রিয়া জানাব, কী শেয়ার করব—এই বাছাইটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভালো কনটেন্টকে স্বাভাবিক ভেবে উপেক্ষা না করে সচেতনভাবে এগিয়ে আনা, আর খারাপ ও উদ্ভট বিষয়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাই পারে ভাইরাল সংস্কৃতির দিক বদলাতে।

সবশেষে বলা যায়, প্রশ্নটা ‘ভালো মানুষ কম কি না’—এটা নয়; প্রশ্নটা হলো, আমরা ভালো মানুষ হয়েও কোনটিকে প্রশ্রয় দিচ্ছি। যতদিন আমরা নীরবে নোংরামি উপভোগ করব, ততদিন ভাইরাল বাস্তবতাও বদলাবে না। পরিবর্তন চাইলে, দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই—দায়িত্ব নিতে হবে আমাদেরই।
#
রোজিনা চৌধুরী

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ