আবার দেখা হবে: ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার বিদায়ী বার্তা

প্রকাশিত: ৫:৩০ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০২৬

আবার দেখা হবে: ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার বিদায়ী বার্তা

Manual8 Ad Code

কূটনৈতিক প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৪ মে ২০২৬ : বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে প্রায় চার বছর দায়িত্ব পালন শেষে ঢাকা ছাড়ছেন প্রণয় ভার্মা। বিদায়ের সময় বাংলাদেশের মানুষের উদ্দেশে একটি লিখিত বার্তা দিয়েছেন তিনি।

প্রণয় ভার্মার বার্তাটি হুবহু প্রকাশ করা হলো—

বাংলাদেশ ছেড়ে বেলজিয়াম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে আমার পরবর্তী দায়িত্বে যোগদানের প্রাক্কালে আমার মনে অনেকগুলো ভাবনার সমাগম ঘটেছে।

আমরা প্রায় চার বছর ধরে ঢাকায় অবস্থান করেছি, যা প্রচলিত তিন বছর মেয়াদকালের চেয়ে দীর্ঘ। এই সময়কালে আমরা একাধিক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছি, যার প্রতিটি একে অপরের থেকে পৃথক। প্রতিটিরই রয়েছে নতুন একদল করে অংশীজন, যাদের ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে রয়েছে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। কখনো কখনো এটি ছিল বন্ধুর। কিন্তু পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, এটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও ফলপ্রসূ একটি অভিজ্ঞতাও ছিল।

আমি ও আমার স্ত্রী মনু এখান থেকে অনেক অবিস্মরণীয় স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে যাব। অনেক মানুষ অসাধারণভাবে আমাদের জীবনকে স্পর্শ করেছেন, গড়ে তুলেছেন এমন বন্ধুত্বের বন্ধন, যা কূটনীতিবিদ হিসেবে এই দেশের সঙ্গে সংযোগের পরিসর অতিক্রম করে অনেক বেশি স্থায়ী হবে।

বাংলাদেশে কাজ করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি যে আমাদের সম্পর্কগুলো কতটা বিশেষ ও অনন্য। এক স্তরে, আমরা অভিন্ন ভূগোল, ইতিহাস, ভাষা ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে সংযুক্ত। অন্য দিকে, আমাদের মধ্যে এমন এক সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা ও সহমর্মিতা রয়েছে, যা অন্য যেকোনো দুটি সমাজের মধ্যে বিরল।

আরও গভীর পর্যায়ে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সম্মিলিত আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমরা আবেগের বন্ধনে আবদ্ধ।

আমাদের সম্পর্কটি তাৎপর্যপূর্ণ পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও আন্তসংযোগের। একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ যেমন ভারতের জন্য কাম্য, তেমনই একটি সমৃদ্ধ ভারতও বাংলাদেশের জন্য কাম্য।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আবেগগত সংযোগের এই বাস্তবতা এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও পারস্পরিক কল্যাণের এই যুক্তিই আমাদের সম্পর্কটিকে অব্যাহতভাবে পথনির্দেশনা প্রদান করবে এবং সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

Manual2 Ad Code

বাংলাদেশের জন্মের পর বিগত ৫৫ বছরে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছে। আমরা উভয়ই আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি সক্ষম, আত্মবিশ্বাসী, সংযুক্ত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী সমাজে পরিণত হয়েছি। আমরা উভয়েই আমাদের অভিন্ন এ অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত স্থায়িত্বের মতো অভিন্ন প্রতিবন্ধকতাসমূহ মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে আমাদের দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের দুটি বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে আমাদের উভয়কেই এই অঞ্চলে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের লক্ষ্যে মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে হবে।

Manual5 Ad Code

আজ আমরা আমাদের অতীতের তুলনায় অনেকাংশেই আলাদা হওয়ার কারণে আমি আরও বিশ্বাস করি, আমাদের সম্পৃক্ততার জন্য ভবিষ্যৎ-কেন্দ্রিক নতুন একটি কর্মসূচি প্রয়োজন। এমন একটি কর্মসূচি যা আমাদের নতুন সক্ষমতাসমূহ, নতুন লক্ষ্যসমূহ ও নতুন জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমন একটি কর্মসূচি, যা আমাদের সুদৃঢ় সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সংযোগের মাধ্যমে পরিচালিত। এবং এমন একটি কর্মসূচি, যা পারস্পরিক আগ্রহ, পারস্পরিক কল্যাণ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর ভিত্তি করে গঠিত।

দ্রুত বিকাশমান দুটি দেশ হিসেবে আমাদের ভৌগোলিক নৈকট্য আমাদের উভয়ের জন্যই একটি সম্পদ, কোনো দায় নয়। এই নৈকট্যকে উভয়ের জন্য নতুন সুযোগে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে আমাদের অবশ্যই নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে।

আমি আশাবাদী, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সব শুভানুধ্যায়ী এই অভিন্ন স্বপ্নকে গড়ে তোলা ও এটার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একত্র হবেন।

দুই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি আরও বেশি আশাবাদী হয়ে বাংলাদেশ ত্যাগ করছি।

Manual2 Ad Code

চার বছর অনেক দীর্ঘ সময় হলেও এই দেশ ও তার মানুষের প্রতি আমাদের যে স্নেহার্দ্রতা ও আবেগীয় টান গড়ে উঠেছে, তার জন্য এই সময়কাল অপ্রতুল। নানা উত্থান-পতন সত্ত্বেও কেবল এখানে গড়ে ওঠা অসাধারণ বন্ধুত্ব এবং সমগ্র দেশের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া উষ্ণতা ও স্নেহের কারণে বাংলাদেশে আমাদের কাটানো এই সময় আমার ও আমার স্ত্রীর কাছে সবচেয়ে প্রিয় পর্যায় হিসেবে স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশের প্রায় সব স্তরের এমন বহু সদয় ও সুহৃদ বন্ধু, যাঁরা আমাদের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করেছেন, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার প্রত্যাশা করছি। আমরা আশা করি, আমাদের পথ আবার কখনো, কোনো এক সময়, কোনো এক স্থানে মিলিত হবে!

Manual2 Ad Code

সেই পর্যন্ত আমি শুধু এটাই বলতে চাই, আবার দেখা হবে!

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ