অবশ্যপাঠ্য অনুষঙ্গ: হামিদ রায়হানের হেজিমনি পলিটিকস

প্রকাশিত: ২:৪৭ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১১, ২০২৬

অবশ্যপাঠ্য অনুষঙ্গ: হামিদ রায়হানের হেজিমনি পলিটিকস

Manual2 Ad Code

গ্রন্থ রিভিউ বিষয়ক প্রতিবেদক | ঢাকা, ১১ জানুয়ারি ২০২৬ : হেজিমনি বর্তমান বিশ্বে একটি অবশ্যপাঠ্য অনুষঙ্গ, যা প্রতিনিয়ত স্পষ্টাবয়ব নিয়ে ঢুকে পড়ছে কেবল সাহিত্য নয়, একাডেমি ও নন-একাডেমি চর্চার সমস্ত কেন্দ্রবিন্দুতে। উত্তরোপনিবেশিকতা, উত্তরাধুনিকতা কিংবা নিম্নবর্গীয় শিল্প-সাহিত্য কিংবা সমাজ-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হেজিমনি কঠিনভাবে এর শেকড় বিস্তৃত করছে। রাষ্ট্র নিজেও কখনো কখনো নিজের হৈজমনিক হয়ে উঠছে। আমরা, যারা তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক, কি এর আগ্রাসি থাবা থেকে দূরে? অবশ্যই, না।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হেজিমনি যে ধরন ও অবয়ব নিয়ে উদ্ভাসিত হচ্ছে তা জাতি-রাষ্ট্রের মধ্যে এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের অসমমিতিক আন্তঃনির্ভরতা কিংবা একটি জাতির মধ্যে সামাজিক শ্রেণিগুলোর পার্থক্যগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু হেজমনি সামাজিক ক্ষমতার চেয়ে বেশি; এটা ক্ষমতা অর্জন ও বজায় রাখার একটি পদ্ধতি।

ধ্রুপদি মার্কসবাদী তত্ত্ব, অবশ্যই, সামাজিক পার্থক্যের শক্তিশালী ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে অর্থনৈতিক অবস্থানের উপর জোর দেয়। আজ, কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস শ্রমিকশ্রেণির পুঁজিবাদী শোষণ সম্পর্কে তাদের গ্রন্থ রচনা করার এক শতাব্দীরও বেশি পরে, অর্থনৈতিক বৈষম্য এখনও অন্তর্নিহিত এবং শিল্পোন্নত সমাজে সামাজিক বৈষম্য পুনরুৎপাদনে সহায়তা করে। যদিও বিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সামাজিক হেজমনির পদ্ধতিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল করে তুলেছে।

আজকের বিশ্বে, সামাজিক শ্রেণিগত পার্থক্য শুধু অর্থনৈতিক কারণ দ্বারা বা সরাসরি নির্ধারিত হয় না। এ কারণে, হেজিমনি পাঠ একান্ত জরুরি হয়ে উঠছে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ অন্যান্য অপরিহার্য অনুষঙ্গগুলো যা যাপনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে সেগুলোর সম্পর্কায়নের বিভিন্ন সহিংসতা-নির্যাতন ও শোষণে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা জরুরি নয় কি? তা না হলে কি শিল্প-সাহিত্য, কি সমাজ-সংস্কৃতি ও রাজনীতি— এগুলোর কি মূল্য যাপনের সম্পর্কগুলোতে?

বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় ‘হেজিমনি’ আর কেবল তাত্ত্বিক পরিভাষা নয়; এটি হয়ে উঠেছে আমাদের দৈনন্দিন যাপন, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও চিন্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে শুরু করে সমাজের ক্ষুদ্রতম স্তর পর্যন্ত ক্ষমতা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত, স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়— সেই জটিল প্রক্রিয়াকেই হেজিমনি ধারণা উন্মোচন করে। এই প্রেক্ষাপটে গবেষক ও চিন্তক হামিদ রায়হানের গ্রন্থ হেজিমনি পলিটিকস সময়োপযোগী ও জরুরি এক পাঠ।

বইটি কেবল রাজনৈতিক তত্ত্বের পুনরাবৃত্তি নয়; বরং উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে ক্ষমতার দৃশ্যমান ও অদৃশ্য বিন্যাসকে বিশ্লেষণের একটি সমালোচনামূলক কাঠামো হাজির করে। লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে হেজমনি আজ সাহিত্য, একাডেমিক চর্চা, গণমাধ্যম, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে নীরবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে উঠছে।

হেজমনি: ক্ষমতার চেয়েও বেশি কিছু

Manual2 Ad Code

ধ্রুপদি মার্কসবাদ যেখানে অর্থনৈতিক শ্রেণি ও উৎপাদন সম্পর্ককে সামাজিক বৈষম্যের মূল নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেখানে হেজিমনি পলিটিকস দেখায়— আধুনিক বিশ্বে ক্ষমতা কেবল অর্থনৈতিক বলপ্রয়োগে টিকে থাকে না। বরং সম্মতি উৎপাদন, সাংস্কৃতিক প্রভাব, জ্ঞান নিয়ন্ত্রণ এবং ভাষার রাজনীতির মধ্য দিয়েই ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের সময় থেকে এক শতাব্দীরও বেশি পেরিয়ে এলেও শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য রয়ে গেছে। তবে বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, গণমাধ্যমের বিস্তার এবং তথ্যপ্রবাহ সামাজিক হেজমনির রূপকে আগের চেয়ে বহুগুণ জটিল করে তুলেছে। লেখক এই জটিলতার ভেতর দিয়ে হেজমনিকে কেবল একটি ধারণা নয়, বরং একটি কার্যকর রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

তৃতীয় বিশ্বের বাস্তবতায় হেজমনি

গ্রন্থটির অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো তৃতীয় বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে হেজমনি তত্ত্বের সংযোগ। রাষ্ট্র নিজেই কখনো কখনো কীভাবে হেজমনিক শক্তিতে রূপ নেয়, কীভাবে নাগরিকরা সেই আধিপত্যকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেয়— এই প্রশ্নগুলো বইটির কেন্দ্রে রয়েছে।
লেখক দেখিয়েছেন, জাতি-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অসম আন্তঃনির্ভরতা কীভাবে বৈশ্বিক হেজমনিকে শক্তিশালী করে। একই সঙ্গে একটি জাতির ভেতরে সামাজিক শ্রেণিগুলোর পার্থক্য, লিঙ্গ, জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও ভাষার রাজনীতি কীভাবে ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে ওঠে— তার বিশ্লেষণও বইটিকে সমকালীন ও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।

Manual1 Ad Code

শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে হেজমনির পাঠ

Manual2 Ad Code

হেজিমনি পলিটিকস শুধু রাজনৈতিক গবেষণার গ্রন্থ নয়; এটি শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির পাঠেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। লেখক প্রশ্ন তুলেছেন— যদি আমরা হেজমনির কার্যপ্রণালি না বুঝি, তবে শিল্প-সাহিত্য, সমাজ-সংস্কৃতি ও রাজনীতির সঙ্গে আমাদের যাপনের সম্পর্ক কীভাবে অর্থবহ হবে?
এই প্রশ্নের মধ্য দিয়েই বইটি পাঠককে আত্মসমালোচনার দিকে নিয়ে যায়। কোন ভাষা আমরা ব্যবহার করছি, কোন বয়ানকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করছি, কোন ইতিহাসকে প্রান্তিক করে রাখছি— এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়েই হেজমনির বিরুদ্ধে সচেতন প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে বলে লেখক ইঙ্গিত দিয়েছেন।

Manual4 Ad Code

একটি জরুরি পাঠ

রাজনৈতিক গবেষণা ও প্রবন্ধধর্মী এই গ্রন্থটি শিক্ষার্থী, গবেষক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সচেতন পাঠকের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সহজবোধ্য ভাষায় জটিল তত্ত্ব উপস্থাপন এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে বৈশ্বিক তত্ত্বের সংযোগ বইটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

বইয়ের নাম: হেজিমনি পলিটিকস
লেখক: হামিদ রায়হান
জনরা: রাজনৈতিক গবেষণা ও প্রবন্ধ
মুদ্রিত মূল্য: ৪৮০ টাকা
ধী বিক্রয় মূল্য: ৩৪০ টাকা

সময়ের দাবি অনুযায়ী হেজমনিকে বোঝার, প্রশ্ন করার এবং চিন্তার পরিসর প্রসারিত করার ক্ষেত্রে হেজিমনি পলিটিকস নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

অর্ডার করতে ইনবক্স করুন m.me/dheebooks অথবা ফোন করুন 01537-371856

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ