সিলেট ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৪:১৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৮, ২০২৬
কূটনৈতিক প্রতিবেদক | নুক (গ্রীণল্যান্ড), ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ : ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টুস্ক, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেদেরিকসেন—এই সাত ইউরোপীয় নেতা গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছেন।
বিবৃতিটি আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা, ন্যাটোর ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার প্রতি ইউরোপের অঙ্গীকারকে নতুন করে স্পষ্ট করেছে।
আর্কটিক নিরাপত্তা: ইউরোপের কৌশলগত অগ্রাধিকার
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আর্কটিক নিরাপত্তা ইউরোপের জন্য একটি ‘মূল অগ্রাধিকার’ এবং এটি কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং আন্তর্জাতিক ও ট্রান্সআটলান্টিক নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলার কারণে নতুন নৌপথ, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ এবং সামরিক উপস্থিতির সম্ভাবনা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে অঞ্চলটি বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
ইউরোপীয় নেতারা উল্লেখ করেছেন যে, ন্যাটো ইতোমধ্যে আর্কটিক অঞ্চলকে একটি অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং ইউরোপীয় মিত্ররাষ্ট্রগুলো সেখানে তাদের উপস্থিতি, কার্যক্রম ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করছে। এর উদ্দেশ্য হলো—আর্কটিককে নিরাপদ রাখা এবং যেকোনো সম্ভাব্য হুমকি বা প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করা।
ন্যাটো, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ডেনমার্ক রাজ্য—যার অংশ হিসেবে গ্রিনল্যান্ড অন্তর্ভুক্ত—ন্যাটোর সদস্য। ফলে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা সরাসরি ন্যাটোর সামষ্টিক প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।
ইউরোপীয় নেতারা জোর দিয়ে বলেছেন, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা অবশ্যই সম্মিলিতভাবে অর্জন করতে হবে এবং তা ন্যাটোর মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমেই সম্ভব।
এই সম্মিলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতিগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং সীমান্তের অখণ্ডতা।
নেতারা বলেছেন, এসব নীতি সর্বজনীন এবং ইউরোপ এগুলো রক্ষার ক্ষেত্রে কখনো পিছপা হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অপরিহার্য অংশীদার’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ন্যাটোর মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র আর্কটিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। পাশাপাশি, ১৯৫১ সালে ডেনমার্ক রাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তির কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও সহযোগিতার আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে।
ইউরোপীয় নেতারা স্পষ্ট করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রেখেই আর্কটিক অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
গ্রিনল্যান্ডের জনগণের অধিকার
বিবৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে গ্রিনল্যান্ডের জনগণের অধিকার নিয়ে কথা বলা হয়েছে। নেতারা একবাক্যে বলেছেন, ‘গ্রিনল্যান্ড গ্রিনল্যান্ডের জনগণের।’ ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড সম্পর্কিত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একমাত্র ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডেরই রয়েছে—অন্য কোনো পক্ষের নয়।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইউরোপীয় নেতারা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ধরনের চাপ, হস্তক্ষেপ বা একতরফা দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে এবং স্থানীয় জনগণের ইচ্ছার ভিত্তিতেই যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও সম্ভাব্য তাৎপর্য
বিশ্লেষকদের মতে, এই যৌথ বিবৃতি আর্কটিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি একদিকে ন্যাটো ও ইউরোপীয় দেশগুলোর ঐক্যকে তুলে ধরেছে, অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকারের প্রশ্নে একটি সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিবৃতির মাধ্যমে ইউরোপ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আর্কটিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের শক্তি প্রদর্শন বা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্কের ধারাবাহিকতা ও পারস্পরিক নির্ভরতার কথাও নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
উপসংহার
গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে ইউরোপের শীর্ষ নেতাদের এই যৌথ বিবৃতি আর্কটিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আইন এবং আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে একটি শক্ত অবস্থানের প্রতিফলন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি