সাংবাদিকতা, সমাজসেবা ও নেতৃত্বে অনন্য দৃষ্টান্ত গোপাল দেব চৌধুরী

প্রকাশিত: ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৬, ২০২৬

সাংবাদিকতা, সমাজসেবা ও নেতৃত্বে অনন্য দৃষ্টান্ত গোপাল দেব চৌধুরী

Manual1 Ad Code
  • আজ শ্রীমঙ্গলের প্রথিতযশা সাংবাদিকের নবম মৃত্যুবার্ষিকী

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ০৬ অক্টোবর ২০২৬ : শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকতা, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও সাংগঠনিক নেতৃত্বে যাঁরা নিজেদের কর্ম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন, গোপাল দেব চৌধুরী তাঁদের অন্যতম। প্রথিতযশা এই সাংবাদিক ছিলেন সাপ্তাহিক চায়ের দেশ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও প্রকাশক এবং শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি। সাংবাদিকতার পাশাপাশি শিক্ষকতা, সমাজসেবা, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন উদ্যোগে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে শ্রীমঙ্গলের মানুষের কাছে স্বতন্ত্র মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

আজ ৬ অক্টোবর তাঁর নবম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৭ সালের এই দিনে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭২ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে শ্রীমঙ্গল হারিয়েছিল সাংবাদিকতা অঙ্গনের একজন অভিভাবক, সংগঠক ও সমাজহিতৈষী ব্যক্তিত্বকে। তাঁর নবম মৃত্যুবার্ষিকীতে সহকর্মী সাংবাদিক, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছেন।

শিক্ষকতা থেকে সাংবাদিকতায়

গোপাল দেব চৌধুরীর কর্মজীবনের সূচনা হয়েছিল শিক্ষকতা দিয়ে। শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। শিক্ষকতার মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেলেও পরবর্তী সময়ে তাঁর কর্মজীবনের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে সাংবাদিকতা।

সাংবাদিকতাকে তিনি কেবল পেশা হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের কথা বলা এবং সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরার একটি দায়িত্বশীল মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। স্থানীয় মানুষের সমস্যা, সম্ভাবনা, চা শিল্পের নানা বিষয়, শিক্ষা-সংস্কৃতি, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং শ্রীমঙ্গলের সামগ্রিক জনজীবন তাঁর সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।

Manual8 Ad Code

চায়ের দেশ—স্থানীয় সাংবাদিকতায় নতুন অধ্যায়

২০০৪ সালের ২৫ জুলাই সাপ্তাহিক চায়ের দেশ প্রকাশনার মধ্য দিয়ে শ্রীমঙ্গলের স্থানীয় সাংবাদিকতায় নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করেন গোপাল দেব চৌধুরী। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর সম্পাদনায় চায়ের দেশ শুধু একটি স্থানীয় সংবাদপত্র হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং শ্রীমঙ্গলের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ জনমাধ্যমে পরিণত হয়। বিশেষ করে চা শিল্পনির্ভর এই অঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষ, চা-বাগান, স্থানীয় অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নাগরিক সমস্যার নানা দিক পত্রিকাটির প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেত।

স্থানীয় সাংবাদিকদের মতে, সীমিত সুযোগ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও গোপাল দেব চৌধুরী স্থানীয় সংবাদপত্রকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করেছেন। তাঁর সম্পাদনা ও নেতৃত্বে তৈরি হয়েছিল স্থানীয় সাংবাদিকতার একটি নিজস্ব পরিসর।

প্রেসক্লাবের নেতৃত্বে দীর্ঘ পথচলা

শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গোপাল দেব চৌধুরী। দীর্ঘ ২৭ বছর তিনি প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি নির্বাচিত সভাপতি হিসেবেও দুই দফা দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

দীর্ঘ সময় ধরে প্রেসক্লাবের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে তিনি ছিলেন একজন অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর নেতৃত্বে শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত হয়ে ওঠে। সাংবাদিকদের পেশাগত কল্যাণ, প্রশিক্ষণ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি সাংবাদিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নেও তিনি গুরুত্ব দিতেন বলে সহকর্মীরা জানান। তাঁর সময়েই প্রেসক্লাবের বিভিন্ন কল্যাণমূলক উদ্যোগ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা তৈরি হয়।

Manual7 Ad Code

সাংবাদিকতার বাইরে বহুমুখী কর্মকাণ্ড

গোপাল দেব চৌধুরীর কর্মপরিধি সাংবাদিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন বহুমুখী সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় একজন সংগঠক।

তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে শ্রীমঙ্গল রোটারি ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট, রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমের কার্যকরী কমিটির সভাপতি এবং শ্রীমঙ্গল ওষুধ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

Manual8 Ad Code

বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি সামাজিক উন্নয়ন, মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখেন। ফলে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরেও তাঁর ছিল ব্যাপক পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা।

চা শিল্পের জনপদে সাংবাদিকতার আলাদা পরিচয়

শ্রীমঙ্গল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চা অঞ্চল। চা শিল্পের সঙ্গে এ অঞ্চলের অর্থনীতি, শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও স্থানীয় সমাজব্যবস্থা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকতায় চা শিল্প ও চা-বাগানের মানুষের জীবনযাত্রা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

গোপাল দেব চৌধুরী তাঁর সাংবাদিকতার মাধ্যমে এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। স্থানীয় সমস্যা ও মানুষের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে সংবাদপত্রের পাতায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি।

তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত চায়ের দেশ স্থানীয় মানুষের কাছে এমন একটি সংবাদমাধ্যম হিসেবে পরিচিতি পায়, যেখানে শ্রীমঙ্গলের নিজস্ব বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হতো।

সহকর্মীদের চোখে গোপাল দেব চৌধুরী 

গোপাল দেব চৌধুরীর দীর্ঘ কর্মজীবনের সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথা-এর বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক এবং বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান তাঁকে স্মরণ করে বলেন, “গোপাল দেব চৌধুরী শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানবিকতার প্রতীক ও শ্রীমঙ্গলের এক জীবন্ত ইতিহাস।”

তাঁর মতে, সাংবাদিকতার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল গোপাল দেব চৌধুরীর। তাঁর কর্মময় জীবন শ্রীমঙ্গলের সামাজিক ও সাংবাদিকতার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব নেতৃত্বের শ্রদ্ধা

গোপাল দেব চৌধুরীর নবম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির আহ্বায়ক সৈয়দ আবু জাফর সালাউদ্দিন ও সদস্যসচিব রুবেল আহমেদ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

এক বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, “গোপাল দেব চৌধুরী ছিলেন শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিক সমাজের পথপ্রদর্শক। তাঁর সততা, নিষ্ঠা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।”

তাঁদের মতে, স্থানীয় সাংবাদিকতার বিকাশে গোপাল দেব চৌধুরীর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব একটি শক্তিশালী সাংবাদিক সংগঠন হিসেবে পরিচিতি পায়।

পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকদের অনুপ্রেরণা

গোপাল দেব চৌধুরীর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার তাঁর হাতে গড়ে ওঠা সাংবাদিকদের একটি প্রজন্ম। স্থানীয় সাংবাদিকদের অনেকেই তাঁর কাছ থেকে সাংবাদিকতার মৌলিক শিক্ষা, সংবাদ সংগ্রহের কৌশল, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এবং পেশাগত দায়িত্বশীলতার পাঠ নিয়েছেন।

তাঁর হাতে গড়ে ওঠা প্রজন্মের অনেক সাংবাদিক পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁদের কর্মজীবনের সাফল্যের পেছনে গোপাল দেব চৌধুরীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয় সাংবাদিকরা।

তাঁরা বলছেন, একজন সাংবাদিকের জন্য সংবাদ প্রকাশের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সত্য, ন্যায় ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা—গোপাল দেব চৌধুরীর কর্মজীবনে এই মূল্যবোধের প্রতিফলন ছিল।

ব্যক্তিজীবনে

২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গোপাল দেব চৌধুরী মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।

Manual1 Ad Code

তিনি স্ত্রী ইলা দেব চৌধুরী, দুই পুত্র সুমন দেব চৌধুরী ও সনেট দেব চৌধুরীসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী, বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ী রেখে যান।

তাঁর মৃত্যু শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিক সমাজে গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই শূন্যতা পুরোপুরি পূরণ হয়নি বলে মনে করেন তাঁর সহকর্মীরা।

গৌরবময় উত্তরাধিকার

গোপাল দেব চৌধুরীর জীবন ছিল বহুমাত্রিক। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে সাংবাদিকতা, সংবাদপত্র প্রকাশনা, সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও সমাজসেবায় তিনি নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছিলেন।

তাঁর হাতে গড়ে ওঠা চায়ের দেশ স্থানীয় সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একইভাবে শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের দীর্ঘ নেতৃত্ব তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার স্মারক হয়ে আছে।

স্থানীয় সাংবাদিকদের মতে, গোপাল দেব চৌধুরীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এটি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতারও একটি ক্ষেত্র। সততা, নিষ্ঠা, সাহস ও সামাজিক দায়িত্ববোধকে সামনে রেখে তিনি যে সাংবাদিকতার চর্চা করেছেন, তা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।

আজ তাঁর নবম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করে শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিক সমাজ বলছে, সময়ের ব্যবধানে মানুষটি শারীরিকভাবে অনুপস্থিত হলেও তাঁর কর্ম, আদর্শ ও অবদান স্থানীয় সাংবাদিকতার ইতিহাসে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে। শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকতা ও সমাজসেবায় তাঁর রেখে যাওয়া পদচিহ্নই হয়ে থাকবে তাঁর সবচেয়ে বড় স্মৃতিচিহ্ন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ