যে গল্প বদলে দিতে পারে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি!

প্রকাশিত: ২:১৬ পূর্বাহ্ণ, মে ২৩, ২০২৬

যে গল্প বদলে দিতে পারে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি!

Manual8 Ad Code
মাসিক স্বাস্থ্যবিধি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে গল্প আহ্বান: নীরবতা ভেঙে সচেতনতার নতুন উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৩ মে ২০২৬ : মাসিক বা পিরিয়ড—যে বিষয়টি একজন নারীর স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার অংশ, সেই বিষয়টিকেই এখনো সমাজের বহু স্তরে লজ্জা, সংকোচ ও কুসংস্কারের আড়ালে রাখা হয়। অথচ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত মাসিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা নারীর মৌলিক অধিকার, স্বাস্থ্যসুরক্ষা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ‘মাসিক স্বাস্থ্যবিধি দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে ইউনিসেফ বাংলাদেশ এবং Menstrual Health & Hygiene Management (MHM) Platform যৌথভাবে একটি ব্যতিক্রমধর্মী গল্প লেখার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

“পিরিয়ড নিয়ে আপনার গল্প ও অভিজ্ঞতা লিখুন” শিরোনামে আয়োজিত এই উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরী, শিক্ষক, অভিভাবক, পেশাজীবী এবং পরিচর্যাকারীদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

Manual6 Ad Code

আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সমাজে পিরিয়ড নিয়ে বিদ্যমান নীরবতা ও ট্যাবু ভাঙার পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

যে গল্প বদলে দিতে পারে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি

আয়োজকরা জানিয়েছেন, প্রতিটি মানুষের অভিজ্ঞতা আলাদা। কারও প্রথম পিরিয়ডের অভিজ্ঞতা ছিল ভীতিকর, কারও কাছে ছিল অজানা ও বিভ্রান্তিকর; আবার কেউ পেয়েছেন পরিবার, বন্ধু বা শিক্ষকের আন্তরিক সহযোগিতা। অনেকের জন্য এখনো নিরাপদ স্যানিটারি সামগ্রী সংগ্রহ করা, স্কুল-কলেজে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের অভাব কিংবা কর্মস্থলে পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

Manual7 Ad Code

এই বাস্তবতাগুলো সামনে আনতেই অংশগ্রহণকারীদের আহ্বান জানানো হয়েছে তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও পরিবর্তনের গল্প লিখে পাঠানোর জন্য।

আয়োজকদের মতে, বাস্তব জীবনের গল্প মানুষের মন ও চিন্তায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। একটি গল্প যেমন অন্য একজন কিশোরীকে সাহস দিতে পারে, তেমনি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে।

যেসব বিষয়ে লেখা যাবে

প্রতিযোগিতার নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অংশগ্রহণকারীরা নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিয়ে গল্প বা অভিজ্ঞতা লিখতে পারবেন:

প্রথম পিরিয়ডের অভিজ্ঞতা;
বাসা, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় বা অফিসে পিরিয়ড সামলানোর গল্প;
বাবা, ভাই, শিক্ষক বা বন্ধুদের সহযোগিতা ও সহমর্মিতা;
পিরিয়ডকালীন প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ ও ব্যবহারজনিত সমস্যা;
মেয়েদের জন্য নিরাপদ, পরিষ্কার ও সহায়ক পরিবেশ তৈরির অভিজ্ঞতা।

আয়োজকরা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, এটি কেবল নারীদের জন্য নয়; বরং পুরুষদেরও অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। কারণ পিরিয়ডকে কেন্দ্র করে একটি সহমর্মী ও বৈষম্যহীন পরিবেশ গড়ে তুলতে নারী-পুরুষ সবার ইতিবাচক ভূমিকা প্রয়োজন।

অংশগ্রহণের সুযোগ সবার জন্য

Manual2 Ad Code

এই প্রতিযোগিতায় কিশোরী, তরুণ-তরুণী, নারী, মা-বাবা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অফিসকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী, পরিচর্যাকারী কিংবা পিরিয়ড নিয়ে কোনো অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে ইচ্ছুক যে কেউ অংশ নিতে পারবেন। গল্প বাংলা অথবা ইংরেজি—যেকোনো ভাষায় লেখা যাবে। শব্দসংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০০ থেকে ২৫০ শব্দের মধ্যে।

গল্প পাঠানোর শেষ তারিখ আগামী ৩১ মে ২০২৬। অংশগ্রহণকারীদের লেখা পাঠাতে হবে unicefcompetition@gmail.com ঠিকানায়।

আয়োজকরা জানিয়েছেন, নির্বাচিত সেরা গল্পগুলোকে বিশেষ পুরস্কার ও স্বীকৃতি প্রদান করা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রমেও এসব গল্প ব্যবহার করা হতে পারে।

বাংলাদেশে মাসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে এখনো বহু কিশোরী প্রথম পিরিয়ড সম্পর্কে আগে থেকে কোনো ধারণা পায় না। ফলে প্রথম অভিজ্ঞতা অনেকের জন্য ভয়, লজ্জা ও মানসিক অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গ্রামীণ অঞ্চলের অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত টয়লেট, পরিষ্কার পানি ও স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। এর ফলে বহু শিক্ষার্থী মাসিক চলাকালে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পিরিয়ড নিয়ে সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত না হলে তা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক, সামাজিক এবং শিক্ষাজীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ইউনিসেফসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে কিশোরী স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবস্থা, নিরাপদ স্যানিটারি পণ্য ব্যবহার এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে।

সামাজিক ট্যাবু ভাঙার গুরুত্ব

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশের বহু পরিবারে এখনো পিরিয়ড নিয়ে খোলামেলা আলোচনা নিরুৎসাহিত করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে কিশোরীদের ধর্মীয় বা সামাজিক নানা বিধিনিষেধের মুখোমুখি হতে হয়। ফলে তারা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, তথ্য ও মানসিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়।

এমন প্রেক্ষাপটে গল্পভিত্তিক এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মানুষ সহজেই অন্যের অনুভূতি ও বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে। এতে পিরিয়ড নিয়ে বিদ্যমান ভুল ধারণা ও কুসংস্কার দূর করাও সহজ হয়।

তরুণদের অংশগ্রহণে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা

শিক্ষাবিদ ও তরুণ সংগঠকরা মনে করছেন, বর্তমান প্রজন্ম পিরিয়ড বিষয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন ও খোলামেলা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রচারণার কারণে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। তবে এখনো শহর ও গ্রামের মধ্যে সচেতনতার পার্থক্য স্পষ্ট।

তাদের মতে, এমন উদ্যোগ তরুণদের শুধু লেখালেখিতে উৎসাহিত করবে না, বরং স্বাস্থ্য, মানবাধিকার ও লিঙ্গসমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নতুন করে ভাবতে শেখাবে। পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখবে।

Manual2 Ad Code

“আপনার গল্প বদলে দিতে পারে অনেকের ভাবনা”

আয়োজকরা বলছেন, প্রতিটি গল্পই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা অন্য কারও জন্য হতে পারে সাহস, সহমর্মিতা কিংবা পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা। পিরিয়ড নিয়ে নীরবতা ভেঙে একটি নিরাপদ, সম্মানজনক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের লক্ষ্যে সবাইকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ বাংলাদেশ ও এমএইচএম প্ল্যাটফর্ম।

মাসিক স্বাস্থ্যবিধি দিবস উপলক্ষে নেওয়া এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি গল্প প্রতিযোগিতা নয়; বরং এটি সচেতনতা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আন্দোলন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ