সোনালি খাতুন এবং মাদুরো : দক্ষিণপন্থার দুই রূপ

প্রকাশিত: ২:৫৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৭, ২০২৬

সোনালি খাতুন এবং মাদুরো : দক্ষিণপন্থার দুই রূপ

Manual3 Ad Code

সৈয়দ তানভীর নাসরীন |

কলকাতা থেকে বর্ধমান যাওয়ার জন্য আমি যে এক্সপ্রেস ট্রেনে মাঝে মাঝে যাতায়াত করি, সেই বীরভূমগামী মা তারা এক্সপ্রেসের ভাড়া কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ৫ টাকা করে বাড়িয়ে দিয়েছে। কোনও প্রথম শ্রেণির সংবাদপত্রে আমি সেই খবর দেখিনি। হয়তো বা ট্রেন যাত্রীদের সমস্যা বা ট্রেন যাত্রীদের ভাড়াবৃদ্ধি নিয়ে আজকাল খবর করাটা আর নিয়ম নেই। ট্রেনে যেতে যেতে আমি ভাবছিলাম এবং আমার বাবার গড়ে দেওয়া অভ্যাস অনুযায়ী অনেকগুলো খবরের কাগজ কিনে পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, কোন কাগজই বা প্রথম পাতায় সোনালি খাতুনের মা হওয়ার সংবাদ প্রকাশ করেছে? এমনকি তথাকথিত মুসলিমদের স্বার্থের কথা বলা প্রথম সংবাদপত্রগুলো কি সোনালি খাতুনের মা হওয়ার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে? ভালো লাগল এবং একটু গর্বও হল আমাদের প্রেসিডেন্সি কলেজের সহপাঠী, সুনন্দ সরকার যে সর্বভারতীয় দৈনিকের রেসিডেন্ট এডিটর, সেই ইংরেজি দৈনিকটি, অর্থাৎ, টাইমস অব ইন্ডিয়া যেমন লিড করেছে উমর খালিদের জামিন না পাওয়ার খবরটি, তেমনই প্রথম পৃষ্ঠাতেই প্রকাশিত হয়েছে সোনালি খাতুনের মা হওয়ার খবর। এবং টাইমস অব ইন্ডিয়ার হেডলাইন মনে করিয়ে দিয়েছে, যে সোনালি খাতুনকে গর্ভবতী অবস্থাতেই বাংলাদেশের পুশব্যাক করা হয়েছিল এবং তারপরে ভারতবর্ষে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার পর তিনি একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। সোনালি খাতুনের মা হওয়ার খবর আমাকে নিজের মা হওয়ার পরে আর কতটা গর্বিত করল এবং কেন গর্বিত করল, সেটা বোধহয় কলকাতা শহরের ‘এলিট’রা সত্যিই বোঝেন না। সুখের কথা, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় মঙ্গলবার তাঁর বীরভূম সফরের সময় সোনালি খাতুনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন।

Manual6 Ad Code

টাইমস অব ইন্ডিয়ার রেসিডেন্ট এডিটর হিসেবে সুনন্দ সরকার যেটা পারেন বা তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেটা পারেন, সেটা অন্যরা কেন পারেন না? বীরভূমগামী ট্রেনে বসে এইসব ভাবতে ভাবতে প্রান্তিক মানুষদের কথপোকথন শুনতে শুনতে বুঝবার চেষ্টা করছিলাম, এই যে ‘এলিট’দের সঙ্গে প্রান্তিক মানুষদের দূরত্ব তৈরি হয়ে যাওয়া, সেটা কি দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকে এতটা বাড়বাড়ন্তের সুযোগ করে দিল, যে তাঁরা একজন ভারতীয় নাগরিককে, সোনালি খাতুনকে সমস্ত কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে পুশব্যাক করে দিতে পারে এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সামিরুল ইসলামের চেষ্টায় বা রাজ্যের শাসকদলের সমস্ত ধরনের প্রয়াসের পরে সোনালি খাতুন যখন ফিরে এলেন এবং তাঁর অবর্ণনীয় যন্ত্রণার কথা বললেন, তখনও সেই যন্ত্রণা আমাদের প্রথম শ্রেণির সংবাদপত্রগুলির বিষয় হয়ে উঠল না! ঠিক কতটা মুসলিম বিদ্বেষ থাকলে, ঠিক কতটা সংখ্যালঘু বিদ্বেষ থাকলে আপনি সোনালি খাতুনের সঙ্গে এই ধরনের আচরণ করতে পারেন! আর সমাজের মেইনস্ট্রিম মিডিয়া আর শহরের গড়িয়াহাট থেকে শ্যামবাজার পর্যন্ত উদ্বেলিত হওয়া জনআন্দোলন কতটা আসলে প্রান্তিক মানুষের থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকলে এই নিয়ে কোনও ঘণ্টাখানেক অনুষ্ঠানও হয় না কিংবা কলকাতায় কোনও সোল্লাস মিছিলও হয় না। সোনালি খাতুন যে আসলে যে সোনালি ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিতে পারে, সেটা কবে কলকাতার ‘এলিট’রা বুঝবেন? শীতের ভোরে, যে ভোরে কেউ ঘুম থেকে ওঠে না, সেই ভোরে মা তারা এক্সপ্রেস ধরে রাঢ় বঙ্গের দিকে যেতে যেতে এইগুলোই আমি ভাবছিলাম এবং বুঝতে পারলাম তথাকথিত প্রগতিশীল ‘এলিট’দের এই না চিনতে পারার দক্ষতাই শুধুমাত্র সোনালি খাতুনকে অসহায় পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল তাই নয়, তাদের এই উদাসীনতাই ট্রাম্পকে এতটা ক্ষমতা দিয়েছে যে, মাদুরো, একটি রাষ্ট্রের প্রধানকে সস্ত্রীক অপহরণ করে নিয়ে আসার মতো সাহস ডোনাল্ড ট্রাম্প দেখাতে পারছেন।

Manual2 Ad Code

অনেক দিন আগে, ঋতুপর্ণ ঘোষ আমায় বলেছিলেন, খুব স্বল্প আলাপেই মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, যে রামায়ণ-মহাভারত পড়েনি, সে ভারতবর্ষ বুঝতে পারবে না। আমি খুব বিনীতভাবে ঋতুদাকে বলেছিলাম, খুব ছোটবেলায় আমার দিদিমা, আমার সংস্কৃতজ্ঞ দিদিমা আমাকে রামায়ণ-মহাভারত পড়িয়েছিলেন। আমি রামায়ণ পড়েছি বলেই জানি, যে সীতাকে অপহরণই রাবণের সবচেয়ে বড় পাপ ছিল। যাঁরা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দেন, তাঁরা বোঝেন, যে নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে অপহরণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই জঘন্যতম কাজ আসলে ওই শ্রীরামচন্দ্রের ঘর থেকে সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার মতোই খারাপ কাজ, অর্থাৎ, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাবণের মধ্যে কোনও তফাত নেই। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই উন্মাদনা, দক্ষিণপন্থী রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত আসলে আমাদের কী দেখায়? দেখুন মাদুরোকে সব ধরনের সমঝোতা করেই তুলে আনা হয়েছে কিনা? কেন রাশিয়া এবং চিন চুপ? কেন লাতিন আমেরিকার দেশগুলি সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ আমরা দেখতে পারছি না?— সেগুলো খুব জরুরি প্রশ্ন। অর্থাৎ, মার্কিন দমননীতির সঙ্গে বা মার্কিন আধিপত্যবাদের সঙ্গে কে কে আপস করে নিল, সেটা চেনাটা জরুরি। কিন্তু একইসঙ্গে নিজেদের প্রশ্ন করাটা জরুরি, যে কেন, কেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সাহস দেখাতে পারছেন, যে একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে অতিক্রম করে সেই রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবং প্রেসিডেন্টের স্ত্রীকে তিনি নিউ ইয়র্কে তুলে আনতে পারছেন কোনও বাধা ছাড়া এবং তাঁর মতো করে বিচার করছেন। আমি জানি না নিকোলাস মাদুরোর স্ত্রীর ঠিক কী অপরাধ? তিনি কেন এক্ষেত্রে সীতার মতোই অপহৃত হলেন? এবং এই রাবণরূপী ডোনাল্ড ট্রাম্প আসলে কী কী ছারখার করে দিতে চাইছে, কোন জায়গায় আঘাত করছে, সেটা কি আমাদের দেশের ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে অভ্যস্ত ভক্তকুল বা রাজনীতিবিদরাও বোঝেন? যাঁরা আজ ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে নতজানু হচ্ছেন এবং ট্রাম্প বলে দিতে পারছেন, যে আমাকে খুশি না করলে আমি মোদির ভারতবর্ষের উপর আরও কর চাপাব, তাঁরা আসলে কী ভয়াবহ ভবিষ্যৎকে টেনে আনছেন, তা কি বোঝেন?

Manual5 Ad Code

যদি আপনি সোনালি খাতুনকে কেন পুশব্যাক করা হয়েছিল, কোন সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদ থেকে সেই কাজটি করা হয়েছিল তা বুঝতে পারেন, তাহলে বুঝতে পারবেন দক্ষিণপন্থী আধিপত্যবাদ ঠিক কোন জায়গায় পৌঁছেছে। যে আধিপত্যবাদের সঙ্গে, যে দর্পের সঙ্গে অমিত শাহ বাঙালি বা বাংলার মানুষদের অপমান করেন, সংখ্যালঘু মুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করতে চান, সেই একই ঔদ্ধত্য, অহংকার নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে আনতে পারেন। নিকোলাস মাদুরো ড্রাগ চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কিনা, তিনি জঙ্গিদের মদত দিতেন কিনা সেগুলো সবই অবান্তর প্রশ্ন। আসলে ডোনাল্ড ট্রাম্প বা মার্কিন আধিপত্যবাদের ভেনেজুয়েলার তেলের দিকে লক্ষ্য, যে তেল সৌদি আরবের চাইতে বড় ভান্ডারের কথা বলে, যে তেল আমেরিকাকে সব দিক থেকে রক্ষা করতে পারে। ঠিক যে কারণে বা যে ঔদ্ধত্য দেখিয়ে রাবণ সীতাকে অপহরণ করেছিলেন, সেই একই ঔদ্ধত্য দেখিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে অপহরণ করেছেন এবং নিউ ইয়র্কের রাস্তা দিয়ে বিচারের জন্য নিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু আজকে আমাদের দেশের বামপন্থীরা এতটাই দুর্বল আর পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম বা বামপন্থীরা এতটাই ‘রামভক্ত’ হতে ব্যস্ত, যে নিকোলাস মাদুরোর অপহরণের বিরুদ্ধেও তাঁরা গর্জে ওঠার তেমন প্রয়াস দেখাতে পারছেন না। সেই প্রয়াস না দেখানোটা যতটা রাজনৈতিকভাবে হারাকিরি, ঠিক ততটাই হারাকিরি সোনালি খাতুন যদি খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় স্থান না পায়। যে-কোনও প্রতিষ্ঠান আসলে টিঁকে থাকে এই প্রান্তিক মানুষগুলোর জন্য। যাঁরা গড়িয়াহাটে শপিং করেন না, যাঁরা আমার মতো প্রেসিডেন্সি – যাদবপুরে পড়েননি, যাঁরা মলে গিয়ে সিনেমা দেখতে পারেন না, যাঁরা ব্লকবাস্টার সিনেমা শব্দটাই শোনেননি, কিন্তু প্রতিদিন প্রতিদিন আমাদের সভ্যতার চাকাটাকে ঠেলে চলেছেন। সোনালি খাতুন সেই সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেন। সোনালি খাতুনের পুত্র সন্তান হওয়া বা সন্তান হওয়াটা আসলে একরকম ভারতাত্মার জয়। সেই ভারতাত্মাকে যাঁরা স্যালুট কর‍তে পারবেন না, সেই ভারতাত্মাকে যাঁরা স্বীকৃতি দিতে পারবেন না, তাঁরা আসলে ভারতবর্ষকে চেনেনই না। সেজন্যেই সোনালি খাতুনরা বারবার নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জিতিয়ে দেন বা এমন সত্যির উচ্চারণ করে যান, যে সত্যিকে কেউ চেনে না।
#
সৈয়দ তানভীর নাসরীন
অধ্যাপক
ইতিহাস বিভাগ
বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়
কলকাতা, ভারত।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ