সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘নব ভাবনা’র ২৭তম সংখ্যায় বহুমাত্রিক লেখা আহ্বান

প্রকাশিত: ১২:১০ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৯, ২০২৬

সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘নব ভাবনা’র ২৭তম সংখ্যায় বহুমাত্রিক লেখা আহ্বান

Manual5 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৯ এপ্রিল ২০২৬ : দেশের উদীয়মান সাহিত্যচর্চার অন্যতম প্ল্যাটফর্ম ‘নব ভাবনা’ তাদের ২৭তম সংখ্যার জন্য বিষয়ভিত্তিক প্রবন্ধ আহ্বান করেছে।

এবার সংখ্যাটির কেন্দ্রীয় প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে “টাকা”—যা মানবসভ্যতার ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি, সম্পর্ক এবং রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি বহুমাত্রিক ধারণা।

আগামীকাল ১০ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত আগ্রহী লেখকদের কাছ থেকে লেখা আহ্বান করা হয়েছে।

‘লেখক ফোরাম নব ভাবনা’ ও ‘নব ভাবনা ইয়ুথ নেটওয়ার্ক’-এর যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিতব্য এই সংখ্যাটি শুধু অর্থনীতির প্রচলিত বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং টাকাকে ঘিরে মানুষের জীবনযাপন, নৈতিকতা, প্রেম, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের নানা দিককে সৃজনশীল ও বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।

প্রবন্ধ আহ্বানের জন্য নির্ধারিত বিষয়গুলো বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময়। এর মধ্যে রয়েছে বিয়ে ব্যবস্থার সঙ্গে বিনিময় ব্যবস্থার ঐতিহাসিক সম্পর্ক, টাকার বহুরূপ, প্রবাদ-প্রবচনে অর্থের উপস্থিতি, প্রেম ও সম্পর্কের অর্থনৈতিক দিক, রাজনীতি ও অর্থের পারস্পরিক প্রভাব, এমনকি আধুনিক ডাটা সমাজে টাকার বিবর্তন পর্যন্ত। পাশাপাশি ‘টাকা দেখলে কাঠের পুতুলও কথা বলে’—এর মতো লোকপ্রচলিত ধারণা থেকে শুরু করে সততা, বিবেক ও অর্থের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা আহ্বান করা হয়েছে।

উল্লেখযোগ্যভাবে, বিষয় তালিকায় স্থান পেয়েছে ‘অর্থের রাজনীতি-রাজনীতির অর্থ’, ‘ধর্ম ও অর্থ’, ‘দাম্পত্য জীবনে অর্থের ভূমিকা’, ‘অলংকার, রমণী ও কড়ি’, ‘উৎকোচ ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি’, এবং ‘মুদ্রার ইতিহাস’—যা সমকালীন সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস ও নৈতিকতার প্রশ্নগুলোকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ করে দেয়।

সম্পাদকমণ্ডলীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই সংখ্যার লক্ষ্য কেবল সাহিত্যচর্চা নয়; বরং সমাজের গভীর বাস্তবতা, মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং অর্থনির্ভর মানবসম্পর্কের জটিলতা নিয়ে একটি সমন্বিত বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করা। তরুণ ও অভিজ্ঞ—উভয় ধরনের লেখকদের অংশগ্রহণের জন্য বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে।

প্রবন্ধ জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ১০ এপ্রিল ২০২৬। আগ্রহী লেখকদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের লেখা পাঠাতে হবে ‘nobovabna@gmail.com’ ঠিকানায়। এ সংক্রান্ত আরও তথ্যের জন্য যোগাযোগ করা যাবে ‘নব ভাবনা’র সিনিয়র সহকারী সম্পাদক আলী হোসেনের সঙ্গে।

সাহিত্যপ্রেমী ও চিন্তাশীল লেখকদের জন্য এটি এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ, যেখানে টাকাকে কেন্দ্র করে ব্যক্তি ও সমাজের নানা স্তরের গল্প, বিশ্লেষণ ও দর্শন একত্রে স্থান পাবে একটি সৃজনশীল মঞ্চে।

সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘নব ভাবনা’ ২৭তম সংখ্যার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়ভিত্তিক প্রবন্ধ পাঠাতে পারেন আপনিও। এবারের সংখ্যাটির নামকরণ করা হয়েছে “টাকা”।

১। বিয়ে ব্যবস্থা প্রবর্তনের সাথে বিনিময় ব্যবস্থার ইতিহাস;
২। মানি’র (গড়হবু) হাত আর মামার হাত: প্রসঙ্গ বাংলাদেশ;
৩। টাকার যতো রূপ;
৪। ‘টাকা দেখলে কাঠের পুতুলও কথা বলে?’ টাকা ও গালগল্প;
৫। ছাগলে যা না খায়; টাকায় যা না হয়!
৬। টাকা; কবিতা; বর্তমান লেখক জীবন;
৭। মানির মান- টাকায়; ঠ্যাকায় না কি ঠ্যালায়?
৮। অর্থের রাজনীতি- রাজনীতির অর্থ;
৯। প্রিয়া; কিয়া (বন্ধুত্ব); পরকীয়া ও টাকা;
১০। প্রেম; ভালোবাসা ও অন্যান্য দিবসের টাকার অর্থনীতি;
১১। ‘যার আছে যত; তারই চাই ততো- টাকা’; আদিম সমাজ- পশুপালন সমাজ- ফলমূল সংগ্রাহক সমাজ-কৃষি সমাজ- শিল্প সমাজ- শিল্পোত্তর সমাজ- ডাটা সমাজ- অও সমাজ এবং শূন্য সমাজে টাকার চল ও চলন ইতিহাস;
১২। যিনি বলেন, ‘টাকা হাতের ময়লা’ তিনিও ময়লা টাকা হাত পেতে নেন; প্রবাদ-প্রবচনে টাকা;
১৩। পৃথিবীর ইতিহাস ও মুদ্রাতিহাস;
১৪। দাম্পত্য জীবনে পতি ও পাতির ভূমিকা;
১৫। অলংকার- রমণী ও কড়ি; ১৬। ধর্ম ও অর্থ;
১৭। টাকার চল; চলন ও দূষণ এবং কথাসাহিত্য;
১৮। ‘তামার বিষ’ না হয় মুদ্রার দোষ; ও মুদ্রা দোষ; আলুর দোষ আন্ত সর্ম্পক নিরূপণ;
১৯। সততা; বিবেক; টাকা ও শঠতা;
২০। টাকার অর্থ; সংগ্রহ ও টাকা যাদুঘর;
২১। কোচের টাকা; উৎকোচ; আর চা-নাশতার অর্থনৈতিক গুরুত্ব;
২২। মোহর; মোহরানা; নজরানা; ও সেবার টাকা।

যোগাযোগ:
আলী হোসেন
সিনিয়র সহকারী সম্পাদক
নব ভাবনা
শেষ তারিখ: ১০ এপ্রিল ২০২৬
মেইল: nobovabna@gmail.com

 

“টাকার তাম্রলিপি”
—সৈয়দ আমিরুজ্জামান

সময়ের কাঁধে ভর দিয়ে আসে
এক অদৃশ্য শব্দ—
তার নাম টাকা।
মাটির নিচে লুকোনো ধাতু নয়,
মানুষের চোখে জ্বলা অদৃশ্য আগুন,
যার তাপে সভ্যতা পাকে,
আবার পুড়েও যায়।

Manual2 Ad Code

কখনো ছিল বিনিময়ের দিন—
ধানের বিনিময়ে লবণ,
গরুর বিনিময়ে জমি,
কন্যার বিনিময়ে গরু কিংবা স্বর্ণমুদ্রা।
বিয়ের মালায় বাঁধা থাকত
অদৃশ্য লেনদেনের চিহ্ন,
যেখানে ভালোবাসার পাশে
নিঃশব্দে বসে থাকত হিসাবের খাতা।

তখনো টাকার জন্ম হয়নি,
তবু টাকার মতো কিছু ছিল—
লোভের প্রথম অক্ষর,
অধিকার আর দখলের প্রথম উচ্চারণ।

Manual3 Ad Code

তারপর এলো মুদ্রা—
তামা, রৌপ্য, সোনা—
রাজাদের মুখখচিত গোলাকার ইতিহাস,
যেখানে ক্ষমতা নিজেকে ছাপায়
মানুষের হাতের তালুতে।

Manual8 Ad Code

একটি মুদ্রা মানে শুধু মূল্য নয়,
একটি সাম্রাজ্যের ছায়া,
একটি শাসকের ইচ্ছা,
একটি জাতির নিয়তি।

টাকা তখন নদীর মতো বয়ে যায়—
কখনো শান্ত,
কখনো বন্যা হয়ে সব ভাসিয়ে নেয়।

Manual2 Ad Code

“টাকা দেখলে কাঠের পুতুলও কথা বলে”—
লোককথার ভেতর লুকানো সত্য,
যেখানে মানুষ নিজেই পুতুল হয়ে ওঠে,
সুতো ধরে টানে অদৃশ্য বাজার।

প্রেম তখন আর শুধু হৃদয়ের বিষয় নয়,
চোখে চোখ রাখা নয়—
একটি ডিনার বিল,
একটি উপহারের মোড়ক,
একটি দিবসের ক্যালেন্ডার-চিহ্নিত ব্যয়।

ভালোবাসা কি বিক্রি হয়?
না—
তবু ভালোবাসার পাশে
একটি মূল্যতালিকা ঝুলে থাকে।

বন্ধুত্বের টেবিলে বসে
চা-নাশতার বিল দেয় কে—
সেই হিসাবেই মাপা হয়
অদৃশ্য সম্পর্কের ওজন।

রাজনীতির অন্দরমহলে
টাকা এক গোপন ভাষা—
যেখানে নীতি শব্দটি
অনুবাদ হয় সুবিধায়,
আর আদর্শের মানে দাঁড়ায়
সমঝোতার নতুন সংজ্ঞা।

ভোটের আগে হাসি,
ভোটের পরে নীরবতা—
এই দুইয়ের মাঝখানে
টাকার গোপন যাত্রা।

উৎকোচ নামে পরিচিত
একটি অন্ধকার নদী,
যেখানে সততা ডুবে যায়,
আর বিবেক ভাসে মৃত মাছের মতো।

“টাকা হাতের ময়লা”—
যারা বলে,
তারাও হাত বাড়ায়
ময়লা স্পর্শের লোভে।

এই দ্বৈততা—
মানুষের চিরন্তন রূপ,
যেখানে নৈতিকতা ও প্রয়োজন
একই শরীরে বসবাস করে।

একদিকে সততা—
অন্যদিকে বেঁচে থাকার তাগিদ,
এই দুইয়ের সংঘাতে
জন্ম নেয় আপসের ইতিহাস।

দাম্পত্যে টাকা—
একটি নীরব চরিত্র,
যে কখনো কথা বলে না,
তবু প্রতিটি ঝগড়ার পেছনে
তার ছায়া থাকে।

স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা
কখনো কখনো থেমে যায়
একটি অসম বেতনের কাছে,
অথবা একটি অপূর্ণ চাহিদার সামনে।

অলংকারের ঝিলিক,
রমণীর হাসি,
আর কড়ির ঝনঝন—
এই ত্রিভুজে আবর্তিত হয়
অসংখ্য জীবনের গল্প।

ধর্মও টাকার বাইরে নয়—
দানের বাক্সে জমে ওঠা বিশ্বাস,
যেখানে পাপ মোচনের আশায়
মানুষ ফেলে যায় কিছু নোট,
কিছু কয়েন,
আর কিছু অপরাধবোধ।

স্বর্গের টিকিট কি বিক্রি হয়?
না—
তবু মানুষ কিনতে চায়
একটু নিশ্চিন্ততা।

সভ্যতা বদলায়—
শিকারি সমাজ থেকে কৃষি,
কৃষি থেকে শিল্প,
শিল্প থেকে তথ্যের যুগ—
আর টাকার রূপ বদলায়
কাগজ থেকে প্লাস্টিক,
প্লাস্টিক থেকে ডিজিটাল সংকেতে।

এখন টাকা আর হাতে ধরা যায় না,
তবু তার ওজন বাড়ে—
স্ক্রিনের ভেতর জমে থাকা সংখ্যাগুলো
নিয়ন্ত্রণ করে বাস্তব জীবন।

ডাটা সমাজে
মানুষ নিজেই হয়ে ওঠে পণ্য,
তার অভ্যাস, তার পছন্দ,
সবকিছু বিক্রি হয় অদৃশ্য বাজারে।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়—
টাকা কি আমাদের সৃষ্টি,
নাকি আমরা টাকার সৃষ্টি?

কাঠের পুতুল কি সত্যিই কথা বলে,
নাকি আমরা নিজেদের কণ্ঠ
টাকার কাছে সমর্পণ করেছি?

একটি শিশু জন্ম নেয়—
তার হাতে কোনো টাকা নেই,
তবু তার ভবিষ্যৎ
আগেই নির্ধারিত হয়
অর্থনৈতিক বাস্তবতায়।

একজন বৃদ্ধ মৃত্যুর আগে
হিসাব মেলাতে চায়—
কত রোজগার, কত ব্যয়,
কত অপূর্ণতা।

শেষে বুঝতে পারে—
সব হিসাবের বাইরে
রয়ে গেছে জীবন।

টাকা—
তুমি শুধু মুদ্রা নও,
তুমি এক দার্শনিক প্রশ্ন,
একটি সামাজিক জটিলতা,
একটি নৈতিক দ্বন্দ্ব।

তুমি মানুষকে চালাও,
আবার মানুষই তোমাকে তৈরি করে—
এই দ্বৈত সম্পর্কেই
লুকিয়ে আছে সভ্যতার রহস্য।

হয়তো একদিন
টাকা হারিয়ে যাবে—
শূন্য সমাজে
মানুষ ফিরে পাবে
তার প্রাচীন সরলতা।

কিন্তু ততদিন—
টাকা থাকবে,
তার ছায়া থাকবে,
তার গল্প থাকবে।

আর আমরা—
এই গল্পের ভেতরেই লিখে যাব
আমাদের নিজস্ব তাম্রলিপি।