ক্ষতিগ্রস্ত ধানচাষিদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণের দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ ৯ মে

প্রকাশিত: ৫:১৫ অপরাহ্ণ, মে ৭, ২০২৬

ক্ষতিগ্রস্ত ধানচাষিদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণের দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ ৯ মে

Manual3 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৭ মে ২০২৬ : দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় সাম্প্রতিক অকাল বন্যা, অতিবৃষ্টি এবং নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি এবার বোরো ধানের ওপর বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজারসহ বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ ও আংশিকভাবে নষ্ট হয়েছে। এতে লাখো কৃষক পরিবার তাদের বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটে পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ, জরুরি খাদ্য সহায়তা ও কৃষি পুনর্বাসনের দাবিতে আগামী ৯ মে শনিবার বিকেল ৪টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জাতীয় কৃষক সমিতি।

সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কর্মসূচিতে হাওরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য অবিলম্বে নগদ আর্থিক সহায়তা, সংগৃহীত পাকা ধান সংরক্ষণের ব্যবস্থা, ছয় মাসের খাদ্য সহায়তা এবং বিনামূল্যে গবাদিপশুর খাদ্য সরবরাহের দাবি জানানো হবে।

জাতীয় কৃষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জ্যোতিশংকর ঝন্টু এবং সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মানিক এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, “হাওরাঞ্চল দেশের খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এখানকার বোরো ধান জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এ অঞ্চলের কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এবারও বহু কৃষক তাদের স্বপ্নের ফসল ঘরে তুলতে পারেননি।”

নেতৃবৃন্দ বলেন, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অনেক এলাকায় ধান কাটার আগেই বন্যার পানিতে ফসল তলিয়ে গেছে। অনেক কৃষক এনজিও, ব্যাংক ও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। কিন্তু ফসলহানির কারণে এখন তাদের পক্ষে ঋণ পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষক নেতারা অভিযোগ করেন, প্রতিবছর দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে অনেকেই পর্যাপ্ত সহায়তা পান না। ফলে কৃষক পরিবারগুলো ঋণ, খাদ্যসংকট এবং জীবিকার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।

জরুরি সহায়তা ও পুনর্বাসনের দাবি

Manual5 Ad Code

জাতীয় কৃষক সমিতির বিবৃতিতে সরকারের কাছে কয়েকটি জরুরি দাবি তুলে ধরা হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ন্যায্য ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান,
জরুরি ভিত্তিতে নগদ আর্থিক সহায়তা,
আগামী মৌসুমে বিনামূল্যে বীজ, সার ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ,
কৃষিঋণ মওকুফ বা সহজ শর্তে পুনঃতফসিল,
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ছয় মাসের খাদ্য সহায়তা,
গবাদিপশুর জন্য বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ।

সংগঠনটির নেতারা বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত পুনর্বাসন না করা হলে আগামী মৌসুমে আবাদ ব্যাহত হতে পারে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব

কৃষক নেতারা হাওরাঞ্চলের সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, প্রতিবছর অকাল বন্যা ও বাঁধ ভাঙনের কারণে বিপুল পরিমাণ ফসলহানি হচ্ছে। তাই টেকসই ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা, নদী খনন এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।

Manual7 Ad Code

জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, “দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য সরকারের দ্রুত, কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই।”

Manual3 Ad Code

এদিকে জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য এবং আরপি নিউজের সম্পাদক কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “প্রতিবছরই হাওরাঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে, যা কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাঁচাতে সরকার কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।”

Manual2 Ad Code

খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাওরাঞ্চল দেশের বোরো ধানের অন্যতম প্রধান উৎপাদন এলাকা। এ অঞ্চলে উৎপাদিত ধান জাতীয় খাদ্য ভাণ্ডারে বড় অবদান রাখে। ফলে বড় আকারে ফসলহানি হলে তার প্রভাব শুধু কৃষকের জীবিকাতেই নয়, সামগ্রিক খাদ্য বাজার ও অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অনেক কৃষক শেষ মুহূর্তে ধান কাটতে গিয়ে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ব্যর্থ হয়েছেন। কোথাও কোথাও কৃষকরা আধাপাকা ধান কেটে রক্ষা করার চেষ্টা করলেও অতিবৃষ্টি ও পানি বৃদ্ধির কারণে তা সম্ভব হয়নি।

কৃষক সংগঠনগুলোর মতে, দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তা কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব, পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকা এবং স্থানীয় পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগও দীর্ঘদিনের সমস্যা। এজন্য ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়ন ও সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে।

আগামী ৯ মে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন ও সমাবেশে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষক প্রতিনিধি, কৃষক সংগঠনের নেতা-কর্মী, প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের সদস্যরা অংশ নেবেন বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ