আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে দার্শনিক লক্ষ্য নির্ধারণ সবচেয়ে বেশি জরুরি: প্রফেসর আব্দুল হান্নান চৌধুরী

প্রকাশিত: ৭:৫৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ২২, ২০২৬

আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে দার্শনিক লক্ষ্য নির্ধারণ সবচেয়ে বেশি জরুরি: প্রফেসর আব্দুল হান্নান চৌধুরী

Manual2 Ad Code

প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যেও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা বলেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী।

বাংলাদেশ, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৮ বছরের শিক্ষকতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। পরিসংখ্যান সম্পর্কিত ৬৫টিরও বেশি প্রবন্ধ ও দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ৭৫টিরও বেশি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন।

তিনি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার নানা অসংগতির কথা তুলে ধরে সমাধানের পথও বাতলে দিলেন। তাঁর বিশেষ এই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাকিব সিকান্দার ও নাইমুর রহমান।

১. প্রথমেই খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন—বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন এবং এর ভালো দিক এবং উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা কী কী?

—প্রথমেই বলি, স্বাধীনতার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের শিক্ষার গুণগত মানের একটি নিম্নমুখী প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করছি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়ার জন্য যে ধরনের অবকাঠামো, মানবসম্পদ এবং শিক্ষণ-পদ্ধতি প্রয়োজন, রাষ্ট্র হিসেবে আমরা তা যথাযথভাবে গড়ে তুলতে পারিনি। শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে যাকে আমরা ‘সার্ভিস ডেলিভারি’ বলি, সেই সেবাটিই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।

Manual2 Ad Code

টিচিং ও লার্নিং মেথডে ঘাটতি রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসামঞ্জস্য শিক্ষাব্যবস্থা। আমাদের দেশে একদিকে বাংলা মাধ্যম, অন্যদিকে ইংরেজি মাধ্যম, আবার কোথাও বাংলা ও ইংরেজির মিশ্র মাধ্যম। এর পাশাপাশি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে, আবার কারিগরি শিক্ষাও আছে।

Manual3 Ad Code

এই প্রতিটি ধারার মধ্যেই শিক্ষাদানে বিভিন্ন ঘাটতি বিদ্যমান। ফলে একজন শিক্ষার্থীর যে ধরনের মানসিক সক্ষমতা বা মেন্টাল অ্যাপটিচিউড লেভেল তৈরি হওয়া দরকার, তা বিভিন্ন ধারার শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমভাবে গড়ে ওঠে না। সব মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় এক ধরনের অসামঞ্জস্য বা ‘গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে। তবে ইতিবাচক দিকও আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে দার্শনিক লক্ষ্য নির্ধারণ সবচেয়ে বেশি জরুরি রয়েছে।
আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজেদের সক্ষমতা দিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। এখানে বৈচিত্র্য আছে, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকে আসা শিক্ষার্থীরা ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও চিন্তার ভুবন নিয়ে শিক্ষাজগতে প্রবেশ করে। এই বৈচিত্র্যকে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায় এবং উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে তাদের মধ্যে একটি সমন্বিত বিশ্লেষণধর্মী মানসিকতা তৈরি করা যায়, তাহলে সেটিই ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে।

২. এই ‘গ্যাপ’টা কোথায় হচ্ছে?

—বিশেষ করে, অষ্টম শ্রেণি থেকে নিচের স্তরে বড় ধরনের একটি গ্যাপ তৈরি হচ্ছে। ভাষাভিত্তিক জ্ঞানের ঘাটতি ও স্টেম-ভিত্তিক (সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যাথমেটিকস) সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা না থাকায় এমনটি হচ্ছে।

আজকের বিশ্বে এই চারটি বিষয় সমন্বিতভাবে শেখানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি যেকোনো শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই সম্ভব। এমনকি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেও। কিন্তু বাস্তবে আমরা সেই অবকাঠামো ও প্রস্তুতি তৈরি করতে পারিনি। ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কিন্তু তার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গণিতের শিক্ষাও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এখানে বড় সমস্যা হলো—সব বিষয়ে পর্যাপ্ত ও দক্ষ শিক্ষক আমরা দিতে পারছি না। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সনদ থাকলেও শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ নেই। অথচ একজন শিশুর শিক্ষাজীবনের শুরুতেই যদি তাকে অযোগ্য শিক্ষকের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তাহলে তার শেখার আগ্রহ ও বুদ্ধিবিকাশে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই কারণেই বলা যায়, প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক এবং মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা—সব স্তরেই আমরা এক ধরনের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে অবস্থান করছি। যদি আমরা সব ধারার শিক্ষাব্যবস্থাকে সঠিকভাবে সহায়তা করতে পারি, তাহলে আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব। তবে এটি কখনোই পাঁচ বা দশ বছরে সম্ভব নয়। এজন্য অবকাঠামোগত, প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক এবং মানবসম্পদ সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত বিনিয়োগ প্রয়োজন।

বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সুদীর্ঘ সময়ের শিক্ষকতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা রয়েছে আপনার। আপনি সেখানে যা দেখেছেন, সেই বাস্তবতার আলোকে যদি সংক্ষেপে বলতেন, আমাদের আর তাদের মৌলিক পার্থক্যটা আসলে কোথায়?

—সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে আমরা এখনো বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছি। উন্নত দেশগুলোতে একটি শিশুকে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মধ্যে দিয়ে এগিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে শিক্ষাব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় হলেও একটি কাঠামোগত ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। সেসব দেশে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও আছে। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই শিক্ষণ-পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরনের ভ্যালু অ্যাডিশন করা হয়। শিক্ষাক্রম অনেক ক্ষেত্রেই সেমি-স্ট্রকচারড, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীনতা দেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত পাঠ্যবই থাকলেও একটি দেশের সব শিক্ষার্থী একই বই পড়ে না। বইয়ের মধ্যে ভিন্নতা থাকে। এই ভিন্নতা শিক্ষার্থীদের চিন্তাভাবনায় বৈচিত্র্য তৈরি করে। বাংলাদেশেও আমি এই ধরনের বৈচিত্র্য দেখতে চাই।

৩. বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীর বিজ্ঞান বা গণিতের জ্ঞান কেন ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীর চেয়ে কম হবে? আবার ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা কেন নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে কম জানবে? আমরা ব্যবস্থা করে রেখেছি যে প্রকৌশল পড়ার জন্য শুধু পদার্থবিজ্ঞান আর গণিতের জ্ঞানই যথেষ্ট। আবার মেডিক্যালের জন্য জীববিজ্ঞান ও রসায়ন। এসব ভুল পদ্ধতি।

৪. টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি ও কিউএস র্যাংকিংয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ঈর্ষণীয়। আপনি এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কোথায় নিয়ে যেতে চান?

—নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় তার ৩৫ বছরের সফরে বাংলাদেশের সব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে গুণগত মানে পেছনে ফেলেছে। আমি সুদীর্ঘ ২০ বছর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যখন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে ফেরত আসি, সেখানে আমার ১৫-১৬ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে যোগ দিই। এই বিজনেস স্কুলটাকেই সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছি। আজকের যে বিজনেস স্কুল সেখানে আমি তিনবার ডিন ছিলাম, সবচেয়ে লম্বা সময় বিবিএর পরিচালক ছিলাম, দীর্ঘতম সময় এই বিজনেস স্কুলটা চালিয়েছি। সেই বিজনেস স্কুল আজ পৃথিবীর লাখ লাখ বিজনেস স্কুলের মধ্যে সেরা ৬০০টির মধ্যে চলে এসেছে।

একজন উপাচার্য হিসেবে বলব, এ বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা বিশ্বমানের সঙ্গে তুলনা করেই চিন্তা করি। আশা করছি, বিজনেস স্কুল হিসেবে এটি আগামী বছর পৃথিবীর সেরার স্বীকৃতি পাবে। আমাদের প্রাথমিক টার্গেট, নর্থ সাউথকে এশিয়ার টপ-১০০-এ নিয়ে যাওয়া।

৫. বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটা পরীক্ষার ফলাফল ও জিপিএ-কেন্দ্রিক। এটা শিক্ষার মানের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে?

—আমরা যেভাবে জিপিএ-সিজিপিএ দিয়ে শিক্ষার্থীদের বিবেচনা করি, তা উন্নত দেশে নেই; বরং তারা সফল কি না, তাদের কাজ প্রভাব সৃষ্টি করছে কি না, সমাজে তার অবদান কেমন ইত্যাদি দেখে। আমাদের সব আটকে গেছে গোল্ডেন জিপিএর মধ্যে। কখনোই এটা বলা উচিত না যে কোনো স্কুলের শতভাগ শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করেছে বলেই ওই স্কুলটা ভালো। এভাবেই আমরা বৈষম্য সৃষ্টি করেছি। এতে ইনস্টিটিউশনাল ইগো তৈরি হচ্ছে। ফলে আমরা খারাপ আখ্যা দিয়ে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আলাদা করে ফেলছি এবং সেই শিক্ষার্থীরাও বঞ্চিত হচ্ছে। মূলত পরিবার, স্কুল, প্রতিষ্ঠান এবং সার্বিকভাবে রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার দর্শনে সমস্যা রয়েছে। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—শিক্ষাক্ষেত্রের দার্শনিক লক্ষ্য নির্ধারণ। আধুনিক বিশ্বে কোথাও এসএসসি, এইচএসসি বা কোনো লেভেলে রেজাল্ট নিয়ে কোনো উৎসব দেখা যায় না। দশম বা দ্বাদশ শ্রেণির ফলাফল প্রকাশের দিন ভালো ফলাফল অর্জনকারীদের ঘিরে পুরো জাতি একটা উৎসব মেজাজে থাকে। ঠিক সেই দিনটিতে খারাপ রেজাল্ট করা শিক্ষার্থীরা মারাত্মকভাবে ডিমোরালাইজড হয়। ওই দিনটিতেই প্রধানশিক্ষক থেকে শুরু করে অভিভাবকরা মিলে শিক্ষার্থীদের বিশাল এক অংশের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে। এসব আচরণের অবসান দরকার। ফলাফলটা আমরা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে যেন ফেলে না দিই। এটা যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিয়ে কাঁচি দিয়ে কাটতে হবে, রেজাল্টের বই হাতে নিয়ে মন্ত্রীর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে—এই সিরেমোনিয়াল পার্টগুলো তুলে দিতে হবে।

৬. প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করলেও অনেকেই চাকরি পাচ্ছেন না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে কর্মবাজারের সংগতি কি নেই?

—বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের সর্বশেষ ডিগ্রির পরে তাকে জব সিকিং এলিমেন্ট হিসেবে দেখা হয়। যেন সে শিক্ষা অর্জন করেছেই চাকরির জন্য। বাংলাদেশে এখন যে পরিমাণ গ্র্যাজুয়েট প্রতিবছর বের হচ্ছে, সে পরিমাণ চাকরি বাংলাদেশে কোনো দিনই আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছরে প্রস্তুত হবে না। আমাদের শিল্পক্ষেত্র বা অর্থনীতি এত ফুলে-ফেঁপে ওঠেনি। শিক্ষা কার্যক্রমে দক্ষতার জ্ঞান ও উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার মনোভাব যোগ করতে হবে। যেন বাচ্চারা বেরিয়ে নিজে কিছু করতে পারে, তার দক্ষতা যা আছে তা দিয়েই সে এগিয়ে যাবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন যে ভাষার জন্য বিভিন্ন ইনস্টিটিউশন করতে হবে। এটা যুগপৎ সিদ্ধান্ত। আমি বলব, কারো ভাষাজ্ঞান যখন বেশি থাকে তখন আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারে তার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তা ছাড়া তাদের ভাবতে হবে বা সুযোগ দিতে হবে যে তারা নিজেরা চাকরিপ্রার্থী নয়, চাকরিদাতা হয়ে উঠবে।

৭. ‘ডিগ্রি উৎপাদন’ হচ্ছে; কিন্তু দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে না। এ বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?

—আমাদের দেশে সব বিশ্ববিদ্যালয় এক মানের না। বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও গুণগত মানসম্পন্ন এবং মানহীন রয়েছে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও তা-ই। এক ধরনের প্রশস্ত ফাঁক রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে। যোগ্য শিক্ষক-কারিকুলাম, এমনকি যোগ্য ছাত্র না থাকলে কখনো ভালো গ্র্যাজুয়েট বেরোবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যকার এই গ্যাপ ঠিক করা না গেলে কখনোই সেরা প্রোডাক্ট পাওয়া যাবে না।

৮. দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ও উদ্ভাবনের সংস্কৃতি এখনো সীমিত। এটি বাড়াতে কী ধরনের নীতি বা উদ্যোগ দরকার?

Manual1 Ad Code

—এটা না হওয়ার পেছনে দায়ী—এক. রাষ্ট্রীয় অসহযোগিতা, দুই. প্রাতিষ্ঠানিক ওরিয়েন্টেশন অ্যান্ড গোল। এ দুই জায়গাতেই বিফল হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা। রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করতে হবে, কোন কোন ক্ষেত্রে গবেষণার জন্য কোন কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সাপোর্ট দেবে। এটা যদি সবাইকে গড়পরতা দেয় তাহলে কিন্তু হবে না। কারণ গবেষণা এগোনোর জন্য সবচেয়ে বড় উপকরণ মানবসম্পদ। যার কাছে সেরা মানবসম্পদ আছে, কোনো বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানে তাকে ওই জায়গাতেই গবেষণায় ফান্ড দেওয়া উচিত। এ কাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। তাদের মধ্যে সমন্বয় রাখতে হবে। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল হচ্ছে সায়েন্স ফ্যাকাল্টি। সেখানে বায়োলজি-কেমিস্ট্রি-ফিজিকসের যে রিসার্চগুলো হয় তার সঙ্গে ঢাকা মেডিক্যাল, বারডেম বা পিজি হাসপাতালের কোনো যোগাযোগ নেই। বাংলাদেশ গবেষণার জন্য এখনো ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারেনি।

Manual1 Ad Code

৯. ডিজিটাল প্রযুক্তি ও এআইয়ের যুগে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কিভাবে পরিবর্তিত হওয়া উচিত? এআই উন্মুক্ত, এখানে শিক্ষার্থীদের করণীয় কী?

—প্রযুক্তি কিন্তু তৈরি হয় ভালোর জন্য। তবে নেতিবাচক দিকও আছে। আমরা কখনোই বলব না যে এআই ইজ ব্যাড। কিন্তু এর বাজে প্রভাব যেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না পড়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমরা বলি এআই বিষয়ে স্টেটমেন্ট তৈরি করতে—এআই দিয়ে কী করা যাবে বা যাবে না তা ঠিক করা খুবই জরুরি হয়ে গেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য। এখানে প্রযুক্তি দিয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার ঠেকাতে হবে। বিশ্লেষণধর্মী অংশে এআইয়ের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। কারণ মানুষ ম্যানুয়ালি অনেক কিছু করতে পারে না; কিন্তু যন্ত্র অনেক কিছুই দ্রুত সময়ে পারে। এটি আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা। প্রযুক্তির অগ্রগতি সত্যিই গবেষকদের লাখ লাখ এবং কোটি কোটি তথ্য বিশ্লেষণ করে খুব দ্রুত ফলাফল দিতে বা সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। কিন্তু সৃষ্টিশীল বিষয়ে এআই পরিত্যাজ্য। উদ্ভাবনী চিন্তা বা সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে চিন্তার যোগ্যতা দেখাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেক ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার করা যেতে পারে অ্যানালিটিক্যাল পার্টে। এআই দিয়ে ক্রিয়েটিভ থিংকিং বা শিক্ষার্থীদের মেধাশক্তির বিচার সম্ভব নয়।

১০. সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ারের পাশাপাশি সুনাগরিক বা ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন ধরনের ভূমিকা থাকতে পারে?

—প্রত্যেকটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মোটোর মধ্যে থাকা উচিত যে সে কি ধরনের গ্র্যাজুয়েট তৈরি করবে। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই থাকতে হবে এথিক্যাল, মোরাল এবং ইন্টিগ্রিটি ডিভোশন এবং সর্বোপরি প্রত্যেক গ্র্যাজুয়েট গুড হিউম্যান বিয়িং হবে। সভ্য সমাজ গড়ে না উঠলে একটা সভ্য রাষ্ট্র গড়ে উঠবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আদর্শিক জায়গায় থেকে ছাত্র-ছাত্রীর নৈতিক দিকটা বিবেচনা করতে হবে। তার মধ্যে থট লিডারশিপ আসবে।

১১. শিক্ষায় নীতি-নির্ধারকদের জন্য আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কী?

—নীতিনির্ধারক যাঁরা আছেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যদি আমি সার্বিকভাবে বলি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ এর অধীনে যতগুলো উইং আছে, হোক তা ইউজিসি, ঢাকা বোর্ড, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ইত্যাদি, সবগুলোর মধ্যে এক ধরনের ‘ফ্রি ফ্লো ইনফরমেশন ডেসিমিনেশন’র ব্যবস্থা থাকতে হবে। মন্ত্রণালয়কে সবসময় স্টেকহোল্ডার বডির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এটা করতে হবে। চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

১২. বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) আরো শক্তিশালী বা দায়িত্বশীল হতে কোনো সংস্কার গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি না?

—প্রতিবছর উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থী বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। তাদের ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট করতে হবে। আমাদের কিন্তু শিক্ষার্থীর তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কম। সুতরাং তা বাড়াতে হবে। তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া একটা বিলম্বিত প্রক্রিয়া। এখানে পরিবর্তন আনা জরুরি।

১৩. বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

—শুধু ক্লাসরুমে যে জ্ঞান পাওয়া যায়, তার ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না। বর্তমান বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডার অনেক বিস্তৃত। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন এক্সট্রা কারিকুলার কার্যক্রমে যুক্ত থাকতে হবে। এতে নেতৃত্বের দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করার ক্ষমতা এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরি হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা। একজন গ্র্যাজুয়েটের মধ্যে নৈতিকতা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ থাকা জরুরি। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সভ্য সমাজ গড়ে ওঠে ভালো মানুষের মাধ্যমে।

১৪. আপনি নামকরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন। সেখানকার কোন বিষয়টা আপনাকে আক্ষেপে ফেলেছিল—এমন কোনো ঘটনা আছে কি?

—সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থাকাকালীন আরো উচ্চশিক্ষার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা শহর আমেরিকার বোস্টনে পড়াশোনার সুযোগ পাই আমি। সেখানে পৃথিবীর আরো দশটা বড় বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছি আমার আশপাশে। দেখেছি, আমি নিজেই বাংলাদেশে শিক্ষক ছিলাম; কিন্তু একটা বঞ্চিত পিছিয়ে পড়া তরুণ-তরুণীর কথা খুব ভাবিনি যে সামাজিকভাবে পেছনে থাকা সেই মানুষটাকে কিভাবে এখানে আনা যায়? কিন্তু ওই দেশে এই ভাবনাটা আছে। আবার স্পেশাল চাইল্ডদের জন্য উন্নত দেশগুলোতে যে পরিমাণ শিক্ষার সুযোগ রেখেছে, তা আমাকে অভিভূত করেছে। আমি সেই জিনিসটা নর্থ সাউথে করার চেষ্টা করছি।

১৫. গেল বছর টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমিক সামিটে ছিলেন আপনি। সেখানে কি অ্যাকাডেমিশিয়ানদের মাঝে অভিজ্ঞতা বা জ্ঞানের আদান-প্রদান হয়, তা বাস্তবায়নের চেষ্টা কি আপনারা করেন?

—আমার এই ৩৮ বছরের ক্যারিয়ারে, বিশেষ করে গত ২০ বছর আমার জীবনের সবচেয়ে ব্লেসড মেসেজ হচ্ছে যে পৃথিবীর প্রায় ৫০টা দেশের এক শর বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রিত অতিথি ছিলাম আমি। এই সুযোগ আমাকে উন্নত বিশ্বের নানা সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। এতে আমি অল্টারনেটিভ থিংকিংয়ের সুযোগ পেয়েছি। সেখানে শুধু র্যাংকিং নিয়ে নয়, বরং গুণগত মান-গবেষণা-জ্ঞান নিয়ে আলোচনা হয়। কিছুদিন আগে চায়নার টপ জিংওয়া ইউনিভার্সিটিতে গেছি। সেখানে জানলাম, তাদের ইউনিভার্সিটিতে মেডিক্যালে ভর্তির পদ্ধতি পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছে তারা। তারা বলছে, মেডিক্যালে পড়তে হলে আগে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি লাগবে। ভাবা যায়! এই ধারণার কথা যদি বাংলাদেশে বলি, তাহলে সবাই কী বলবে? আমি দেখলাম এটা খুবই যৌক্তিক এই অর্থে যে আজকের চিকিৎসাব্যবস্থা যন্ত্র-নির্ভর হয়ে যাচ্ছে। ডাক্তারদের এখন মেশিন ড্রিভেন ডিসিশন দিতে হয়। এমআরআই, সিটি স্ক্যান, এক্স-রে, ইকো এ সব রিপোর্টই যন্ত্র দিচ্ছে। একজন ডাক্তারের আবিষ্কৃত ওষুধের প্রয়োগ বা পরীক্ষার জন্য যে ধরনের যন্ত্র প্রয়োজন তা যদি তিনি নিজেই বানাতে পারেন, তবে সেটাই সর্বোচ্চ ফল বয়ে আনবে। কাজেই একজন প্রকৌশলীকে যখন ডাক্তারি পড়ানো হবে, তখন তিনি বুঝবেন তার বানানো মেশিনটাকে আরো কার্যকর বানাতে করণীয় কী। বাংলাদেশে চিকিৎসা শিক্ষাকে এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দেওয়া হয়নি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি মেডিক্যাল উইংস আছে, অথচ ওটা একটা লিবারেল আর্টস ইউনিভার্সিটি ছিল। এ কারণে সেখানকার গবেষণায় ঠিকই একটা ওষুধ আবিষ্কার হয়, চিকিৎসা যন্ত্র আবিষ্কার হয়। আমি বলি, সুযোগটা থাকতে হবে। আমাদের দেশে এসএসসি আর এইচএসসির রেজাল্ট খারাপ করলে সে বুয়েটে যেতে পারে না, অথবা ঢাকা মেডিক্যালে যেতে পারে না। তার মানে আমাদের সত্যিকারের সমস্যা আছে এই শিক্ষাব্যবস্থায়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ