সিপিবি’র কংগ্রেসঃ ডাকসু’তে বামদের বিভক্তি ও ছাত্রদের প্রতি অনুরোধ

প্রকাশিত: ১০:০৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৩, ২০২৫

সিপিবি’র কংগ্রেসঃ ডাকসু’তে বামদের বিভক্তি ও ছাত্রদের প্রতি অনুরোধ

Manual2 Ad Code

মঞ্জুরে খোদা টরিক |

জরুরী পরিস্থিতিতে জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ ছাড়া যে কোন সাধারণ-নিয়মিত কর্মকান্ড স্থগিত রাখা যায়। গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের পরিস্থিতি অনেকটা তেমনি ছিল, এখনো স্থিতিশীল হয়েছে এমনটা নয়। দেশের সেই পরিস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান কর্তব্য কি হওয়া উচিত ছিল? এই পরিস্থিতিতে একটি পরিষ্কার দিক নির্দেশনামুলক কর্মসূচী হাজির করে- ক্ষমতাকেন্দ্রীক বিকল্প শক্তি হয়ে ওঠার তৎপরতা চালানো। সেই কাজটিকে গুরুত্ব না দিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) তাদের সন্মেলনকে জরুরী কর্তব্য মনে করলো।

সেই লক্ষ্যে এই সেপ্টেম্বরে সন্মেলন করতে বছর ধরে তারা কাজ শুরু করলো। সন্মেলন রাজনৈতিক দলের নিজস্ব সাংগঠনিক কার্যক্রম। এর অনিয়নের জন্য তাদের দেশ-জাতির কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হবে না। এই সন্মেলনের যে মেয়াদউত্তীর্ণ হওয়ার কারণে হচ্ছে তাও নয়। জানা যায় সংগঠনের আভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে সন্মেলন নির্ধারিত সময়ের প্রায় বছরখানেক পূর্বেই তা করছে। কি এমন জরুরী বিষয় ছিল যে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে বিবেচনায় না নিয়ে এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হলো? সিপিবি’র সন্মেলন অতীতে অনেকবার রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে স্থগিত থেকেছে, পিছিয়ে গেছে। এখন তা করা গেল না কেন?

দেশের এই সংকটময় সময়ে উচিত ছিল পুরো দলকে নিয়ে একটি বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প রাজনৈতিক ধারা গড়ে তুলতে সামাজিক-সাংস্কৃতিক শক্তিকেও সংগঠিত করে একটি বৃহত্তর বলয় তৈরী করা। কিন্তু সেটা না করে তারা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন অভ্যুত্থানের পক্ষে-বিপক্ষে কে কতটা জোড়ালো অবস্থানে ছিলেন তা নিয়ে পারস্পারিক দোষারোপের রাজনীতিতে। তাতে কারা লাভবান হলো, হচ্ছে? লাভবান হচ্ছে অতি দক্ষিনপন্থী ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠী।

মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ভয়াবহ বিরোধ ছিল। তারা এক পক্ষ অন্য পক্ষ মুসলমান মনে করে না। একেঅন্যের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অভিযোগ আনতো, ফতোয়া দিতো সেই মৌলবাদী শক্তি তাদের বিরোধ মিটিয়ে কাছাকাছি এলেও সিপিবি-বামরা বিভক্তি ও কাঁদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত হলো।

যে হেফাজত হাসিনার শাসনামলে তাদের ঘনিষ্ট ছিল, যে আহলে হাদিস সুন্নাতের শতাধিক মাজার ধ্বংস ও লুট করা হলো, তারা এক সাথে সোহরোয়ার্দ্দীতে ঠিকই সমাবেশ করলো, এক সাথে নির্বাচন করার ঘোষণা্ও দিলো। তাদের সাংগঠনিক শক্তিও সকল বাম দলের চেয়েও বহুগুণ বেশি। তারা ভিন্নভিন্ন মাজহাব-ফিতনা নিয়েও ঐক্যবদ্ধ কিন্তু বামরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অবস্থান নিয়ে বিভক্ত।

Manual8 Ad Code

বামরা ইতিহাসের আরেকটি সুযোগকে হাতছাড়া করলো। মুক্তিযুদ্ধের পর ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বিপরীতে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল হয়ে ওঠা উচিত ছিল সেটা তারা হতে পারেনি। লীগের সাথে থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আরেকটি শক্তিশালী বিরোধী দল হতে পারেনি। সেটা হতে পারলে বাংলাদেশের ইতিহাস অন্যরকম হতো। সেটা ছিল সিপিবি’র ঐতিহাসিক ব্যর্থতা ও কর্তব্য নির্ধারণের অক্ষমতা।

৯০এর গণআন্দোলনের পরও বামদের একটা সুযোগ এসেছিল দ্বি-দলীয় ধারার বাইরে একটি বিকল্প বলয় গড়ে তোলার কিন্তু সেটাও হাতছাড়া হয়ে যায়। বামদলগুলো দুই বৃহৎ শক্তির ছায়ায় থেকে নিজেদের বিকাশ ও সুবিধার গ্রহণের কৌশলে- যে সম্ভবনাও ক্ষতিগ্রস্থ করলো।

Manual6 Ad Code

পরবর্তিতে পরিবারকেন্দ্রীক দ্বি-দলীয় ধারার বাইরে একটি বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় দুই-তিন দশক নানাভাবে চেষ্টা চলছে কিন্তু সেখানেও একই সংকট ছিল। বামদের একটি অংশ শাসক দলের সাথে অন্যটি বিরোধী দলের সঙ্গে, আরেকটি অংশ জোট-মহাজোটের বাইরে বিকল্পের প্রচেষ্টায় সংগ্রাম করেছে কিন্তু সফল হয়েছে তা নয়। সমাজে তারা কোন দৃশ্যমান ধারা-অবস্থান তৈরী করতে না পারলেও ধারাবাহিকতা রেখেছিল।

২৪এর অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার পতন ও দলটির সকল নেতাকর্মীদের পলায়ন ও আত্মগোপনের পরিস্থিতিতে দেশে ধর্মান্ধশক্তি ও দক্ষিনপন্থী রাজনৈতিক ধারার উত্থাণ ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকারেও তাদের প্রভাব লক্ষ্নীয়। সেই পরিস্থিতিতে অসাম্প্রদায়িক দক্ষিনপন্থী বিএনপি হয়ে ওঠে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ। এই দল ক্ষমতায় না থাকলেও তাদের নেতাকর্মীরা সারা দেশে সন্ত্রাস-দখল-চাঁদাবাজিতে যুক্ত হয়। এক কথায় ভিন্ননামে পতিত স্বৈরাচারের রিপ্লেসমেন্ট ঘটে। মানুষও অতীতের ন্যায় আশাহীন, ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে পড়ে।

Manual7 Ad Code

এই পরিস্থিতিতে একটি মধ্য-বাম ধারার বিকল্পের আকাঙ্খা-বাস্তবতা ছিল তীব্র কিন্তু সেটা হলো না। সেই না হওয়ার কারণ এই বলয়ের প্রধান ও প্রাচীন দল সিপিবি কর্তৃক উপযুক্ত কর্তব্য ও কৌশল নির্ধারণে ব্যর্থতা।

অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের দিকে মনোযোগ না দিয়ে- জুলাই ঘোষণা, জুলাই সনদ, সংস্কার, বিচার, সংবিধান রাখা না রাখাসহ নানা বিষয়ের সাথে বন্দর-করিডর, মার্কিন নীতির বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক দলগুলো রাখঢাকহীনভাবে মার্কিন প্রতিনিধির সাথে বৈঠক করছে। তারাই ঠিক করে দিচ্ছে দেশের সংস্কার-বিচার, নির্বাচন ও তাদের স্বার্থের বিষয়গুলি। হাসিনার পতনে পর মানুষের মধ্যে যে পরিবর্তনের আকাঙ্খা তৈরী হয়েছিল তা তাদের আশাহত করে।

একদিকে বাম নেতৃত্ব বলছে, বৃহত্তর ঐক্য ও নয়া যুক্তফ্রন্টের কথা অন্যদিকে নিজ সংগঠনে বিরোধ-বিভক্তি তা কি মশকরা নয়? জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথা বলে নিজ দলের অনৈক্য নিয়ে উদ্বেগহীনতা কি স্ববিরোধীতা নয়? কিন্তু এই পরিস্থিতি কাদের, কোন শক্তিকে মদদ যোগাচ্ছে, তা কি এই নেতৃত্বের অজানা?

এই পরিস্থিতিতে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। যাকে আমার স্বাভাবিক পরিস্থিতির কোন নির্বাচন মনে হয় না। তারপরো যেহেতু হচ্ছে তাকে বর্জন করার সুযোগ নেই। নির্বাচনেও আন্দোলন-সংগ্রামের অংশ। কিন্তু যেটি উদ্বেগের বিষয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও ধর্মান্ধ শক্তির উত্থান। দেশের যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভাষা, স্বাধীনতাসহ সকল স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে সেই বিশ্ববিদ্যালগুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী শক্তি জয়ী হবে তা মেনে নেয়া কঠিন।

তাদের প্রতিরোধ করার কি কোন ব্যবস্থা নেই? হয়তো ছিল বা আছে, সেক্ষেত্রে বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর এই বিপদ মোকাবেলায় যে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়ার কথা সেটা তারা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এখানে বামদের দু’টি প্যানেল খুবই অনভিপ্রেত, অপরিনামদর্শিতা ও কান্ডজ্ঞানহীনতা মনে করি।

কেন সেটা হতো পারলো না? সেখানে কি বাধা হয়ে দাড়ালো? বাধা হয়ে দাড়ালো হয়তো পদ-পদাবি, ছাড় না দেয়া ও অন্তর্ভূক্ত না করার মানসিকতা। এই ধরণের মানসিকতাকে বলা যায় ক্ষুদ্রতা ও দলীয় সংকীর্ণতা।

কিন্তু এরাই হয়তো ক্যাম্পাসে কবিতা আওড়ায়;
কমরেড মানে কৃষকের লোক, কমরেড মানে শ্রমিকের লোক,
কমরেড মানে বিশাল হৃদয় অগ্নিগর্ভ চোখ!

বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর যে সাংগঠনিক অবস্থা তাতে কি তাদের জয়ের সম্ভবনা আছে? অতীত অভিজ্ঞতা তা বলে না। তবু সবাই সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করলে একটা সম্ভবনা তৈরী হতে পারতো। এই সম্ভবনা বাড়িয়ে দিতে পারে যেহেতু ছাত্রলীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। তাদের অনেক সমর্থক আছে তারা যদি বামদের ভোট দেয় সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে পারে। হিন্দু, অন্যান্য ধর্ম, আদিবাসি, মেয়েদের ভোট এদের বাক্সে পড়তে পারে কিন্তু এই বলয়ের বিভাজন তাকে বিভক্ত করবে। সেটা নিশ্চয়ই কারো জন্য স্বস্তিকর নয়। তারপরেও এখানে আছে নানা সমীকরণ।

বাংলাদেশের ইতিহাসের শুধু নয়, ইসলামি ছাত্র শিবির/সংঘের প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম সংগঠনটি প্রকাশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচন করছে। যা গত জুলাইয়ের আগেও ছিল অকল্পনীয় কিন্তু গুপ্ত সাংগঠনিক কাজকর্মের মাধ্যমে তারা এই অবস্থা তৈরী করেছে। মানুষের ধর্ম বিশ্বাস তাদের সংগঠন ও ভোট আদায়ের একটি বড় কৌশল। তার সাথে আছে তাদের অর্থ, পেশি শক্তি, সরকার ও প্রশাসনের নিরব সমর্থন।

ডাকসুতে বামধারা আলোচনায় আছে সেটা একটা ইতিবাচক দিক কিন্তু সেটা জয়ী হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। আর বিজয়ী হলেও দেশে অনেক কিছু হয়ে যাবে তা নয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ছিল দেশের শীর্ষ সংগঠন। ছাত্র ইউনিয়ন কোন জোট করে’ এককভাবে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর প্রায় ৭৫ ভাগ কেবিনেটে বিজয়ী হয়েছিল। তারমানে তারা কি অনেক কিছু করে ফেলেছিল? না তা নয় তবে সমাজ-রাজনীতিতে একটি প্রভাব তৈরী করতে পেরেছিল।

বর্তমানে সকল বাম ছাত্র সংগঠন মিলে কি সেই অবস্থার কথা কল্পনা করতে পারে? না পারে না। তারপরো তারা কেন মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিপদের বিপরীতে ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না? তারা কি একে বিপদ মনে করছে না? ধর্মান্ধতাকে কি তারা হাসিনার চেয়ে কম বিপদ মনে করছে? তাহলে বলবো তাদের রাজনীতির পাঠ-স্কুলিংয়ে আছে মারাত্মক ঘাটতি।

ছাত্র সংগঠনগুলো নিয়ন্ত্রিত হয় তাদের অভিভাবক সংগঠন দ্বারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীয়াশীল সংগঠনের ক্ষেত্রে এর অন্যথা নয়। এই তরুণরা না হয় আবেগ-উত্তেজনায় অনেক কিছু করতে-বলতে পারে কিন্তু মূলনেতারা কি ভূমিকা পালন করছেন? তাদের ইন্ধন বা জানার বাইরে কি এগুলো ঘটছে? আমার মনে হয় না। সেটা না হলে এর দায় তাদের।

সিপিবি যেমন বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের আশু কর্তব্য নির্ধারণে ব্যর্থ ঠিক তেমনি ডাকসু নির্বাচনে বামদের একটি ঐক্যবদ্ধ প্যানেল দিতে না পারাও তাদের বড় ব্যর্থতা। ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষনে সময়ের চাওয়ার এই দায় মেটাতে না পারার মূল্য তাদের একদিন দিতে হবে।

২৫শে আগস্ট ডাকসুতে মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। হাতে এখনো তিনদিন সময় আছে। ছাত্র আন্দোলনের একজন সাবেক কর্মী হিসেবে সকলের প্রতি অনুরোধ, ভাষা, স্বাধীনতা, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম; সাহিত্য-সংস্কৃতি ও মুক্তিবুদ্ধি চর্চার (?) সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে- মৌলবাদী শক্তি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ প্যানেল প্রদান করুন।
#
———————-
মঞ্জুরে খোদা টরিক
সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।

 

Manual3 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ