মায়ের স্মৃতিতে পাঠাগার, আলোকিত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম

প্রকাশিত: ৩:২১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬

মায়ের স্মৃতিতে পাঠাগার, আলোকিত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম

Manual1 Ad Code
  • সালেহা বেগমের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে সিরাজগঞ্জে স্মরণসভা, প্রতিযোগিতা, সম্মাননা ও শিক্ষার্থীদের মাঝে বই-গাছ বিতরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : ‘বই পড়ি—জীবন গড়ি’—এই প্রত্যয়কে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জে প্রবাসী লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মঞ্জুরে খোদা টরিকের মা সালেহা বেগমের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে। তাঁর স্মৃতিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ধারণ করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞানচর্চা, মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে সালেহা বেগম স্মৃতি পাঠাগারের উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।

স্মরণসভাকে কেন্দ্র করে পাঠাগার প্রাঙ্গণে ছিল শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, পাঠক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি। আয়োজনের বিভিন্ন পর্বে বাংলা হাতের লেখা, বই পড়া, চিত্রাঙ্কন ও কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, স্মরণসভা, সম্মাননা প্রদান, মেধা স্বীকৃতি, পুরস্কার বিতরণ এবং শিক্ষার্থী ও পাঠকদের মধ্যে বই উপহার দেওয়া হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের হাতে গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়।

স্মৃতিকে শিক্ষার আলোয় রূপ দেওয়ার উদ্যোগ

সালেহা বেগমের মৃত্যুবার্ষিকীকে কেবল আনুষ্ঠানিক স্মরণে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত পাঠাগারকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিবছর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে নানা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের বই পড়া ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে একটি জ্ঞানভিত্তিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে।

পাঠাগারটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—শিশু-কিশোরদের জন্য বই পড়ার পাশাপাশি তাদের নিজেদের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করা। কবিতা আবৃত্তি, রচনা, হাতের লেখা, চিত্রাঙ্কন, বিতর্কসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ সেই উদ্যোগেরই অংশ।

আয়োজকদের মতে, একটি পাঠাগার শুধু বই রাখার স্থান নয়; এটি একটি এলাকার শিশু-কিশোরদের চিন্তা, কল্পনা ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। সেই লক্ষ্যেই সালেহা বেগম স্মৃতি পাঠাগারের কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

দুই দিনের আয়োজন

সালেহা বেগমের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ২৬ সেপ্টেম্বর শনিবার সকাল ৯টা থেকে শুরু হয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতা। এদিন বাংলা হাতের লেখা, বই পড়া, চিত্রাঙ্কন ও কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। একই দিন দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আয়োজন করা হয় ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প।

পরদিন ২৭ সেপ্টেম্বর রবিবার বিকেল ৩টায় অনুষ্ঠিত হয় মূল স্মরণসভা। এতে সালেহা বেগমের স্মৃতিচারণের পাশাপাশি সম্মাননা প্রদান, মেধা স্বীকৃতি ও পুরস্কার বিতরণ করা হয়। শিক্ষার্থী ও পাঠকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বই। শিক্ষার্থীদের মাঝে গাছের চারা বিতরণের মধ্য দিয়ে জ্ঞানচর্চার সঙ্গে পরিবেশ সচেতনতার বার্তাও দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মহীদুল হাসান, সিরাজগঞ্জ জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারের সিনিয়র লাইব্রেরিয়ান সাজ্জাদ করিম এবং অ্যাডভোকেট মাহবুবে খোদা টুটুল।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সালেহা বেগম স্মৃতি পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম। সভাপতিত্ব করেন পাঠাগারের সভাপতি রফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ফজল-এ-খোদা লিটন।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, গুণীজনদের উপস্থিতি ও আন্তরিক অংশগ্রহণ পুরো আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তোলে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি করে।

‘মায়ের স্মৃতি আজ একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে’

সালেহা বেগমের ছেলে এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি, কানাডা প্রবাসী লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মঞ্জুরে খোদা টরিক তাঁর মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মায়ের স্মৃতি এবং পাঠাগার প্রতিষ্ঠার কথা তুলে ধরেছেন।

Manual1 Ad Code

তিনি লিখেছেন, তাঁর মা পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার ছয় বছর পার হয়েছে। মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিতে ছোট ভাই অ্যাডভোকেট মাহবুবে খোদা টুটুল মায়ের জন্মভিটায় শিশু-কিশোরদের জন্য একটি আধুনিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছেন।

টরিকের ভাষায়, শত শত ছেলে-মেয়ে সেখান থেকে শিল্প-সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞানবিষয়ক বই সংগ্রহ করে এবং পাঠাগারে বসে বই পড়ে ও নিজেদের মধ্যে ভাবনা বিনিময় করে।

প্রতিবছর মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পাঠাগার কর্তৃপক্ষ কবিতা আবৃত্তি, বিষয়ভিত্তিক রচনা, বই পড়া, হাতের লেখা, বিতর্কসহ নানা ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে অংশ নেয়।

এবারের আয়োজনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. আলী জিন্নাহ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বলেও তিনি তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন।

‘মা আমাদের শিক্ষিত করেছেন’

মায়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ড. মঞ্জুরে খোদা টরিক লিখেছেন, তাঁর মা তাঁদের শিক্ষিত করেছেন। মা আজ তাঁদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত পাঠাগার একটি গ্রাম ও অঞ্চলকে বছরের পর বছর আলোকিত ও শিক্ষিত করে চলেছে।

তিনি লিখেছেন, পাঠাগারটি দেখলে তাঁদের ঘিরে মায়ের মমতা, প্রচেষ্টা ও সংগ্রামের কথা মনে পড়ে।

একজন মায়ের ব্যক্তিগত স্মৃতিকে কীভাবে একটি বৃহত্তর সামাজিক উদ্যোগে রূপ দেওয়া যায়, সালেহা বেগম স্মৃতি পাঠাগার তার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে—এমন ভাবনাই উঠে এসেছে তাঁর বক্তব্যে।

পাঠাগার ঘিরে শিশু-কিশোরদের নতুন পরিসর

গ্রাম ও মফস্বল পর্যায়ে শিশু-কিশোরদের জন্য নিয়মিত বই পড়া, সৃজনশীল প্রতিযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উদ্যোগ। বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের বাইরে বইয়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক গড়ে তোলা তাদের জ্ঞান ও কৌতূহলের পরিসর বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

সালেহা বেগম স্মৃতি পাঠাগারের আয়োজনে তাই শুধু পুরস্কার বা প্রতিযোগিতার বিষয়টি নয়, পাঠাভ্যাস তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়া এবং পাঠাগারে তাদের নিয়মিত আসার সুযোগ তৈরি করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

Manual1 Ad Code

পাঠাগারকে ঘিরে শিশু-কিশোরদের এমন অংশগ্রহণ স্থানীয়ভাবে একটি সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে। যেখানে বই, সাহিত্য, চিত্রকলা, কবিতা, বিতর্ক ও নানা সৃজনশীল কর্মকাণ্ড একই সঙ্গে চর্চার সুযোগ পাচ্ছে।

Manual3 Ad Code

বইয়ের সঙ্গে গাছ—জ্ঞান ও পরিবেশের বার্তা

এবারের আয়োজনে শিক্ষার্থীদের বই উপহারের পাশাপাশি গাছের চারা বিতরণ করা হয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতার বার্তাও দেওয়া হয়েছে।

একদিকে বই মানুষের চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করে, অন্যদিকে গাছ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশ ও জীবনের ভিত্তি রক্ষা করে। তাই স্মরণসভাকে কেন্দ্র করে বই ও গাছ—দুই ধরনের উপহার দেওয়ার বিষয়টি আয়োজনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে।

স্মরণ থেকে সামাজিক দায়বদ্ধতা

মৃত্যুবার্ষিকী সাধারণত প্রিয়জনকে স্মরণ করার একটি উপলক্ষ। তবে সালেহা বেগমের স্মরণে আয়োজিত কর্মসূচি সেই ব্যক্তিগত শোক ও স্মৃতিকে একটি সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করেছে। মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত পাঠাগারকে কেন্দ্র করে শিশু-কিশোরদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করা, প্রতিভা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং তাদের পুরস্কৃত করার ধারাবাহিক উদ্যোগ সেই স্মৃতিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

ড. মঞ্জুরে খোদা টরিক তাঁর বক্তব্যে এ প্রসঙ্গে চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের একটি বহুল উদ্ধৃত উক্তি তুলে ধরেছেন—‘যদি তোমার পরিকল্পনা এক বছরের জন্য হয়, তাহলে ধান রোপণ করো। যদি তোমার পরিকল্পনা দশ বছরের জন্য হয়, তাহলে গাছ লাগাও। আর যদি তোমার পরিকল্পনা একশ বছরের জন্য, সব সময়ের জন্য, তাহলে মানুষকে শিক্ষিত করো।’

সালেহা বেগমের স্মরণে প্রতিষ্ঠিত পাঠাগারের কার্যক্রমের মধ্যেও যেন সেই দীর্ঘমেয়াদি ভাবনার প্রতিফলন দেখা যায়। একজন মানুষ চলে গেলেও তাঁর স্মৃতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি প্রতিষ্ঠান যদি পরবর্তী প্রজন্মের জ্ঞানচর্চা ও মানবিক বিকাশে ভূমিকা রাখে, তবে সেই স্মৃতি ব্যক্তিগত পরিসর ছাড়িয়ে সামাজিক পরিসরে বিস্তৃত হয়।

একটি পরিবারের স্মৃতি থেকে একটি এলাকার সম্পদ

সালেহা বেগম স্মৃতি পাঠাগারের উদ্যোগটি মূলত একটি পরিবারের প্রিয়জনকে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে শুরু হলেও এর কার্যক্রম এখন শিশু-কিশোর ও পাঠকদের ঘিরে বিস্তৃত হয়েছে। নিয়মিত বই পড়ার সুযোগ, প্রতিযোগিতার আয়োজন, বই উপহার, মেধার স্বীকৃতি এবং শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে পাঠাগারটি স্থানীয় পর্যায়ে একটি শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ হিসেবে কাজ করছে।

Manual7 Ad Code

মায়ের স্মৃতিকে ধরে রাখার এই প্রয়াস সম্পর্কে ড. মঞ্জুরে খোদা টরিকের বক্তব্যে তাই আবেগের পাশাপাশি রয়েছে শিক্ষার গুরুত্বের কথাও। তাঁর উপলব্ধি—মানুষের জীবন শেষ হলেও তার আদর্শ, স্মৃতি ও কাজকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কোনো প্রতিষ্ঠান যদি অন্যদের উপকারে আসে, তবে সেই উত্তরাধিকার দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

সিরাজগঞ্জের এই আয়োজন সেই উত্তরাধিকারেরই একটি ধারাবাহিক প্রকাশ। প্রতিবছর মৃত্যুবার্ষিকী ফিরে আসে; ফিরে আসে স্মৃতিচারণ, প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণের আয়োজন। আর সেই আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের হাতে পৌঁছে যায় বই, তারা পায় নিজের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ, পাঠাগারে তৈরি হয় পাঠের পরিবেশ।

সালেহা বেগম নেই—কিন্তু তাঁর নামে গড়ে ওঠা পাঠাগারটি বইয়ের পাতায়, শিশু-কিশোরদের কণ্ঠে কবিতায়, তাদের আঁকা ছবিতে এবং জ্ঞানচর্চার নানা কর্মকাণ্ডে তাঁর স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখছে। একটি মায়ের স্মৃতি এভাবেই ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে একটি প্রজন্মের জন্য শিক্ষার ও সংস্কৃতির পরিসরে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ