হাইল হাওড়ে দখল–দৌরাত্ম্য: নিষিদ্ধ জাল, সেচে মাছ আহরণ ও প্রশাসনিক নজরদারির প্রশ্ন

প্রকাশিত: ২:৩৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৪, ২০২৫

হাইল হাওড়ে দখল–দৌরাত্ম্য: নিষিদ্ধ জাল, সেচে মাছ আহরণ ও প্রশাসনিক নজরদারির প্রশ্ন

Manual7 Ad Code

সৈয়দ আবু জাফর সালাউদ্দিন |

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওড় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যসম্পদ ভাণ্ডার। জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এ হাওড় শুধু অর্থনীতিতে নয়, স্থানীয় মানুষের জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশব্যবস্থার ওপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক বছরে হাওড়ের প্রকৃতি ও সম্পদের ওপর এমন নির্মম আঘাত নেমে এসেছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে—এখনই যার লক্ষণ স্পষ্ট।

Manual8 Ad Code

অবৈধ দখল ও মাছ শিকারের নতুন রূপ

হাওড়ের সরকারি জলমহাল নীতিমালার বাইরে গিয়ে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী কয়েক কিয়ার লিজ নেওয়ার পর সেটিকে অজুহাত বানিয়ে শত শত কিয়ার জায়গায় দখল বিস্তার করেছে। তারা বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখছে, বিলের পানি সেচে ফেলে মাছ আহরণ করছে এবং দিব্যি নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ব্যবহার করছে—যা সরাসরি পরিবেশ ধ্বংসের শামিল।

২ হাজার কিংবা ৩ হাজার কিয়ার সরকারি জলমহালকে কেন্দ্র করে কয়েক কিয়ার লিজ নিয়ে যে দৌরাত্ম্য চলছে, তা নজিরবিহীন। প্রজনন মৌসুমে কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরা শুধু মা মাছকে ধ্বংসই করছে না, বরং পুরো বংশবিস্তারের চক্র ভেঙে দিচ্ছে। হাওড়বাসী যখন ক্ষোভ নিয়ে পলো উৎসবে মাছ শিকার করছে, এর পেছনে রয়েছে এই দখলদারির দীর্ঘদিনের চাপের প্রতিক্রিয়া।

উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগ থাকলেও সমস্যা রয়ে গেছে

গত কয়েক মাস ধরে আমি হাওড় দখল ও অবৈধ মাছ আহরণের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে লিখে আসছি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যস্ততার মাঝেও উপজেলা প্রশাসন দু’বার অভিযান পরিচালনা করেছে। এতে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল, বানা ও বড় নেট উদ্ধার করে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়; এসি ল্যান্ডের নেতৃত্বে এসব অভিযান প্রশংসার দাবিদার।

কিন্তু অভিযান দুই-একবার হলেই কি দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্য কমে? বাস্তবতা হলো—এরা থেমে নেই। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে আগের মতোই হাওড়ের পানি সেচে মাছ আহরণ, নতুন করে বাঁধ নির্মাণ এবং জালের দৌরাত্ম্য অব্যাহত রেখেছে। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ—নিয়মিত নজরদারি না থাকলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে, ঠিক সেটাই এখন ঘটছে।

মৎস্য বিভাগ ও মাঠ প্রশাসনের দায়িত্ব প্রশ্নের মুখে

হাওড় অঞ্চলে মৎস্য কর্মকর্তার নিয়মিত পরিদর্শন কি হয়? তহশিলদার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নজরদারি ঠিক কতটা সক্রিয়? এমন গুরুতর প্রশ্ন এখন হাওড়ের মানুষের মুখে মুখে। স্থানীয়রা বহুবার ভিডিও, ছবি, তথ্য–উপাত্ত প্রশাসনের কাছে পাঠালেও দ্রুত ও ধারাবাহিক অ্যাকশন কেন হয় না—এটাই বড় প্রশ্ন।

ডিসি, ইউএনও, এসি ল্যান্ড—এরা সকলে বিষয়টি জানেন। তারপরও অভিযান নিয়ন্ত্রিত, সংখ্যা কম, আর অনিয়মকারীরা আরও সংগঠিত হয়ে উঠছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মৎস্যজীবী, যারা প্রজন্ম ধরে হাওড়ের ওপর ভরসা করে জীবন চালায়।

লীজ ব্যবস্থার আড়ালে প্রভাবশালীদের দখল

Manual7 Ad Code

মৎস্যজীবীদের নামে জলমহাল লীজ নিলেও প্রকৃতপক্ষে এর পেছনে থাকে শক্তিশালী রাজনীতিবিদ কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী। লিজকে ঢাল বানিয়ে তারা প্রকাশ্যেই অপরাধ করছে। ফলে প্রকৃত মৎস্যজীবী সমাজ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, জীবিকা হারাচ্ছে, আর জলমহালের মূল উদ্দেশ্য—মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ—ব্যর্থ হচ্ছে।

Manual7 Ad Code

রাজনীতির নোংরা খেলায় সত্য চাপা পড়ে যাচ্ছে

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাস্তব সমস্যাকে আড়াল করার চেষ্টা চলছে। একটি পক্ষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপপ্রচার চালাচ্ছে, যাতে অন্য পক্ষকে ঘায়েল করা যায়। কিন্তু এ নোংরা রাজনীতির খেলায় যে মূল সন্ত্রাসী, দখলদার ও অবৈধ শিকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে—এটাই সবচেয়ে বড় ভয়। এতে হাওড় দখল হবে, পরিবেশ ধ্বংস হবে এবং সাধারণ মানুষ মাছ আহরণের অধিকার হারাবে।

সমাধান কী?

১. নিয়মিত ও ধারাবাহিক অভিযান—সপ্তাহে একাধিকবার
২. মৎস্য বিভাগ, তহশিল অফিস ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ টাস্কফোর্স
৩. নিষিদ্ধ জাল ও সেচে মাছ শিকারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
৪. হাওড়ের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বিশেষ পরিকল্পনা
৫. লীজ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অগ্রাধিকার
৬. স্থানীয় গণমাধ্যম ও নাগরিকদের তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া

শেষ কথা

হাইল হাওড় শুধু একটি জলাশয় নয়—এটি শ্রীমঙ্গলের পরিবেশ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির প্রাণভোমরা। এটিকে দখলদারদের হাতে ছেড়ে দিলে একদিন হয়তো বইয়ের পাতায় ‘হাওড়ের মাছ’ থাকবে, কিন্তু বাস্তবে আর দেখা যাবে না।
এখনই সময়, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার। নয়তো হাওড় বাঁচবে না—বাঁচবে না মাটির মানুষও।
#
সৈয়দ আবু জাফর সালাউদ্দিন
যুগ্ম সম্পাদক, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব
প্রতিনিধি, দৈনিক যুগান্তর
শ্রীমঙ্গল।

Manual8 Ad Code

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ