অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলোর কি ‘মৃত্যু’ আসন্ন?

প্রকাশিত: ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলোর কি ‘মৃত্যু’ আসন্ন?

Manual3 Ad Code

শাহদীন মালিক |

অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলোর কি ‘মৃত্যু’ আসন্ন?
বিলুপ্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অতি উৎসাহী হয়ে ডজন ডজন অধ্যাদেশ জারি করেছিল। আইন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম দেড় মাসে, অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৪৫ দিনে সরকার ৩৬টি অধ্যাদেশ জারি করে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি দেড় দিনের কম সময়ে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।

২০২৫ সালে জারি হয়েছিল ৮০টি অধ্যাদেশ; অর্থাৎ গড়ে প্রতিটি অধ্যাদেশের জন্য সময় লেগেছিল সাড়ে ৪ দিনের মতো। আর ২০২৪ সালে ১৩ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জারি হয়েছিল ১৭টি অধ্যাদেশ। প্রতিটি অধ্যাদেশের জন্য গড়পড়তা সময় লেগেছিল ৯ দিনের মতো।

স্পষ্টতই যত দিন গেছে, অধ্যাদেশ জারির দক্ষতা এন্তার বৃদ্ধি পেয়েছে। এটাই স্বাভাবিক। কেননা একই কাজ করতে করতে বা বারবার করলে সাধারণত দক্ষতা ক্রমান্বয়ে প্রস্ফুটিত হয়।

প্রতিটি অধ্যাদেশের প্রারম্ভে যে মোদ্দা কথাটি বলা আছে, তা হলো সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশগুলো জারি করেছেন। ৯৩ অনুচ্ছেদে মোটাদাগে যে কথাটি বলা আছে, সেটি হলো সংসদ অধিবেশনে না থাকলে অথবা সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় ‘যদি…রাষ্ট্রপতির নিকট আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে…তিনি অধ্যাদেশ জারি করতে পারবেন।’

এর অর্থ, স্পষ্টতই রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ১৩৩ বার ‘আশু ব্যবস্থা’ গ্রহণের প্রয়োজন ‘উপলব্ধি’ করেন। বলা বাহুল্য, আসল ‘উপলব্ধিটা’ হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর এবং তাঁদের পরামর্শক্রমেই এত এত অধ্যাদেশ জারি হয়েছে।

Manual7 Ad Code

২.
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তো চলে গেছে; এখন অধ্যাদেশগুলোর কী হবে? আর ধারণা, বেশির ভাগ নাগরিকই মনে করছেন, নতুন সংসদ বেশির ভাগ অধ্যাদেশকেই আইন হিসেবে পাস করিয়ে অধ্যাদেশগুলোর কার্যকারিতা চলমান রাখবে। কিন্তু এখানে একটা বড় ‘প্যারা’ আছে।

সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদটি বড়ই বেরসিক। প্রথমত, রাষ্ট্রপতি প্রয়োজন মনে করলেও ৯৩ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতির জন্য তিন-তিনটি সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। সেগুলো হলো—(ক) সংসদ যে আইন সংবিধান অনুযায়ী প্রণয়ন করতে পারে না, সেই রকম আইন রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ রূপে জারি করতে পারবেন না; (খ) অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধানের কোনো বিধানকে সংশোধন অথবা বিলুপ্ত করা যাবে না। যেমন রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী দুই মেয়াদের বেশি থাকতে পারবে না—এমনটি করা যাবে না; (গ) পূর্বের অধ্যাদেশের কার্যকারিতা বহাল বা চলমান রাখার জন্য নতুন অধ্যাদেশ জারি করতে পারবেন না।

তর্কের খাতিরে যেকোনো ব্যক্তি দাবি করতে পারেন, প্রণীত ১৩৩টি অধ্যাদেশের কোনোটিই এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেনি অথবা দিলদরিয়া মানুষ হলে হয়তো মেনে নেবেন যে দু-চারটা অধ্যাদেশ এই সীমা লঙ্ঘন করেছে। সে কারণে দু-চারটা অধ্যাদেশ বাতিল হলেও হতে পারে। অর্থাৎ বেশির ভাগ অধ্যাদেশই বহাল তবিয়তে বিদ্যমান থাকবে।

রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য অধ্যাদেশ জারি করা কোনো বিচারেই মোক্ষম ব্যবস্থা নয়। এই অধ্যাদেশগুলোর অধীনে কিছু কার্যক্রম, পদক্ষেপ, নিয়োগ বা পুরোনো কোনো কার্যক্রম বাতিল করা হয়েছে। তবে এই অধ্যাদেশগুলোর কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেলে, এসব অধ্যাদেশের অধীনে সূচিত বা গৃহীত কার্যক্রমের পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে নিকট ভবিষ্যতে প্রচুর তর্কবিতর্ক হবে।

৩.
তবে বড় ঝামেলা বাধিয়েছে ৯৩ অনুচ্ছেদের উপ–অনুচ্ছেদ (২)। এই উপ–অনুচ্ছেদ (২) হয়তো বেশ কিছু সাধারণ পাঠকের জন্য গোলমেলে বা জটিল মনে হতে পারে। তাই আমরা চেষ্টা করব ভেঙে ভেঙে একটা সহজ বয়ান তৈরি করার।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে—যখন সংসদ অধিবেশন থাকে না অথবা ভেঙে দেওয়া হয়, কেবল তখনই রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। আগামী ১২ মার্চ নতুন বা ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে। উপ–অনুচ্ছেদ (২)–এর নির্দেশনা হলো—সংসদ অধিবেশন বসার প্রথম দিনই জারি করা অধ্যাদেশগুলো সংসদে উপস্থাপন করতে হয়। সেই অনুযায়ী ১৩৩টি অধ্যাদেশের সব কটি বিবেচনার জন্য ১২ মার্চ সংসদে উপস্থাপিত হবে। এরপর কী হবে?

উপ–অনুচ্ছেদ (২) অনুযায়ী সংসদের জন্য তিনটি রাস্তা খোলা আছে। উপস্থাপনের দিনই সংসদ সব অধ্যাদেশ একযোগেই বাতিল করতে পারে। প্রথম দিনই বাতিল না করলে সংসদের দ্বিতীয় করণীয় হলো ক্রমান্বয়ে, যেমন প্রথম দিন ৫টি; তার দু-তিন দিন পর আরও ১০টি এবং পরবর্তী সপ্তাহে আরও ২০টি—এভাবেও অধ্যাদেশগুলো বাতিল করতে পারে।

আর যদি অধ্যাদেশগুলো প্রথম দিনে অথবা ক্রমান্বয়ে বাতিল না করা হয় বা কয়েকটি বাতিল হয় আর কয়েকটি সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তই না নেওয়া হয়, তাহলে উপ–অনুচ্ছেদ (২) অনুযায়ী প্রথম সংসদ অধিবেশনের ৩০ দিনের মাথায় যেগুলো বাতিল হলো, আর যেগুলোর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, তার সব কটি অধ্যাদেশেরই ‘কার্যকারিতা লোপ পাইবে’। সোজা কথায়, সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মাথায় সব অধ্যাদেশই নির্বিশেষে ‘মারা’ যাবে!

৪.
তাহলে করণীয় কী? ধরে নিচ্ছি নতুন সংসদ হয়তো চাইবে কিছু অধ্যাদেশের কার্যকারিতা বহাল থাকুক। যে অধ্যাদেশগুলোর কার্যকারিতা বহাল রাখা হবে, সেগুলোকে নতুন করে সংসদের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নতুন আইন হিসেবে সংসদকে পাস করতে হবে।

মোটাদাগে, এই প্রক্রিয়ায় থাকবে—সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দ্বারা এই আইনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে একটি সারসংক্ষেপ তৈরি; সারসংক্ষেপটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদে উপস্থাপন এবং মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক অনুমোদন। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আইনটির খসড়া প্রস্তুত করবে এবং খসড়াটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আবার মন্ত্রিপরিষদের সভায় পেশ করা হবে।

মন্ত্রিপরিষদের খসড়া অনুমোদনের পর, প্রয়োজনে ভাষা, ব্যাকরণ ইত্যাদি ঘষামাজা করে বিল হিসেবে ছাপার জন্য সরকারি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হবে এবং ছাপা কপি সংসদে উপস্থাপনের আগে সব সংসদ সদস্যের কাছে পাঠানো হবে। এরপর নির্দিষ্ট দিনে সংসদে বিবেচনার জন্য বিলটি উপস্থাপন করা হবে।

সংসদে আলোচনার ও তর্কবিতর্কের কয়েকটি ধাপ বা ঘাট আছে, যার বিস্তারিত এই মুহূর্তে প্রয়োজন নেই। এসব ধাপ ও ঘাট পেরিয়ে সংসদে বিলটি পাস হলে, তা পাঠানো হবে রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর আইন হিসেবে এটি প্রকাশিত হবে এবং তখন আমরা সেই আইনগুলো মানতে বাধ্য।

Manual5 Ad Code

শেষের কথা, ধারণা করা যায় যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হয়তো ভেবেছিল, অধ্যাদেশ জারি করলেই সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু তারা সম্ভবত খেয়াল রাখেনি, এই অধ্যাদেশগুলো স্বল্পমেয়াদি বা টেম্পরারি। একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর, অর্থাৎ পরবর্তী সংসদের অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে, সব অধ্যাদেশই বিলোপ হয়ে যাবে।

রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য অধ্যাদেশ জারি করা কোনো বিচারেই মোক্ষম ব্যবস্থা নয়। এই অধ্যাদেশগুলোর অধীনে কিছু কার্যক্রম, পদক্ষেপ, নিয়োগ বা পুরোনো কোনো কার্যক্রম বাতিল করা হয়েছে। তবে এই অধ্যাদেশগুলোর কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেলে, এসব অধ্যাদেশের অধীনে সূচিত বা গৃহীত কার্যক্রমের পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে নিকট ভবিষ্যতে প্রচুর তর্কবিতর্ক হবে।

Manual6 Ad Code

গত ৫৪ বছরে আইনের এই জটিল প্রশ্ন দুটি রায়ে খোঁজা হয়েছে। একটি হলো সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বনাম নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল (১৯৮১); আরেকটি হলো শরিয়তুল্লা বনাম বাংলাদেশ (২০০৯)। এ ছাড়া আরও এক-দুটি মামলায় সংক্ষিপ্ত আলোচনা আছে। কিন্তু এই নজিরগুলো আইনি জটিলতা নিরসনের জন্য যথেষ্ট নয়।

এত এত অধ্যাদেশ জারি করে যে জটিলতা তৈরি করা হয়েছে, তা না করলেই অন্তর্বর্তী সরকার ভালো করত। হুটহাট আইন করার চেয়ে না করাই শ্রেয়।
#

Manual6 Ad Code

শাহদীন মালিক
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

[২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে লেখাটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলোর পরিণতি কী—শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।]

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ