১০৫ বছরেও অধিকার অধরাই: রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে শ্রীমঙ্গলে ‘মুল্লুক চলো দিবস’ পালন

প্রকাশিত: ৫:০৬ অপরাহ্ণ, মে ২০, ২০২৬

১০৫ বছরেও অধিকার অধরাই: রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে শ্রীমঙ্গলে ‘মুল্লুক চলো দিবস’ পালন

Manual2 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ২০ মে ২০২৬ : ঐতিহাসিক ‘মুল্লুক চলো দিবস’-এর ১০৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের উদ্যোগে আলোচনা সভা, স্মরণসভা ও শ্রদ্ধা নিবেদন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। দিবসটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বক্তারা।

বুধবার (২০ মে ২০২৬) দুপুরে শহরের মৌলভীবাজার রোডস্থ বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর ‘লেবার হাউস’ মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চা শ্রমিক নেতৃবৃন্দ, ভ্যালি ও বাগান পঞ্চায়েত প্রতিনিধি, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন।

Manual3 Ad Code

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতি বৈশিষ্ঠ তাঁতী। বক্তব্য রাখেন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিপেল পাল, সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা, কোষাধ্যক্ষ পরেশ কালিন্দীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।

সভায় বক্তারা বলেন, ১৯২১ সালের ২০ মে উপমহাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের জন্ম হয়েছিল। সে সময় ব্রিটিশ শাসনামলে চা বাগানে অমানবিক নির্যাতন, স্বল্প মজুরি ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে হাজার হাজার চা শ্রমিক সিলেট অঞ্চল থেকে নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। ইতিহাসে যা ‘মুল্লুক চলো আন্দোলন’ নামে পরিচিত।

বক্তারা জানান, দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করে শ্রমিকরা চাঁদপুরের মেঘনা স্টিমার ঘাটে পৌঁছালে ব্রিটিশ গোর্খা বাহিনী তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে বহু চা শ্রমিক নিহত হন। আহত ও নিহতদের অনেকের মরদেহ মেঘনা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

তারা বলেন, “এই গণহত্যা শুধু চা শ্রমিকদের নয়, বরং সমগ্র শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক নির্মম অধ্যায়। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও চা শ্রমিকদের জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়নি।”

“মজুরি ও অধিকার এখনো নিশ্চিত হয়নি”

সভায় বক্তারা অভিযোগ করেন, বর্তমান সময়েও দেশের চা শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান, শিক্ষা ও ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত। চা শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।

তাদের ভাষ্য, “চা উৎপাদনে নতুন নতুন রেকর্ড গড়া হলেও শ্রমিকদের ভাগ্যে উন্নয়ন জোটেনি। এখনও তারা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করছে, সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত এবং চিকিৎসাসেবা অপর্যাপ্ত।”

Manual7 Ad Code

সভা থেকে বক্তারা ‘মুল্লুক চলো দিবস’কে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা, চা শ্রমিকদের জন্য পৃথক মজুরি বোর্ড গঠন, ভূমির অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং শ্রম আইন বাস্তবায়নের দাবি জানান।

কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানের শ্রদ্ধা ও মূল্যায়ন

মুল্লুক চলো আন্দোলন ও চা শ্রমিক গণহত্যার ১০৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক উপদেষ্টা, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজ সম্পাদক ও কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

মুঠোফোনে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি চা শ্রমিকদের আত্মত্যাগের ইতিহাসকে “ঐতিহাসিক বীরত্বগাথা ও রক্তাক্ত সংগ্রামের মহাউপাখ্যান” হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, “১০৫ বছর আগে যে অধিকার রক্ষার সংগ্রামে চা শ্রমিকদের আত্মত্যাগের ইতিহাস রচিত হয়েছিল, সেই অধিকার আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বছরের পর বছর ধরে বাগানমালিক ও রাষ্ট্রীয় অবহেলার শিকার হচ্ছেন চা শ্রমিকরা। নামমাত্র মজুরির পাশাপাশি মৌলিক অধিকারও তাদের কাছে অধরাই রয়ে গেছে।”

তিনি আরও বলেন, “চা শ্রমিকদের অমানবিক পরিশ্রমে দেশের চা শিল্প বিকশিত হয়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতে, জিডিপিতে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এই শিল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। অথচ শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেই।”

সৈয়দ আমিরুজ্জামান অভিযোগ করেন, শ্রম আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় চা জনগোষ্ঠী এখনও বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত। তার ভাষায়, “ভূমির অধিকার না থাকায় একুশ শতকেও বাগানমালিকরা কার্যত জমিদার হিসেবেই রয়ে গেছে।”

তিনি বলেন, “চুক্তিভিত্তিক ন্যায্য মজুরি ব্যবস্থা এবং ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে শ্রমের মূল্য নির্ধারণ আজও কার্যকর হয়নি। ফলে রাষ্ট্র চা শ্রমিকদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে পারেনি।”

Manual7 Ad Code

এ সময় তিনি ‘মুল্লুক চলো দিবস’কে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘মহান চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান এবং বলেন, “চা শ্রমিকদের সংগ্রামের চেতনা অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করুক।”

ইতিহাসের দায় ও বর্তমান বাস্তবতা

বিশ্লেষকরা বলছেন, উপমহাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে ‘মুল্লুক চলো আন্দোলন’ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও জাতীয় পর্যায়ে এ নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা, সংরক্ষণ ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ঘাটতি রয়েছে। চা শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার সুযোগ ও ভূমির অধিকার নিয়ে এখনও বহু প্রশ্ন রয়ে গেছে।

চা শ্রমিক নেতাদের মতে, দিবসটির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি শুধু অতীতের শহীদদের প্রতি সম্মানই নয়, বরং বর্তমান প্রজন্মের শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে শক্তিশালী করবে।

Manual2 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ