সিলেট ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬:৫৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৭, ২০২৬
মাদুরো কে?
নিকোলাই মাদুরো কারাকাসে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি এই রাজনীতিতে যুক্ত হন। উচ্চশিক্ষার সুযোগ গ্রহণ না করে শ্রমিকশ্রেণীর রাজনীতির সাথে যুক্ত হন এবং একজন বাস চালক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০৬ থেকে ১৩ সাল পর্যন্ত তিনি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৩ সালে তিনি ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর তিনি টানা ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন।
মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযোগ কি?
তাঁর বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ নাকি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে কোকেন পাচারের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। মাদক কার্টেল ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসাজশে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবাহে সহায়তা করেন। এছাড়া অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বাধাগ্রস্ত, বিরোধীদের দমন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ।
তিনি কি আসলেই মাদক কারবারি?
মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DEA)-এর ২০২৫ ন্যাশনাল ড্রাগ থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট-এ ভেনেজুয়েলাকে কোন কোকেন উৎপাদক দেশ হিসেবে দেখানো হয়নি। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট কাল্পনিক ’কার্টেল দে লস সোলেস’কে একটি ’বৈদেশিক টেরোরিস্ট অরগানাইজেশন’ (FTO) হিসেবে অভিযুক্ত করছে—যা নাকি মাদুরো পরিচালনা করছেন, কিন্তু যার সাথে বাস্তবে তার কোন সম্পর্ক নেই। ডিইএ-এর নথিতে এর নাম নেই, কারণ বাস্তবে এমন কোনো সংগঠনের অস্তিত্ব নেই। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ড্রাগ রিপোর্ট ২০২৫এর প্রতিবেদন বলছে, ভেনেজুয়েলায় কোনো মাদক উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান নেই। বিশ্বের অবৈধ মাদকের সবচেয়ে বড় ভোক্তা ও সংঘবদ্ধ মাদকচক্রের প্রধান কেন্দ্র ও অস্ত্র-সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র। অথচ তারাই এ নিয়ে ভেনিজুয়েলাকে অভিযুক্ত করছে!
তাহলে তাঁকে অপহরণের কারণ কি?
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ভেনিজুয়েলার সরকারকে উৎখাত তৎপর। তাঁকে একাধিকবার হত্যা ও অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছিল এবং তাঁকে ধরিয়ে দিতে ৫০ মিলিয়ন ডলার পুরষ্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।
তাঁকে অপহরণের প্রধান কারণ হচ্ছে ভেনিজুয়েলার বিপুল তেল ও খনিজ সম্পদ। বিশেষজ্ঞদের মতে ভেনিজুয়েলায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেল সম্পদের মজুদ রয়েছে। যাদের প্রমানিত তেলের রিজার্ভ প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যা রাশিয়া, আমেরিকা, কানাডা ও কুয়েতের সম্মিলিত তেলের মজুতের সমপরিমান প্রায়।
রাশিয়া বাদে বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর প্রায় সবই হয় মার্কিন সামরিক ছাতার নীচে বা তাদের অনুগত শাসকরাই ক্ষমতায়। ভেনিজুয়েলা তার বাইরে ছিল। তেল সম্পদের বলি হয়েছে ইরাক, লিবিয়া। ইরানের সরকার বিরোধী আন্দোলন উষ্কানি দেয়া হচ্ছে। রাশিয়াকেও ইউক্রেনের মাধ্যমে খন্ড-বিখন্ড করতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি। সেটা হলে বিশ্বে শক্তিসম্পদে তারা হতো নিয়ন্ত্রণহীন এক শক্তি।
কোন স্বাধীন দেশে কি এমন হামলা বৈধ?
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র কোনো স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতিকে অপহরণ করতে পারে না। তা করলে আগ্রাসন হিসেবে বিবেচিত হবে। যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও এমন হামলা চালিয়েছে। ১৯৮৯ সালে পানামায় হামলা চালিয়ে তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল নরিয়েগাকে আটক করেছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধেও ছিল একই অভিযোগ।
জাতিসংঘ সনদের ২ (৪) ধারা অনুযায়ী অন্য দেশের ভূখণ্ডে জোরপূর্বক অভিযান চালানো নিষিদ্ধ। নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বৈধ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেই কেবল তা আন্তর্জাতিকভাবে কার্যকর হয়। এক কথায় শক্তি দিয়ে এই কাজ করা গেলেও আইনের চোখে তা বৈধ নয়।
ভেনিজুয়েলার ক্ষমতায় এখন কে?
মাদুরোর ভাইস-প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ এখন ভেনিজুয়েলার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্টের আদেশে তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তার সরকারই নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত ভেনিজুয়েলার দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি আরো বলেন, বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট তাদের নীতি অনুযায়ী চলবেন। সেটা না হলে তারা সেখানে বড় ধরণের হামলা করবেন। অন্যদিকে দেলসি বলেছেন, মাদুরোই দেশটির একমাত্র বৈধ প্রেসিডেন্ট। সাংবাদিকরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেছিলেন ভেনিজুয়েলার পরবর্তি নেতা হিসেবে তিনি নোবেল জয়ী কারিনা মাচাদো ভাবছেন কিনা? তিনি উত্তরে বলেছেন, মাচাদো চমৎকার মহিলা কিন্তু নেতা হিসেবে তিনি গ্রহণযোগ্য নন।
মাদুরো অপহরণে বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া কি?
এই ঘটনায় জাতিসংঘ সনদ ও সার্বভৌমত্বের নীতি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। শক্তিধর রাষ্ট্রের একক পদক্ষেপে বিশ্বব্যবস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে। ছোট ও মাঝারি দেশগুলো অনিরাপদ হয়ে হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র বনাম রাশিয়া–চীন বলয়ে উত্তেজনা বাড়বে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলাভা বলেছেন, ভেনিজুয়েলার ভূখন্ডে বোমাবর্ষণ সে দেশের প্রেসিডেন্টকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্র সকল সীমা অতিক্রম করেছে। তিনি আরো বলেন, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ ভয়াবহ। তিনি এই বিষয়ে জাতিসংঘের জোড়ালো ও দৃঢ় ভূমিকা চান।’ কলাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রো লাতিন আমেরিকার তীব্র সামলোচনা করেছেন।
মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এক ভিডিও বার্তায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, তিনি বলেছেন, মাদুরো স্বৈরাচার, একনায়ক হলে ট্রাম্পের অধিকার নেই একটি স্বাধীন দেশে প্রবেশ করে কাউকে গ্রেফতার করার। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসও ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ট্রাম্প আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করছেন। ভেনিজুয়েলার তেল সম্পদ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে একটি গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি করছেন।’
ভেনিজুয়েলার ভবিষ্যৎ কি?
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা ঘটনায় মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান শিবিরে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। ডেমোক্র্যাট সদস্যরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ‘অসাংবিধানিক’ ও ‘একনায়কতান্ত্রিক’ বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, ট্রাম্পের অনুসারীরা একে মাদকপাচার ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক জয় হিসেবে দেখছেন। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড গতবছর অক্টোবরে এক আন্তর্জাতিক সন্মেলনে বলেছিলেন, ’মার্কিন প্রশাসন দশকের পর দশক ধরে চলা রেজিম চেঞ্জের নীতি থেকে সরে এসেছে? কিন্তু মাদুরোর এই ঘটনা তাঁর বক্তব্যের অসাড়তা প্রমাণ করেছে।
ভেনিজুয়েলায় মাদুরো বিরোধী মার্কিনপন্থী শিবিরে যেমন আনন্দ-উৎসব চলছে তার বিপরীতে দেশজুড়ে সরকারপন্থীদের চলছে তুমুল বিক্ষোভ। মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শুধু কারাকাসে নয়, আমেরিকাসহ বিশ্বের সকল দেশেই ব্যাপক প্রতিবাদ হচ্ছে। এমতাবস্থায় ভেনিজুয়েলার ভবিষ্যত কি হবে তার অনেকটা নির্ভর করছে মার্কিন নীতির ওপর। তারা কি কোন সমঝোতায় যাবে না দেশটিকে আগ্রাসন চালবে, তার ওপরই নির্ভর করছে ভেনিজুয়েলার ভবিষ্যৎ।
শান্তিপূর্ণ পথে না গিয়ে বিরোধের পথ বেছে নিলে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠবে, যা তাদের জন্য কোনভাবেই মঙ্গলজনক হবে না।
#
ড. মঞ্জুরে খোদা টরিক
লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি