বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্কের ৫০ বছর ও ভারতের সাত রাজ্যের সমুদ্রদর্শন: ভূরাজনৈতিক বাংলা ট্রায়াংগেল!

প্রকাশিত: ৯:৫৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১, ২০২৫

বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্কের ৫০ বছর ও ভারতের সাত রাজ্যের সমুদ্রদর্শন: ভূরাজনৈতিক বাংলা ট্রায়াংগেল!

Manual5 Ad Code

শরীফ শমশির |

কাকতালীয়ভাবে এবছর বাংলাদেশ- চীনের সম্পর্কের পঞ্চাশ বছর পূর্তি হলো আর তাকে স্মারক ধরে সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা চীন সফর করেন। এই সফরকে কেন্দ্র করে পক্ষে বিপক্ষে মতামত প্রদান অব্যাহত আছে। এই সফর বন্ধুত্বপূর্ণ হলেও শুধু বাংলাদেশ ও চীন নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশও এই সফরের দিকে নজর রেখেছে। বিশেষ করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রতো বটেই।

Manual1 Ad Code

সাম্প্রতিক সরকার পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক বেশ ঠান্ডা, এমনকি কথার উত্তেজনাও চলছে। গুজব এবং উভয় পক্ষের অপপ্রচার একটা ধোঁয়াশা পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ভারত গভীরভাবে তা পর্যবেক্ষণ করছে এবং বাংলাদেশ প্রথম দিকে চোখে চোখ রাখার কথা বললেও সম্প্রতি পররাষ্ট্র দপ্তর প্রায় মৌন বলা চলে কারণ এখন মঞ্চে চীন প্রবেশ করেছে।

সরকার পরিবর্তনের পর সবচেয়ে বেশি তৎপর ছিল চীনের রাষ্ট্রদূত। ইতিমধ্যেই তারা রাজনৈতিক দল ও সম্ভাব্য মিত্রদের বেইজিং ভ্রমণ করিয়ে এনেছে। এই তৎপরতার সর্বশেষ হলো প্রধান উপদেষ্টার সফর।
প্রধান উপদেষ্টা চীনে বেশ জনপ্রিয় তাঁর গ্রামীণ ব্যাংকের রেপ্লিকা প্রসারের জন্য। এই বিষয়ে তিনি আফ্রিকা এমনকি ভারতেও বেশ পরিচিত। তবে পার্থক্য হলো, এখন তিনি শুধু নোবেলজয়ী নন, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক ব্যক্তিত্বও বটে। আলোচনার জায়গা এখানেই। রাষ্ট্র আর রাষ্ট্রের সম্পর্ক ব্যক্তির সম্পর্কের চেয়ে অনেক জটিল ও বিপদজনক। সম্প্রতি তা আরও বেশি সত্য কারণ বাংলাদেশ একটা রাজনৈতিক ওলট-পালটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।

Manual1 Ad Code

চীন বাংলাদেশের বন্ধু ১৯৭৫ সালের পর থেকে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। ভারত- রাশিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল। তবে সব সম্পর্কই গতিশীল এবং পরিবর্তনশীল। এখন দাবার ছক একটু উল্টে গেছে। ভারত এখন কেবল প্রতিবেশী; কিছুটা বৈরিও মনে করেন অনেকে।

চীন বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চায় কিন্তু নতুন কিছু দিয়ে নয়, পুরনো প্রতিশ্রুতিকে ঝালাই করে মাত্র। গত সরকার চীনের উপর বেশ আশা ভরসা করেছিল। কিছু ডলার দিবে – রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য, এশিয়ান ইন্ফ্রাস্ট্টাকশনাল ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ দিবে – ইত্যাদি। বাংলাদেশের এই চীনমূখীতা ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ভালো চোখে দেখেনি। সরকারের পতনে তাই একজন সক্রিয় ছিল আরেকজন নিষ্ক্রিয় ছিল।

এই বিপদ যে কেটে গেছে তা নয়। রোহিঙ্গা সমস্যায় ভারত ও চীন এক। যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন মত। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের শুল্ক যুদ্ধ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা বলা মুশকিল।

এই ধরনের টালমাটাল পরিস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টা চীনে অনেক কথা বলতে গিয়ে ভারতের সাতবোন হিসেবে পরিচিত সাত রাজ্য ও বাংলাদেশের সমুদ্র নিয়ে একটা মন্তব্য করেছেন যা উত্তেজনার পারদকে বেশ উপরের দিকে নিয়ে গেছে। প্রধান উপদেষ্টার মন্তব্য বাংলাদেশে থেকে করলে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা দিত না কিছু চীনে গিয়ে করাতে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি হয়তো অধ্যাপকসুলভ ভঙ্গিতে বলেছেন কিন্তু তিনি তো প্রধান উপদেষ্টা; একটা রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তি।

Manual7 Ad Code

ভারতের সাত রাজ্য, নেপাল ও ভূটান স্থলবেষ্টিত – একথা সত্যি কিন্তু রাজনৈতিক অর্থনীতিতে তার সুযোগ সমুদ্র উন্মুক্ত করে দেয় এটাও সত্যি কিন্তু রাষ্ট্রনীতি ভিন্ন জিনিস।

চীন এখনো নেপাল ও ভূটানের ত্রেতা হতে পারেনি। সাত রাজ্যেরও ত্রেতা বাংলাদেশ চাইলেই পারবে না ; এটা উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের উপর নির্ভরশীল।

তাহলে, বাংলাদেশ চাইলেই, চট্টগ্রাম, মংলা ও অন্যান্য সমুদ্র বন্দরের সুবিধা সাত রাজ্যকে দিতে পারবে না। কারণ, বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর নয়। বাংলাদেশ একটা রাজনৈতিক রাষ্ট্র এবং খুব তরঙ্গায়িত। ফলে বাণিজ্য চাহিদা ও সরবরাহের উপর নির্ভর করবে না। নির্ভর করবে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক সম্পর্কের উপর। বাংলাদেশ এটা সম্ভব করতে চাইলে অবশ্য রাষ্ট্রনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়নে জোর দিতে হবে।

তবে একটা সতর্কতা মনে রাখতে হবে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা একটা গন্ডীর মধ্যে; এখনে অন্যান্য খেলোয়াড় হলো, ভারত ও মিয়ানমার। তারপর চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা। বাংলাদেশ যদি বাস্তব অবস্থা মাথায় না নেয় তবে বাংলাদেশ বারমুডা ট্রায়াংগেল হয়ে যেতে পারে। নিজের বিপদ নিজে ডেকে নিয়ে আসতে পারে।

মনে রাখতে হবে; সমুদ্র যেমন সম্পদ, সুযোগ তেমনি শত্রুরও আগমন পথ। এসেছিল, পুর্তগীজ বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সমূহ।
#
শরীফ শমশির
লেখক ও গবেষক।

Manual5 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ