ইতিহাস কেবল কিছু ঘটনার সমষ্টি নয়

প্রকাশিত: ৩:১০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৪, ২০২৫

ইতিহাস কেবল কিছু ঘটনার সমষ্টি নয়

Manual3 Ad Code

কমল কলি চৌধুরী |

সরাসরি অস্বীকার না করেও মুক্তিযুদ্ধকে অর্থহীন ও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলার যে সমসাময়িক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে-তার ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশলগুলো গভীরভাবে বোঝা জরুরি। ইতিহাস বিকৃতি আজ আর কেবল ভৌত স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং পাঠ্যবই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, তথাকথিত নিরপেক্ষ বিতর্ক এবং উন্নয়নকেন্দ্রিক ভাষ্য নির্মাণের মধ্য দিয়ে এটি একটি সূক্ষ্ম ও দীর্ঘমেয়াদি ন্যারেটিভে পরিণত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে নিরপেক্ষতা একটি বিভ্রম- কারণ এটি আদতে নৈতিক অবস্থানের প্রশ্ন। ইতিহাসকে ‘বিতর্কিত’ করে তোলার এই প্রক্রিয়া সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ডকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্মৃতিহীন নাগরিকে রূপান্তরিত করে। ইতিহাস কখনোই কেবল অতীতের ঘটনাপঞ্জি নয়-এটি একটি সমাজের আত্মপরিচয়ের কাঠামো। যে সমাজ তার ইতিহাসকে আপেক্ষিক করে তোলে, সে সমাজ নিজের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় অথচ সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাহস আর রাখে না।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সেই অর্থে শুধু একটি রাজনৈতিক সংগ্রাম নয়; এটি ছিল একটি নৈতিক ও মানবিক অভিজ্ঞতা, যার মধ্য দিয়ে জাতিসত্তা নিজেকে সংজ্ঞায়িত করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ করা যাচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার না করেও তাকে ধীরে ধীরে অর্থহীন করে তোলার একটি সুপরিকল্পিত প্রয়াস চলছে। এই নীরব ও সূক্ষ্ম ইতিহাস বিকৃতির কৌশলগুলো চিহ্নিত করা এবং তাদের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক অভিঘাত বিশ্লেষণ করা আজ সময়ের দাবি।

২. আগের দশকগুলোতে ইতিহাসবিরোধিতার কৌশল ছিল স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙা, প্রকাশ্য অস্বীকার, আক্রমণাত্মক বক্তব্য। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই কৌশল বদলে গেছে। এখন আর বলা হয় না, ‘মুক্তিযুদ্ধ হয়নি’; বলা হয়, ‘মুক্তিযুদ্ধ অতিরঞ্জিত’। শহিদের সংখ্যা হয়ে ওঠে ‘বিতর্কিত’, যুদ্ধাপরাধ ‘প্রেক্ষাপটনির্ভর’ আর সহযোগীরা রূপ পায় ‘সময়ের শিকার’-এর বয়ানে।

Manual3 Ad Code

এই নরম অস্বীকৃতির রাজনীতি যুক্তির ভাষায় উপস্থিত হয়, সন্দেহের বীজ বপন করে এবং ধীরে ধীরে নৈতিক অবস্থানকে ভেঙে দেয়। ইতিহাস এখানে আর সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্বে আবদ্ধ থাকে না; বরং ব্যাখ্যার খেলায় পরিণত হয়। অথচ ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত থাকে, যেখানে ব্যাখ্যার বহুত্ব নয়-নৈতিক স্পষ্টতাই প্রধান দাবি।

Manual5 Ad Code

৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইতিহাসবিকৃতির একটি কার্যকর ও দ্রুত বিস্তৃত ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এখানে ইতিহাস পরিবেশিত হয় খণ্ডিত আকারে-একটি ছবি, একটি বাক্য, একটি প্রশ্নচিহ্ন। যেমন, ‘সব যুদ্ধেই তো উভয় পক্ষের মানুষ মারা গেছে’-এই আপাতনিরীহ বাক্যের মধ্য দিয়েই দায়বদ্ধতাকে ঝাপসা করে দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধকে জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম থেকে নামিয়ে এনে একটি সাধারণ ক্ষমতার সংঘাতে পরিণত করা হয়।

ফলে অপরাধ ও প্রতিরোধের মধ্যকার নৈতিক পার্থক্য বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইতিহাস এখানে আর গভীর উপলব্ধির বিষয় নয়-হয়ে ওঠে দ্রুত স্কুল করা একটি মতামত। স্মৃতি রূপ নেয় কনটেন্টে আর কনটেন্টের আয়ু যেমন ক্ষণস্থায়ী- স্মৃতির স্থায়িত্বও তেমনই নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

Manual4 Ad Code

৪. ইতিহাস বিকৃতির আরেকটি কৌশল হলো ‘উন্নয়ন বনাম অতীত’-এই কৃত্রিম দ্বন্দ্ব নির্মাণ। বলা হয়, অতীতে পড়ে থাকলে উন্নয়ন আসে না-ইতিহাসচর্চা মানেই পশ্চাৎমুখিতা। এই ভাষ্যের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে ভবিষ্যতের পথে এক ধরনের বাধা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। স্মৃতি হয়ে ওঠে বোঝা, শহিদ হয়ে ওঠেন অপ্রয়োজনীয় আবেগ আর ন্যায়বিচারকে চিহ্নিত করা হয় ‘ডিস্টার্বিং ফ্যাক্টর’ হিসেবে। অথচ ইতিহাসচর্চা মানে অতীতে আটকে থাকা নয়, বরং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতের নৈতিক দিকনির্দেশ তৈরি করা। যে সমাজ স্মৃতিকে পরিত্যাগ করে উন্নয়নের কথা বলে, সে সমাজ উন্নয়নকে কেবল অবকাঠামোতে সীমাবদ্ধ রাখে-মানুষকে নয়।

Manual5 Ad Code

৫. শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এই ন্যারেটিভের অনুপ্রবেশ স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। পাঠ্যসূচির সংকোচন, ভাষার নির্লিপ্ততা, শিল্প-সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের ক্রমাগত অনুপস্থিতি-সব মিলিয়ে একটি প্রজন্মকে এমনভাবে গড়ে তোলা হবে-যারা জানবে খুব কম, অনুভব করবে আরো কম। এই প্রজন্ম তথ্য পাবে, কিন্তু দায়বোধ পাবে না। স্মৃতি থাকবে, কিন্তু তা হবে আবেগহীন।

৬. ইতিহাস কেবল কিছু ঘটনার সমষ্টি নয়-এটি একটি আদর্শিক ও নৈতিক স্মৃতি। মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই। যে সমাজ তার গণহত্যা, নারীর ওপর সংঘটিত সহিংসতা ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকে বিতর্কে পরিণত করে, সে সমাজ আসলে নিজের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলে। এখানে প্রয়োজন স্পষ্ট নৈতিক অবস্থান।

৭. মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এই বয়ানের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল রাজনৈতিক নয়-এটি সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক লড়াই। এখানে কবিতা দরকার, গবেষণা দরকার, স্মৃতিচারণ দরকার-এবং প্রশ্ন দরকার। তবে সেই প্রশ্নের দিকনির্দেশ সঠিক হতে হবে, কারণ ভুল প্রশ্ন থেকেই বিকৃত ইতিহাস জন্ম নেয়।

মুক্তিযুদ্ধ কোনো সমাপ্ত অধ্যায় নয়-এটি ন্যায়, মানবিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে একটি চলমান চুক্তি। সেই চুক্তি ভাঙার নীরব প্রচেষ্টাকে চিহ্নিত করা, বোঝা এবং প্রতিরোধ করাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে জরুরি দায়। ইতিহাসকে রক্ষা করা মানে অতীতকে রক্ষা করা নয়-মানুষ হয়ে ওঠার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে রক্ষা করা।
#
লেখক: কবি, কথাসাহিত্যিক, অধ্যাপক।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ