সিলেট ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১১, ২০২৪
একটি বাচ্চা জন্মের সময় ছেলে না মেয়ে এটি নির্ধারিত হলেও তাকে কিন্তু আমরা পুরুষ বা নারী বলিনা, কারণ এ পরিচিত মানুষের সম্পূর্ণ দৈহিক এবং মানসিক বিকাশের একটি পরিপূর্ণ স্তর। তাই
জন্মমাত্রই একটি মেয়ে নারী হয়না, ঘর-সমাজ- দায়িত্ব- পারিপার্শ্বিকতা তাঁকে জীবনের বিভিন্ন বাঁকে ধীরে ধীরে নারীতে রূপান্তরিত করে। আমাদের সমাজে একটি পুরুষ যতোটা সহজে তাঁর ক্ষেত্র তৈরী করতে পারে, একটা মেয়েকে ঠিক ততোটাই বাঁধা এবং সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। সেজন্য নারীদের ক্ষমতায়ন খুবই প্রয়োজন অন্য নারীদের চলার পথকে সহজ করার জন্যে।
এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্যটি বেশ যথার্থ : নারীতে বিনিয়োগ এবং দ্রুত অগ্রগতি সাধন। আর বিনিয়োগটা করবে কে? নারী নিজে, তাঁর পরিবার, সমাজ এবং দেশ.. সকলেই। মেয়েরা যদি সফল হয়, তাহলে তাঁর পরিবার, দেশ এবং সমগ্র জনগোষ্ঠীও সেই সুফলতা ভোগ করে। তাহলে মেয়ে, তুমি তৈরী তো নারী হতে?
বর্তমান বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়ন একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় একজন নারী, আমেরিকার প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছে, এরপর আমরা হয়তো একজন প্রথম মহিলা
প্রেসিডেন্ট পাবো। ১৮৯৭ সালে সুসান বি. আ্যন্থনী বলেছিলেন, “যতক্ষণ না নারীরা নিজেরাই আইন প্রণয়নে এবং আইন প্রণেতা নির্বাচনে সহায়তা না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সমাজে সুষম ভারসাম্য আসবেনা”!
সম্প্রতি নারীর ক্ষমতায়নের একটি উজ্বল দৃষ্টান্ত নিউইর্য়কের সিটি কাউন্সিলে নারীদের অভূতপূর্ব বিজয়। বর্তমানে সেখানে ৫১ সদস্যের মধ্যে ৩১ জনই নারী। তবে এমন অবস্থা কিছুদিন আগেও ছিলনা! ২০০৯ য়ে কাউন্সিলে নারী সদস্যের সংখ্যা ছিল মাত্র ১০ জন। প্রাক্তন সিটি কাউন্সিল সদস্য মেলিসা মার্ক-ভিভেরিটো এবং এলিজাবেথ ক্রাউলি নিউইর্য়ক সিটি কাউন্সিলে লিঙ্গ সমতা অর্জনে ‘‘21 in 21’ স্লোগানে একটি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন, যেখানে তাঁদের উদ্দেশ্যে ছিল ২০২১ সালে ২১ জন মহিলা কাউন্সিলর নির্বাচন করা ! ফলস্বরূপ, ২০২২ সালে নিউইর্য়কের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৫১টি আসনের মধ্যে নারীদের দখলে যায় ৩১টি আসন। বাংলাদেশী বংশদ্ভুত শাহানা হানিফ প্রথম মুসলিম কাউন্সিলর হিসেবে জয়ী হন।
বেগম রোকেয়াকে বাঙালি নারীদের মুক্তি ও শিক্ষার সংগ্রামের অগ্রদূত বলা হয়। সেই সময়কার বাঙালি সমাজ ব্যবস্থায় সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি এতোকিছু হয়তো তাঁর পক্ষে করা সম্ভব হতো না, যদি না তাঁর উদার মানসিকতার স্বামী সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন পূ্র্ণ স্বাধীনতা এবং সহযোগীতা দিতেন। সময় এখন অনেক বদলেছে, মেয়েরা মেধায় ছেলেদের চাইতেও বেশী সফল হচ্ছে, সম্প্রতি বাংলাদেশের মেডিকেল পরীক্ষার রেজাল্টে ছেলেদের চাইতে মেয়েরা অনেক বেশী এগিয়ে। গতবছর আমার জন্মস্থান যশোরে যেয়ে আমি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, মেয়ে এবং মহিলারা অনেকেই স্কুটার চালাচ্ছে, অথচ বিশ/ পঁচিশ বছর আগে আমরা বড়জোড় জিন্সের প্যান্ট পরেছি কেবল।
প্রকৃতি যেমন সাজে বিভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন রূপে,
মেয়েদের সৌন্দর্যও তেমন একেক বয়সে একেক রকম বৈচিত্র্যময় লাগে। আমাদের বাঙালি সমাজের অধিকাংশই একথা মনে করেন যে বাচ্চা পালন, রান্না, ঘরের কাজ সব মেয়েদেরই করতে হবে।
অনেক ক্ষেত্রেই স্বামীরা স্ত্রীদের যোগত্যার মূল্যায়ন করতে পারে না। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ তাঁর স্ত্রী গুলতেকিন খানের মেধা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন বলে তাঁকে সহজ বিষয় নিয়ে পড়তে বলেছেন! কিন্তু গুলতেকিন দীর্ঘ বিরতিতে তিনটা বাচ্চা নিয়ে ইংরেজী সাহিত্য পড়ে প্রমাণ করেছেন, কেউ কেউ সত্যিই সময়টাকে বদলে দিতে পারে। এই যে এতো বছরের সংসার করার পর প্রিয় মানুষটা হঠাৎ করে অন্যের হয়ে গেল.. কষ্ট তো হয়েছেই, কিন্তু গুলতেকিন ম্যাডামের আত্মবিশ্বাস ছিল বিধায় প্রতিকূল অবস্থায় অটল থেকেছেন। ঠিক এজন্যই মেয়েরা ওয়েল স্টাবলিস হবে, যাতে তাঁকে যে কোন পরিস্থিতিতে কারো কাছে মুখাপেক্ষী হতে না হয়।
ছোটবেলা আমার বাবাকে দেখেছি কিভাবে অফিস থেকে এসে আমাদের ভাইবোনদের দায়িত্ব নিয়ে আমার মা’কে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আমার অস্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া মাকে সর্বাত্বক সহযোগীতায় গ্রাজুয়েশ্যন করিয়েছে। কিন্তু মা চাকুরী করতে চাইলে, তখন বলেছেন, তোমার তো চাকুরী করার প্রয়োজন নেই। প্রবাসে আমার ক্যারিয়ার গড়তে আমার হাজবেন্ড সার্বক্ষণিক সাহায্য করেছে, সে না হলে আমি কিছুতেই দুই বাচ্চা সামলে এই পথে সফল হতাম না। তবে আমার স্বামীও যে আমাকে পথ বাতলে দিয়েছে তা নয়, বরং আমি পথ তৈরী করেছি, সেই পথে চলতে সে আমাকে সাপোর্ট করেছে।
স্বাস্থ্য সেবার প্রফেশনে থাকার সুবাদে বিভিন্ন কালচারের মানুষের সাথে আলাপকালে জানতে পারি যে, তাঁদের অনেকেই তিন/ চার দশক সংসার করার পরও বিচ্ছেদের পথে হাঁটছেন। এমন মধ্যবয়সে এসে বিচ্ছেদের কারণ সম্মানহীনতায় ব্যক্তিত্বের সংঘাত। অল্পবয়সে মেয়েরা অবহেলা/ অপমান সহ্য করতে পারলেও, একজন পরিপূর্ণ নারীর পক্ষে সেটা অসহনীয়। আর এ সম্মানহীনতা কেবল ঘরে নয়, আমাদের সমাজও সমানভাবে মেয়েদের অবদমিত করে রাখে! আমেরিকার মতো সভ্যতার শিখরে থাকা একটি রাষ্ট্রের অনেক রাজ্যে এখন আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গর্ভপাতকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এছাড়া অনেক রাজ্যে গর্ভপাত প্রক্রিয়াকে সীমিত করা হয়েছে। ধর্মের নামে সামাজিক সংস্কার এই একবিংশ শতাব্দীতেও মেয়েদের মানসিক এবং শারিরীক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করে।
আমাদের দেশে বলা হয় মেয়েরা চল্লিশে বুড়ী হয় ! অথচ চল্লিশের পরেই পরিপূর্ণতার প্রস্ফুটনে
জীবনটা কিন্তু বেশী মধুময়। আমি যখন বিভিন্ন দেশের সত্তর, আশি, বিরাশী বয়সের সুঠাম স্বাস্থ্যের সবল নারীদের দেখি সাহায্য ছাড়া একা একাই নিজের প্রয়োজনীয় সকল কাজ করতে, তখন সত্যিই বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যাই। তাঁদের কেউ কেউ আবার সপ্তাহে ৩/৪ দিন জবও করে! জিজ্ঞাসা করি, এই বয়সেও এমন সু্ন্দর থাকার রহস্য কি? সবারই একই উত্তর: তাঁরা নিজেদের ব্যস্ত রাখে নিজের কাজে, সোশ্যাল ওয়ার্ক করে, প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটা এবং খাওয়া দাওয়া খুব মেইনটেইন করে চলা।
অথচ অনেক মেয়ে নারী হওয়ার দীর্ঘ সংগ্রামে কিছু বোঝার আগেই নিজের অবহেলা করে নিজের ক্ষতিটা নিজেই করে ফেলে। চল্লিশের কোঠা পার হওয়ার সাথে সাথেই তাই মেয়েদের নিজের শরীরের ওপর বেশী যত্নবান হতে হবে দীর্ঘ সুস্থজীবন লাভে।
মেয়েদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ স্থান হলো আফগানিস্তান। আফগানিস্তানে মহিলাদের অধিকার রক্ষার জন্য আইন ও নীতি ছিল, কিন্তু তালিবানরা ১৯৯৬ সাল হতে ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালীন আফগানিস্তানের সংবিধান এবং নারীদের অধিকার রক্ষাকারী অন্যান্য আইন স্থগিত করে নারীদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে বোরকায় ঢেকে রাখার নিয়ম জারী করে। শুধু তাই নয়, বোরকার রঙ এবং নীচের পোশাকও নির্ধারণ করে দিয়েছিল ! বোরকার নীচে আড়ম্বরপূর্ণ এবং উজ্জ্বল রঙের পোশাক পরা মহিলাদের প্রকাশ্যে মারধর, বেত্রাঘাত এবং অপমান করা হতো। মহিলাদের স্কুলে যাওয়া বা বাড়ির বাইরে কাজ করা নিষিদ্ধ ছিল। মহিলারা কখনও একা বাইরে যেতে পারতেন না, বাইরে যাওয়ার সময় একজন পুরুষ আত্মীয়ের সাথে থাকতে হতো। তালেবানরা গান নিষিদ্ধ করেছিল, চোরদের হাত কেটে দিতো এবং ব্যভিচারীদের পাথর দিয়ে মেরে ফেলতো। সম্প্রতি আবার ক্ষমতা গ্রহণের পর তালেবানরা নিজেদেরকে মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা নারীর অধিকারকে সম্মান করবে।
আর ঠিক এই মূহুর্তে নারীদের ইতিহাসের জঘন্য অবমাননা হচ্ছে ইস্রাইল কর্তৃক প্যালেষ্টাইনের পবিত্র ভূমিতে। গর্ভবতী নারীদের আশ্রয় নেই, নূন্যতম চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই, অন্ধকার রাতে ঠান্ডা মাটির ওপরে তাঁবুর নীচে, টর্চ লাইটের আলোয় তাঁরা বাচ্চা প্রসব করছে। প্রসোবত্তর বাচ্চাকে খেতে দিতে না পারায় বাচ্চা মারা যাচ্ছে। কোন এক মা’কে একজন স্বেচ্ছাসেবক নার্স জটিল অবস্থা থেকে সুস্থভাবে বাচ্চা প্রসব করার পরেরদিন, মা সহ বাচ্চাটি মারা যায় বোমার আঘাতে … হামাস নিধনের উসিলায় গাজা, ওয়েস্ট ব্যাংক হতে জনসংখ্যার শতকরা ৮৫ ভাগকে উচ্ছেদ করে নারী-শিশুদের জীবন বিপন্ন করাকে কোন ভাবেই ফেলা যায় না সভ্যতার কাতারে।
নারী দিবস হোক মনুষ্য সভ্যতার বিজয়, এবং মানবতার অবমাননার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী প্রলয়!

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি