সিলেট ৯ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৯, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৯ অক্টোবর ২০২৬ : পাটুরিয়া ফেরিঘাটের মানুষ, শ্রম, অপেক্ষা, যাত্রা ও নদীকেন্দ্রিক জীবনের নানা গল্প উঠে এসেছে ৫৯ নবীন আলোকচিত্রীর ক্যামেরায়। তাঁদের নির্বাচিত ৫৯টি আলোকচিত্র নিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চিত্রশালায় শুরু হয়েছে ‘ফেরিঘাটের জীবন’ শীর্ষক প্রদর্শনী।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ‘আলোর ইশকুল’ কর্মসূচির ফটোগ্রাফি কোর্সের ১১তম ব্যাচের কোর্স সমাপনী অনুষ্ঠান ও আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর ২০২৬) সন্ধ্যা ৭টায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ৪০১ নম্বর কক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সাবেক সভাপতি এবং নিবেদিতপ্রাণ বন্যপ্রাণী ও পাখি আলোকচিত্রী জালাল আহমেদ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ও সাবেক সিনিয়র সচিব মো. আবদুস সামাদ এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ও স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ আলী নকী।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক খোন্দকার মো. আসাদুজ্জামান।
ফটোগ্রাফি কোর্সের ১১তম ব্যাচের ৫৯ জন সদস্য সফলভাবে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। কোর্সের অংশ হিসেবে তাঁরা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌযোগাযোগকেন্দ্র পাটুরিয়া ফেরিঘাটে দিনব্যাপী আলোকচিত্র ধারণ করেন। তাঁদের সেই মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের নির্বাচিত ফলাফল নিয়ে সাজানো হয়েছে ‘ফেরিঘাটের জীবন’ শীর্ষক এ প্রদর্শনী। এতে প্রত্যেক আলোকচিত্রীর একটি করে ছবি স্থান পেয়েছে। ফলে প্রদর্শনীতে মোট ৫৯ জন নবীন আলোকচিত্রীর ৫৯টি নির্বাচিত আলোকচিত্রের মধ্য দিয়ে একই স্থানকে দেখার ৫৯টি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে।
ফেরিঘাটের চেনা দৃশ্যে জীবনের বহুমাত্রিক গল্প
ফেরিঘাট সাধারণত মানুষের কাছে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার পথ, ফেরিতে ওঠার অপেক্ষা কিংবা নদী পারাপারের একটি ব্যস্ত যোগাযোগকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই পরিচিত দৃশ্যের আড়ালেও রয়েছে মানুষের জীবনসংগ্রাম, জীবিকা, সম্পর্ক, আবেগ, প্রত্যাশা ও প্রতিদিনের অসংখ্য গল্প। ‘ফেরিঘাটের জীবন’ প্রদর্শনীতে সেই বহুমাত্রিক বাস্তবতাকেই আলোকচিত্রের ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন নবীন আলোকচিত্রীরা।
পাটুরিয়া ফেরিঘাটে দিনব্যাপী ছবি ধারণের অভিজ্ঞতা তাঁদের সামনে খুলে দিয়েছে এক ব্যস্ত জনপদের নানা অনুষঙ্গ। নদী ও ফেরির চলাচল, মানুষের অপেক্ষা, শ্রমজীবী মানুষের কর্মব্যস্ততা, যাত্রীদের যাত্রাপথ, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন জীবনের বিচিত্র মুহূর্ত—সব মিলিয়ে ফেরিঘাট এখানে কেবল যাতায়াতের একটি স্থান নয়; বরং হয়ে উঠেছে জীবনকে কাছ থেকে দেখার একটি ক্ষেত্র।
একটি স্থানে একই সময়ে উপস্থিত থেকেও প্রত্যেক আলোকচিত্রী তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, অনুভব ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আলাদা গল্প খুঁজে নিতে পারেন। কেউ হয়তো একটি মুহূর্তের মানবিক আবেদনকে গুরুত্ব দিয়েছেন, কেউ খুঁজেছেন শ্রম ও জীবিকার দৃশ্য, আবার কারও দৃষ্টিতে নদী, ফেরি ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক হয়ে উঠেছে ছবির মূল বিষয়। এভাবেই একটি পরিচিত স্থান ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে নতুন অর্থ ও ব্যঞ্জনা নিয়ে হাজির হয়েছে।
প্রদর্শনীর ‘এক ঘাট, অনেক গল্প’ ভাবনাটি তাই শুধু একটি শিরোনাম নয়; বরং আলোকচিত্রের বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রকাশ। একই ফেরিঘাটকে ৫৯ জন আলোকচিত্রীর চোখে দেখা এবং সেই দেখার অভিজ্ঞতাকে একটি সম্মিলিত প্রদর্শনীতে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়েছে একটি বৃহত্তর দৃশ্যকথন। এখানে প্রতিটি ছবি স্বতন্ত্র, অথচ সব কটি ছবি মিলে তৈরি করেছে একটি জনপদের জীবনচিত্র।
প্রশিক্ষণ থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতায় নবীন আলোকচিত্রীরা
আলোকচিত্রের প্রতি আগ্রহকে দক্ষতা ও সৃজনশীলতায় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ‘আলোর ইশকুল’-এর ফটোগ্রাফি কোর্সের এ আয়োজনেও শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তব পরিবেশে ছবি ধারণের অভিজ্ঞতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পাটুরিয়া ফেরিঘাটে দিনব্যাপী আলোকচিত্র ধারণের মধ্য দিয়ে অংশগ্রহণকারীরা একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে পর্যবেক্ষণ, মুহূর্ত নির্বাচন এবং দৃশ্যকে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছেন।
একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা আলোকচিত্রীকে শুধু দৃশ্য ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং চারপাশের পরিবেশ, মানুষের আচরণ, আলোর পরিবর্তন এবং একটি মুহূর্তের তাৎপর্য অনুধাবন করতেও সহায়তা করে। ফেরিঘাটের মতো গতিশীল ও বহুমাত্রিক পরিবেশে কাজ করার মধ্য দিয়ে নবীন আলোকচিত্রীরা এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তই বদলে যেতে পারে। সেই পরিবর্তনশীলতার মধ্য থেকে অর্থবহ দৃশ্য নির্বাচন করাই আলোকচিত্রচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
কোর্সের সমাপনীতে ৫৯ জন অংশগ্রহণকারীর নির্বাচিত আলোকচিত্র নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন তাঁদের শেখার অভিজ্ঞতাকে দর্শকের সামনে উপস্থাপনের একটি সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এটি প্রশিক্ষণপর্বে অর্জিত দক্ষতা, সৃজনশীল অনুসন্ধান এবং আলোকচিত্রের মাধ্যমে চারপাশের জীবনকে দেখার চর্চার একটি সম্মিলিত প্রকাশ।
আলোকচিত্রে সাধারণ মানুষের অসাধারণ উপস্থিতি
দৈনন্দিন জীবনের অনেক দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে প্রতিনিয়ত ঘটে। অভ্যাসের কারণে সেসব দৃশ্যের বিশেষত্ব অনেক সময় আলাদা করে চোখে পড়ে না। আলোকচিত্রের একটি বড় শক্তি হলো, পরিচিত সেই মুহূর্তকেই নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করা। একটি স্থিরচিত্র সময়ের প্রবাহ থেকে বিশেষ একটি মুহূর্তকে আলাদা করে ধরে রাখে এবং দর্শককে সেই মুহূর্তের অর্থ নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
‘ফেরিঘাটের জীবন’ প্রদর্শনীর বিষয়বস্তুও সেই বিবেচনায় তাৎপর্যপূর্ণ। ফেরিঘাটের মতো জনবহুল ও কর্মচঞ্চল স্থানে মানুষের জীবন নানা মাত্রায় প্রকাশিত হয়। সেখানে রয়েছে চলাচল ও অপেক্ষা, ব্যস্ততা ও বিরতি, জীবিকার তাগিদ ও গন্তব্যে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা। নদী ও ফেরিকে ঘিরে গড়ে ওঠা মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা একদিকে যেমন যোগাযোগব্যবস্থার অংশ, অন্যদিকে তেমনি বৃহত্তর সামাজিক জীবনেরও প্রতিফলন।
আলোকচিত্রের মাধ্যমে এসব দৃশ্যকে তুলে ধরার ফলে দর্শক একটি পরিচিত জায়গাকে নতুন করে দেখার সুযোগ পান। একই সঙ্গে ছবিগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতি মনোযোগী হওয়ার এবং সাধারণ দৃশ্যের ভেতরেও গল্প আবিষ্কারের অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে। এ ধরনের প্রদর্শনী আলোকচিত্রকে কেবল দৃশ্য ধারণের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং পর্যবেক্ষণ, অনুভব ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি সৃজনশীল ভাষা হিসেবেও সামনে নিয়ে আসে।
‘আলোর ইশকুল’-এর কোর্স সমাপনীতে নতুন যাত্রার সূচনা
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ‘আলোর ইশকুল’ কর্মসূচির ফটোগ্রাফি কোর্সের ১১তম ব্যাচের সমাপনী এ আয়োজন অংশগ্রহণকারীদের প্রশিক্ষণপর্বের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি নির্দেশ করে। তবে আলোকচিত্রচর্চার ক্ষেত্রে একটি কোর্সের সমাপ্তি নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন ও সৃজনশীল অনুসন্ধানের আরেকটি যাত্রার সূচনাও হতে পারে। প্রশিক্ষণ চলাকালে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পরিসরে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয় এ ধরনের প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে।
৫৯ জন অংশগ্রহণকারীর নির্বাচিত আলোকচিত্রকে একই পরিসরে উপস্থাপন করার ফলে দর্শকেরা একদিকে যেমন তাঁদের স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন, অন্যদিকে তেমনি একটি অভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে নির্মিত ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যভাষার সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। এই সম্মিলিত আয়োজন নবীন আলোকচিত্রীদের কাজকে দর্শকের সামনে তুলে ধরার পাশাপাশি আলোকচিত্রের প্রতি আগ্রহী মানুষের জন্যও একটি অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ক্ষেত্র তৈরি করবে।
প্রদর্শনীতে প্রতিটি আলোকচিত্রীর একটি করে ছবি স্থান পাওয়ার বিষয়টি আয়োজনটির সামগ্রিক ভাবনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এখানে কোনো একক দৃষ্টিভঙ্গি পুরো ফেরিঘাটকে ব্যাখ্যা করছে না; বরং ৫৯টি পৃথক দৃষ্টিভঙ্গি মিলেই তৈরি করছে একটি বিস্তৃত দৃশ্যকাহিনি। ফলে প্রদর্শনীটি একদিকে যেমন কোর্সের অংশগ্রহণকারীদের সৃজনশীল কাজের সম্মিলিত উপস্থাপনা, অন্যদিকে তেমনি একটি পরিচিত জনপরিসরকে বহুমাত্রিকভাবে দেখার আমন্ত্রণ।
৯ অক্টোবর থেকে শুরু প্রদর্শনী, চলবে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত
‘ফেরিঘাটের জীবন’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীটি ৯ অক্টোবর থেকে ১৭ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চিত্রশালায় দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। শুক্রবার ও শনিবার সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এবং রোববার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি দেখা যাবে।
পাটুরিয়া ফেরিঘাটের মানুষের জীবন, নদীকেন্দ্রিক যাতায়াত, শ্রম, অপেক্ষা ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার নানা মুহূর্তকে ৫৯ জন নবীন আলোকচিত্রীর চোখে দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে এ আয়োজন। একটি ঘাটকে ঘিরে অসংখ্য মানুষের বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও জীবনের গল্পকে আলোকচিত্রের মাধ্যমে আবিষ্কারের এই যাত্রায় দর্শকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে আয়োজকেরা।
একটি ঘাট, অথচ গল্পের শেষ নেই। সেই গল্পের কিছু মুহূর্তকে ফ্রেমবন্দি করে দর্শকের সামনে হাজির করেছেন ৫৯ জন নবীন আলোকচিত্রী। তাঁদের ছবিতে ফেরিঘাটের পরিচিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে মানুষের জীবনকে নতুন করে দেখার উপলক্ষ। ‘এক ঘাট, অনেক গল্প’—এই ভাবনাকে ধারণ করেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চিত্রশালায় চলবে ‘ফেরিঘাটের জীবন’ আলোকচিত্র প্রদর্শনী।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি