সাংবাদিকতার কারণে রোষানলে পড়ে আমাকে লন্ডনে পালিয়ে জীবন বাঁচাতে হয়েছে: আব্দুর রব ভুট্টো

প্রকাশিত: ১১:৪০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৬, ২০২৪

সাংবাদিকতার কারণে রোষানলে পড়ে আমাকে লন্ডনে পালিয়ে জীবন বাঁচাতে হয়েছে: আব্দুর রব ভুট্টো

Manual3 Ad Code
শ্রীমঙ্গলে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে দুই প্রবাসী সাংবাদিকের মতবিনিময়

সাংবাদিকতায় ঝুঁকি থাকবেই কিন্তু সৎ ও নিষ্ঠাবানরা হারিয়ে যাবেনা: সৈয়দ আমিরুজ্জামান

সাংবাদিকদের পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কাজ করার উদাহরণ স্থাপন করতে হবে: এম ইদ্রিস আলী


বিশেষ প্রতিনিধি | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ১৬ ডিসেম্বর ২০২৪ : নব্বই দশকের আলোচিত সাংবাদিক, লন্ডন বাংলা চ্যানেলের সম্পাদক আব্দুর রব ভুট্টো শ্রীমঙ্গলে এক মতবিনিময় সভায় বলেছেন, গেল সাড়ে ১৫ বছরে বাংলাদেশে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে শৃংখলিত করে রাখা হয়েছিল। সাংবাদিকতার অপমৃত্যু হয়েছিল৷ ভারতের মদদপুষ্ট স্বৈরাচার আওয়ামী দুঃশাসনে দেশের সাংবাদিকেরা স্বাধীন সাংবাদিকতা করতে পারেননি। সরকারের অন্যায়- অনিয়ম, দুর্নীতি, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যারাই কলম ধরেছে তাদেরকে ভয়াবহ নিপীড়ন-নির্যাতন, জেল জুলুম ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হতে হয়েছে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে কেবল সাংবাদিক নয়, তার পরিবারের সদস্যদেরও হয়রানি, তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অনেক সংবাদকর্মীকে খুন-ঘুমের শিকার হতে হয়েছে।

আব্দুর রব ভুট্টো বলেন, খুনি হাসিনার রোষানলে পড়ে তাকে গেল ১৫ বছর লন্ডনে পালিয়ে জীবন বাঁচাতে হয়েছে। এই পনের বছরে দেশে মা, শশুর-শাশুড়ী মারা গেলে, তাদের শেষ দেখটাও করতে পারিনি। লন্ডনে প্রবাসী জীবনে শেখ হাসিনা কুটনৈতিক চ্যানেলে বৃটিশ পুলিশকে দিয়ে তিন দফায় হয়রানি করার ঘটনা ঘটেছে। হতাশ হয়ে একসময় স্ত্রীর দাবী ছিল সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে দিতে। কিন্তু আল্লাহর উপর ভরসা রেখে আমার কলম কখনো বন্ধ করিনি।

Manual6 Ad Code

যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক আব্দুর রব ভুট্টো ও শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম ইদ্রিস আলীর স্বদেশ আগমন উপলক্ষে শনিবার (১৬ ডিসেম্বর ২০২৪) রাত ৮টায় শ্রীমঙ্গল শহরের গ্রান্ড তাজ রেস্টুরেন্ট এন্ড পার্টি সেন্টারে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

আব্দুর রব ভুট্টো আরও বলেন, নব্বই দশকে মৌলভীবাজার জেলার তুখোর সাংবাদিক আবদুর রব ভুট্টো সাড়ে ১৫ বছর পর সম্প্রতি দেশে ফেরেন। এছাড়া ২০২১ সালে করোনা মহামারী চলাকালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর পক্ষে স্থানীয় প্রেসক্লাবে করোনা সামগ্রী ও পিপিই বিতরনের অজুহাতে স্থানীয় আওয়ামীলীগ যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবে হামলা ও নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক এম ইদ্রিস আলীকে আজীবন বহিষ্কার করে থানায় মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ও শহরে মানহানিকর পোস্টারিং করে সামাজিক ভাবে তাকে ও তার পরিবার কে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়। সে কারণে তার স্ত্রী সরকারী প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষিকা ব্রেইন স্ট্রোক করেন। শুধু তাই নয় ইদ্রিসকে আওয়ামীলীগের সন্ত্রাসীরা শ্রীমঙ্গলে অবাঞ্ছিত ঘোষনা করে ক্ষান্ত হয়ন, সেদিন তার স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারেনি। তার মেয়েরা সেদিন হাসপাতালে নিয়ে যান। ১৮ দিন তিনি আইসিওতে থাকেন। এরপর ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগ সরকারের রোষানল থেকে মামলা হামলা ও প্রাণ বাঁচাতে আমেরিকা পাড়ি দেন। ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি সম্প্রতি দেশে ফেরেন। এর আগে শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের নির্বাহী কমিটি কর্তৃক এম ইদ্রিস আলীর বহিষ্কারাদের প্রত্যাহার করে তার সদস্য পদ ফিরিয়ে দেয়া দেন।
সাংবাদিক আব্দুর রব ভুট্টো শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম ইদ্রিস আলীর প্রতি ফ্যাসিষ্ট হাসিনা সরকারের নেয়া নিপীড়নমুলক পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে শ্রীমঙ্গলের সকল সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপনারা সেদিন কোনো ভুমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছিলেন, আপনারা তার জন্য কিছুই করেননি। কিন্তু উপরে আল্লাহ একজন আছেন। তিনি ন্যায় বিচারক। আজ দেশ থেকে হাসিনা একপ্রকার নগ্ন হয়ে বিতাড়িত হয়েছেন।’ তিনি বলেন, ৭১-এর বিজয় আওয়ামী লীগ ভারতের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল, যে কারনে এদেশের মানুষ স্বাধীনতার ফল ভোগ করতে পারেনি। ছাত্র জনতার অনেক ত্যাগের বিনিময়ে ২৪-এ অর্জিত এ স্বাধীনতা যেন আমাদের হাত ছাড়া না হয় তার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে’।

Manual1 Ad Code

 

শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আ ফ ম আব্দুই হাইয়ের সভাপতিত্বে ও দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি সাইফুল ইসলামের সঞ্চালনায় এ মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান; দৈনিক খোলা কাগজ নির্বাহী সম্পাদক মনির হোসেন, সাংবাদিক পলাশ চৌধুরী, ৭১ টিভির জেলা প্রতিনিধি আহমেদ ফারুক মিল্লাদ, সিনিয়র সাংবাদিক কাওছার ইকবাল, সিনিয়র ইসমাইল মাহমুদ, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সাবেক কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ ছায়েদ আহমেদ, দৈনিক সমকাল পত্রিকার প্রতিনিধি শামিম আক্তার মিন্টু, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন আরাফাত রবিন, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের যুগ্ম–সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর সালাউদ্দিন, বিশ্বজিৎ ভট্রাচার্য বাপন, দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার প্রতিনিধি এম এ রকিব, দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার প্রতিনিধি আনোয়ার হোসেন জসিম, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ এহসান বিন মুজাহির, দৈনিক শুভ প্রতিদিন পত্রিকার প্রতিনিধি আবুজার রহমান বাবলা, দৈনিক মৌমাছি কন্ঠ পত্রিকার প্রতিনিধি শাহাব উদ্দিন আহমেদ, সিনিয়র সাংবাদিক আতাউর রহমান কাজল, এম এ শুকুর, আমজাদ হোসেন বাচ্চু, দৈনিক জবাবদিহি পত্রিকার প্রতিনিধি শামসুল ইসলাম শামীম, দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার প্রতিনিধি শফিকুল ইসলাম রুম্মন প্রমুখ।

আয়োজিত এ সভায় অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। অপর তিনটি স্তম্ভ হচ্ছে, আইনসভা, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ। বোঝাই যাচ্ছে গণমাধ্যমের গুরুত্ব ও অবস্থান কোথায়! জনস্বার্থ অভিমুখী মুক্ত গণমাধ্যম ছাড়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পূর্ণতা পায় না। সরকার ও প্রশাসনের অসঙ্গতি ধরিয়ে দেওয়াসহ জনগণের সংগ্রামের সহযোদ্ধা হিসেবে গণমাধ্যমকে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হয়।
আসলে গণমাধ্যম হচ্ছে জনগণের সংগ্রামের সহযোদ্ধা, নীতি-আদর্শের যৌথ প্রচারক ও যৌথ আন্দোলনকারী, জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রের পাহারাদার। গণমাধ্যমই সঠিক পথ বাতলে দেয় যাতে সরকার, প্রশাসন ও জনগণ সঠিক পথে পরিচালিত হতে পারে। গণমাধ্যম সরকার, প্রশাসন ও জনগণের প্রতিপক্ষ নয়; তবে জনস্বার্থে নজরদারী করবে। কাজেই বলিষ্ট ও শক্তিশালী গণমাধ্যম ছাড়া জনস্বার্থের রাষ্ট্রব্যবস্থা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে না।
রাষ্ট্রের অন্য তিনটি স্তম্ভ নড়বড়ে হয়ে গেলেও চতুর্থ স্তম্ভ শক্ত থাকলে রাষ্ট্রকে গণমুখী রাখা যায়। আর চতুর্থ স্তম্ভ নড়বড়ে হলে রাষ্ট্রব্যবস্থা গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, রাষ্ট্র বিপদগ্রস্ত হয়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব আশাবাদী মানুষ। আঁধার কেটে নিশ্চয়ই আলো আসবে। কিন্তু সেটা কি প্রকৃতির নিয়মে হবে? কাউকে না কাউকে ভূমিকা পালন করতে হয়।
সাংবাদিকতায় ঝুঁকি থাকবেই। সজাগ ও সচেতন থাকলে সৎ ও নিষ্ঠাবান সাংবাদিকরা হারিয়ে যাবেনা। সাংবাদিকতার ডিকশনারি থেকে সততা ও পেশাদারিত্ব শব্দ দুটি কখনই বিলীন হবে না। সেখানে অসৎ আর হলুদ সাংবাদিকতার স্থান নেই।”

অনুষ্ঠানে শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম ইদ্রিস আলী তার বক্তব্যে আবু সাইদ, মুগ্ধদের মতো কোমলমতি হাজারো শহিদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, যদি জুলাই-আগস্টের বিপ্লব না হতো আজ দেশে ফিরে আসতে পারতাম না। মুক্ত স্বাধীন ভাবে কথা বলতে পারতাম না। সেদিন আমিসহ আমার পরিবারের ওপর ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের ও আওয়ামী দোসরদের নিপীড়নের ঝড় গিয়েছে তা এখনও আমাকে তাড়া দেয়। তাদের স্টিমরোলারে আমার স্ত্রী ব্রেইন স্ট্রোক করে। অথচ আমি হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারিনি। আমার বিরুদ্ধে মানহানিকর পোষ্টারিং শহরে অফিস পাড়ায় রেলস্টেশনে লাগিয়ে আমার পরিবারের সদস্যদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে। শুধু তাই নয় আমার সন্তানেরা স্কুল কলেজে যাওয়া বন্ধ হয়ে পড়েছিল। বিচার দেয়ার জায়গা পাইনি।

Manual8 Ad Code

তিনি স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের মাঝে -সকল ভেদাভেদ ভুলে নিজেদের অধিকার ও পেশাগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে জুলাই আগস্টের বিপ্লবের চেতনায় সকলে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

এসময় স্থানীয় সকল সাংবাদিকদের এক প্লাটফর্মে নিয়ে আসার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এ মতবিনিময় সভায় শ্রীমঙ্গলের কর্মরত প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সকল গণমাধ্যম কর্মীরা যোগ দেন।

 

Manual7 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ