ভাইরাল সংস্কৃতি, নৈতিক অবক্ষয় ও আমরা

প্রকাশিত: ৬:১১ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৮, ২০২৫

ভাইরাল সংস্কৃতি, নৈতিক অবক্ষয় ও আমরা

Manual6 Ad Code

সুশান্ত দাশ গুপ্ত |

নওগা শহরের এক ছোট ক্লিনিক। গেটের পাশে টিনের চাল, ভেতরে গন্ধটা ওষুধ আর দুপুরের ভাতের মাঝামাঝি কোথাও। সেখানেই ছিলেন এক নার্স—চলনসই, চুপচাপ, কাজ জানেন, কথাও কম বলেন। নাম জান্নাতারা রুমি। রোগীরা তাঁকে চিনত “আপা” বলে। সহকর্মীরা চিনত “দায়িত্বশীল” বলে। বাড়িতে স্বামী, আর ছেলে।

Manual8 Ad Code

সমস্যাটা শুরু হল একদিন হঠাৎ করে—যেদিন তিনি বুঝে ফেললেন, “আপা” বলে ডাকায় জীবন চলে, কিন্তু “ভাইরাল আপা” না হলে চলে না। সে দিন থেকেই তিনি নতুন এক দলে ঢুকলেন। নাম এনসিপি। নামটা এমন যে শুনলেই মনে হয়, “এটা নিশ্চয়ই নতুন, খুব নতুন, আর খুব জরুরি।” চাকরি ছাড়লেন। স্বামীকে বললেন, “আমি বড় কাজ করতে যাচ্ছি।” স্বামী বুঝে উঠতে পারল না বড় কাজটা কী—কারণ বড় কাজের আগে সাধারণত বড় আলোচনা হয়, এখানে হল বড় লাফ। সন্তানকে রেখে ঢাকায় চলে এলেন। কারণ ঢাকায় নাকি সব কিছু দ্রুত হয়—বাস, ব্রেকিং নিউজ, আর মানুষের বিচার।

Manual1 Ad Code

ঢাকায় এসে দেখলেন, সমস্যা অন্য জায়গায়। এখানে সবাই কারও না কারও “পরিচিত”। কেউ কারও “ক্যাডার”। কেউ “কারো লোক”। তিনি তো নওগা শহরের নার্স—এখানে তাকে চেনে কে? তখনই আধুনিক যুগের গুরুজনেরা ফিসফিস করে বলল, “চেনা লাগে? সহজ। একটা কাজ করলেই হবে। একটু নাটক, একটু ধাক্কা, বাকিটা ফেসবুক সামলে নেবে।”

তিনি ভাবলেন, নাটক তো জীবনে কম করেননি—কখনও রোগীর আত্মীয়কে বুঝিয়েছেন “ইনজেকশন দিলে ভয় নেই”, কখনও প্রশাসনিক লোককে বুঝিয়েছেন “স্যার, স্টক শেষ।” কিন্তু ঢাকার নাটক আলাদা। এখানে নাটক মানে ক্যামেরা। ক্যামেরা মানে পরিচিতি। পরিচিতি মানে… বাকিটা সবাই জানে।

এরপর এল সেই দিন—ধানমন্ডি ৩২ এর সামনে ভিড়, শ্লোগান, উষ্ণ রোদ আর তিক্ত কথা। এক বৃদ্ধা এলেন, কৌতূহল নিয়ে, স্মৃতি নিয়ে, “দেখি আসি” মনোভাব নিয়ে। বৃদ্ধার পায়ে ধীর গতি, মুখে বয়সের শান্তি। আর ঠিক তখনই—আমাদের এই নবাগত পরিচিতি-শিকারি মনে করলেন, “এটাই তো সুযোগ!” তিনি লাঠি তুললেন—কিন্তু সেটা তার হাতে ছিল না, যেন লাইক-শেয়ার-কমেন্টের অদৃশ্য হাত তাকে নাড়াচাড়া করছে। এক আঘাত, আরেক আঘাত—আর চারদিকের ফোনগুলো একসাথে জ্বলে উঠল। কেউ থামাল না, কেউ বলল না “আপা, আপনি তো নার্স, এই কাজ আপনার মানায়?” বরং ভিডিওতে ক্যাপশন বসে গেল: “দেখুন, কী সাহস!”

সাহসের সংজ্ঞা যে কখন সাহস থেকে কদর্যতায় পাল্টে যায়, ফেসবুক অ্যালগরিদম সেটা বুঝে না। সে বোঝে “এনগেজমেন্ট।” বৃদ্ধার চোখের পানি সে গুনে না। সে গুনে ভিউ।

পরদিন সকাল। নওগা শহরের সেই ক্লিনিকের পুরনো রোগী, পুরনো সহকর্মী, এমনকি দূরের আত্মীয়ও বলল, “এই তো! আমরা তো জানতামই ও একদিন বড় হবে!” বড় হওয়া বলতে মানুষ যা বোঝে—কখনও সুনাম, কখনও কেলেংকারি, দুটোতেই পরিচিতি হয় বলে এই যুগে তফাত কম।

তিনি নিজেও অবাক। এত দিন ইনজেকশন দিয়ে মানুষকে সুস্থ করেছিলেন, কিন্তু এক দিনের লাঠি তাকে “তারকা” বানিয়ে দিল! লোকজন তার নাম জানল, পরিচয় জানল, ঠিকানাও জানল—যেটা মানুষ সাধারণত চিকিৎসা নিতে গিয়ে জানতে চায় না, কেবল বিচার করতে গিয়ে চায়।

তারপর কয়েক দিন চলল অদ্ভুত এক জীবন। কক্ষে ফিরে মোবাইল খুললেই দেখা যায়, কেউ তাকে দেবী বানাচ্ছে, কেউ দানব। কেউ বলছে, “তুমি দেশের মুখ!” কেউ বলছে, “তুমি লজ্জা!” তিনি মাঝখানে বসে ভাবেন—“আমার মুখটা এত দিন মাস্কের আড়ালে ছিল, এখন সবাই মুখ খুঁজছে!” কিন্তু কেউ খুঁজছে না সেই নার্সটাকে, যে কখনও রাত জেগে ড্রিপ সামলেছে, কারও জ্বর কমেছে দেখে হাঁফ ছেড়েছে। সবাই খুঁজছে ভাইরাল মানুষটাকে।

Manual7 Ad Code

আর ভাইরাল মানুষদের একটা সমস্যা আছে—জ্বর তাদের দ্রুত ওঠে, দ্রুত নামে। আজ ট্রেন্ড, কাল আরেকজন। আজ ক্যামেরার আলো, কাল অন্ধকার। আজ “বাহ বাহ”, কাল “কোথায় গেল?”

তারপর এল আরেক সকাল, যেটা আর কোনও ক্যাপশনে গ্ল্যামার হয় না। তার কক্ষের দরজা বন্ধ। ভিতরে নীরবতা। আর সেখানেই পাওয়া গেল ঝুলে থাকা নিথর শরীর—যেন গোটা শহর এক মুহূর্ত থমকে গিয়ে বলল, “আহা!”

আহা, জীবন। যে জীবন নার্স হয়ে তিনি বাঁচাতে শিখেছিলেন, সেই জীবনই যেন তাকে বলে গেল—লাইক দিয়ে জীবন চালানো যায় না, জীবনের দায় এড়ানো যায় না। ক্ষমতা, খ্যাতি, অর্থ—সবই দরকার, কিন্তু এগুলো যদি আসে মানুষের চোখের জল পেরিয়ে, কারও অসম্মান পেরিয়ে, তবে সে অর্জন আসলে ঋণ। আর ঋণ একদিন সুদসহ ফেরত চায়—কারও কাছ থেকে সম্মান নিয়ে, কারও কাছ থেকে শান্তি নিয়ে।

আমরা যারা দূরে বসে দেখছিলাম, তারা সবাই বিচারকের চেয়ার টেনে বসলাম। কেউ বলল “প্রাপ্য”, কেউ বলল “ষড়যন্ত্র”, কেউ বলল “কী দুঃখ!”—কিন্তু খুব কম মানুষই বলল, “এই সমাজে এমন কী হল যে একজন নার্স পরিচিত হতে গিয়ে এমন পথ বেছে নেয়?” খুব কম মানুষই জিজ্ঞেস করল, “ভাইরাল হওয়ার জন্য আমরা কতটা হিংসা আর নিষ্ঠুরতাকে বাহবা দিই?”

Manual3 Ad Code

শেষমেশ যা থাকে, তা হল এক বৃদ্ধার ব্যথা, এক শিশুর শূন্যতা, এক স্বামীর অদ্ভুত নীরবতা, আর আমাদের সবার টাইমলাইনে একটু স্ক্রল করে চলে যাওয়ার অভ্যাস।
#
সুশান্ত দাশ গুপ্ত 

Sushanta Das Gupta

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ