গরিবের ১০০ টাকাই অর্থনীতি সচল রাখে: সংসদে রেজা কিবরিয়া

প্রকাশিত: ৬:০০ অপরাহ্ণ, জুন ২৬, ২০২৬

গরিবের ১০০ টাকাই অর্থনীতি সচল রাখে: সংসদে রেজা কিবরিয়া

Manual3 Ad Code
  • প্রান্তিক মানুষের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছানোর আহ্বান, উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং সংস্কারের তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক | সংসদ ভবন (ঢাকা), ২৬ জুন ২০২৬ : হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া বলেছেন, দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে সম্পদের সুষম বণ্টন এবং প্রান্তিক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে। কোটিপতিদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার চেয়ে দরিদ্র মানুষের হাতে সামান্য অর্থ পৌঁছালেও তা দ্রুত বাজারে প্রবাহিত হয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন ২০২৬) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, “আপনি একজন কোটিপতিকে যদি ১০ হাজার টাকা দেন, সে হয়তো সেই অর্থ ব্যয়ই করবে না। ফলে অর্থনীতিতে এর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব পড়বে না। কিন্তু একজন গরিব মানুষ ১০০ টাকা বা ১ হাজার টাকা পেলেও তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবায় ব্যয় করে। এর ফলে স্থানীয় বাজার, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।”

Manual6 Ad Code

তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোটিপতি ও ধনী গোষ্ঠীকে তোষণের পরিবর্তে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন মানুষের জীবনমান উন্নত হবে, অন্যদিকে অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাহিদাও শক্তিশালী হবে।

আয়ের সুষম বণ্টনকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান

সংসদ সদস্য রেজা কিবরিয়া বলেন, অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি বা সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক নয়, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি মনে করেন, একজন দিনমজুরের দৈনিক আয় এবং বাজারে সবচেয়ে সস্তা চালের দামের অনুপাত বিশ্লেষণ করলেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, “একটি জনবান্ধব সরকারের উচিত নিয়মিতভাবে এই সূচক পর্যবেক্ষণ করা। কারণ মানুষের আয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের সম্পর্কই বলে দেয় সাধারণ মানুষ কতটা স্বস্তিতে আছে।”

তার মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল যদি সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে না পৌঁছায়, তবে সেই উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। এজন্য আয় বৈষম্য কমিয়ে অর্থনৈতিক সুযোগের বিস্তার ঘটানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়

Manual2 Ad Code

প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে রেজা কিবরিয়া বলেন, দেশের অর্থ শুধু বড় বড় শপিং মল, বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট বা অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো খাতে ব্যয় করলে অর্থনীতির প্রকৃত ভিত্তি শক্তিশালী হবে না।

তিনি বলেন, “টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে বিনিয়োগকে উৎপাদনমুখী শিল্প ও কারখানা স্থাপনের দিকে নিয়ে যেতে হবে। উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, মানুষের হাতে আয় আসবে এবং অর্থনীতির ভেতরে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে।”

তার মতে, শিল্পায়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই হতে পারে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায়। একই সঙ্গে রপ্তানি সক্ষমতা বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও এটি সহায়ক হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

Manual3 Ad Code

ব্যাংকিং খাতের অদক্ষতা নিয়ে সমালোচনা

দেশের ব্যাংকিং খাতের কার্যক্রম নিয়েও সমালোচনা করেন রেজা কিবরিয়া। তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে গড়ে ৫ শতাংশ সুদ প্রদান করলেও ব্যবসায়িক ঋণের ক্ষেত্রে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আদায় করছে।

তিনি বলেন, “আমানত ও ঋণের সুদের মধ্যে এত বড় ব্যবধান ব্যাংকিং খাতের অদক্ষতা এবং কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। এর ফলে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ব্যয় বেড়ে যায় এবং শিল্প ও ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।”

Manual3 Ad Code

ব্যাংকিং খাতকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নের জন্য আর্থিক খাতের সংস্কার অপরিহার্য।

রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রশ্ন

বাজেটে নির্ধারিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হবিগঞ্জ-১ আসনের এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, গত দেড় দশকে সরকার কখনোই রাজস্ব আদায়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ৮০ থেকে ৮৪ শতাংশের বেশি অর্জন করতে পারেনি।

রেজা কিবরিয়ার ভাষায়, “বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে বাজেট প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু অর্থবছর শেষে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক, বেসরকারি খাত এবং বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি পূরণ করতে হয়।”

তিনি মনে করেন, রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি, করজাল সম্প্রসারণ এবং কর প্রশাসনে দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে বাস্তবভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন করা প্রয়োজন। অন্যথায় ঋণনির্ভরতা বাড়তে থাকবে এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হবে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পক্ষে অবস্থান

সংসদে দেওয়া বক্তব্যে ড. রেজা কিবরিয়া মূলত অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে সাধারণ মানুষকে রাখতে হবে। দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বাস্তবসম্মত রাজস্ব ব্যবস্থাপনা—এই পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দিলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।

তার বক্তব্যে বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে সমালোচনা থাকলেও মূল বার্তা ছিল—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যেন সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে এবং উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে যেন সাধারণ জনগণ থাকে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ