ইটাকুমারীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রকাশিত: ১০:৫১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৬, ২০২৬

ইটাকুমারীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য

Manual5 Ad Code

অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী |

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ প্রবন্ধের শুরুতেই লিখেছেন – ভারতবর্ষের যে ইতিহাস আমরা পড়ি এবং মুখস্থ করিয়া পরীক্ষা দিই, তাহা ভারতবর্ষের নিশীতকালের একটা দু:স্বপ্ন কাহিনীমাত্র। কোথা হইতে কাহারা আসিল, কাটাকাটি মারামারি পড়িয়া গেল, বাপে-ছেলেয় ভাইয়ে-ভাইয়ে সিংহাসন লইয়া টানাটানি চলিতে লাগিল, এক দল যদি বা যায় কোথা হইতে আর এক- দল উঠিয়া পড়ে- পাঠান, মোগল, পর্তুগিজ, ফরাসি, ইংরেজ সকলে মিলিয়া এই স্বপ্নকে উত্তরোত্তর জটিল করিয়া তুলিয়াছে। কিন্তু এই রক্তবর্ণে রঞ্জিত পরিবর্তমান স্বপ্নদৃশ্যপটের দ্বারা ভারতবর্ষকে আচ্ছন্ন করিয়া দেখিলে যথার্থ ভারতবর্ষকে দেখা হয় না।ভারতবাসী কোথায়, এসকল ইতিহাস তাহার কোন উত্তর দেয় না। যেন ভারতবাসী নাই, কেবল যাহারা কাটাকাটি খুনাখুনি করিয়াছে তাহারাই আছে।’
যথার্থই বলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আমরা যারা ইতিহাস পড়ি,পড়াই এবং লেখালেখি করি; কবি- লেখক-সাহিত্যিক- গবেষক তাদের আমরা প্রায় সবাই রবীন্দ্রনাথ বর্ণিত ওই স্বপ্নদৃশ্যপটে আচ্ছন্ন। একারণেই অবিভক্ত বঙ্গদেশের বহুমাত্রিক গৌরবময় ইতিহাস অন্ধকারে ডুবে গেছে। আস্তরণে ঢাকা পড়েছে ঐতিহাসিক হেরিটেজ ‘ইটাকুমারীর” ইতিহাস।বিলুপ্তপ্রায় ইতিহাসের কালের সাক্ষী ইটাকুমারীর প্রত্নরূপ “শিবচন্দ্র রায়ের রাজবাড়ি।”

রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলার ইটাকুমারী গ্রাম।সব মিলে ইটাকুমারী খুব সাধারণ এক গ্রাম। তবে ইটাকুমারীর অসাধারণত্ব অন্যখানে। ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ জনপদ ছিল এককালের ফতেপুর চাকলার ইটাকুমারী। তৎকালিন অবিভক্ত বঙ্গদেশে ‘দ্বিতীয় নবদ্বীপ হিসেবে’ ইটাকুমারীর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতবর্ষের নানাপ্রান্তে। ইটাকুমারীর পল্লীতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের বহু অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীরা এখানে অধ্যাপনা, পড়ালেখার কাজে যুক্ত ছিলেন। ভারতবর্ষের প্রখ্যাত পন্ডিত, সংগঠক, লেখক গবেষক যাদবেশ্বর তর্করত্ন ছিলেন ইটাকুমারীর সন্তান।
যাদবেশ্বর তর্করত্ন রংপুরে স্থাপিত (রংপুর জেলা স্কুলে) কলেজের অধ্যাপকের পেশায় যুক্ত ছিলেন। কিছুদিন পর কলেজটি বন্ধ হলে রংপুরে শ্রীকৃষ্ণধন ঘোষ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত চতুষ্পঠীতে তিনি অধ্যাপনা শুরু করেন।যাদবেশ্বর তর্করত্নের ছিল অসীম সাংগঠনিক দক্ষতা।
তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের রংপুর শাখার স্থপতি এবং সেই শাখার সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন।

Manual1 Ad Code

চলবে।

ইটাকুমারী : বিস্মৃত আলোর উপাখ্যান
—সৈয়দ আমিরুজ্জামান

রাতের গভীর ইতিহাসে রক্তরঙা ছাপ,
রাজদণ্ডের টানাটানিতে মুছে গেছে স্বপ্নতাপ,
সিংহাসনের লোভে যারা লিখেছে দিনের নাম,
তাদের কাহিনীতে ঢাকা মানুষেরই গ্রাম।

রবির কণ্ঠে উচ্চারিত সেই পুরোনো বাণী—
ইতিহাসের অন্ধকারে হারায় সত্যখানি,
যেখানে নেই জনজীবন, নেই মাটির গান,
শুধু যুদ্ধ, হানাহানি, ক্ষমতারই টান।

তবু কোথাও মাটির নিচে জেগে থাকে আলো,
নিভে গিয়ে আবার জ্বলে অতীতেরই ভালো,
তেমনি এক গ্রাম জেগে আছে স্মৃতির গভীরী—
রংপুর জেলার পল্লীগ্রাম, নাম তার ইটাকুমারী।

দেখতে সাদামাটা, ধুলো-মাখা পথ,
ধানের শীষে দুলে ওঠে জীবনেরই রথ,
কিন্তু তারই বুকের ভেতর গোপন ইতিহাস,
গৌরবময় দিনগুলোর অমলিন প্রকাশ।

Manual4 Ad Code

ফতেপুরের চাকলার মাঝে ছিল তার স্থান,
জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়ত দূর দেশ অবধি জ্ঞান,
‘দ্বিতীয় নবদ্বীপ’ নামে ছিল যার পরিচয়,
পণ্ডিত, ছাত্র, বিদ্যাপীঠে ভরেছিল সেইময়।

ভারতবর্ষের নানা প্রান্ত থেকে আগমন,
জ্ঞানপিপাসু মানুষেরা করত সাধনা-মন,
শাস্ত্রপাঠ, তর্ক-বিতর্ক, বেদ-উপনিষদ,
ইটাকুমারীর আকাশজুড়ে উঠত জ্ঞানের রোদ।

যাদবেশ্বর তর্করত্ন, জ্ঞানের দীপশিখা,
এই মাটিতে জন্ম নিয়ে আলোক করলেন দীক্ষা,
সংগঠনের দৃঢ় হাতে গড়লেন নতুন পথ,
সাহিত্য পরিষদের মাঝে জ্বাললেন জ্ঞানের রথ।

রংপুর শহর জানে তার কর্মেরই ছাপ,
চতুষ্পাঠীর আঙিনাতে রেখেছেন যে চাপ,
শিক্ষার বীজ বুনে গেছেন দৃঢ় প্রত্যয়ে ভরা,
তারই আলোয় উজ্জ্বল আজ ইতিহাসের ধরা।

Manual6 Ad Code

শিবচন্দ্র রায়ের রাজবাড়ি দাঁড়িয়ে নীরব,
ইট-পাথরের শরীরে তার সময় যেন স্থির রব,
ভগ্ন দেয়াল বলে যায় হারানো দিনের কথা,
রাজকীয় সেই প্রাসাদে ইতিহাসের ব্যথা।

ঝরে পড়া কার্নিশ গায়ে ধুলো জমে রয়,
তবু তারই স্তব্ধতায় এক মহাকালের ভয়,
সেইসব দিনের প্রতিধ্বনি ভেসে আসে কানে—
কোথায় গেল সেই গৌরব, সেই জ্ঞানের টানে?

আজও কি কেউ শুনতে পায় সেই পুরোনো ডাক?
ইটাকুমারী ডাকছে যেন ফিরে পেতে পাক,
হারানো সেই ঐতিহ্য, সেই গৌরবের গান,
যেখানে মানুষই ছিল ইতিহাসের প্রাণ।

Manual1 Ad Code

শুধু যুদ্ধের কাহিনি নয়, চাই জীবনের কথা,
চাই মানুষের হাসি-কান্না, চাই মাটির ব্যথা,
ইটাকুমারী শেখায় আজ সেই সত্যের পথ—
ইতিহাস মানে মানুষেরই অবিরাম রথ।

আসুক আবার গবেষকেরা, লেখকের দল,
খুঁজে নিক সেই হারানো দিনেরই সম্বল,
ধুলো ঝেড়ে উঠুক আবার ইতিহাসের দ্বার,
ইটাকুমারী জেগে উঠুক আলোর অপরপার।

যে গ্রামে ছিল জ্ঞানের দীপ, আজও তারই ছায়া,
সময়েরই আবর্তনে মুছে গেছে মায়া,
তবু সেই মাটির ভেতর জেগে আছে প্রাণ—
ইটাকুমারী চিরদিন থাকবে অম্লান।