সবার ভেতর প্রত্যেকের থাকা

প্রকাশিত: ৭:২৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৭, ২০২৬

সবার ভেতর প্রত্যেকের থাকা

Manual2 Ad Code

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী |

প্রত্যেকের ভেতর সবাই থাকে, নাকি সবার ভেতর প্রত্যেকে? দুটো থাকাই সত্য এবং উভয়েই স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত। মূল প্রশ্নটা আসলে ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির সম্পর্কের। সবার ভেতর প্রত্যেকে থাকবে— এ ব্যবস্থা স্বাধীনতার ভেতরই শুধ সম্ভব। থাকাটা ঘটবে রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিকভাবে।

সমষ্টি ব্যক্তিকে ধারণ করবে, লালন-পালন করবে, মুক্তি দেবে— এটা শুধু তখনই সম্ভব, যখন রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েই হয় গণতান্ত্রিক। আর গণতান্ত্রিক হওয়াটাই হচ্ছে প্রকৃত স্বাধীনতা। অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যক্তিকে গ্রাস করে ফেলে, তাকে আজ্ঞাবহ করে রাখে, তার ব্যক্তিসত্তাকে স্বীকৃতি দেয় না। সমষ্টি সেখানে ব্যক্তির শত্রু, নিপীড়ক ও শোষক।

অন্যদিকে প্রত্যেক ব্যক্তির ভেতরই কোনো না কোনোভাবে সবাই থাকে। সেটা প্রত্যক্ষ হোক কিংবা হোক অপ্রত্যক্ষ। সবার যে সমষ্টিগত রূপ, সেটাই তো রাষ্ট্র ও সমাজ। আর আমরা কে কবে রাষ্ট্রের বাইরে যেতে পেরেছি বা পারব, তা স্থানের দিক থেকে দেশের ভেতরেই থাকি, অথবা থাকি অতি দূরদেশে।

Manual4 Ad Code

সমাজের সংস্কৃতি, রাষ্ট্রের ধ্যানধারণাকে আমরা সঙ্গে নিয়েই চলি। তারা থাকে আমাদের অভ্যাসে, আচার-আচরণ ও চিন্তাধারায়। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজ যদি স্বাধীন না হয়, হয় যদি তারা স্বৈরাচারী, অগণতান্ত্রিক একনায়ক অথবা ধনিক শ্রেণির দ্বারা শাসিত, তাহলে আমরা, রাষ্ট্র ও সমাজের সদস্যরা, স্বাধীনতা ভোগ করছি, এমনটা বলার উপায় থাকে না। বিপরীতে রাষ্ট্র ও সমাজ যদি স্বাধীন হয়, তাহলে ওই যে আমাদের প্রত্যেকের জীবনে তার উপস্থিতি, সেটা আমাদের বন্দি করে না, উল্টো মুক্তি দেয়।
স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র তাই অত্যন্ত অন্তরঙ্গভাবেই পরস্পর নির্ভরশীল।

প্রকৃত স্বাধীনতারই অন্য নাম হচ্ছে মুক্তি। গণতন্ত্র নেই অথচ স্বাধীনতা আছে, এমন কথা বলার উপায় নেই। আমরা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছি, প্রথমে ব্রিটিশকে, পরে পাকিস্তানিদের তাড়িয়েছি, তাই বলে আমরা কি বলতে পারব যে আমরা যথার্থ অর্থে স্বাধীন হয়েছি? না, পারি না। না পারার কারণ, আমরা গণতন্ত্র পাইনি।
গণতন্ত্রের পরিবর্তে বৈধ-অবৈধ নানা কিসিমের ও নানা নামের স্বৈরশাসন পেয়েছি। আমাদের মুক্তির সংগ্রাম শেষ হয়ে গেছে— এ কথা বলাটা তাই মস্ত বড় আত্মপ্রবঞ্চনা, অথবা বিভ্রান্তি সৃষ্টির সচেতন অপপ্রয়াস।

Manual7 Ad Code

এটা তো আমাদের অবশ্যই জানতে ও মানতে হবে যে সবার মুক্তি না ঘটলে প্রত্যেকের মুক্তি কিছুতেই আসবে না। সবার সেই মুক্তির জন্য আমাদের প্রত্যেককেই সচেষ্ট হতে হবে। বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্তভাবে নয়, ঐক্যবদ্ধ হয়ে।

Manual6 Ad Code

স্বাধীনতার যুদ্ধ একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তাকে তখনই শেষ হতে দেওয়া উচিত হয়নি। দরকার ছিল তাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং দেশে তেমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সবাই মুক্ত হয়ে প্রত্যেকের জন্য মুক্তি নিশ্চিত করবে। মুক্তিসংগ্রাম যে শেষ হয়নি সেটা বুঝে নেওয়া। তা করা হয়নি। যে জন্য গণতন্ত্র আসেনি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তানিরা তাদের স্বার্থে নিজেদের এবং সারা বিশ্বের কাছে চিহ্নিত করতে চেয়েছিল গৃহযুদ্ধ বলে। এত বড় মিথ্যা প্রচারণা তো আর হয় না। কিন্তু দেশ স্বাধীনতার এত বছর পরে এখন তো দেখছি তা-ও তো খুব আশাপ্রদ নয়। শ্রেণিতে শ্রেণিতে যুদ্ধ নয়, সেটা ঘটলে তা-ও তো একটি নিষ্পত্তিতে গিয়ে পৌঁছাবে বলে আশা করা যেত এবং আশাটা হতো জনগণের বিজয়ের ভেতর দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। যুদ্ধটা এখন চলছে পথেঘাটে, দোকানে-বাজারে, অফিসে-আদালতে, রাজনীতিতে তো অবশ্যই, এমনকি ঘরের ভেতরেও। গৃহাভ্যন্তরে নারীর ওপর নৃশংসতায় তো জানা গেল বাংলাদেশ ইতিমধ্যে সারা বিশ্বে উদ্বেগ ও অসম্মানজনক অবস্থান অধিকার করেছে। মেয়েরা রুখে দাঁড়ায় না বলেই হয়তো রক্তপাতের খবর তেমন পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে পর্দাপ্রথা খুবই কার্যকর বটে।

আমাদের কালে আদর্শলিপির বইতে এবং পাঠ্যপুস্তকেও নানাবিধ উপদেশাবলি পাওয়া যেত। এগুলোর একটি ছিল, ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’ ব্যাপারটাকে তখন কেমন মনে হতো স্মরণে নেই, কিন্তু এই প্রবীণ বয়সে মনে হয়, উপদেশটা যতই উদ্দীপক হোক না কেন, মোটেই সঠিক ছিল না। একটা মোটা সত্য তো এই যে প্রত্যেক মানুষই আসলে নিজের তরে। আমার যে বন্ধুটি দীর্ঘকাল ধরে আমেরিকায় বাস করেন এবং মনেপ্রাণে খাঁটি ও বিশ্বাসযোগ্য বাঙালি, তিনি প্রায়ই আমাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে অন্য সব প্রাণীর মতো মানুষও অত্যন্ত আত্মস্বার্থসচেতন। তা সে সত্যটা অস্বীকার করে কোন মূর্খে? এবং সেটা স্বীকার করে নিয়েই তো আমরা আজও প্রকৃত স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখি। কেবল স্বপ্ন দেখি না, রাষ্ট্র ও সমাজে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে সংগ্রাম করে থাকি। তাহলে? হ্যাঁ, মানুষ স্বার্থপর প্রাণী ঠিকই, কিন্তু মানুষ আবার মানুষও। তার ভিতরে এই বোধটুকুও কার্যকর রয়েছে যে অপরের সঙ্গে না মিললে অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা না পেলে তার পক্ষে উন্নতি করা তো দূরের কথা, বেঁচে থাকাটাও সম্ভব হবে না।

যথার্থ কথাটা যদি এমন হয় যে প্রত্যেকেই আমরা নিজের তরে, তাহলে উচ্চৈঃস্বরে সেটা বলাতেও আপত্তি দেখি না। কেননা নিজের তরে হওয়ার জন্যই তো পরের তরে হতে হবে। নিজে স্বাধীন হওয়ার প্রয়োজনেই সবাইকে স্বাধীন করা দরকার। নির্বুদ্ধিতা ও অন্ধত্ব পরিহার করে আমরা যদি নিজেকে মুক্ত করতে চাই, তাহলে সবার সঙ্গে মিলিত না হয়ে কোনো উপায় নেই। এবং সেই মিলন স্থবির বা স্থিতিশীল হবে না, তাকে যেতে হবে সামনে। সর্বদাই থাকবে সে চঞ্চল এক অভিযাত্রী।

আরেকটি প্রবাদবাক্যও স্মরণযোগ্য। সেটা শুধু আমাদের এখানে নয়, সারা বিশ্বেই প্রচলিত। সেটা হলো দশের লাঠি একের বোঝা। এটাও ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির সম্পর্কবিষয়ক একটি প্রস্তাবনা বৈকি। কথাটা সত্য। দশজনে বহন করলে কোনো বোঝাই আর বোঝা থাকে না। অত্যন্ত সহজ হয় বহন করা। আর সবাই মিলে কাজ করলে বিরোধী থাকবে না, বৈরিতার অবসান ঘটবে, উৎপাদন ও বিতরণের ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আসবে। পরস্পরকে শ্রদ্ধা করতে শিখে, ভালোবেসে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে আমরা মর্যাদাবান হব। আমাদের দুর্দশা ঘুচবে, অবনতির দিক থেকে শীর্ষস্থান অধিকারের গ্লানিকর পরিস্থিতির অবসান ঘটবে।

লাঠি প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের সেই অবিস্মরণীয় উক্তিটি স্মরণ না করে উপায় থাকে না। ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসে তিনি লিখেছেন, ‘হায় লাঠি! তোমার দিন গিয়াছে।’ কিন্তু সত্যি কি তাই? লাঠির কি দিন চলে গেছে, নাকি তার উন্নতি ঘটেছে এবং উন্নত হয়ে অত্যন্ত পরাক্রান্ত, অনেক ক্ষেত্রে খুবই সূক্ষ্ম মারণাস্ত্রে পরিণত হয়েছে? সর্বত্রই তো লাঠি মারামারি অর্থাৎ অস্ত্রের খেলা চলছে। আমরাও খেলছি। কিন্তু প্রকৃত শত্রুকে চেনা হচ্ছে না। তাই আঘাত করছি পরস্পরকে এবং ক্ষতবিক্ষত হচ্ছি নিজেরাই।

আমার আমেরিকাপ্রবাসী সজ্জন বন্ধুটি প্রতিবছরই একবার করে দেশে আসেন। এসে মন খারাপ করেন। দেশে যে তাঁর বিপুল পরিমাণ বিষয়সম্পত্তি রয়েছে, তা নয়। দেশে আসেন দেশের মানুষকে ভালোবাসেন বলে। এবং অবস্থা দেখে খুবই দুঃখ পান। আমি তাঁকে পুঁজিবাদের কর্মতৎপরতার কথা বলি। তিনি সেটা বুঝেও বুঝতে চান না। তিনি বলেন, আমেরিকায় বসবাসের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে সরাসরি জানেন যে পুঁজিবাদেরও অনেক ভালো দিক রয়েছে।

আমি সেটা অস্বীকার করি না। কিন্তু বোঝাবার চেষ্টা করি যে পুঁজিবাদের পক্ষে এখন আর ভালো কিছু দেওয়ার নেই। তিনি মানেন সেটা। কিন্তু পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রশ্নে সাড়া দেন না। হয়তো ভেতরে ভেতরে তিনি জাতীয়তাবাদীই রয়ে গেছেন। হয়তো ভাবেন, আর এগোলে এমন নৈরাজ্য দেখা দেবে, যেটা নিয়ন্ত্রণে আনা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাহলে কী করতে হবে? জবাবে সংস্কারের কথা বলেন, যেসব কথা অনেক শুনেছি। সংস্কারে যদি কাজ হতো তাহলে তো যুদ্ধে যাওয়ার দরকার হতো না। তিনি নিজেও কিন্তু যুদ্ধে গিয়েছেন, একাত্তরে।

আরেকজনের সঙ্গেও কথা হয়। তিনি পুঁজিবাদে নন, সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। একাত্তরে তিনিও যুদ্ধে ছিলেন। কিন্তু মতাদর্শিক প্রবণতায় ছিলেন মস্কোপন্থি।

তাঁর মূল জিজ্ঞাসাটা হলো, আন্দোলন তো করবেন, কিন্তু তহবিল আসবে কোত্থেকে? শুনে বড়ই বিচলিতবোধ করি। তহবিলের অভাবে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন থেমে গেছে, এমন সংবাদ তো কোথাও পাইনি। তাঁর অভিযোগ যে সবাই জিজ্ঞাসা করে, লড়াই-সংগ্রাম তো অনেক করলাম, কিন্তু আমি কী পেলাম? এখানটায় তাঁর রোগ নির্ণয় সম্পূর্ণ নির্ভুল। আমি কী পেলাম, এ প্রশ্নটা অমীমাংসিত বটে। তাঁরা নিজেকে সবার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে অপারগ। সবার মধ্যেই যে ব্যক্তির মুক্তি নিহিত রয়েছে, এই অতিসাধারণ সত্যটিকে তাঁরা ধরতে পারেন না। কিন্তু আমি তো এটাও বিশ্বাস না করার কারণ দেখি না যে ওই যে প্রবীণ সমাজতন্ত্রী তহবিলের দুশ্চিন্তায় কাতর থাকছেন, সেটাও তাঁর মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট পুঁজিবাদী ব্যাধিরই লক্ষণ। কথাটা দাঁড়াচ্ছে এই যে সবার মুক্তির যে সংগ্রাম, সেটা শেষ হয়নি। সেটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের অপরিহার্য কর্তব্য।
#

ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
লেখক :
ইমেরিটাস অধ্যাপক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Manual1 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ