উপমহাদেশের প্রথম মুদ্রিত লেখিকা লুৎফুন্নিসা ইমতিয়াজ

প্রকাশিত: ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ, মে ১৯, ২০২৪

উপমহাদেশের প্রথম মুদ্রিত লেখিকা লুৎফুন্নিসা ইমতিয়াজ

Manual1 Ad Code

সুচেতনা মুখোপাধ্যায় | কলকাতা (ভারত), ১৯ মে ২০২৪ : ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মুদ্রিত লেখিকা লুৎফুন্নিসা ইমতিয়াজ।

Manual7 Ad Code

১৭৬৩ সাল। বছর দুয়েকের মাতৃহারা ফুলটিকে তার উদাসীন আব্বার অবহেলা থেকে নিজেদের স্নেহছায়ায় সরিয়ে এনেছিলেন প্রতিবেশী নিঃসন্তান দম্পতি। তাঁদের কাছে স্নেহ, শিক্ষা ও সহবতের আলোয় ক্রমে প্রস্ফুটিত হচ্ছিল সে। মহল্লার অন্য কিশোরীরা যখন দল বেঁধে পুতুল খেলা করে তখন সে মগ্ন থাকে আপন ভাবজগতে। নিজের প্রিয় জানালার পাশে বসে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে গড়ে তোলে অপূর্ব সব উর্দু নজম, যাতে কখনো ঝিকমিকিয়ে ওঠে কৈশোরের ঔজ্জ্বল্য, কখনো তা ধূসর হয় হারিয়ে যাওয়া মায়ের জন্য গভীর আকুতিতে। আর শিরোনামহীন সেইসব নজমগুলির শেষে সে লিখে রাখে কখনো-সখনো নিজের নামও। তার নাম লুৎফুন্নিসা।

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি। পতনোন্মুখ মোঘল সাম্রাজ্যের দক্ষিণ-পূর্ব ভাগে মোঘল সুবেদার নিজাম-উল- মুলক-চিন-কিলিস খান গড়ে তুলেছিলেন বিশালাকৃতি হায়দ্রাবাদ রাজ্য। তৎকালীন সেরা শিল্পী-সাহিত্যিক ও গুণীজনেরা বিশৃঙ্খলার দিল্লি শহর ত্যাগ করে ভিড় করেছিলেন ক্রমে সেখানে, নিজামদের উদার পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্তির আশায়। অপসৃয়মান মোঘল সংস্কৃতির এক মহান কেন্দ্র রূপে বিকশিত হতে থাকে রাজ্যের রাজধানী হায়দ্রাবাদ শহর। এ সময় এই শহরে বসবাসকারী উত্তর ভারতীয় কবিদের কলমে হিন্দুস্থানী, উর্দু, আরবি ও ফারসি শব্দের সঙ্গে দক্ষিণী ভাষাগুলির মেলবন্ধনে হায়দ্রাবাদে জন্ম নিচ্ছিল সাহিত্যের এক নবীন-মধুর উপভাষা, যার নাম দখিনি উর্দু জুবান।
এরকমই এক সময়ে, সামাজিক রীতি অনুসারে কিশোরী লুৎফুন্নিসার নিকাহ হয়ে গেল সে সময়কার জনপ্রিয় দখিনি উর্দু শায়র আসাদ আলী খাঁ তামান্না’র সঙ্গে। কবির সাহচর্যে লুৎফুন্নিসার তদবধি লুক্কায়িত কাব্যচর্চা ও মনোজগৎ ভরে উঠলেও দীর্ঘস্থায়ী হলো না সেই আনন্দ। ১৭৯০ সালে স্বামীর হঠাৎ মৃত্যুতে একাকিত্বের গভীর আঁধারে ডুবে গেছিল সে। জীবনের এই কঠিন পর্বে দুঃখিনী লুৎফুন্নিসাকে শান্তি ও সদর্থকতার পথ দেখিয়েছিলেন প্রখ্যাত সুফি সন্ত শাহ আতাউল্লাহ। তাঁরই অনুপ্রেরণায় লুৎফুন্নিসা এরপর নিজের বাকি জীবন আধ্যাত্মিকতা, জনসেবা ও সর্বোপরি সাহিত্য রচনায় উৎসর্গ করেছিলেন।
স্বামীর মৃত্যুর পর হজে যান লুৎফুন্নিসা। সেখান থেকে ফিরে এসে নতুন করে কবিতা লিখতে শুরু করেন। নজম ছাড়াও দখিনি তথা উর্দু ভাষার অন্য সকল ধরনের লেখনশৈলীতেই তিনি সমধিক সাবলীল ছিলেন। ১৮৪টি গজল, ১৫টি রুবাইয়ৎ, ৫টি খিলাৎ ও অজস্র মসনবি ও কসিদা’র সমন্বয়ে তিনি ক্রমে একটি সুবিশাল কাব্যসমগ্র বা দিওয়ান রচনা করেন। ১৭৯৬ সালে অর্থাৎ হিজরী ১২১২ তে লুৎফুন্নিসার ৩৬ বছর বয়সে দিওয়ানটি হায়দ্রাবাদ থেকে গ্রন্থাকারে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়াও তিনি ৮০০০ আয়ৎ সমন্বিত গুলশান-এ-শুরা নামক দীর্ঘ একটি কল্পকাহিনী রচনা করেছিলেন।

Manual8 Ad Code

লুৎফুন্নিসা ইমতিয়াজের পান্ডুলিপির বৃহদংশ বর্তমানে হায়দ্রাবাদের সালারজং গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রয়েছে।
বহুকাল ধরে তৎকালীন হায়দ্রাবাদের বিখ্যাত নর্তকী ও রাজনীতিজ্ঞ মাহলকা বাঈ চন্দা কে ভারতের প্রথম মুদ্রিত লেখিকা বলে মনে করা হতো। কিন্তু মাহলকার গজলের সংকলন ছাপা হয়েছিল ১৭৯৭ সালে অর্থাৎ লুৎফুন্নিসা লিখিত গ্রন্থটির পরের বছর। আধুনিকতম গবেষণালব্ধ তথ্যের সূত্র ধরে তাই বর্তমানে লুৎফুন্নিসা বেগমকেই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মুদ্রিত লেখিকা রূপে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।
তবে লুৎফুন্নিসা মাহলকার মত খ্যাতিমতী ও প্রভাবশালিনী তো ছিলেনইনা, বরং ছিলেন অনাম্নী এক আত্মমগ্ন শায়রা। তাই ঘরের কোণে বসে কাব্যরচনা থেকে দিওয়ান মুদ্রণ পর্যন্ত তাঁর দীর্ঘ সৃজনপথটি সহজ হয়নি মোটেই। অষ্টাদশ শতকের ভারতে জাতি-ধর্ম-শ্রেণী-প্রান্ত নির্বিশেষে যেকোন পুরুষতান্ত্রিক সমাজেই মহিলাদের অধিকাংশ ব্যতিক্রমী পদক্ষেপকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যেতে হতো। সমকালীন এই সামাজিক পরিবেশ সম্পর্কে সম্যকভাবে ওয়াকিবহাল ছিলেন লুৎফুন্নিসা। তিনি বিলক্ষণ জানতেন যে, কাব্যসাহিত্যের পুরুষপ্রধান জগতে তিনি নিজের প্রকৃত নাম ও পরিচয় প্রকাশ্যে আনলে কখনই ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হতে পারবেনা তাঁর প্রিয় রচনাগুলি। তাই ইমতিয়াজ নামক একটি পুরুষ ছদ্মনামের আড়ালে নিজের দিওয়ান তথা অন্যান্য সমস্ত লেখাগুলিকে মুদ্রিত করেছিলেন লুৎফুন্নিসা।

Manual3 Ad Code

তাঁর প্রায় প্রতিটি রচনার শেষে ইমতিয়াজ নামটি স্বাক্ষরিত থাকার কারণে দীর্ঘদিন লুৎফুন্নিসার প্রকৃত পরিচয় গোপন ছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক বছর আগে ইমতিয়াজ রচিত একটি মসনবির শেষে কনীজ অর্থাৎ মহিলা শব্দটি লক্ষ্য করে সাহিত্য গবেষকরা নতুন করে অনুসন্ধিৎসু হয়ে ওঠেন। এরপর তাঁদের গহন একনিষ্ঠ খোঁজের ফলশ্রুতিতে পুরুষ ইমতিয়াজের অস্পষ্ট মুখোশের আড়াল থেকে উজাগর হয়ে বর্তমান সময়ে ফিরে আসেন আঠারো শতকের এই প্রতিভাময়ী মহিলা কবি ও তাঁর বৃহদায়তন কাব্যসম্ভার।

লুৎফুন্নিসা বেগমের প্রথমদিকের কবিতাগুলি মানবিক নানা আবেগ নিয়ে রচিত হলেও, পরের দিককার প্রায় সমস্ত লেখাতেই ইসলামি রহস্যবাদের গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু সেখানেও আধ্যাত্মিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে তাঁর রচনাগুলিতে আপন সৌকর্যে ফুটে উঠেছে সাবেক হায়দ্রাবাদ নগরীর প্রকৃতি ও জনসমাজের দৈনন্দিন ছবি। শায়রার পংক্তিগুলি কখনো ঈদের খুশিতে উদ্বেল, আবার কখনো হোলির রঙে মাতোয়ারা। একদিকে তিনি জগতের মঙ্গলের জন্য আল্লাহ্’র কাছে প্রার্থনা নিবেদন করেন। অন্যদিকে তিনিই ব্যথিত হয়ে ওঠেন শহরবাসীর ভিতর ধর্মীয় বিভেদ ও ধর্মাচরণের নিরর্থক বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করে। মানবতাবাদী এই ধরণের কবিতাগুলিই ছিল নিঃসন্দেহে তাঁর সর্বোত্তম রচনা। রাজপরিবার বা অভিজাত রমনীদের পাশে তাঁর কাব্যিক বর্ণনায় একইরকম উজ্জ্বল হয়ে আছেন শহরের সাধারণ মেয়েরাও। সমাজের সকল শ্রেণীর নারীদের রোজকার হাসি-কান্না, রঙিন স্বপ্ন, এমনকি কঠিন নানা সঙ্কটকেও সুললিত দখিনি উর্দু জুবানে সার্থকভাবে লিপিবদ্ধ করেছিলেন এই শায়রা।

যেহেতু আজও লুৎফুন্নিসার জীবন সম্পর্কে বিশদ কোন ঐতিহাসিক উপাদান উপলব্ধ হয়নি, তাই তাঁর মৃত্যু কালকেও সঠিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়না। তবু উপসংহারে খুব ক্লিশে হলেও বলাই যায় যে, মহান স্রষ্টারা তাঁদের মহতী সৃষ্টিরাজি নিয়ে সগৌরবে বেঁচে থাকেন সময়ের সব সীমানা পেরিয়ে। আর ঠিক সেই কারণেই বিগত দুইশতকের অগণিত ভারতীয় লেখিকার লিখন ও প্রকাশনা সংক্রান্ত সকল উদ্যম-উদ্যোগের শিকড়ে আলোকবর্তিকা হয়ে সদাসর্বদা রয়ে যাবেন দেশের প্রথম সাহিবান-এ-দিওয়ান অর্থাৎ প্রথম মুদ্রিত লেখিকা অষ্টাদশ শতকের শায়রা লুৎফুন্নিসা বেগম।

*লুৎফুন্নিসার প্রামাণ্য ছবি সম্ভবত পাওয়া যায়নি। হতে পারে কাল্পনিক, তবে যেহেতু নিম্নোক্ত গবেষণা নিবন্ধের সঙ্গে নিচের ছবিটি মুদ্রিত ছিল তাই এটিকেই বেছে নিয়েছি। অবশ্য অন্য কোন কৃতি ভারতীয় মুসলিম নারীর ক্ষেত্রেও ইন্টারনেটে/ফেসবুকে এই ছবিটির ব্যবহার দেখছি আজকাল।

* ওনার গজলগুলি উর্দু গজল/নজমের প্রখ্যাত সাইট rekhta.org এ পাওয়া যায়। পাঠক ইচ্ছুক হলে পড়তে পারেন।

Manual4 Ad Code

উৎস সূত্রঃ
১) Urdu’s First Woman Poet Remains Unsung – J.S. Ifthekhar
২) LutfunNisa Imtiaz : The First Women Poetess Of Hyderabad Deccan kamalp.blogspot.com
৩)https://www.rekhta.org/poets/lutfunnisa-imtiyaz/all