ধর্মীয় মৌলবাদ আধুনিক একটি ঘটনা: সাক্ষাৎকারে ইয়ুর্গেন হাবেরমাস

প্রকাশিত: ১:৪৪ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৩, ২০২৬

ধর্মীয় মৌলবাদ আধুনিক একটি ঘটনা: সাক্ষাৎকারে ইয়ুর্গেন হাবেরমাস

Manual3 Ad Code
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বোর্হা এরমোসো |

বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক, সমাজতাত্ত্বিক এবং জার্মানির অন্যতম প্রধান বুদ্ধিজীবী ইয়ুর্গেন হাবেরমাস ১৪ মার্চ মারা গেছেন। হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্যেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটের পরিচালক হাবেরমাসের বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর ভাবনা সাম্প্রতিক চিন্তাজগৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। স্পেনের পত্রিকা এল পাইস-এর ইংরেজি সংস্করণ থেকে বোর্হা এরমোসোর নেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করা হলো। অনুবাদ করেছেন সুমন রাহমান।

প্রশ্ন: দায়িত্বশীল বুদ্ধিজীবীদের অবক্ষয় নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়ে থাকে। আপনি কি মনে করেন এসব আলোচনা বুদ্ধিজীবী মহলের বাইরে খুব একটা যায় না?

ইয়ুর্গেন হাবেরমাস: ফরাসি মডেলের দিকে—জোলা থেকে সার্ত্র এবং বুর্দিয়ে পর্যন্ত—লক্ষ করলে দেখা যাবে, জনপরিসর বুদ্ধিজীবীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর দুর্বল কাঠামো এখন দ্রুত ভেঙে পড়ছে। ‘বুদ্ধিজীবীরা সব কোথায় হারিয়ে গেল?’—এই নস্টালজিক জিজ্ঞাসা আসলে মূল বিষয়টি ধরতে অপারগ। দায়িত্বশীল বুদ্ধিজীবী পাওয়া যাবে না যদি তাঁদের ধারণাগুলো শোনার মতো পাঠক না থাকে।

প্রশ্ন : ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যম দাঁড়িয়ে থাকে জনপরিসরের মদদের ওপর। ইন্টারনেট কি সেই জনপরিসর দুর্বল করে দিয়েছে এবং দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের ওপরও প্রভাব ফেলেছে?

Manual3 Ad Code

হাবেরমাস: হ্যাঁ। হাইনরিখ হাইনের সময় থেকে বুদ্ধিজীবীর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। কারণ, তখন উদার জনপরিসরের একটি বিশেষ অবকাঠামো ছিল। এই অবকাঠামোর জন্য বেশ কিছু দুরূহ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শর্ত পূরণ অপরিহার্য—যেমন সচেতন সাংবাদিকতা, মানসম্পন্ন সংবাদপত্র এবং এমন গণমাধ্যম যা রাজনৈতিক জনমত গঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের দিকে সংখ্যাগরিষ্ঠের আগ্রহকে চালিত করতে সক্ষম। এ ছাড়া এমন একটি পাঠকসমাজ থাকা দরকার, যারা রাজনীতিতে আগ্রহী, শিক্ষিত, সময় করে উন্নত মানের স্বাধীন সংবাদপত্র পড়েন এবং জনমত গঠনের জটিল প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে অভ্যস্ত।
বর্তমানে এই অবকাঠামো আর অটুট নেই। যদিও আমি যত দূর জানি স্পেন, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো কিছু দেশে এখনো তা আংশিকভাবে টিকে আছে। কিন্তু এসব দেশেও ইন্টারনেটের বিভাজনমূলক প্রভাব ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যমের ভূমিকা বদলে দিয়েছে, বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্মের জন্য। এমনকি ইন্টারনেট আসার আগেই জনমনোযোগের বাণিজ্যিকীকরণের ফলে জনপরিসরের অবক্ষয় শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও তার বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর এক্সক্লুসিভ ব্যবহার এর অন্যতম উদাহরণ।

এখন নতুন যোগাযোগমাধ্যম আরও সূক্ষ্ম এক বাণিজ্যিক মডেল তৈরি করেছে, যেখানে লক্ষ্য শুধু দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ নয়, বরং ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যকে অর্থনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানো। এই মডেলে ব্যবহারকারীদের অজান্তেই তাদের ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে তা অধিকতর দক্ষতার সঙ্গে স্বার্থসিদ্ধির কাজে লাগানো হয়। কখনো কখনো রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের উদ্দেশ্যেও তা ব্যবহার করা হয়। ফেসবুকে এ ধরনের কেলেঙ্কারির ঘটনা দেখা গেছে।

প্রশ্ন: বাস্তব উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও ইন্টারনেট কি নতুন ধরনের অশিক্ষার জন্ম দিচ্ছে?

হাবেরমাস: আপনি কি আক্রমণাত্মক বিতর্ক, তথ্য-বুদ্​বুদ এবং এক্সে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিথ্যাচারের কথা বলছেন? এই ব্যক্তি তাঁর দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্তরেরও নিচে আছেন বললে কম বলা হয়। ট্রাম্প আসলে সেই স্তরটি স্থায়ীভাবেই ধ্বংস করে দিচ্ছেন।
ছাপা বই আসার পর থেকে পড়তে শেখানো এবং পুরো জনগোষ্ঠীকে পড়তে সক্ষম করে তোলার জন্য কয়েক শতাব্দী লেগেছে। ইন্টারনেট সবাইকে সম্ভাব্য লেখক বানিয়ে ফেলছে, অথচ এর বয়স মাত্র কয়েক দশক। হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আরও সভ্যভাবে ব্যবহার করতে শিখব।

ইন্টারনেটের অনেক ইতিবাচক দিকও আছে। মাধ্যমটি যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিরাট সুবিধা এনে দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই নতুন মিডিয়া কী ধরনের সাংস্কৃতিক ধ্যানধারণার জন্ম দিচ্ছে, তা বিচার করার বয়স আমার নেই। তবে আমি বিরক্ত এই কারণে যে মানব–ইতিহাসে এটিই প্রথম গণমাধ্যম বিপ্লব যা সাংস্কৃতিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং মূলত অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে।

আজ অন্যান্য শাস্ত্রের মতো দর্শনও অতিরিক্ত বিশেষায়ণের দিকে যাচ্ছে। এটি একটি বন্ধ রাস্তা। দর্শনের কাজ হওয়া উচিত সমগ্রকে বোঝার চেষ্টা করা, নিজেদের ও বিশ্বকে বোঝার উপায়ের যৌক্তিক ব্যাখ্যায় অবদান রাখা।

প্রশ্ন : প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে দর্শনের ভবিষ্যৎ কী?

হাবেরমাস: প্রাচীন ধারার মানুষ হিসেবে আমি এখনো মনে করি, দর্শনের উচিত কান্টের প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে যাওয়া—আমি কী জানতে পারি? আমার কী জানা উচিত? আমি কী আশা করতে পারি? মানুষ হওয়ার অর্থ কী?
তবে আমরা যেভাবে দর্শনকে জানি, তার ভবিষ্যৎ আছে কি না, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। আজ অন্যান্য শাস্ত্রের মতো দর্শনও অতিরিক্ত বিশেষায়ণের দিকে যাচ্ছে। এটি একটি বন্ধ রাস্তা। দর্শনের কাজ হওয়া উচিত সমগ্রকে বোঝার চেষ্টা করা, নিজেদের ও বিশ্বকে বোঝার উপায়ের যৌক্তিক ব্যাখ্যায় অবদান রাখা।

প্রশ্ন: আপনার পুরোনো মার্ক্সবাদী অবস্থানের কী হলো? আপনি কি এখনো বামপন্থী?

হাবেরমাস: আমি ৬৫ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয় ও জনপরিসরে বামপন্থী ধারণার পক্ষে কাজ করেছি। সিকি শতাব্দী ধরে আমি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দৃঢ় রাজনৈতিক সংহতির পক্ষে লড়েছি। এর কারণ, আমি বিশ্বাস করি, কেবল এই মহাদেশীয় কাঠামোই বল্গাহীন পুঁজিবাদকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। আমি কখনো পুঁজিবাদের সমালোচনা বন্ধ করিনি, তবে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তেও আমি বিশ্বাস করি না। লক্ষ্যবিহীন তোপদাগা বুদ্ধিজীবীদের দলে আমি নেই।

প্রশ্ন : কান্ট + হেগেল + এনলাইটেনমেন্ট + মোহমুক্ত মার্ক্সবাদী = হাবেরমাস। এটা কি ঠিক?

হাবেরমাস: সংক্ষেপে বলতে গেলে ঠিকই আছে। তবে এর সঙ্গে থিওডর অ্যাডোর্নোর এক চিমটি ‘নেগেটিভ ডায়ালেক্টিক’ও যোগ করতে হবে।

প্রশ্ন : ১৯৮৬ সালে আপনি সংবিধানভিত্তিক দেশপ্রেমের ধারণা দিয়েছিলেন। আজকের পতাকা ও জাতীয় সংগীতনির্ভর তথাকথিত দেশপ্রেমের তুলনায় এটি কি অর্জন করা কঠিন?

হাবেরমাস: সংবিধানভিত্তিক দেশপ্রেমের জন্য একটি সঠিক ঐতিহাসিক পটভূমি দরকার, যাতে আমরা সর্বদা সজাগ থাকি যে সংবিধান একটি জাতীয় অর্জন।

প্রশ্ন: আপনি কি নিজেকে দেশপ্রেমিক মনে করেন?

Manual2 Ad Code

হাবেরমাস: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে দেশটি স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে এবং পরবর্তী কয়েক দশকে রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্য দিয়ে একটা উদার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে, তার একজন নাগরিক হিসেবে আমি নিজেকে দেশপ্রেমিক বলতে পারি। হ্যাঁ, আমি নিজেকে জার্মান দেশপ্রেমিক ও জার্মান সংস্কৃতির ফসল মনে করি।
ধর্মীয় মৌলবাদ একেবারেই আধুনিক একটি ঘটনা। উপনিবেশবাদ ও তার অবসানের ফলে সৃষ্ট সামাজিক শিকড়চ্যুতি এবং বৈশ্বিক পুঁজিবাদ থেকে এর উদ্ভব।

প্রশ্ন : অভিবাসীদের আগমনের পর জার্মানি কি এখনো একটিমাত্র সংস্কৃতির দেশ আছে?

হাবেরমাস: আমি গর্বিত যে আজ তুর্কি, ইরানি ও গ্রিক বংশোদ্ভূত দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের মানুষও আমাদের সংস্কৃতির অংশ। তাদের মধ্য থেকে আমরা পেয়েছি অসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাতা, সাংবাদিক, টিভি ব্যক্তিত্ব, সিইও, দক্ষ ডাক্তার, সেরা সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ ও শিক্ষক। এটি আমাদের সংস্কৃতির শক্তির ও নবায়নের ক্ষমতার প্রমাণ। দক্ষিণপন্থী জনতুষ্টিবাদীরা অভিবাসীদের বহিষ্কার করতে চায়। এটা আহাম্মকি।

প্রশ্ন : ধর্ম এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক হানাহানির দিকে তাকিয়ে আপনার কি মনে হয় আমরা সভ্যতার সংঘাতের দিকে এগোচ্ছি?

হাবেরমাস: আমার মতে, এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ধর্মীয় মৌলবাদ একেবারেই আধুনিক একটি ঘটনা। উপনিবেশবাদ ও তার অবসানের ফলে সৃষ্ট সামাজিক শিকড়চ্যুতি এবং বৈশ্বিক পুঁজিবাদ থেকে এর উদ্ভব।

প্রশ্ন: আপনি কখনো কখনো লিখেছেন, ইউরোপের উচিত ইসলামের ইউরোপীয় ভার্সন গড়ে তোলা। সেটা কি হচ্ছে?

হাবেরমাস: জার্মান প্রজাতন্ত্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমরা ইসলামি ধর্মশাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছি। এর ফলে তুরস্ক ও অন্যান্য দেশ থেকে ধর্মীয় শিক্ষক আনার পরিবর্তে দেশেই আমরা তাদের প্রশিক্ষণ দিতে পারব। তবে এই প্রক্রিয়া নির্ভর করে অভিবাসী পরিবারের প্রকৃত অঙ্গীভূতকরণের ওপর।
স্তেফান লেসেনিখ তাঁর বই দ্য এক্সটারনালাইজেশন সোসাইটিতে দেখিয়েছেন, ইউরোপে অভিবাসীর ঢেউ আছড়ে পড়ার মূল কারণ পশ্চিমা বিশ্বের ভেতরেই নিহিত।

প্রশ্ন : ইউরোপ অভিবাসনের ঢল সামলাবে কীভাবে?

হাবেরমাস: এর একমাত্র সমাধান হলো যে দেশগুলো থেকে মানুষ আসছে, সেসব দেশের অর্থনৈতিক কারণগুলো মোকাবিলা করা।

Manual3 Ad Code

প্রশ্ন : সেটা কীভাবে সম্ভব?

হাবেরমাস: বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া সেটা সুদূরপরাহত। এটা কয়েক শতাব্দীর পুরোনো সমস্যা। স্তেফান লেসেনিখ তাঁর বই দ্য এক্সটারনালাইজেশন সোসাইটিতে দেখিয়েছেন, ইউরোপে অভিবাসীর ঢেউ আছড়ে পড়ার মূল কারণ পশ্চিমা বিশ্বের ভেতরেই নিহিত।

প্রশ্ন : জাতিরাষ্ট্র কি আগের চেয়ে আরও বেশি প্রয়োজন বলে মনে করেন?

Manual3 Ad Code

হাবেরমাস: হয়তো বলা উচিত নয়, আমার মনে হয়, জাতিরাষ্ট্র বলতে কোনো কিছুতে কারও বিশ্বাস ছিল না, কিন্তু বাস্তব কারণেই জাতিরাষ্ট্র গঠন করতে হয়েছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ