বিডিনিউজের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী আর নেই

প্রকাশিত: ৮:১২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২, ২০২৬

বিডিনিউজের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী আর নেই

Manual1 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০২ অক্টোবর ২০২৬ : বাংলাদেশের অনলাইন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা রাখা সাংবাদিক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌফিক ইমরোজ খালিদী আর নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

Manual3 Ad Code

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর লন্ডনের সেইন্ট বার্থোলমিউ’স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার (২ অক্টোবর) স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে তিনি মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর।

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ব্যক্তিগত সফরে তৌফিক ইমরোজ খালিদী লন্ডনে ছিলেন। সেখানে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে বৃহস্পতিবার রাতে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার তার মৃত্যু হয়।

তার মরদেহ কবে দেশে আনা হবে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। জানাজা ও দাফনের স্থান ও সময় চূড়ান্ত হলে পরিবারের পক্ষ থেকে তা জানানো হবে।

দুই দশকের ডিজিটাল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ

বাংলাদেশে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের বিকাশের ইতিহাসে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তার নেতৃত্বেই দুই দশক আগে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নতুন আঙ্গিকে যাত্রা শুরু করে, যার মধ্য দিয়ে দেশে ২৪ ঘণ্টার অনলাইন সংবাদ পরিবেশনের নতুন যুগের সূচনা হয়।

২০০৫ সালের প্রথমার্ধে ‘বিডিনিউজ’ মূলত সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে সংবাদ সরবরাহকারী একটি বার্তা সংস্থা হিসেবে কাজ শুরু করে। দেশের অন্যান্য বার্তা সংস্থা যখন টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে সংবাদ সরবরাহ করত, তখন বিডিনিউজ ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংবাদ পরিবেশনের উদ্যোগ নেয়।

২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসে। তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তখন প্রতিষ্ঠানটির কাঠামো ও কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। ওই বছরের ২৩ অক্টোবর নতুন আঙ্গিকে ২৪ ঘণ্টার অনলাইন সংবাদমাধ্যম হিসেবে যাত্রা শুরু করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

Manual7 Ad Code

এর পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ নিউজ ২৪ আওয়ার্স লিমিটেডেরও পরিচালক ও অংশীদার ছিলেন তিনি।

‘শুধুই সাংবাদিকতা, সবসময়’

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর পেশাগত দর্শনের সঙ্গে সাংবাদিকতার প্রতি নিবেদন গভীরভাবে যুক্ত ছিল। প্রায় চার দশকের সাংবাদিকতা জীবনে সংবাদপত্র, আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম এবং ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬৭ সালের ১৪ জুন জন্ম নেওয়া তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি ১৯৮৯ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি যোগ দেন ‘সানডে এক্সপ্রেস’ পত্রিকায়।

পরবর্তী সময়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’ ও ‘দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস’-এ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

দ্য ডেইলি স্টারে তিনি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত কূটনৈতিক প্রতিবেদক, ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বিজনেস এডিটর এবং ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত যুগ্ম বার্তা সম্পাদক ও উইকেন্ড এডিশনের বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসে সহকারী সম্পাদক ও সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কূটনীতি, বাণিজ্য, রাজনীতি ও দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন করেন তিনি।

বিবিসিতে পাঁচ বছর

দেশের গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম বিবিসিতেও কাজ করেছেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৫ সালের জুন পর্যন্ত তিনি লন্ডনে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কর্মরত ছিলেন। সেখানে সংবাদ ও কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স অনুষ্ঠান প্রযোজনা ও উপস্থাপনার পাশাপাশি আলোচিত ‘ডিবেট’ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতায় তার দক্ষতা আরও সমৃদ্ধ হয় প্যারিসের জার্নালিস্টস ইন ইউরোপ ফাউন্ডেশন এবং জাপান ফরেন প্রেস সেন্টারের ফেলোশিপ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সক্রিয় ছিলেন

ডিজিটাল সাংবাদিকতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী সাংবাদিকদের মধ্যে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর পরিচিতি ছিল আন্তর্জাতিক পর্যায়েও।

২০১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত সাউথ-টু-সাউথ মিডিয়া ডায়ালগে এশিয়া-প্যাসিফিক, লাতিন আমেরিকা ও পশ্চিম এশিয়ার ১৪ জন শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল মিডিয়া উদ্ভাবকের একজন হিসেবে স্বীকৃতি পান তিনি।

২০১৬ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশ নেন।

জার্মানির বনে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামেও একাধিকবার অংশ নেন তিনি। ২০১০, ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৯ সালে ফোরামটির বিভিন্ন আয়োজনে তিনি অংশগ্রহণ করেন।

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ রাইজিং’ শীর্ষক সম্মেলনে প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

সাংবাদিকতা ও ডিজিটাল গণমাধ্যমে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তৌফিক ইমরোজ খালিদী বিভিন্ন সম্মাননা ও স্বীকৃতি পেয়েছেন।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন ক্ষেত্রেও তিনি যুক্ত ছিলেন। অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন ও পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির ২০১২ ও ২০১৫ সালের কার্যক্রমে সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৮ সালে বার্তা সংস্থাগুলোর নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। এর আগে ২০০৭ সালে ঢাকার নদী রক্ষায় গঠিত জাতীয় টাস্কফোর্সের সদস্য হিসেবেও কাজ করেন।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রস্তুতির মধ্যেই চলে গেলেন

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাংবাদিক ও কর্মীদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

প্রতিষ্ঠানটির একজন মুখপাত্র বলেন, আগামী ২৩ অক্টোবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি চলছিল। তৌফিক ইমরোজ খালিদী নিজেই এসব পরিকল্পনার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

মুখপাত্র বলেন, “আসছে ২৩ অক্টোবর ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আমরা। তৌফিক ভাই নিজে সব পরিকল্পনা করছিলেন। সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন দারুণ উজ্জীবিত, উদ্দীপ্ত। কিন্তু তার তিন সপ্তাহ আগে সব শেষ হয়ে গেল। আমাদের এ ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়।”

রাষ্ট্রপতির শোক

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের অনলাইন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার বিকাশে তৌফিক ইমরোজ খালিদী ছিলেন একজন পথিকৃৎ। তার মৃত্যুতে দেশ একজন অভিজ্ঞ, সজ্জন ও বরেণ্য গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বকে হারিয়েছে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, “তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যু আমার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।”

Manual2 Ad Code

ওয়ার্কার্স পার্টির শোক

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নূর আহমেদ বকুল।

এক শোকবার্তায় তারা মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং তার সাংবাদিকতা জীবনের অবদানের কথা স্মরণ করেন।

সৈয়দ আমিরুজ্জামানের শোক

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

শোকবার্তায় তিনি বলেন, তৌফিক ইমরোজ খালিদী আশির দশকের এরশাদবিরোধী ছাত্র-গণআন্দোলনের সংগঠক এবং জাসদ ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। পরবর্তী সময়ে অনলাইন সাংবাদিকতায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

তিনি মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

একটি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে একটি যুগের যাত্রা

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাংবাদিকতা জীবন ছিল সংবাদমাধ্যমের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলার একটি দীর্ঘ অধ্যায়। মুদ্রিত সংবাদপত্রের যুগ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম এবং সেখান থেকে ইন্টারনেটভিত্তিক ২৪ ঘণ্টার সংবাদমাধ্যম—তার পেশাজীবনের বড় অংশজুড়েই ছিল গণমাধ্যমের পরিবর্তন ও রূপান্তর।

২০০৬ সালে তার নেতৃত্বে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের যাত্রা বাংলাদেশের সংবাদ পরিবেশনের ধরনকে নতুন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়। দ্রুত সংবাদ প্রকাশ, সার্বক্ষণিক আপডেট এবং ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদ পরিবেশনের ধারণা তখনও দেশের গণমাধ্যমে তুলনামূলক নতুন ছিল।

পরবর্তী দুই দশকে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের পরিসরও বদলে যায়। সেই পরিবর্তনের শুরুর পর্যায়ের সঙ্গে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা অঙ্গনে তৈরি হলো এক শূন্যতা। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি যে প্রতিষ্ঠান, পেশা ও ডিজিটাল সংবাদব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তার সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা শোকের সঙ্গে স্মরণ করছেন তাকে।

২৩ অক্টোবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের দুই দশক পূর্তির আয়োজন সামনে রেখেই তার আকস্মিক মৃত্যু প্রতিষ্ঠানটির জন্য যেমন গভীর শোকের, তেমনি বাংলাদেশের ডিজিটাল সাংবাদিকতার ইতিহাসেও একটি বেদনাবিধুর অধ্যায়ের সূচনা করল।

Manual4 Ad Code

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর। তিনি স্ত্রী, সন্তান, স্বজন, সহকর্মী ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ