সিলেট ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৩০, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | সিলেট, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ : দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, কূটনীতি ও রাজনীতির অঙ্গনে অনন্য অবদান রেখে যাওয়া সাবেক অর্থমন্ত্রী, বর্ষীয়ান রাজনীতিক, ভাষাসৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও গবেষক আবুল মাল আবদুল মুহিতের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল ৮৮ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ সিলেট ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সিলেটে মরহুমের কবর জিয়ারত, ফাতিহা পাঠ, দোয়া মাহফিল ও স্মরণসভাসহ বিভিন্ন আয়োজন করা হয়েছে। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোও পৃথকভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। ঢাকাতেও তাঁর কর্মময় জীবনের স্মৃতিচারণ করে আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
রাষ্ট্রনায়ক ও অর্থনীতির দূরদর্শী রূপকার
আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের অন্যতম প্রধান কারিগর। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দেশের অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি মোট ১২টি জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম উল্লেখযোগ্য রেকর্ড। এর মধ্যে ১০টি বাজেট তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উপস্থাপন করেন।
তাঁর সময়েই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল অর্থনীতির ধারায় প্রবেশ করে, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, কৃষি ও শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির মতো নানা গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ঘটে। তিনি ছিলেন সাহসী সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রবক্তা।
জন্ম, শিক্ষা ও বর্ণাঢ্য শৈশব
১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। তাঁর পিতা আবু আহমদ আবদুল হাফিজ এবং মাতা সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী। পরিবারের তৃতীয় সন্তান ছিলেন তিনি। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন তিন সন্তানের জনক। তাঁর কন্যা সামিনা মুহিত ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ, বড় ছেলে সাহেদ মুহিত বাস্তুকলাবিদ এবং ছোট ছেলে সামির মুহিত শিক্ষক।
শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পরের বছর একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ভাষা আন্দোলন থেকে ছাত্রনেতৃত্ব
শিক্ষাজীবনেই তিনি রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। এ সময় থেকেই তাঁর নেতৃত্বগুণ ও জাতীয় বিষয়ে সচেতনতা প্রকাশ পেতে শুরু করে।
পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস থেকে স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান
১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি) যোগ দেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তানের ওয়াশিংটন দূতাবাসে কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন।
১৯৭১ সালের জুনে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রত্যাহার করে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি সমর্থন জানান। যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীন দেশে প্রশাসনিক নেতৃত্ব
স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে তিনি পরিকল্পনাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের উপসচিব থাকাকালে ১৯৬৬ সালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন তৈরি করেন, যা পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে এ বিষয়ে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন হিসেবে আলোচিত হয়।
পরবর্তীতে তিনি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব হিসেবে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে কাজ করেন।
বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের সদস্য হওয়ার পর ১৯৭২-৭৩ সালে তিনি বিশ্বব্যাংকে বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কা গ্রুপের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
নীতির প্রশ্নে আপসহীন
১৯৮১ সালে তিনি স্বেচ্ছায় সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। ১৯৮২ সালে তৎকালীন সেনাশাসক এইচ এম এরশাদ তাঁকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি শর্তসাপেক্ষে দায়িত্ব নেন। তাঁর শর্ত ছিল, নির্দলীয় সরকার গঠন করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। পরে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা না হওয়ায় দুই বছরের মাথায় তিনি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন। এই সিদ্ধান্ত তাঁর নীতিনিষ্ঠ ও আপসহীন চরিত্রের পরিচায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়।
রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা
পরবর্তী সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ২০১১ সালে দলটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নিযুক্ত হন। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৪ সালেও পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি অংশ নেননি। এর আগেই সক্রিয় রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন।
লেখক, গবেষক ও পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক
রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ লেখক ও চিন্তাবিদ। মুক্তিযুদ্ধ, জনপ্রশাসন, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বিষয়ে তিনি প্রায় ৪০টি বই রচনা করেন। তাঁর লেখনীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, প্রশাসনিক সংস্কার ও উন্নয়ন ভাবনার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।
তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। পরিবেশ সংরক্ষণ, টেকসই উন্নয়ন ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং জাতীয় জীবনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০১৬ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’-এ ভূষিত করে।
স্মৃতিতে অম্লান
রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। সৎ, স্পষ্টভাষী ও দূরদর্শী নীতিনির্ধারক হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের কাছেও সম্মানিত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন এই বরেণ্য ব্যক্তিত্বকে।
বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার ইতিহাসে আবুল মাল আবদুল মুহিতের নাম দীর্ঘদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
আজও ভোরের সিলেট জাগে শিশির-ধোয়া ঘাসে,
আজও ঢাকার জানালাতে নীরব আলো ভাসে।
আজও কাঁপে স্মৃতির পাতা এপ্রিল-শেষের দিনে,
একজনের নাম উচ্চারিত শ্রদ্ধাভরা ঋণে।
যে নাম শুনে বাজেট-ভাষ্য উঠত দেশে জেগে,
যে নাম শুনে কৃষক-শ্রমিক আশার কথা লেখে,
যে নাম শুনে শিক্ষালয়ে উঠত মেধার গান,
যে নাম শুনে ইতিহাসে জ্বলে স্বাধীন প্রাণ।
তিনি ছিলেন প্রজ্ঞার দীপ, কর্মের দৃঢ় হাত,
তিনি ছিলেন শুদ্ধ বুদ্ধি, সাহসী উচ্চ মাত।
তিনি ছিলেন রাষ্ট্রচিন্তার স্বচ্ছ নির্ভীক মুখ,
দেশের জন্য জীবনজুড়ে স্বেচ্ছা ত্যাগের সুখ।
আবুল মাল আবদুল মুহিত— উচ্চারণে ধ্বনি,
বাংলাদেশের পথরেখাতে দীপ্ত এক লোক।
মাটির প্রতি দায়বদ্ধতা, মানুষেরই টান,
এই দুটিকে সঙ্গে নিয়ে কাটালেন জীবন।
সিলেট নগর জন্ম দিয়েছিল জানুয়ারির প্রভাত,
পঁচিশ তারিখ আলো নামায় শুভ্র শিশির রাত।
মায়ের কোলে শৈশব এল স্বপ্নমাখা দিন,
পিতার ঘরে শিক্ষার বীজ উঠল অঙ্কুর বিন।
শিশু চোখে দেখেছিলেন বিভক্তির সব ক্ষত,
মানুষ কেন মানুষ ভোলে— সেই প্রশ্নের রথ।
বইয়ের পাতায় জ্বাললেন তিনি অদম্য জ্ঞানের শিখা,
জীবন যেন নদীর মতো বহে শেখার দিশা।
ঢাকা তখন ছাত্রসমাজ উত্তাল নব বেগে,
ভাষার অধিকারের ডাকে রাস্তায় মানুষ নেমে।
তরুণ তিনি দাঁড়িয়েছিলেন মিছিলেরই সারি,
মায়ের ভাষার মর্যাদাতে জীবন দেবার ভারি।
রক্তে লেখা ফেব্রুয়ারির অমর অক্ষর-মালা,
তারই ভেতর তরুণ মুহিত দেখেন নতুন জ্বালা।
ভাষা মানে আত্মপরিচয়, ভাষা মানে দেশ,
ভাষা মানে শিকড় জাগা— শপথ অবশেষ।
শিক্ষাঙ্গনে ছিলেন তিনি সবার আগে দীপ,
ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণি, মেধার অমিত সীপ।
স্নাতক শেষে স্নাতকোত্তর জ্ঞানের সিঁড়ি বেয়ে,
বিশ্বমঞ্চে যাবেন পরে বাংলাদেশের নেয়ে।
হার্ভার্ডেরই প্রাঙ্গণ ছুঁয়ে অর্থনীতির পাঠ,
সংখ্যার ভেতর মানুষ খোঁজা ছিল তাঁরই ঠাট।
মুদ্রানীতি, উন্নয়ন, বাজার, ন্যায়ের ধারা—
সবকিছুকে মানুষমুখী ভাবতেন বারংবার।
সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে রাষ্ট্রকার্যে মন,
দপ্তরজুড়ে শৃঙ্খলিত এক দীপ্ত সাধন।
কূটনীতির মসৃণ পথে গেলেন দূর দেশান্তর,
তবু বুকের ভিতর জাগে বাংলারই অন্তর।
একাত্তরের জুনের দিনে ইতিহাসের ডাক,
সত্যের পক্ষে দাঁড়াব কি না— ছিল কঠিন ফাঁক।
তিনি তখন ছাড়লেন স্বার্থ, ছাড়লেন ভয়ের খাঁচা,
বাংলাদেশের পক্ষে এসে খুললেন মুক্তি-বাঁশা।
ওয়াশিংটনের সভাকক্ষে, প্রবাসীদের মাঝে,
স্বাধীনতার যুক্তি গাঁথেন ভাষণে আর কাজে।
বিশ্বজনের দরবারেতে তুললেন দেশের নাম,
যুদ্ধরত জনতার পাশে দিলেন প্রজ্ঞা-ধাম।
যে কূটনীতিক সত্য বুঝে অন্যপথে যায়,
সে-ই তো পরে ইতিহাসে আলোকমালা পায়।
দেশ মানে কেবল মানচিত্র নয়, মানুষের অধিকার—
এই বোধেতে মুহিত হলেন অনন্য এক ধার।
স্বাধীনতার পরে যখন ভাঙা সেতু আর ক্ষুধা,
নব রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষণে দারিদ্র্যেরই বুদ্ধা,
তখন তিনি ফিরলেন দেশে দায়িত্বেরই টানে,
পরিকল্পনার মানচিত্র আঁকলেন নতুন প্রাণে।
সচিব হয়ে ভাবলেন তিনি কীভাবে গড়ি দেশ,
কোথায় যাবে শিল্পের ধারা, কৃষি পাবে রেশ।
পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্যের যে প্রতিবেদন লিখে,
আগেই দেখিয়েছিলেন সত্য শাসকেরই মুখে।
সংখ্যা শুধু সংখ্যা নয় যে— সংখ্যার পিছে প্রাণ,
বাজেট শুধু হিসাব নয় যে— মানুষেরই টান।
তিনি জানতেন রুটির দামে কাঁপে শিশুর মুখ,
চাষির ঘামে জমে থাকে রাষ্ট্রনীতির সুখ।
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, জাতিসংঘের দ্বার,
বাংলাদেশের পক্ষ হয়ে গেছেন বারংবার।
সাহসী, সুশিক্ষিত, স্থির, আলোচনায় দৃঢ়,
দেশের স্বার্থ রক্ষায় ছিলেন যুক্তির শাণিত তীর।
কর্মজীবন শেষে যখন ক্ষমতারই ডাক,
শর্ত দিয়ে বলেছিলেন— আগে জনগণের হক।
নির্দলীয় সুশাসনের প্রত্যয় ছিল স্থির,
ক্ষমতা যদি কথা ভোলে, সরে যাবেন ধীর।
কথা যখন রক্ষা হলো না, ছাড়লেন মন্ত্রিসভা,
নীতির কাছে পদ যে ছোট— দিলেন তারই প্রভা।
কত মানুষ ক্ষমতা ধরে বেঁধে রাখে প্রাণ,
তিনি তবে ছেড়ে দেখালেন মর্যাদারই মান।
তারপরও তিনি থেমে যাননি কর্মের নদী থামি?
বিশ্বমঞ্চে বিশেষজ্ঞ রূপে গড়েছেন জ্ঞানের গ্রামি।
পরিবেশের ডাক শুনে গড়েন বাপার পতাকা,
নদী, বন আর বাতাস রক্ষায় দিলেন প্রাণের রাখা।
উন্নয়ন যদি প্রকৃতি-হীন, সে তো অন্ধ পথ,
এই বোধেতে তিনি লিখেছেন ভবিষ্যতের রথ।
সবুজ ধানের শীষের সাথে নগরীরও গান,
সমন্বয়ের পাঠ শিখিয়েছেন জাগ্রত মহিয়ান।
স্বাধীনতা পদক পেলেন জাতির শ্রদ্ধা-ছায়া,
তবু তাঁর চোখে অহংকারের লাগেনি কোনো মায়া।
সরল ভাষায় কথা বলতেন, সোজা ছিল মন,
জটিল প্রশ্নে স্বচ্ছ উত্তর— এটাই ছিল ধন।
চল্লিশটির বেশি গ্রন্থে চিন্তার দীঘি খনন,
ইতিহাস আর প্রশাসনে রেখেছেন অনুক্ষণ।
অর্থনীতি, রাজনীতি, যুদ্ধের স্মৃতি-রেখা,
পাঠক আজও পড়ে সেখানে সময়কে নতুন দেখা।
বারো বার যে বাজেট দিলেন সংসদ-মহামঞ্চে,
কত বিতর্ক, কত প্রশ্ন উঠেছে তারই সঞ্চে।
তবু তিনি দীর্ঘশ্বাসে বলেননি কখনো হার,
রাষ্ট্রচালনা কঠিন শিল্প— চাই ধৈর্যেরই ভার।
গ্রামবাংলার সড়ক পথে স্কুলের নতুন ছাদ,
বিদ্যুতের আলো, সেচের জলে সবুজ ফসলবাদ—
যে স্বপ্নে ছিল নীতির রূপরেখা অঙ্কিত,
সেই স্বপ্নে বহু শ্রমের রেখা আজও দৃষ্ট।
সংসদ সদস্য হয়ে থেকেও মাটির কাছে যান,
মানুষেরই ভাষা শুনে নিতেন প্রতিদিন সন্ধ্যান।
নেতা মানে দূর আসনে নয়, জনতারই পাশে,
এই পাঠ দিয়ে গেছেন তিনি চলার প্রত্যয় ভাষে।
অবসরের ডাক যখন এল নিজ ইচ্ছারই টানে,
ক্ষমতার মায়া ছাড়লেন তিনি শান্ত নির্মল প্রাণে।
কতজন পারে নিজে থেকে সরে যেতে হেসে?
তিনি পেরেছেন— তাই তো তিনি থাকেন সবার শেষে।
দুই হাজার বাইশের শেষে এপ্রিল এল ক্ষণ,
ত্রিশ তারিখে থেমে গেল কর্মময় জীবন।
আটাশি বছরের দীর্ঘ পথের নক্ষত্রখানি,
নিভে গিয়ে আকাশজুড়ে রেখে গেল বাণী।
আজ চার বছর পেরিয়ে গেছে, তবু কই সে ক্ষয়?
যারা সত্যে কাজ করে যায়, তাদের মরণ নয়।
সিলেট জুড়ে দোয়ার সুরে ভিজে ওঠে বাতাস,
ঢাকায় ফুলের স্তবকে জাগে কৃতজ্ঞতার শ্বাস।
কবরে যারা ফাতিহা পড়ে দাঁড়ায় নতশির,
তারা শুধু এক মানুষকে স্মরণ করে ধীর?
না, তারা এক মূল্যবোধে দেয় শ্রদ্ধারই ফুল—
নীতি, জ্ঞান আর দেশপ্রেমেতে যিনি ছিলেন কূল।
আজকের তরুণ শুনুক তবে এই প্রজন্মের কথা—
মেধা যদি হয় জনকল্যাণে, তবেই তারই ব্যথা।
শিক্ষা যদি দেয় মানবসেবা, তবে সে মহৎ,
ক্ষমতা যদি দায় না বোঝে, তবে তা তো ক্ষত।
মুহিত মানে সৎ প্রশাসন, মুহিত মানে জ্ঞান,
মুহিত মানে উন্নয়নের মানবিক আয়োজন।
মুহিত মানে সাহস করে সত্যের পক্ষে দাঁড়াও,
মুহিত মানে প্রাপ্ত সম্মান সহজভাবে নাও।
যে দেশে এখন বিভ্রান্তি আর স্বার্থের ঘনঘটা,
সেই দেশে তাঁর জীবন যেন নির্মল পথলতা।
যে ঘরে শিশু বই খুলে আজ ভবিষ্যতের গান,
সেই ঘরে তাঁর স্মৃতি হোক আলোকিত আহ্বান।
বাংলাদেশের ইতিহাসে যত নাম উজ্জ্বল,
কিছু নাম থাকে পথপ্রদীপ, কিছু নাম সম্বল।
আবুল মাল আবদুল মুহিত সেই বিরল এক নাম,
যার জীবনেই দেশ পেয়েছে কর্মশুদ্ধ অবিরাম।
আজকে তাই এ মৃত্যুদিন শোকের শুধু নয়,
এ দিন মানে দায়ের ডাকে নতুন করে সয়।
দেশকে ভালোবাসার মানে কাজে দিতে প্রাণ,
এ পাঠ নিয়ে এগিয়ে যাক আগামী প্রজন্মগান।
সিলেট থেকে রাজধানী, গ্রাম হতে নগর,
যেখানে আছে বাংলার মানুষ, স্মৃতি যাক ঘুরে ঘুর।
বলুক সবাই— জ্ঞানের সাথে নৈতিকতার জোট,
এই পথেই গড়বে দেশ, খুলবে আগামি-দ্বার-ফট।
শ্রদ্ধা নিন, হে প্রাজ্ঞজন, নিন প্রণাম নিরব,
আপনারই কর্মজীবন অনুপ্রেরণার রব।
জাতির বুকে থাকুন আপনি দীপ্ত মানচিহ্ন,
বাংলাদেশের আকাশ জুড়ে আপনার নাম লীর্ণ।
আজও ভোরের সিলেট জাগে শিশির-ধোয়া ঘাসে,
আজও ঢাকার জানালাতে নীরব আলো ভাসে।
কারণ আপনি চলে গিয়েও থাকেন দেশের ভিতর—
জনতারই উন্নয়নস্বপ্নে জাগ্রত অনন্ত প্রহর।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি