অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় হাজারো গ্রেপ্তার, হচ্ছে না জামিন

প্রকাশিত: ১১:১২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় হাজারো গ্রেপ্তার, হচ্ছে না জামিন

Manual1 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : গুমের ব্যাপকতাসহ ভয়ভীতি ও দমন–পীড়নের সংস্কৃতি অনেকাংশে বন্ধ হয়েছে বলে মনে করা হলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিবেচনায় হাজারো মানুষকে নির্বিচার আটক করেছে। বিচারহীন অবস্থায় আটকে থাকা এসব ব্যক্তির জামিন নিয়মিতভাবে নাকচ করা হচ্ছে।

নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৬–এ এ কথা বলা হয়েছে।

আজ বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মানবাধিকার সংস্কার বাস্তবায়নে হিমশিম খাচ্ছে। ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে।

Manual8 Ad Code

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

এইচআরডব্লিউ বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বাইরের গোষ্ঠীর মব ভায়োলেন্স (উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ সহিংসতা) উদ্বেগজনক বৃদ্ধি। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে নারী অধিকার ও এলজিবিটিবিরোধী কট্টরপন্থীরা।

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ আগস্টের মধ্যে গণপিটুনিতে কমপক্ষে ১২৪ জন নিহত হয়েছেন।

গণগ্রেপ্তার ও হেফাজতে মৃত্যু

Manual8 Ad Code

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নির্বিচার আটকের ধারা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে মামলায় অজ্ঞাতনামা হিসেবে কয়েক শ ব্যক্তিকে আসামি করার চর্চাও রয়েছে।

বর্তমানে আওয়ামী লীগের শত শত নেতা, কর্মী ও সমর্থক হত্যা মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে কারাবন্দী রয়েছেন। বিচারহীন অবস্থায় আটকে থাকা এসব ব্যক্তির জামিন নিয়মিতভাবে নাকচ করা হচ্ছে। এই তালিকায় অভিনেতা, আইনজীবী, গায়ক ও রাজনৈতিক কর্মীরাও রয়েছেন।

গত বছর শুরু হওয়া ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামের অভিযানে কমপক্ষে ৮ হাজার ৬০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া ভিন্নমত দমনে অতীতে ব্যবহৃত কঠোর বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আরও অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে চব্বিশের আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশের পর নিরাপত্তা বাহিনী এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতায় পাঁচজন নিহত হন।

পরে পুলিশ সন্দেহভাজন কয়েক শ আওয়ামী লীগ সমর্থককে নির্বিচার আটক করে এবং ৮ হাজার ৪০০ জনের বেশি (যাঁদের অধিকাংশ অজ্ঞাতনামা) মানুষের বিরুদ্ধে ১০টি হত্যা মামলা দায়ের করে। তবে সরকার ‘গণগ্রেপ্তার’ চালানোর বিষয়টি অস্বীকার করেছে।

মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর অক্টোবর মাসের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এইচআরডব্লিউ বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কমপক্ষে ৪০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৪ জন নির্যাতনে মারা গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতায় এ পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার মানুষ আহত এবং ৮১ জন নিহত হয়েছেন।

মতপ্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা

সন্ত্রাসবিরোধী আইনের নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে পাওয়া ক্ষমতা ব্যবহার করে গত বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগকে ‘সাময়িকভাবে’ নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দেয় সরকার। এই নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে অন্যান্য বিধিনিষেধের মধ্যে দলটির সভা-সমাবেশ, প্রকাশনা এবং দলটির সমর্থনে অনলাইন বক্তব্য প্রচারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

২০২৫ সালে সাংবাদিকদের ওপর অসংখ্য হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার অধিকাংশই ঘটিয়েছে রাজনৈতিক দলের কর্মী ও সহিংস জনতা (মব)। এ ছাড়া ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ দেওয়ার অভিযোগে সাধারণ মানুষের দায়ের করা মামলায় লেখক ও সাহিত্যিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধির আওতায় মামলা নিয়েছে পুলিশ ও আদালত।

অন্যদিকে সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর অন্যায্য বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ করে দিচ্ছে। এই আইনের মাধ্যমে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’সহ বিভিন্ন অভিযোগে রাজনৈতিক সমালোচকদের অপরাধী সাব্যস্ত করা এবং কারাগারে পাঠানোর ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কর্মকর্তাদের।

গত বছরের মার্চ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইনের ৯টি ধারা বাতিলে সংশোধনী আনে। তবে এই সংশোধনীর পরও আইনে এমন কিছু বিধান রয়ে গেছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ নয়।

বিগত সরকারের বিচার

এইচআরডব্লিউ বলেছে, শেখ হাসিনা সরকার উৎখাতের আন্দোলনের সময় পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল বলে ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ওই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন মানুষ নিহত হন।

তবে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রগতি সীমিত। জুলাই মাসে বাংলাদেশ পুলিশের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে জানান, ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে ভূমিকার জন্য মাত্র ৬০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুরুতর অপরাধগুলোর বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে (আইসিটি) বেছে নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর আগে দেশীয় এই আদালতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা হয়েছিল।

গত নভেম্বরে এই ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে তাঁদের অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। গ্রেপ্তার থাকা একজন সাবেক পুলিশ প্রধান প্রসিকিউশনের পক্ষে সাক্ষ্য দিলে (রাজসাক্ষী) তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এই ট্রাইব্যুনালের বিচারিক মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করে কিছুটা উন্নতি করলেও এতে গুরুত্বপূর্ণ যথাযথ আইনি সুরক্ষার অভাব রয়েছে। যেমন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী হওয়া সত্ত্বেও এতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রাখা হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক সংগঠনের বিচার ও বিলুপ্ত করার ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এই ট্রাইব্যুনালকে।

এদিকে আওয়ামী লীগ আমলের গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একটি কমিশন গঠন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত এই কমিশন ১ হাজার ৮৫০টির বেশি অভিযোগ পেয়েছে। এইচআরডব্লিউকে কমিশন জানিয়েছে, কমিশন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছে, কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা তথ্য নষ্ট করেছেন, সহযোগিতা সীমিত করেছেন এবং হোতাদের বিচারের মুখোমুখি করার প্রচেষ্টায় বাধা তৈরি করছেন। গত অক্টোবরে গুমের ঘটনায় জড়িত অভিযোগে ২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে কর্তৃপক্ষ।

থমকে আছে সংস্কার কার্যক্রম

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা তাঁর ১৫ বছরের শাসনামলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন, এ কাজ করতে গিয়ে তিনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে ফেলেছিলেন। ২০২৪ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ, নারী অধিকার, শ্রম অধিকার এবং সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের সুপারিশ করতে বেশ কয়েকটি কমিশন গঠন করে। পরবর্তী সময়ে সংস্কার প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত করতে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে একটি ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়।

Manual8 Ad Code

তবে রাজনৈতিক অংশীজনদের মধ্যে ঐকমত্যের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে খুব কম সংস্কারই গৃহীত বা বাস্তবায়িত হয়েছে। গত ৫ আগস্ট অধ্যাপক ইউনূস ‘জুলাই ঘোষণা’র আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন, যা পরে অক্টোবর মাসে আরও বিস্তারিতভাবে ‘জুলাই সনদ’ হিসেবে প্রকাশ করা হয়। গত নভেম্বরে অধ্যাপক ইউনূস ঘোষণা করেন, নির্বাচনের সময় সংবিধান সংস্কারের ওপর একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এর মাধ্যমে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার জুলাই সনদের অংশবিশেষ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে।

এ ছাড়া নারী নির্যাতনের ব্যাপকতা, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা এবং নতুন করে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রবেশ ও বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে তাঁদের জীবনমানের অবনতির বিষয়টি এইচআরডব্লিউর বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

Manual2 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ