প্রধান অতিথি হিসেবে হাজিরা দিতে দিতে উপাচার্যগণ আসল কাজগুলো করার সময় কতটুকু পান?

প্রকাশিত: ৩:৪৮ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২২

প্রধান অতিথি হিসেবে হাজিরা দিতে দিতে উপাচার্যগণ আসল কাজগুলো করার সময় কতটুকু পান?

Manual6 Ad Code

ড. রায়হানা শামস ইসলাম|

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম। বলতে কোনোরকম সংকোচ বোধ করছি না যে যতদিন সেখানে পড়াশোনা করেছি, কেমব্রিজের ভিসির নাম আমি জানতাম না। যাঁরা আমার গবেষণা সহকর্মী বা বন্ধু ছিলেন, তাঁরাও জানতেন বলে কখনও মনে হয়নি। ভিসি প্রসঙ্গ ওঠেইনি কোনোদিন। আমার পিএইচডি সুপারভাইযার কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস প্রফেসর। কত কিছু নিয়ে কথা বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গও এসেছে; কিন্তু ভাইস চ্যান্সেলর ব্যাপারটি কখনও আসেনি। তিনি নিজেও ভিসি সংক্রান্ত কিছু জানতেন কি না আমার সন্দেহ আছে! এটাই স্বাভাবিক ছিল, কারণ আমাদের কারও জন্যই এই পদ বা পদধারী ব্যক্তি একটুও প্রাসঙ্গিক ছিল না।

বিপরীতে, আমার এই দেশে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ই কী ভীষণভাবে ভিসিময়! শুধু নাম কেন, উপাচার্য মহোদয়ের চেহারাটি পর্যন্ত মনে গেঁথে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই—সর্বত্র ব্যানার আর প্রতিটি অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধান অতিথির উপস্থিতি! এই প্রধান অতিথি হিসেবে হাজিরা দিতে দিতে উপাচার্যগণ আসল কাজগুলো করার কতটুকু সময় পান, সেটি একটি সংগত জিজ্ঞাসা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ভাগ্যবান, কারণ কর্মজীবনে তাঁদেরকে কারো অধস্তন হতে হয় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও, কোথাও ভিসির দেখা পেলে অনেক শিক্ষক অতিশয় আহ্লাদে গদগদ হয়ে প্রয়োজনের চাইতে বেশি সময় ধরে করমর্দন করতে থাকেন, মুখে ঝোলানো থাকে এক তেলতেলে “জ্বি স্যার” হাসি! বিগলিত এই বিনয় তোষামোদের পর্যায়ে পড়ে। অনেকে উপাচার্যের কাছে ধর্না দিয়ে পড়ে থাকেন কোনো ‘বড়’ পদ পাবার আশায়। উচ্চাকাঙ্ক্ষার বশে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজেরাই নিজেদের মানবিক মর্যাদায় কুঠারাঘাত করেন। এই শিক্ষকসমগ্র থেকেই আবার পরবর্তী ভিসি বেছে নেওয়া হয়। স্বভাবে তোষামোদি না থাকলে আজকাল উপাচার্য হওয়া ও উপাচার্য হিসেবে ‘টিকে থাকা’—উভয়ই অসম্ভব মনে হয়।

Manual7 Ad Code

ভিসির দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়কে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা মাত্র; অথচ পদটিকে হর্তা-কর্তা-বিধাতায় রূপান্তরিত করে ফেলা হয়েছে। আবার এই ‘বিধাতা’গণ যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসে পদটিতে আসীন হন, এমন তো আর নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সীমাহীন পদলেহনের দাক্ষিণ্য স্বরূপ এই প্রাপ্তি। অতএব সার্বিক পরিণতি যে দৃষ্টিনন্দন হবে না, এতে আর বিস্ময় কি? বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক পদটিকে সর্বময় অধিকর্তায় রূপান্তরিত করলে পরিণতি যা হওয়ার, চারদিকে আমরা তা-ই দেখছি।

কয়েক বছর আগের ঘটনা। একটি কনফারেন্সে গিয়েছি। সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রধান অতিথির ভাষণ দিচ্ছেন। ভিসিকে কেন কোন সায়েন্টিফিক কনফারেন্সে চীফ গেস্ট হতেই হবে, এই প্রশ্ন খুব একটা কারও মনে হয়ত জাগেও না! সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় হলেও এটি এখন একটি নিয়মিত রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। যাই হোক, উক্ত ভিসি মহোদয় তাঁর বক্তৃতায় সামনে উপবিষ্ট শিক্ষকদের প্রচুর তিরস্কার করলেন। তন্মধ্যে নানারকম রাজনৈতিক বিষোদগারও ছিল। তাঁর বক্তব্যের ভাষায় সহকর্মী শিক্ষকদের প্রতি একরকম প্রচ্ছন্ন হুমকিও ছিল! ভদ্রলোকের বক্তৃতাটি যদি রেকর্ডেড থাকতো, আমার বিশ্বাস এটা আমাদের এই নষ্ট সময়কে ধারণ করা একটা স্মারক হতে পারতো! এই সময়ে ঠিক কোন্‌ স্তরের চিন্তাধারা একটা অ্যাকাডেমিক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সগর্বে প্রকাশ করা সম্ভব, শিক্ষিত মহলে কী ধরনের কথাবার্তা আজকাল স্বাভাবিকায়িত—এর একটা অডিও দলিল হিসেবে থেকে যেতো। আপসোস, সময়ের এই আয়না সংরক্ষিত হয়নি!

সব কথা এখন আর মনে নেই, শুধু মনে আছে নিথর হয়ে বসে উপাচার্যের সেই ভাষণ শুনছিলাম। পুরো বক্তৃতাটি এতটাই অসঙ্গত ছিল যে আমি ধারণা করেছিলাম বক্তব্যের পর তিনি কোন হাততালি পাবেন না। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে চারদিকে তুমুল করতালি শুরু হল! আমার কাছাকাছি বসা যে দুজন শিক্ষক ভাষণ চলাকালীন প্রচণ্ড সমালোচনা করছিলেন নিজেদের মধ্যে, তাঁরা দেখলাম জোরে জোরে হাততালি দিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ সহমত পোষণ করার কারণে এই করতালি নয়, হাতের তালিতে মেকি তোষামোদ ঝরে পড়ছে। ‘প্রভাবশালী’ এলিট শিক্ষক হিসেবে এঁরা ভবিষ্যতের উপাচার্য পদপ্রার্থী কিন্তু!

Manual8 Ad Code

বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে অঙ্গনে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে যেখানে অ্যাকাডেমিক যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক অন্ধ আনুগত্য ও তৈলমর্দনের ক্ষমতাকে লালন, পালন ও বর্ধন করার সংস্কৃতি উৎসাহিত। শিক্ষা-গবেষণার রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিচালনার ভার উপাচার্যের উপর ন্যস্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই পদ ক্ষমতা চর্চার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভিসি একজন “ক্ষমতাধর” ব্যক্তি, এই ধারণাটি এখন প্রতিষ্ঠিত। যে ব্যক্তি রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উপরে উঠতে পারেন, তিনি উপাচার্য-রাডারের আওতায় আসেন; অতঃপর নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকেন। বহুকাল থেকে ভিসি তৈরির প্রক্রিয়াটাই এমন যে, একটি বিশেষ ধরণের মানুষ ছাড়া কেউ নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ছাত্রদেরকে “গরিবের বাচ্চা” বলে যে ভিসি মহাশয় তাঁর কথার মাধ্যমে ছাত্রদের প্রতি তাচ্ছিল্য এবং দরিদ্র মানুষের প্রতি তাঁর মজ্জাগত শ্রেণিঘৃণার প্রকাশ ঘটান, অথবা ভিসি পদ ছেড়ে দিয়ে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সভাপতি হবার ইচ্ছা যিনি অসংকোচে ব্যক্ত করতে পারেন, এমন মানুষেরাই উপাচার্য পদে আসীন হন। যাঁরা হন, তাঁদের মেরুদণ্ড নমনীয় হওয়ার কারণে যেমন ইচ্ছা তেমন মুচড়ে পছন্দসই আকার দেয়া যায় সহজেই।

এমন একটি সার্বিক পটভূমিতে যখন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান ঘটনার মতো কোন স্পর্শকাতর পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে? ছাত্রছাত্রীরা তাদের উপর নিপীড়নের প্রতিবাদে ও ভিসির পদত্যাগের দাবীতে বিরতিহীন অনশনে গেছে, অসুস্থ হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর। এমতাবস্থায়ও উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সাথে আরও ৩৪ জন ভিসি সংহতি প্রকাশ করেছেন, এতে বিস্মিত হবার কিছু নেই। তাঁরা একাত্মবোধ করবেনই, কারণ উপাচার্য পদভুক্ত হবার প্রক্রিয়ায় তাঁদের সবার একই ধারায় মানসিক কন্ডিশনিং সাধিত হয়েছে। তাঁদের চিন্তাপদ্ধতি ও কর্মপন্থা তাই এক বৃন্তে জোড়বদ্ধ।

বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন নির্দিষ্ট এক ব্যক্তিতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। এটা হয়ত অবশ্যম্ভাবী ছিল। কিন্তু, দুঃখজনক সত্য হল, একজন ব্যক্তির অপসারণ হলেও প্রকৃত সমস্যার সমাধান হবে না শেষ পর্যন্ত। কদুর বদলে লাউ, অথবা লাউ সরিয়ে কদু – আদতে এতে চিত্র পাল্টায় না। সমগ্র ভিসি-চরিত খুলে বসলে এটা দিবালোকের মতোই স্পষ্ট।

অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে ব্যক্তিগতভাবে চিনি। খুব কাছ থেকে দেখেছি, তাঁরা প্রত্যেকে কী নির্ভেজাল সততায় ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বে জীবন কাটিয়েছেন! ছাত্রছাত্রী ও জনমানুষের তরফ থেকে পেয়েছেন অপরিমেয় সম্মান ও শ্রদ্ধা। এই পেশায় সম্মানই তাঁদের প্রধান প্রাপ্তি। কিন্তু বেশ অনেকদিন থেকেই একের পর এক উপাচার্যের ঘটনায় গণ-মানসে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রতি নেতিবাচকতা সৃষ্টি হয়েছে, এবং তা বাড়ছেই শুধু। অথচ এখনও বহু শিক্ষক আছেন যাঁরা শতভাগ সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ। একাংশের স্খলনের নিকষকৃষ্ণতার মাঝেও শেষাবধি এঁরাই অগণিত তারার মতো জ্বলজ্বল করবেন, এমন আশা কি রাখা যায়?

Manual2 Ad Code

লেখক: অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Manual1 Ad Code

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ