কার্যকর সমাধানের লক্ষ্যে সমস্যার মূলে যেতে হবে, নইলে দুর্গতি কমবে না

প্রকাশিত: ১০:৫৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০২৬

কার্যকর সমাধানের লক্ষ্যে সমস্যার মূলে যেতে হবে, নইলে দুর্গতি কমবে না

Manual1 Ad Code

বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ : বিশ্বে যুদ্ধোন্মাদনা আর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখে বিপন্ন মানুষ ভাবছে শান্তি কোথায়? বিশ্বের দেশে দেশে চলছে সম্পদ দখল, ভূ-রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সাম্রাজ্যবাদী দস্যুতা ও আগ্রাসী তৎপরতা। আর দেশে চলছে অনিয়ম অরাজকতা। জনগণের অধিকারের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম সত্ত্বেও শাসনক্ষমতা গণতন্ত্রের নামে বাস্তবে মোড়লি ব্যবস্থা অতিক্রম করতে পারছে না। বুর্জোয়া দল ও শক্তিসমূহের মধ্যে লুটপাটের নীতির ঐক্য থাকলেও গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব চরমে। পুঁজিবাদী অর্থনীতি আর বুর্জোয়া রাজনীতি সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্ভোগ বাড়ালেও ক্ষুদ্র একটি দাপুটে অংশের বাড়ছে সমৃদ্ধি, সুখ। দুর্নীতি, লোভ-লালসা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থপরতা যত বাড়ছে, ততই নীতি-নৈতিকতা আদর্শবাদিতা ক্রমাগত যাচ্ছে হারিয়ে। বুর্জোয়া রাজনীতির এটাই ফলাফল। এরা জনগণকে যতটা নামাতে পারবে, বুর্জোয়া গোষ্ঠী তত উপরে উঠবে। কিন্তু এর বিপরীত হলো বিপ্লবী রাজনীতি, উন্নত সংস্কৃতি, এখানে তা হয় না। তাই বামপন্থার রাজনীতি ও সংস্কৃতির উপর বুর্জোয়া শ্রেণির এত আক্রোশ-আক্রমণ।

ক্ষমতার মোহে, লোভে আর টিকে থাকার তাগিদে শাসকরা শুধু বন্দর নয়, দেশের স্বার্থ, জনস্বার্থ ইজারা দিতে কুণ্ঠিত হচ্ছে না। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কারা করছে? প্রতিবাদের শক্তি এখন রাজপথে, বামপন্থিদের কণ্ঠে মিছিলে বিক্ষোভে। শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে পার্লামেন্টকে সকল কাজের কেন্দ্র বলার একটা চল থাকলেও পার্লামেন্ট এক্ষেত্রে নীরব। তবে নিজেদের স্বার্থ, সুবিধা এবং অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে সংসদ সরগরম রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর এগুলোর প্রচার দিয়ে প্রচার মাধ্যম তাদের ভাসিয়ে রাখছে জনদৃষ্টির সামনে। জনগণের কাঁধে চেপে, জনস্বার্থ উপেক্ষা করে এভাবেই গণতন্ত্রকে বাস্তবে ভোটতন্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। ভোটের বাজারেও চরম বিশৃঙ্খলতা। তাই ডান্ডাতন্ত্র দিয়ে শাসানোর কথাও কেউ কেউ ভাবছে।

Manual7 Ad Code

ভালোর চেয়ে আরও ভালো নয় খারাপ আর অতি খারাপের মধ্যে গ্রহণ-বর্জনের মাপে দেশের হিসাবনিকাশ, দেশের প্রয়োজন বিবেচনায় নয় বিদেশি অঙ্কে মেলাবার ও মিটানোর চেষ্টা চলছে।

Manual5 Ad Code

ধর্মকে ব্যক্তিগত আচারনিষ্ঠার বদলে রাজনৈতিক ক্ষমতার সিঁড়ি ও সাম্প্রদায়িকতার জ্বালানিতে পরিণত করা হয়েছে। হাম-ডেঙ্গু, ক্যান্সারে যত প্রাণহানি হচ্ছে, তার চেয়ে অধিক সাম্প্রদায়িকতার বিষে মানসিক স্বাস্থ্যহানি ঘটছে। বিজ্ঞান শিক্ষা ও বিজ্ঞান মনস্কতার বদলে কারিগরি জ্ঞানসৃষ্ট ভোগ উপকরণ লাভের ও ভোগের তাড়না বাড়ছে। শিক্ষা বাস্তবে শিক্ষাহীনতা, অশিক্ষা ও কুশিক্ষা একদিকে, অন্যদিকে উচ্চমূল্যে অর্জিত সার্টিফিকেটে করপোরেট হাউসের যোগ্য সেবাকর্মী হওয়ার কথাই প্রাধান্যে আসে। একশত জন মানুষের মধ্যে ৫০ ভাগ দরিদ্র; গত এক বছরে নতুন করে ২১ লাখ মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে নেমে গেছে। অন্যদিকে ৬-৭ মাসে ২২ হাজারের উপরে কোটিপতি হয়েছে। আপেল-মাল্টা ইত্যাদি ফল আমদানি খরচ কেজিতে যদি হয় ৭০-৮০ টাকা বাজারে ৪৫০-৫০০ টাকা। মাছ-মাংস তো দূরের কথা, শাকসবজি, তরিতরকারিতে হাত দেওয়াও কঠিন। কর্মসংস্থান নাই বললেই চলে, অন্যদিকে ছাঁটাই রয়েছে অব্যাহত।

Manual2 Ad Code

বেকারত্ব এবং অপরাধ পাল্লা দিয়ে চলছে ক্রমবর্ধমান হারে। চিকিৎসা ব্যবস্থারই এখন চিকিৎসা প্রয়োজন। দেশের প্রধান সরকারি বিশেষায়িত ক্যান্সার হাসপাতালে রেডিওথেরাপির জন্য অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ছাড়িয়েছে। কোন কোন রোগীর সিরিয়াল পড়েছে ২০২৮ সালের শেষভাগে (বণিক বার্তা, ৩ অক্টোবর, ২০২৬)। ৮ মাসে ৩৬ নিখোঁজ শিশুর লাশ উদ্ধার। অন্যদিকে সারা দেশে ৩৮৬ কিশোর গ্যাংয়ের ৪ হাজারের বেশি সদস্য। ঢাকা মহানগরে ১৫৯ সদস্য (বণিক বার্তা, ২৩ সেপ্টেম্বর ২৬)। এই সংখ্যা বৃদ্ধি ও মাদকাসক্তির দলভারি হওয়া পরিবারের অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ৮ মাসে ২২৪ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করছে। ১৩ অক্টোবর ডেইলি স্টার পত্রিকা জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসের সহিংস চিত্র প্রকাশ করে একটি গবেষণার বরাত দিয়ে লিখেছে, এই সময়ে ২৫৩ নারী ধর্ষিত হয়েছে। এর মধ্যে ১২ জনকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে, ১ জন আত্মহত্যা করেছে। ২২০ নারী যৌন হয়রানির শিকার, তার মধ্যে ১০৩ শিশু। যৌতুক আদায় সন্ত্রাসে ১৩ নারী হত্যা, ১৭ আহত ও ২ জন আত্মহত্যা করেছে। পারিবারিক সংঘাতে ১৩৭ নারী নিহত, ৬৮ আহত এবং ৭২ জন আত্মহত্যা করেছেন। শারীরিক-মানসিক নির্যাতনে ৭৩৩ শিশুর মধ্যে ১৮৯ জনের মৃত্যু, ৫৪৪ জন লাঞ্ছিত। রাজনৈতিক সংঘাতের ১৮৩ ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যু, ১ হাজার ২২৭ জন আহত; বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও অন্যদের সাথে বিরোধে।

বিএনপি দলের ৬৯টি অভ্যন্তরীণ বিরোধে ৯ জনের মৃত্যু, ৫৪০ আহত। বিএনপি-জামায়াত ৪১টি সংঘাতে ১ জনের মৃত্যু, ৩৩৮ জন আহত। মব সন্ত্রাসে ৫৪ মৃত্যু, ১৪৫ আহত ১৩৭টি ঘটনায়। কারাগারে ৩৭ মৃত্যু। এর মধ্যে ১৪ জন সাজাপ্রাপ্ত, ২৩ জন বিচারাধীন। নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতনে ৬ জনের মৃত্যু। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী ১৮টি সভা ও মিছিলে বাধা দিয়ে হামলা করে ১২৮ জনকে আহত, ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। ৮৮টি ঘটনায় ১৩৫ সাংবাদিক হেনস্তার শিকার, যার মধ্যে ৬৩ আহত, ২৭ জন অপদস্থ, ৯ জনকে মৃত্যুভয় দেখানো হয়েছে। কর্মস্থলে ১৬৪ শ্রমিক নিহত নিরাপত্তাহীনতা ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে। ২৫১ ঘটনায় শ্রমিক নির্যাতনে ৭১ জন নিহত, ২৬০ জন আহত। ১ গৃহকর্মী খুন, ৩ জনের মৃত্যু রহস্যজনক, যার মধ্যে ২ জন শিশু। সংখ্যালঘুদের উপর ৬টি সহিংস ঘটনায় আহত ৬ জন। ২টি মন্দির, ৫টি প্রতিমা ভাঙচুর এবং ৪টি বাড়িতে লুটপাট হয়েছে।

ধান উৎপাদনে কৃষকের ব্যয়—বীজ-সার, কীটনাশক, সেচ-শ্রম ও জমি প্রস্তুত ইত্যাদির খরচ ৫ বছরে ২৫% বেড়েছে। অথচ ফসলের সঠিক মূল্য এবং বাজারমূল্য কোনোটাই কৃষক পায় না। উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত যারা তারা ন্যায্য পাওনা পায় না আর মধ্যস্বত্বভোগীরা বিনা শ্রমে পুঁজি বাড়ায়। পরিবারে-সমাজে, রাষ্ট্রে, প্রশাসনে, আইনকানুনে, বিধিবিধানে, সম্পর্ক-সম্বন্ধে, সর্বক্ষেত্রে মুষ্টিমেয়ের উন্নতি আর গরিষ্ঠ জনতার অবনতি।

Manual3 Ad Code

এর উৎস যে পুঁজিবাদ আর এর প্রতিকার যে পুঁজিবাদ উচ্ছেদের সংগ্রামের মাঝে নিহিত, এ বোধের উদয় না হওয়া পর্যন্ত সুদিনের স্বপ্ন জাগবে না, মানুষের মধ্যে উন্নত সামাজিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটবে না। সাংস্কৃতিক অবক্ষয় যে সভ্যতার ক্ষয় ঘটায়, তা অনেক নগ্নরূপে প্রকাশিত হলেও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের তাগিদ তৈরি হচ্ছে না। এই সর্বগ্রাসী অবক্ষয়ের হাত থেকে মুক্তি পেতে চাইলে বাম প্রগতিশীল রাজনীতি ও তার পরিপূরক অগ্রসর সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বিকল্প নেই। সেই সংগ্রামের, অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ বিরোধী সংগ্রাম ও তার পরিপূরক সাংস্কৃতিক আন্দোলনই কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ নিকটবর্তী করবে। সমাজের এবং নিজের জীবনের সংকট দেখে হাহাকার করলে সমাধান ও স্বস্তি আসবে না। প্রয়োজন সমস্যা সমাধানে প্রতিরোধ আন্দোলন। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি আগামী দিনে সেই সংগ্রামকে মুখ্য এবং প্রধান করে তুলতে বদ্ধপরিকর। প্রয়োজন সামাজিক শক্তির সক্রিয় অংশগ্রহণ। তাই আমরা আহ্বান জানাই, আসুন বহু আন্দোলনের অভিজ্ঞতায় গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণের সংগ্রামে এগিয়ে আসি। মানবমুক্তির সত্যিকার শক্তি বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ও বামপন্থাকে দৃশ্যমান করি। শোষণ বৈষম্যের অবসান ঘটাতে তাই সব বাম গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তির প্রতিও আহ্বান, মূল লক্ষ্যে পৌঁছাতে আসুন ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম এগিয়ে নেই।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ